সাংবাদিকতা: ‘প্রেস’ ব্যবহারে নীতিমালা চাই

রবিবার, নভেম্বর ১১, ২০১২

:: কাজী আলিম-উজ-জামান ::

pressসাংবাদিকতার জায়গা থেকে প্রেস শব্দটির অর্থ হলো সংবাদপত্র, সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকেরা। তবে সাংবাদিকতা বেশ কয়েক দশক ধরে আর সংবাদপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন ইলেকট্রনিক সাংবাদিকতার বাড়বাড়ন্ত। এর পরে আছে অনলাইন সাংবাদিকতা। আছে ব্লগ। তা ছাড়া ফেসবুক, টুইটারের মতো সোশ্যাল মিডিয়াও এখন অনেকটাই সাংবাদিকতা করছে। প্রেস শব্দটির অতি আধুনিক বাংলা তাই ‘সংবাদক্ষেত্র’।
প্রেস শব্দটির গভীরে লুকিয়ে আছে দায়িত্ববোধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ একজন পেশাদার সাংবাদিকের কর্মচাঞ্চল্য, খবরের সন্ধানে তাঁর সবেগে ছুটে চলা। একজন সাংবাদিক তাঁর ব্যক্তিগত বাহনে ‘প্রেস’ শব্দটি স্টিকার হিসেবে ব্যবহার করেন। কারণ, এটা তাঁর পেশার স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে। এটা তাঁকে লক্ষ্যে পৌঁছতে সহায়তা করে। তথ্য সংগ্রহের কাজে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো বাধার মুখে তাঁকে পড়তে হয় না। তাই দায়িত্বরত থাকাকালে সাংবাদিক ‘প্রেস’ লেখা স্টিকার ব্যবহার করবেন, এটাই যুক্তিযুক্ত, এটাই ন্যায়সংগত।
আবার কোনো গোপন তথ্য উদ্ধার করতে গেলে ব্যক্তিগত বাহনে ‘প্রেস’ না লেখাই শ্রেয়। কারণ, সাংবাদিক এসেছেন জানাজানি হয়ে গেলে প্রকৃত তথ্য বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন ‘প্রেস’ স্টিকারের ব্যবহার নিয়ে রীতিমতো নৈরাজ্য চলছে। সাংবাদিক-অসাংবাদিক, সন্ত্রাসী-দুর্বৃত্ত সবাই যত্রতত্র ‘প্রেস’ লেখা স্টিকার তাঁদের বাহনে ব্যবহার করছেন। এর কারণ, কে বা কারা বা কখন ‘প্রেস’ লেখা স্টিকার ব্যবহার করতে পারবেন, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা, নীতিমালা বা আইন এ দেশে নেই।

২.
প্রশ্ন উঠেছে, একজন সাংবাদিক যখন দায়িত্বে থাকেন না, তখন তাঁর বাহনে প্রেস স্টিকার লেখা কতটুকু যৌক্তিক? সাংবাদিক যখন কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে যান বা কোনো ব্যক্তিগত কাজে যান, তখন প্রেস স্টিকার ব্যবহার কতটুকু শোভনীয়। অনেকে বলতে পারেন, পেশাদার সাংবাদিকের কোনো ‘ডিউটি আওয়ার’ নেই।
এটা একটা যুক্তি বটে। তবে এটি নিয়েও দীর্ঘ আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এর বিপরীত কথা হচ্ছে, আজকাল অধিকাংশ গণমাধ্যমেই সাংবাদিকের কর্মঘণ্টার ব্যাপারে একটা শৃঙ্খলা এসেছে।
পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, সাংবাদিকদের বাহনে একবার প্রেস স্টিকার লাগানো হলে সেটা আর খোলা হয় না। আর যখন ওই বাহনটি সাংবাদিকের কোনো আত্মীয়-পরিজন ব্যবহার করেন, তখনো স্টিকারটি শোভা পায়। এ কারণে চলতে-ফিরতে দেখি কমিউনিটি সেন্টারের সামনে অসংখ্য প্রেস স্টিকার লাগানো গাড়ি। ভেতরে একজনও সাংবাদিক নেই। আছেন সেজেগুজে গাদাগাদি করা বসা নারী-পুরুষ-শিশুর দল। এক শুক্রবার দুপুরে যাত্রাবাড়ীতে এক সরু গলির মধ্যে দেখলাম তিনটি প্রাইভেট কার আর রাস্তার ওপর দাঁড়ানো দুটি মাইক্রোবাস। একটি মাইক্রোবাসে ও একটি প্রাইভেট কারে একটা টিভি চ্যানেলের নাম লেখা স্টিকার। গলির মধ্যে কোনো অনুষ্ঠানে তাঁরা এসেছেন। মাইক্রোবাসটি রাস্তায় অনাকাঙ্ক্ষিত যানজট সৃষ্টি করেছে। যেহেতু মাইক্রোবাসের গায়ে একটি টিভি চ্যানেলের নাম লেখা, কেউ কিছু বলতেও সাহস করছে না। দায়িত্বরত ট্রাফিক কর্মকর্তাও কোনো মামলা দেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন না। দুই ক্ষেত্রেই সংগত ছিল, প্রেস বা টিভির নাম লেখা স্টিকার খুলে তারপর বাহনটি ব্যবহার করা। এখানে বাহনটির যিনি মালিক, তাঁর সচেতনতা কাম্য ছিল।
অপর দিকে গণমাধ্যম অফিসে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা সবাই সাংবাদিক নন। বাস্তবতা হলো, গণমাধ্যম অফিসের সাংবাদিক, অসাংবাদিক সবাই যত্রতত্র প্রেস ব্যবহার করছেন। এটা বলা নিশ্চয় অন্যায় হবে না, ভাঙা কলস যেমন বেশি বাজে, তেমনি রাস্তায় নেমে প্রেসের দাপট দেখিয়ে এই অসাংবাদিকেরাই বেশি আস্ফাালন দেখান।

৩.
ঢাকার বাইরের চিত্রটা আঁতকে ওঠার মতো। যে দৈনিকটি বাজারে দেখা যায় না, প্রকাশনা অনিয়মিত অথবা যে সাপ্তাহিক প্রতি তিন বা চার মাসে একবার বেরোয়, যাদের অফিসের ঠিক নেই, তাদের হয়তো সাংবাদিক আছেন ডজন ডজন। মাসে এক কলাম না লিখেও তাঁরা বড় সাংবাদিক। অনেকে মোটরসাইকেলের সামনে বড় করে লেখেন, ‘সাংবাদিক’ বা ‘প্রেস’। চাঁদাবাজি তাঁদের পেশা, সমাজে পরিচিত তাঁরা উৎপাত সৃষ্টিকারী হিসেবে। এঁদের অনেকের কাছেই তিন-চারটা সংবাদপত্রের পরিচয়পত্র। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের কিছু বললে তাঁরা পরিচয়পত্র দেখিয়ে দিচ্ছেন। কিছুই করার থাকছে না।
ঢাকার আশপাশের সাংবাদিকতার চিত্রটা আরও শোচনীয় এবং শিউরে ওঠার মতো। সাভার-আশুলিয়া অঞ্চলে সাংবাদিকের সংখ্যাটা হাজার খানেকের কম হবে না। এঁদের কারও কারও তিন-চারটা প্রাইভেট কার। আর প্রতিটি গাড়িতে ওই গণমাধ্যম, বিশেষ করে টিভি চ্যানেলের স্টিকার লাগানো থাকে। কোনো সাংবাদিক হয়তো চোরাই গাড়ি ব্যবহার করেন, কিন্তু সেই গাড়িতে টিভি চ্যানেলের স্টিকার। কেউ হয়তো তাঁর মাইক্রোবাসটি কোনো হাসপাতাল বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভাড়া দিয়েছেন, সেখানেও চ্যানেলের স্টিকার।
আরেকটি প্রবণতা আছে। যে শিল্প গ্রুপের কথিত গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান আছে, সেই শিল্প গ্রুপের সব গাড়িতে ওই গণমাধ্যমের স্টিকার ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি ইট, বালুসহ অন্যান্য মালবাহী ট্রাক, পিকআপেও অমুক সংবাদপত্র, অমুক চ্যানেল স্টিকার।
জেলা শহরে অনেক পেশাদার সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপ করে দেখেছি, এসব ‘প্রেস’ স্টিকারধারী সাংবাদিকের কারণে তাঁদের সারা জীবনের অর্জন যে ভাবমূর্তি, তা আজ বিপন্ন। এঁদের কারণে সংশ্লিষ্ট জেলার প্রকৃত, ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকদের বদনামের ভাগীদার হতে হচ্ছে। অনেকেই লজ্জায় নিজেদের বাহনে প্রেস কথাটি লেখার ঝুঁকি নিচ্ছেন না।

৪.
ভারত, এমনকি পাকিস্তানের গণমাধ্যম যতটা শক্তিশালী, আমাদের গণমাধ্যম হয়তো ততটা শক্তিশালী হতে পারেনি। তার পরও বলতে হবে, গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে দেশের গণমাধ্যমের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। সংসদ অকার্যকর, তাই গণমাধ্যম ছাড়া সরকারের জবাবদিহি করার আর কোনো জায়গা নেই। স্বাধীন, শক্তিশালী গণমাধ্যম দেশের সাধারণ জনগণের বিরাট আস্থার এক জায়গা। স্বাধীনতার চার দশকে দেশের যদি কয়েকটা অর্জন থাকে, তার একটি নিঃসন্দেহে এ দেশের গণমাধ্যম।
তাই সাংবাদিকতা পেশাটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যেখানে যেখানে কাজ করার কথা, যে নীতিমালা বা বিধিবিধান প্রণয়নের কথা, সেগুলো শুরু করতে হবে। এই কাজের জায়গাগুলো একটি নিজেদের বাহনে ‘প্রেস’ স্টিকারের সঠিক ব্যবহার। সাংবাদিকতা গায়ের জোরে হম্বিতম্বি করার মতো পেশা নয়। সাংবাদিকতা একটি বুদ্ধিবৃত্তিক, মননশীল পেশা। তাই পেশাদারি, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার স্বার্থে ‘প্রেস’ স্টিকার ব্যবহারের একটি নীতিমালা প্রণয়নের জন্য জোর আহ্বান জানাই।

কাজী আলিম-উজ-জামান: সাংবাদিক।
alim_zaman@yahoo.com

সৌজন্যে: প্রথম আলো