পাঠক ও পত্রিকা

সোমবার, ২১/০৩/২০১৬ @ ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ

:: মাহমুদুল হক আনসারী ::

man reading newspaperসংবাদপত্রকে সমাজের আয়না বলা হয়। দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ, সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, সুবিধা-অসুবিধা, ন্যায়-অন্যায় উঠে আসে পত্রিকায়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামজিক, সংস্কৃতি, সভ্যতা, উন্নতি অগ্রগতি প্রচারে পত্রিকার অবদান লিখে শেষ করা যাবে না। পত্রিকার মাধ্যমে জনগণ দেশ বিদেশের নানা ধরনের খবরাদি, তথ্যাবলী জানতে পারে।

রাষ্ট্রীয় খবর থেকে আরম্ভ করে গ্রাম-গঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ সব খবরই সংবাদপত্রে প্রকাশ হচ্ছে। দেশে প্রতিদিন জাতীয় ও স্থানীয়ভাবে কয়েক হাজার সংবাদপত্র প্রকাশ হচ্ছে। প্রতিটি জেলা শহর হতে সংবাদপত্র প্রকাশিত প্রচারিত হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন কোন না কোন এলাকা হতে নতুন নতুন সংবাদপত্র নতুন আঙ্গীকে বের হচ্ছে, আবার কখনো ঐতিহ্যবাহী কিছু কিছু পত্রিকা নানা কারণে প্রকাশিত হচ্ছে না। অনুকূল প্রতিকুল দুটোই এ প্রকাশনায় দেখা যায়। কারো জন্য সুদিন, কারো দুর্দিন।

পত্রিকা প্রকাশ, প্রচার, মার্কেটিং, পাঠক সমর্থন অর্জন করা, বর্তমান সময়ে চ্যালেঞ্জিং। পত্রিকার প্রকাশক, সম্পাদক, সংবাদের পরিবর্তনের সাথে পাঠকের সমর্থন রুচির ও পরিবর্তন দেখা যায়। দিন দিন এক বিত্তশালী মানুষের কাছে এ শিল্পের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে বলে মনে হয়। সংবাদপত্র একটি মেধা সম্পন্ন শিল্প।

এ শিল্পের সাথে অনেক যোগ্যতা সম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট সার্টিফিকেটধারী শিক্ষিত যুবক, লেখক, প্রাবন্ধিক, বুদ্ধিজীবী জড়িত। মেধা সম্পন্ন একটি বিশাল সম্পাদক লেখক এ শিল্পকে লালনে পালনে মননে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের অবদান ত্যাগ নিষ্ঠা, কর্মদক্ষতা অপরিসীম, দেশে নিয়মিত অনিয়মিত প্রচুর সংখ্যক সংবাদপত্রের মধ্যে যেসকল সংবাদপত্র নিয়মিত প্রকাশিত হয়। সেসব পত্রিকা নিয়েই মূলত এ লেখা।

জাতীয়, স্থানীয়ভাবে সে সকল পত্রিকা প্রচারিত হচ্ছে তাতে সংবাদপত্রের একটি অংশ জুড়েই আছে বিশাল আকারের বিজ্ঞাপন। পত্রিকা খুললেই প্রথমে বিজ্ঞাপন। সংবাদের পূর্বেই বিজ্ঞাপন, অনেক ক্ষেত্রে সংবাদই বিজ্ঞাপন হিসাবে সংবাদপত্রে দেখা যায়। অথচ সংবাদপত্রের উদ্দেশ্য মানুষ, সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প বানিজ্য নিয়ে কথা বলবে। মানুষ সমাজ রাষ্ট্রের সুখ শান্তি, হাসি-কান্নার কথা বলবে।

রাজনীতি, অপরাজনীতি, স্বৈরচার, গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র নিয়ে কথা বলবে। গণতন্ত্রের পক্ষে স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে লিখবে। এটাই জনগণ চায়। দেশ মাটি মানুষের কথা বলতে গিয়ে অর্থনীতি, শিল্প, বাণিজ্য, ভূমিদৃশ্য, জাল দলিলসৃজন, কালোবাজারী, মুনাফাখোরী মওজুদদারী ঋণ খেলাপীদের মুখোশ উন্মোচন থাকা চায়। আজকের সংবাদপত্র পাঠক প্রত্যাশা হল সর্বস্তরের গণমানুষের চিন্তা চেতনার প্রতিফলন ঘটানো। বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিভিন্নভাবে সংবাদ পরিবেশন দেখা যায়।

জাতির বিবেক সংবাদপত্রকে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে নিয়োজিত রাখতে পারলে এ শিল্পের মান আরো বৃদ্ধি পাবে। সঠিক সংবাদ উল্টো সংবাদ দুটো সংবাদই সংবাদপত্রে দেখা যায়। বুস্তু, নিষ্ট সংবাদ কতিপয় পত্রিকা এড়িয়ে যেতে দেখা যায়। সংবাদের যোগ্যতা নেই এমন সংবাদও গুরুত্বপূর্ণ কলামে দেখা যায়। তথ্যবহুল সংবাদ ছাপা হয় না সে রকম অনেক সংবাদ পত্রিকা সমূহ এড়িয়ে যায়।

স্থানীয় পত্রিকায় স্থানীয় সংবাদ, সংগঠন ক্লাব, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, গীর্জার, রাস্তা, ব্রীজ ইত্যাদির গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছাপা হয় না। অথচ স্থানীয় পত্রিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সংবাদ প্রচার পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হচ্ছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সুখ-দু:খের বিচার বিশ্লেষনের কথা যেভাবে বলার কথা ছিল কিন্তু তা পাবলিষ্ট হচ্ছে না। সামাজিক রাজনৈতিক অর্থনৈতিক মুক্তির কথা যে ভাবে বলার কথা ছিল তা বলা হচ্ছে না।

সামাজিক সংগঠন ক্লাব সমিতির কথা যেভাবে বলার কথা ছিল তা স্থানীয় পত্রিকায় প্রচারিত হচ্ছে না। পাঠক অনেক আশা আকাঙ্খা রাখে স্থানীয় পত্রিকায় কিন্তু তার প্রতিফলন পত্রিকার পক্ষ হতে অনেকাংশে সম্ভব হয় না। দেখা যায় পত্রিকার পাঠক তাদের স্থানীয় সংবাদ যখন পাবলিষ্ট হতে দেখে না তখন তারা ঐ প্রকাশনার প্রতি বিরূপ মনোভাব প্রতিক্রিয়া দেখায়। দুঃখ-কষ্ট পায় সংবাদপত্রের উপর, সংবাদপত্র শিল্প হলেও অন্যে শিল্প থেকে এর দূরত্ব অনেক বেশী।

অর্থ আয়ের শিল্প হিসেবে এ শিল্পকে নেয়া যাবে না। সমাজ, রাষ্ট্র মানুষ, ধর্ম-কৃষ্টি কালচারের উন্নতি, অগ্রগতি, মানুষের ভালবাসা পাওয়ার চিন্তা-চেতনা থাকতে হবে। সংবাদ পত্রের প্রকাশক, সম্পাদক হওয়ার পর পাঠকের চিন্তা চেতনা মনের কথা বুঝতে হবে তাদের মনের কথা সংবাদপত্রে প্রচারে আসলেই সংবাদপত্রের মূল লক্ষ্য উদ্দেশ্য সফল হবে। পাঠক চায় গ্রামগঞ্জের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্ম, কৃষ্টি, কালচার, ইতিহাস, ঐতিহ্য ব্যাপকভাবে ধারাবাহিকভাবে আসুক।

চট্টগ্রামে বেশ কিছু দৈনিক, সাপ্তাহিক, মাসিক পত্রিকা প্রকাশ হলেও বাস্তবে চট্টগ্রামের ইতিহাস ঐতিহ্য, কৃষ্টি কালাচার প্রচার প্রসারে এ সকল পত্রিকার প্রচার তেমনভাবে চোখে পড়ে না। বিজ্ঞাপন, ব্যবসাবান্ধব প্রকাশনা হিসেবে দেখা যায়। চট্টগ্রামে প্রায় সব প্রকাশনাকে, সংবাদ, ইতিহাস, ধর্ম, সভ্যতা, সকল প্রচার যোগ্য সংবাদ প্রকাশ করে বিজ্ঞাপন প্রচার প্রসার, কবলে পাঠকের কোন অভিযোগ থাকার কথা নয়।

গ্রামগঞ্জের, শহরতলীর ব্যাপক সংবাদ প্রচারের মত নিজউ থাকলেও তা প্রচারিত হয় না। জনগণের দর্শন পত্রিকা, সংবাদ প্রকাশের উদ্দেশ্য প্রতিষ্ঠিত এ সংবাদ মাধ্যম প্রথমে জনগণের বস্তু, নিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করবে, জনগনের গণতন্ত্রের কথা বলবে, মানবাধিকার, খাদ্য ভেজাল, মওজুদদারী, মোনাফাখোরীদের বিরুদ্ধে বস্তু, নিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশিত হবে সেটাই আশা রাখে সিংহভাগ পাঠক সমাজ, স্থানীয় পাঠকদের চাহিদা বিরোধী সংবাদ, কলাম, নিউজ, সংবাদপত্রে অধিক হারে প্রকাশিত হউক সেটা পাঠকের কাম্য নয়। পত্রিকার কালারে চেয়ে প্রকাশিত নিউজের মান কি পর্যায়ে সেটাও প্রকাশক সম্পাদককে নির্ণয় করা দরকার, বিজ্ঞাপন, প্রকাশ হওয়ার জন্য পত্রিকা এ কথা দুরে রাখা দরকার।

পত্রিকার উদ্দেশ্য রাখতে হবে পাঠক সন্তুষ্টি। এলাকার সমস্যা চিন্থিতকরণ, সমাধানের পথ পরামর্শ সমাধান কোন পথে, পত্রিকা যদি সমাজ ও পাঠকের জন্য হয় তাহলে সমাজ ও পাঠক সমস্যাকে সামনে আনতে হবে। সমাজ ও পাঠকের সমস্যা আগে। বিজ্ঞাপন, বিনোদন, বিদেশ সংবাদ পরে আনুন। সমাজের গৃহহীন, ছিন্নমুল, দরিদ্র, ভাসমান মানুষের সুখ-দুঃখের সংবাদ গুরুত্বের সাথে থাকা চাই। পঁচাত্তর পারসেন মানুষ গ্রামে বাস করে। তাদের সংবাদ গুরুত্ব না পেলে ঐ পত্রিকা জনমার্কেট ধরে রাখতে পারবে না। জনগণের সংবাদ খবর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রচার করতে হবে।

প্রচার হউক তাই চায়, সর্বস্তরের সামাজিক, রাজনৈতিক, পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিগণ, পত্রিকা প্রকাশের যেমন শেষ নেয় তেমনিভাবে সময়ের চাহিদা পূরণে জনগণের কথা বলার জন্য প্রকাশনাকে আরো সাহসী ভূমিকা রাখতে হবে। স্থানীয় প্রশাসনের নানাবিধ জনভোগান্তি আরো ব্যাপকভাবে উঠে আসা দরকার। প্রকাশনা শিল্পে যারা জড়িত তাদের সুখ-দুঃখের কথা চিন্তা করে তাদের রুটি রুজির সঠিক চিন্তা সমাধান প্রকাশক, সম্পাদকদের থাকা চাই।

ফলে এ শিল্পের পেশাজীবীগন সত্য, নিষ্ঠা, ত্যাগ ও সেবা দিয়ে এ শিল্পকে আরো গতিশীল করতে পারবে। পত্রিকা প্রকাশনার সাথে জড়িত বিশাল মেধাবী ত্যাগী, সংবাদকর্মীগন তাদের প্রয়োজনীয় বেতন ভাতা না পেলে এ পেশায় ঠিকে থাকা কঠিন হবে। প্রকাশনার ভবিষ্যত ভালো হবে না। পত্রিকার এ প্রকাশনাকে জনকল্যান, দেশ সেবা, মানবদরদী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে এসব বিষয়ে প্রকাশক, সম্পাদক, রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবে আরো কল্যাণকর উপকার দেশ ও জনগণ ভোগ করতে পারবে, প্রকাশনা শিল্পকে দল নিরপেক্ষ হিসেবে দেখতে চাই।

গণতন্ত্রের পক্ষে, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের পক্ষে, মানবতার পক্ষে কথা বলুক, জনগনের দাবী সেটাই। ভূমিদস্যু, কালো টাকার মালিক, মানবপাচারকারীর বিরুদ্ধে তথ্য প্রমাণ ভিত্তিক সংবাদ আরো থাকা চায়। মাদকদ্রব্যে, পাচার, যুব সমাজের চারিত্রিক, নৈতিক অধ:পতন সম্পর্কে ব্যাপকভাবে লেখালেখি প্রচার হওয়া চাই।

সমসাময়িক লেখকদের প্রবন্ধ, নিবন্ধ, গুরুত্বের সাথে চাপা হউক। এসব সম্মানিত লেখকদের সম্মানি সুযোগ সুবিধা, তাদের মেধাকে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করা হউক। সব মিলে প্রকাশনাকে চাই দলীয়মুক্ত, রাজনীতিমুক্ত, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের পক্ষে মা মাটি মানুষ, মাতৃভূমি গনতন্ত্রের পক্ষে।

লেখক: প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম।