মফস্বল সাংবাদিকতায় ঝুঁকি বাড়ছে

বৃহস্পতিবার, ২৮/০৩/২০১৩ @ ৭:১০ অপরাহ্ণ

আহসান হাবিব বুলবুল::

mofossol journalগত এক দশকে বাংলাদেশে সংবাদপত্র ও টেলিভিশন সাংবাদিকতার প্রভূত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। সাংবাদিকতার পরিধির বিস্তার ঘটেছে। সাংবাদিকতা এখন রাজধানীর বাইরে গ্রামীণ জনপদে বিস্তৃত হয়েছে। ক্রম অগ্রসরমান সাংবাদিকতায় পেশাগত ঝুঁকিও বেড়েছে সমানতালে। বিশেষ করে মফস্বল সাংবাদিকতায় ঝুঁকি বেড়েছে বেশি।

কিছুদিন আগেও সংবাদপত্রগুলোতে গ্রামের সমস্যা সম্ভাবনা ও সাধারণ মানুষের সুখ-দুখের খবরকে মফস্বল সংবাদ নামে অভিহিত করা হত। বর্তমানে মফস্বল সংবাদ কথাটি বেশ সেকেলে। বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামোর বেশকিছু পরিবর্তনের কারণে যে ধরনের নগরায়ণ, জীবন জীবিকার মান ও গ্রামের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে, তাতে রাজধানীর বাইরে স্থান কাল পাত্র গুরুত্ব পাচ্ছে। অবাধ তথ্যপ্রবাহের কারণে নগরের সঙ্গে গ্রামের দূরত্ব কমে আসছে। একটা সময় ছিল যখন একমাত্র ঢাকা মহানগরীকে সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু মনে করা হত। রাজধানীর সংবাদপত্রগুলোতে তাই অধিকাংশ খবরই থাকতো ঢাকার। বহির্বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও স্থান পেত। পত্রিকার প্রথম পাতায় গ্রামের মানুষের কথা তেমন একটা দেখা যেত না। অবশ্য দু’একটি ঘটনা পরিস্থিতি সারাদেশ বা জাতিকে প্রভাবিত করতে পারলে সে কথা ছিল ভিন্ন। রাজধানীর বাইরের অন্যসব সাধারণ খবরকে মফস্বলের খবর বা গ্রাম বাংলার খবর নাম দিয়ে ভেতরের পাতায় পরিবেশন করা হত। আর যিনি এই খবর সংগ্রহ করে বা লিখে পাঠাতেন তাকে মফস্বল সংবাদদাতা বলে দায়িত্ব সারা হত। এখন এ দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাচ্ছে। তার একটা বড় কারণ হল দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর বাস রাজধানীর বাইরে। পত্রিকা পাঠকদের একটা বড় অংশও থাকে ঐ গ্রামে এবং ক্রমেই তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। দ্রুত পৌঁছার সুবাদে আঞ্চলিক দু’একটি পত্রিকার কাটতি রাজধানী থেকে প্রকাশিত কোন কোন পত্রিকার চাইতে বেশি। আর এ কারণেই টেলিভিশন সাংবাদিকতার প্রসারও ঘটছে দ্রুত।

পাঠকের চাহিদা খবরের উৎস ও বিবর্তনের কথা বিবেচনায় এনে ঢাকার পত্রিকাগুলো গ্রামীণ জনপদের খবর এখন সর্বশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করছে। পাতার শিরোনামেও লেগেছে পরিবর্তনের ছোঁয়া। এসব স্থানের খবরকে ‘‘রাজধানীর বাইরে’’, ‘‘জাতীয় সংবাদ’’, ‘‘দেশের খবর’’ ও ‘‘গ্রাম-গঞ্জ-শহর’’ প্রভৃতি নামে অভিহিত করা হচ্ছে। আজকাল বড় পত্রিকাগুলো দু’থেকে তিন পৃষ্ঠা জুড়ে ঢাকার বাইরের খবর ছাপাচ্ছে। তাই মফস্বলের খবর এখন পত্রিকার প্রাণ।

গ্রাম বাংলার পথে প্রান্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে খবরের নানা উপাদান প্রতিদিন ঘটছে বিচিত্র সব ঘটনা। একজন মফস্বল সাংবাদিক সেই তৃণমূল পর্যায় থেকে খবর সংগ্রহ করে পত্রিকা অফিসে (ডেস্কে) পাঠান। বর্তমানে মফস্বল সাংবাদিকদের কাজের পরিসর বেড়েছে। তাদের নির্দিষ্ট কোন বিট নেই। তাদের একাধারে ক্রাইম, রাজনীতি, প্রশাসন, খেলাধুলা সকল বিষয়ের রিপোর্টই পাঠাতে হয়।

বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মাথায় নিয়েই একজন সাংবাদিককে খবরের পিছনে ছুটতে হয়। আর্থিক দৈন্য, যোগাযোগ অব্যবস্থা, সন্ত্রাসীদের রক্তচক্ষু ও প্রভাবশালীদের হুমকি এসব সামাল দিয়েই একজন মফস্বল সাংবাদিককে মাঠে কাজ করতে হয়।

তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা যার বিরুদ্ধে রিপোর্টটি লিখছেন তার সামনে পড়তে হচ্ছে পরক্ষণেই। আর তাই তাদের আতঙ্কটা থেকেই যায় সব সময়। সাংবাদিকরা এই ঝুঁকির সঙ্গেই বসবাস করেন আজীবন। চাকরি না পাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে তাদের জীবন শুরু হয়, পরে ধারাবাহিকভাবে যুক্ত হয় নিয়োগ পত্র না পাওয়ার ঝুঁকি, পেলেও তা বিধিসম্মত না হওয়ার ঝুঁকি, বেতন না পাওয়ার ঝুঁকি, পেলেও ওয়েজবোর্ড রোয়েদাদ অনুযায়ী না পাওয়ার ঝুঁকি, কাজ করতে গিয়ে আইনের মারপ্যাঁচে পড়ার ঝুঁকি। এর পাশাপাশি থাকে যে কোনও সময় চাকরি চলে যাওয়ার ঝুঁকি। চাকরি চলে গেলেও সুযোগ-সুবিধা ও বকেয়া বেতন না পাওয়ার ঝুঁকি তো আছেই। এসব ঝুঁকি রাজধানী ও রাজধানীর বাইরের সাংবাদিক উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। বর্তমানে এসবের সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রাণনাশের ঝুঁকি।

মফস্বল সাংবাদিকতায় এ ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে আরও বেড়েছে। কিন্তু কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যেটা প্রতীয়মান হয় সেটা হলো, ঢাকায় কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে সেই সাংবাদিকের সহকর্মীরা প্রতিবাদ করে লেখে। ফলে পুলিশকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হয়। কিন্তু মফস্বলের সাংবাদিকরা একেবারে একা। একটি পত্রিকার মফস্বল সংবাদদাতা একজনই। তাকে টার্গেট করা সহজ। তাকে কাজ করতে হয় একা এবং আক্রান্ত হলে তাকে সাপোর্ট দেয়ার মতো কেউ থাকে না। পত্রিকার মফস্বল প্রতিনিধিকে সহজে জানা যায়, চেনা যায়, তাকে টার্গেট করা সোজা এবং তার ওপর আক্রমণটাও শহরের তুলনায় বেশি। সাম্প্রতি কালে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো বেশিরভাগই আঞ্চলিক পর্যায়ের। বাংলাদেশে সাংবাদিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাংবাদিকদের নির্যাতন ও হয়রানির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই অঞ্চলে চোরাচালান, নিষিদ্ধ রাজনীতি এবং সন্ত্রাসের ক্রমাগত প্রসার এই নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধির নিয়ামক হিসাবে কাজ করছে। এই জনপদে গত দুই দশকে প্রায় ১০ জন সাংবাদিক খুন হয়েছেন। সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ১০০ জন। এ সময়ে ফেনীর সাংবাদিকরা বার বার শক্তিধর মহলের আক্রমণের মুখে পড়েছেন। উত্তরাঞ্চলেও সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। রাজশাহীতে সেন্টার ফর কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কর্তৃক প্রকাশিত এক জরিপে জানা যায়, রাজশাহী অঞ্চলে ৪৯ জন সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ১০ জন গুরুতর আহত হন।

হলুদ সাংবাদিকতা মফস্বল সাংবাদিকতার আরেকটি ঝুঁকি। বর্তমানে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অনেকের মধ্যেই সাংবাদিক হবার একটা আগ্রহ লক্ষ্য করা যায়। তাদের কেউ ছাত্র কেউ বা বেকার যুবক অথবা টাউট শ্রেণীর কেউ। সাংবাদিকদের মর্যাদার কথা ভেবেই তারা সাংবাদিক হবার স্বপ্ন দেখেন। যাদের কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। নতুন পত্রিকাগুলো কোন যাচাই-বাছাই না করেই অনেক ক্ষেত্রে সংবাদদাতার পরিচয়পত্র দিয়ে দেয়। এতে কিছু অসৎ লোকও ঢুকে পড়েছে এ পেশায়। ফলে সাংবাদিকতা পেশার মান ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

মফস্বল সাংবাদিকরা গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রেখে চলেছেন। পাশাপাশি সত্য প্রকাশের সুবাদে তাদের এক ধরনের গণভিত্তি রচিত হয়। তারা পান সর্বস্তরের মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান। গ্রামীণ জনপদে কাজ করেছেন এমন অনেক সাংবাদিক রয়েছেন, যারা তাদের সততা নিষ্ঠা আর সাহসিকতায় এগিয়ে গেছেন অনেক দূর; মফস্বলের গন্ডি পেরিয়ে জাতীয়ভাবে হয়েছেন সমাদৃত।