বিটিভি বন্ধ হলে ক্ষতি কী?

বৃহস্পতিবার, ২৮/০৩/২০১৩ @ ৯:০৭ পূর্বাহ্ণ

প্রভাষ আমিন::

btvগোটা দেশ এখন শোকে আচ্ছন্ন। রাষ্ট্রীয় তিন দিনের শোকের সীমানা ছাড়িয়ে এই শোক আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখবে আরো বহু দিন। রাষ্ট্রপতি ছিলেন বলেই নয়, জিল্লুর রহমানের মৃত্যু আমাদের শোকার্ত করে তাঁর নিজের চারিত্রিক দৃঢ়তা আর সততার কারণেই। জাতি হারাল একজন অভিভাবক, রাজনীতি হারাল একজন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বকে। রাজনীতি এখন যেভাবে দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, টেন্ডারবাজ আর ব্যবসায়ীদের খপ্পরে চলে যাচ্ছে; তখন জিল্লুর রহমানের মতো একজন ব্যক্তির বিদায় আমাদের শোকার্ত করে। দলবদলের রাজনীতি দেখতে দেখতে ক্লান্ত আমরা আশ্রয় খুঁজি ছাত্রজীবন থেকে অভিন্ন আদর্শে অবিচল থাকা জিল্লুর রহমানের কাছে। ১৯৪৯ সালে রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠার দিন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সেই দলের সঙ্গে থেকেও তিনি হয়ে উঠতে পেরেছিলেন জাতির সত্যিকার অভিভাবক, সবার রাষ্ট্রপতি। অসহিষ্ণুতা যেখানে আমাদের রাজনীতির প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে, সেখানে জিল্লুর রহমান হয়ে থাকবেন উজ্জ্বল বাতিঘর। চার দফায় দীর্ঘ সময় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন, ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী। এত কিছুর পরও প্রতিপক্ষ দলে তাঁর সম্পর্কে খারাপ কিছু বলার লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিজের আদর্শে অবিচল থেকেছেন, কিন্তু প্রতিপক্ষ সম্পর্কে কখনো কটু কথা বলেননি। আপাত নরম-সরম দেখতে জিল্লুর রহমান কখনো আপস করেননি। নিজের আদর্শের প্রশ্নে একচুল ছাড় দেননি। এক-এগারোর ঝোড়ো হওয়া যখন বাংলাদেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলের ভিতর-বাহির তছনছ করে দিয়েছে, তখনো তিনি নৌকার অবিচল মাঝি। তাঁর বিরুদ্ধে কখনো কোনো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি। এমন একজন মানুষের বিদায়ে জাতি তো শোকার্ত হবেই। প্রথমবারের মতো একজন দায়িত্ব পালনরত রাষ্ট্রপতির স্বাভাবিক মৃত্যু দেখেছে দেশ, দেখেছে রাষ্ট্রাচারের কিছু অদেখা রীতি। পরিণত বয়সে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে মারা গেছেন তিনি। এর পরও তাঁর মৃত্যু সবাইকে হতভম্ব করে দিয়েছে। তাৎক্ষণিক তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করলেও সরকারি ছুটি ঘোষণা করতে তাই দেরি হয়ে যায়। বিদায়বেলায় যে সম্মান তিনি পেয়েছেন, তা তাঁর প্রাপ্য ছিল। অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রপতি পদে থেকে মারা গেছেন বলেই তিনি এত সম্মান পেয়েছেন। আমি এর সঙ্গে পুরোপুরি একমত নই। রাষ্ট্রপতি ছিলেন বলে কিছু রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছেন। তবে লাখ লাখ সাধারণ মানুষের যে ভালোবাসা তা তো ব্যক্তি জিল্লুর রহমানের অর্জন। সুরক্ষিত বঙ্গভবনে ছুটে যাওয়া হাজার হাজার মানুষ বা জাতীয় ঈদগাহে আসা লাখো মানুষকে তো আর রাষ্ট্র জোর করে আনেনি। তারা এসেছে হৃদয়ের টানে, জিল্লুর রহমানকে ভালোবেসে।
জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে আমি শোকার্ত। কিন্তু আজ আমি জিল্লুর রহমানের জন্য শোকের পঙ্‌ক্তিমালা লিখতে বসিনি। আমি বসেছি অভিযোগ করতে, দাবি জানাতে। অভিযোগ বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিরুদ্ধে, দাবি বাংলাদেশ টেলিভিশন বন্ধ করে দেওয়ার। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে মারা গেছেন ২০ মার্চ বুধবার বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা ৪৭ মিনিটে। কোনো রকম সরকারি ঘোষণা না পেলেও মিনিট দশেকের মধ্যেই বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর স্ক্রলে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে তা প্রচারিত হয়। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে নিশ্চিত হয় পরের দিন দুপুর ১২টায় বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে রাষ্ট্রপতির মরদেহ দেশে ফিরবে। স্বল্প সময়ের নোটিশেই দেশের সব বেসরকারি চ্যানেল তাদের সর্বোচ্চ কারিগরি সুবিধায় সম্প্রচার পরিকল্পনা করে মাঠে নেমে পড়ে। সব চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচারের জন্য ব্যয়বহুল কারিগরি সুবিধা নেই। তারা নির্ভর করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ওপর। সাধারণত রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠানই বিটিভি সরাসরি সম্প্রচার করে। অনেক সময় আগ্রহ থাকলেও সব ইভেন্ট সরাসরি সম্প্রচার করার অনুমতি পায় না বেসরকারি টেলিভিশনগুলো। অনেক সময় এর সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নটিও জড়িত থাকে। শুধু দেশের নয়, দেশের বাইরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইভেন্টও সরাসরি সম্প্রচার করে বিটিভি। ছোটবেলা থেকেই বিটিভির কল্যাণে এসব দেখে দেখেই আমরা বড় হয়েছি। বিটিভির কল্যাণেই বেতবুনিয়া আর তালিবাবাদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র সারা দেশে পরিচিত নাম। ১৯৯৯ সালে একুশে টেলিভিশন আসার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে টেলিভিশন বলতে বাংলাদেশ টেলিভিশনই বুঝত সবাই। নিউজ ভালো না হলেও বিনোদন আর দেশি-বিদেশি বড় বড় ইভেন্ট লাইভ দেখানোর কারণে বিটিভি ছিল সবার ঘরে ঘরে। তখন বিটিভির কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। কিন্তু মানসম্মত নাটক আর নানা অনুষ্ঠান মানুষের মনে দাগ কেটে আছে এখনো। ব্যাপারটি মোটেই এমন নয় যে আর কোনো টিভি ছিল না বলে সবাই হুমড়ি খেয়ে বিটিভি দেখত। তখন বিটিভির অনুষ্ঠানের মান সত্যি সত্যি ভালো ছিল। বিটিভির ধারাবাহিক নাটকের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যেত। হুমায়ূন আহমেদের নাটকের চরিত্রের ফাঁসির প্রতিবাদে রাস্তায় মিছিল হয়েছে। বিটিভির ঈদের নাটক বা আনন্দমেলা না দেখলে ঈদের আনন্দই অপূর্ণ থেকে যেত। ‘যদি কিছু মনে না করেন’ দিয়ে দেশজুড়ে পরিচিতি পেয়েছিলেন ফজলে লোহানী। শুধু দেশি অনুষ্ঠান নয়; টারজান, সিক্স মিলিয়ন ডলার ম্যান, থ্রি স্টুজেস, নাইট রাইডারের মতো ইংরেজি সিরিয়ালও তুমুল জনপ্রিয় ছিল। এমনকি ডালাসের মতো পারিবারিক ড্রামাও দেখত লোকজন। প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই যাদের রুচি এত ভালো, নিশ্চয়ই প্রতিদ্বন্দ্বী বাড়লে তারা আরো ভালো করবে- এমনটাই আশা ছিল। কিন্তু হা হতোস্মি। একটার পর একটা বেসরকারি চ্যানেল আসছে, আর এক ধাপ করে পেছাচ্ছে বিটিভি। সাধারণভাবে বলে দেওয়া যায়, এখন আর কেউ বিটিভি দেখে না। বাংলাদেশে ২৪টি চ্যানেলের মধ্যে বিটিভি ওয়ার্ল্ডের অবস্থান ২১ বা ২২ নম্বরে।
এ তো গেল অনুষ্ঠানের কথা। আগে অনুষ্ঠানের মান ভালো ছিল, এখন খারাপ না ভালো- সেটা বিচারের জন্যও কেউ বিটিভি দেখে না। কিন্তু বিটিভির নিউজ বরাবরই হাস্যকর- তখনো, এখনো। বিটিভির দিনের মূল সংবাদ ৮টার নিউজকে সবাই বলত ‘ঠাট্টার নিউজ’। আর বিটিভিকে বলা হতো সাহেব-বিবি-গোলামের বাঙ্। ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর মানুষ অনেক স্বপ্ন দেখেছিল। আশা ছিল গণতান্ত্রিক দেশে বদলে যাবে বিটিভি। বিটিভি বদলেছে, তবে তা নেতিবাচক অর্থে, ভূতের মতো পেছনের পায়ে হেঁটে চলে গেছে আরো অনেক পেছনে। বিটিভির স্বায়ত্তশাসনের অঙ্গীকার ছিল, প্রতিশ্রুতি ছিল, চেষ্টা ছিল। কিন্তু কিছুই হয়নি। বিটিভি সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। সরকারের নয়, সরকারি দলের অনুগত লোকজনই সেখানে ছড়ি ঘুরায় সব সময়। যদি সেই অনুগতদের মাথায় কিছু থাকত তাহলেও দুঃখ কিছুটা কম থাকত। ধারাবাহিকভাবে প্রধানমন্ত্রী আর মন্ত্রীদের দেখানোতেই যেন দায়িত্ব শেষ। শুধুই চামচামি, কোনো সৃষ্টিশীলতা নেই। বিটিভি তার ব্যর্থতার ষোলোকলা পূর্ণ করল ২১ মার্চ রাষ্ট্রপতির মরদেহ দেশে আসার পর।
একুশে টিভির বিপ্লবের পর থেকে অন্তত নিউজের জন্য কেউ আর কোনো দিন বিটিভি অন করেনি। তারপর একে একে সব টিভিই নিউজ সম্প্রচার করছে। এসেছে নতুন নতুন চ্যানেল। এখন দেশে ২২টি চ্যানেল নিউজ অন এয়ার করে। এর মধ্যে চারটি আবার ২৪ ঘণ্টার নিউজ চ্যানেল। এর পরও মাঝেমধ্যে বেসরকারি চ্যানেলগুলোকে বিটিভির ওপর নির্ভর করতে হয়। কারণ নিরাপত্তার কারণেও সব রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের সবাইকে সরাসরি সম্প্রচারের অনুমতি দেওয়া সম্ভব না। কারণ ২৪টি চ্যানেল কোনো অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করতে গেলে সেখানে শুধু এই কারণেই সেই ইভেন্টে অতিরিক্ত ২৫০ লোক থাকবে। তাই বড় ইভেন্টে বেসরকারি চ্যানেলগুলোর বিটিভি নির্ভরতা অনেক পুরনো। ২১ মার্চ দুপুর ১২টায় বিমানবন্দর থেকে রাষ্ট্রপতির মরদেহ আসার আনুষ্ঠানিকতা বিটিভি লাইভ দেখায়। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে রামেন্দু মজুমদারের ধারা বর্ণনাসহ সেই সরাসরি সম্প্রচার বিটিভির সৌজন্যে অনেক বেসরকারি চ্যানেলও লাইভ দেখিয়েছে। কিন্তু ধাক্কা খেতে হয় বঙ্গভবনে গিয়ে। বিমানবন্দর থেকে রাষ্ট্রপতির মরদেহ শোভাযাত্রাসহ বঙ্গভবনে নেওয়া হয়। সেখানেই ছিল মূল আনুষ্ঠানিকতা। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা থেকে শুরু করে কূটনীতিক এবং পরে সর্বস্তরের মানুষ সেখানে রাষ্ট্রপতির মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। সেখানেই অনুপস্থিত ছিল বিটিভি। অন্যরা যেখানে বিটিভির সৌজন্যে লাইভ দেখায়। সেখানে ওই দিন বিটিভিই সময় টিভির সৌজন্যে লাইভ দেখিয়েছে। দুর্জনেরা বলছেন, আইন প্রতিমন্ত্রীর মালিকানাধীন সময় টিভি চ্যানেলকে সুযোগ দেওয়ার জন্যই ওই দিন বঙ্গভবনে লাইভ করেনি। তবে সেটা আমি বিশ্বাস করিনি। ওই দিন সময় টিভি বিমানবন্দর থেকে বঙ্গভবন, বঙ্গভবন থেকে সিএমএইচ- পুরোটাই লাইভ দেখিয়েছে। সময় টিভিতে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের অনেককেই আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি, তাঁদের দক্ষতা সম্পর্কে আমি জানি। তাই সেদিন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য তাঁদের অভিনন্দন জানিয়েছি। সময় টিভির সাফল্য কিন্তু বিটিভির ব্যর্থতাকে ঢাকতে পারবে না। বিটিভির ব্যর্থতা ২১ মর্চেই শেষ হয়নি। পরদিন ভৈরবে রাষ্ট্রপতির প্রথম জানাজার আনুষ্ঠানিকতাও বিটিভি সরাসরি সম্প্রচার করেছে একাত্তর টিভির সৌজন্যে। বেসরকারি টিভিগুলোকে লাইভ করতে হলে অনেক ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়, সময় লাগে, অর্থ লাগে। কিন্তু বিটিভির কোনো ইভেন্ট লাইভ করতে শুধু সিদ্ধান্তই যথেষ্ট। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তির মৃত্যু পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতা, যেখানে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। তেমন অনুষ্ঠান লাইভ হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত যাঁরা নিতে পারেন না- তাঁদের সেখানে বসে থাকার দরকার কী। বাংলাদেশের প্রায় সব টিভি চ্যানেলের অফিসই আমি দেখেছি। বিটিভির যত বড় অবকাঠামো, তাতে চাইলে বাকি সব চ্যানেল ওখান থেকে অন এয়ার করা সম্ভব। এত সুযোগ-সুবিধা নিয়েও যখন দর্শকপ্রিয়তায় তলানিতে থাকে, তখন সময় এসেছে এই শ্বেতহস্তী বন্ধের দাবি তোলার। স্বায়ত্তশাসনের দাবি অনেক হয়েছে, এবার দাবি বন্ধের। আমাদের ট্যাক্সের টাকায় বিটিভির অথর্ব, চাটুকারিতা ছাড়া যাঁদের আর কোনো কাজ নেই; তাঁদের আর পুষতে চাই না। সরকার যদি ভালো কাজ করে প্রতিটি বেসরকারি চ্যানেলই তা প্রচার করবে। শুধু সরকারের প্রপাগান্ডা চালানোর জন্য বিটিভি চালু রাখার দরকার নেই। কারণ বিটিভি কেউ দেখে না, তাই সরকারের প্রপাগান্ডাও কারো দেখা হয় না। সরকারের একটি টিভি থাকতেই হবে- এমন কোনো আইন তো কোথায় নেই।
লেখক : সাংবাদিক
[email protected]
সূত্র: কালের কন্ঠ