সমকালীন সাংবাদিকতা প্রসঙ্গ

শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫

:: সহিদ উল্যাহ লিপন ::

Mohammad Sahid Ullah Liponবাংলাদেশের সমকালীন সাংবাদিকতাকে কোন একটি নির্ধারিত ছকে আবদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব। কারণ পেশা সাংবাদিকতা আজ আর সমাজসেবার ব্রতে আবদ্ধ নেই; তেমনি গণতান্ত্রিক সমাজ বা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও নেই। স্বাধীনভাবে পেশার মর্যাদা রক্ষার কঠিন সংগ্রামে যেমন সাংবাদিকের পেশাদারিত্বকে আবদ্ধ করার সুযোগ নেই; তেমনি অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিকতা করে সমাজে আলোড়ন তোলার তেমন কোন উদাহরণও খুব একটা নজরে আসছেনা।

এমন পরিস্থিতিতে সংবাদপত্র বেরুচ্ছে, টেলিভিশন এর চ্যানেলও গজাচ্ছে, আর অনলাইন সাংবাদিকতার জোয়ার তো আছেই। সম্ভবত সাংবাদিকেরও অভাব নেই; অভাব যা আছে তা হলো পেশাজীবী সংবাদকর্মীর।

একটু পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে গত শতকের শেষ দিকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছিলো একাট্টা। আর এ শতকের শুরুতে দেখা মিলল দলীয় সংবাদ কর্মীর, দল ভিত্তিক সাংবাদিকতা; পরের দিকে শুরু হলো কর্পোরেট সাংবাদিকতা। সাংবাদিক হয়ে গেলেন বড় কোম্পানির ব্যবসা হাসিলের হাতিয়ার; আর এতে যারা একটু নামি-দামি ছিলেন তারা হলেন বেচা-কেনার হাটের বলী; বেতনভুক্ত কর্মচারী সাংবাদিক। গলায় রশি ঝুলিয়ে অফিসে ঢোকা টাকার কাছে নিজের পেশার ব্রত বিক্রি করা কর্পোরেট সাংবাদিক।

নিজের ইচ্ছায়, সময়ের প্রয়োজনে, সমাজের দাবিতে তারা আর মত প্রকাশ করতে পারেন না; পারেন না চ্যানেলে তুলে ধরতে সাড়া জাগানো কোন প্রতিবেদন। তার ওপর রয়েছে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সংবাদ প্রচারের এক প্রতিযোগিতা। কার আগে কে দিবে জনগণকে সংবাদ- এ প্রতিযোগিতায় সংবাদের যে বস্তুনিষ্ঠতা (নিরপেক্ষ তা নয়) বলে একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার এখন দেখা মেলা ভার।

সম্প্রতি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নিয়ে একটি গবেষণা করতে গিয়ে আমার এক সহকর্মী জানালেন সাংবাদিক সংখ্যার কোন সঠিক হদিশ পাওয়া যায়নি। তাঁর মতে বিভাজিত সাংবাদিক ইউনিয়ন এর দুই শাখায় মোটামুটি ১০ হাজারের মতো সদস্য সাংবাদিক থাকার কথা জানালেও প্রকৃত সংখ্যা বোধ করি এর চেয়ে ঢের বেশী। গাঁও-গ্রামে নম্বর প্লেট বিহীন মোটর সাইকেলে যেমন সাংবাদিক বা প্রেস লেখা থাকে; রাজধানী ঢাকা বা বড় শহরগুলোতেও কম যায়না। মাঝে মাঝে ভুয়া সাংবাদিক এর খবরে বিস্মিত হলেও বিশেষ কোন উদ্বিগ্ন হবার কারণ দেখিনা।

সৎ দের সঙ্গে অসৎ মিলে একাকার; পেশাজীবীদের সঙ্গে ভুয়া’রাও চলছেন বুক উচিয়ে। কে যে আসল আর কেইবা যে নকল সাধারণ মানুষের বোঝা মুশকিল। ভুয়া ধরা পড়লে আছে ইউনিয়ন; আর তাও সম্ভব না হলে করা হবে পাল্টা ক্ষুদ্র ইউনিট, ফোরাম, সমিতি- তারা বিবৃতি দিলেই যেন সাত খুন মাফ। হরেক রকম নামে এসব ভুঁইফোড়ের অত্যাচারে তিলকে তাল করার নানান পথ সৎ সাংবাদিকতার পথকে করেছে কণ্ঠকাকীর্ণ।

আগে শোনা যেত থানায় বসে থাকা এক শ্রেণির দালাল সাংবাদিকদের কথা। এখন তার চেয়ে বেশি হলো সন্ত্রাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাকারী লাইভ দেয়ার এক ধরনের সাংবাদিকদের। চ্যানেলগুলোও নাকি উৎসাহ দেয়; তাদের ধারণায় চমকদার এসব ছবি চ্যানেলে’র জনপ্রিয়তা বাড়ায়; খবর আর বিজ্ঞাপনের কাটতিতে টনিকের মতো কাজ করে। আমার ধারণা একটা অসুস্থ মানসিকতা থেকে এ ধরনের সাংবাদিকতার জন্ম আর অনুশীলন।

এ সাংবাদিকতা হতে পারে না। আজ মানুষের মনোজগতে ভীতি তৈরি করার মোক্ষম হাতিয়ার যেন গণমাধ্যম আর পুরো সাংবাদিকতার জগৎ। এছাড়া টেলিভিশন সাংবাদিক আর তাদের দাপটে মুদ্রণ মাধ্যমের সংবাদকর্মীদের সংবাদ সংগ্রহ প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। টিভি সাংবাদিকদের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে মুদ্রণ মাধ্যমের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের বিষয়টিও হারিয়ে ফেলা হচ্ছে।

আমাদের সাংবাদশিল্পে অন্যদের তুলোধুনো করার সংস্কৃতি দৃশ্যমান অথচ নিজেদের সমালোচনা করার পথ রুদ্ধ। ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের দু’অংশের নেতা প্রধান দুই দলের প্রধান উপদেষ্টা; স্বাধীন সাংবাদিকতার বুকে ছুরিকাঘাত করার জন্য এ ধরনের লেজুড়বৃত্তিই যথেষ্ট। সম্ভবত এ কারণে শুধু ইউনিয়ন নয় এমনকি সংবাদপত্র পরিষদ এর ধামকি কিংবা বিবৃতিকে কেউ আর পোছেনা। সাংবাদিক গ্রেফতার (প্রবীর শিকদার) কিংবা সাংবাদিকের মৃত্যুকে (সাগর-রুনী) রাজনীতির বলয়ে ফেলে পুরো পেশাকে পেশাদারিত্বের বাইরে নিয়ে গেছে। এ সুযোগে কিছু আগাছা সাংবাদিকতা পেশায় ঢুকে পড়েছে।

সংবাদ মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা বলেন কিছু বাদে এদের বেশীরভাগই অনলাইনের সাংবাদিক। নব্বইকে যদি সংবাদপত্র প্রকাশের জোয়ার কাল ধরা হয়, শতকের শুরুর দশককে যদি টেলিভিশন সাংবাদিকতার অসুস্থ প্রতিযোগিতা ধরা হয় তবে এখনকার সময়কে বলা দরকার নাম সর্বস্ব অনলাইন সাংবাদিকতার যুগ। খরচ খুব একটা নেই বলে যে কেউ (দু-একটি বাদে) রাতারাতি অন লাইন সংবাদ মাধ্যমের সম্পাদক আর সাংবাদিক; যেন মানুষের চেয়ে দেশে ”সাংবাদিক” বেশী। এ ধরনের সাংবাদিকতা পেশাজীবীদের স্বার্থেই রোধ করা জরুরী। প্রেস কাউন্সিল বোধকরি এ কারণে সাংবাদিকদের গ্রেডিং এর কথা বলতে চেয়েছে।

এবার আসা যাক সংবাদপত্র কিংবা চ্যানেলের বিশ্বাসযোগ্যতার কথায়। আজকাল একটা সংবাদপত্র যদি পড়ে কেউ কোন উদাহরণ টানেন, কিংবা রেডিও শুনে বা টিভি চ্যানেল দেখে কোন ঘটনার বর্ণনা দেন তবে তা কেউ পুরোপুরি বিশ্বাস করেন না। একটা বিশ্বাসহীনতার সংস্কৃতি যে গণমাধ্যম কিংবা সাংবাদিকতা পেশার জন্য কতোটা অপমানের তা পেশাজীবী সাংবাদিকরা না বোঝার কথা নয়।

কিন্তু নিজেদের আরাম আয়েশ; ক্ষমতার গন্ডীতে থাকার অপপ্রয়াসে এ পেশার সমস্ত মূল্যবোধকে জলাঞ্জলি দেয়া হচ্ছে। মাত্র গুটি কয়েক লোকের চাটুকারিতাকে প্রশ্রয় দিয়ে পুরো সাংবাদিকতা পেশার মর্যাদাহানি অপমানজনক তা অনেকেই বোঝেন; কিন্তু কিছু করার বা প্রতিবাদ করার ভাষা তো জানা নেই, পাছে যদি আবার রুটি রুজি হারায়।

সাংবাদিকতা পেশার এতো দৈন্যতা কিংবা সীমাবদ্ধতার মাঝে কী আমাদের স্বপ্ন দেখার কিছুই কী নেই – এ প্রশ্ন মনে জাগা স্বাভাবিক। সমাজের অন্য অংশে ঘুণ ধরার পর সমাজ চলছে; কিন্তু গণমাধ্যমে নৈতিকতার ধস অথবা পেশাদারিত্বের সংকট সুস্থ সমাজের আর দশটি অংশকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। একারণে শত কষ্টের মাঝেও যেন আমরা গৌরবের সাংবাদিকতার ঐতিহ্যকে চর্চা করি; মানুষের মধ্যে ভাতৃত্ববোধের মশাল জ্বালাই – এ প্রত্যাশা কী খুব বেশী?

আমাদের সাংবাদিকতার এ অস্থির সময়ে গণমাধ্যম কিংবা পেশাকে কোন একটি নির্ধারিত ছকে না ফেলা গেলেও প্রত্যাশার এ আকাঙক্ষা পূরণের দাবিটি রেখে গেলাম যদি কখনো আবার কোন সময় ফিরে আসে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে দিন আসবেই অচিরেই।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
(দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিশেষ সংখ্যা থেকে লেখাটি নেয়া হয়েছে।)