আজাদী : আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল

শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০১৫

:: বিকাশ চৌধুরী বড়ুয়া ::

azadiস্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবাদপত্র হলেও দৈনিক আজাদীর জন্ম বাংলাদেশ জন্মের ১১ বছর ৩ মাস ১১ দিন আগে, আজকের এই দিনে অর্থাৎ ১৯৬০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর। মনে মনে ভাবি, মোহাম্মদ আবদুল খালেক ইঞ্জিনিয়ার ৫৫ বছর আগে যদি কেবল তার কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেস নিয়ে থাকতেন এবং দৈনিক আজাদী প্রকাশ না করতেন, তাহলে আজকের চট্টগ্রামের চেহারা কী রকম হতো!

আমি তো কল্পনায়ও ’’আজাদী-বিহীন’’ চট্টগ্রামের কথা ভাবতে পারি না। চট্টগ্রামে আজকে যে সাংবাদিকতা গড়ে উঠেছে তার পেছনে দৈনিক আজাদীর ভূমিকা কতখানি তা নতুন করে বলার প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। কেবল সাংবাদিকতা বলি কেন, দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, নগরের নানা উন্নয়ন কর্মকান্ডেও দৈনিক আজাদীর ভূমিকা উল্লেখ করার মত।

সাংবাদিকতায় যখন আমার প্রবেশ, আজ থেকে ৩৫ বছর আগে ১৯৮০ সালে ইংরেজী দৈনিক ডেইলি লাইফের মধ্যে দিয়ে, তখন চট্টগ্রামে দৈনিক আজাদীকে যে দাপটের সাথে সংবাদপত্র জগতে আধিপত্য বিরাজ করতে দেখেছি, আজ এতগুলি বছর পরও তথাকথিত জাতীয়, রিজিওনাল, আঞ্চলিক অনেক পত্রিকার আগমনও আজাদীর অবস্থানকে এতটুকু নাড়াতে পেরেছে বলে মনে হয় না। আসলে আজাদী আজাদীই।

কোন কিছুর সাথে তুলনা করা বুঝি চলে না। এ যেন সেই গানের মত, ”তুমি যে ওগো তোমারি তুলনা।’’ দৈনিক আজাদীর কোন বাহ্য বাড়ম্বনা নেই, কোন কিছুতে বাড়াবাড়ি নেই, এ যেন আপন গতিতে, আপন লয়ে চলেছে। দৈনিক আজাদীর বড় সাফল্য, আমার ধারণায়, পাঠকের সাথে এর একটা নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলার মধ্যে। যখন অন্যান্য দৈনিক পত্রিকাগুলি পাঠকের পেছনে ছুটে চলে, তখন পাঠক ছুটে চলে আজাদীর পেছনে।

আজাদীর এই সাফল্য তো আর একদিনে আসেনি। এর পেছনে ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল খালেক, পরবর্তীকালে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদের বলিষ্ঠ সম্পাদনা এবং খালেদ-পরবর্তী সময়ে এম এ মালেকের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং পরিশ্রম দৈনিক আজাদীকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে।

দৈনিক আজাদী নানা কারণে গর্ব করতে পারে। গর্ব করতে পারে এর কর্মরত সাংবাদিকরা, মালিক পক্ষ, গোটা আজাদী পরিবার। দৈনিক আজাদীর সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মুক্ত চিন্তা জড়িত এই কথা বললে এতটুকু বাড়িয়ে বলা হবে না। স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ দৈনিক সংবাদপত্র হিসাবে দৈনিক আজাদী বুক ফুলিয়ে গর্ব করতেই পারে।

একুশের প্রথম কবিতা, মাহবুবউল আলম চৌধুরীর ”কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’’ – এই কবিতাটি প্রকাশের মত সাহস ও দেশপ্রেম দেখিয়েছিলেন দৈনিক আজাদীর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক। (এখানে মাহবুব আলম চৌধুরী সম্পর্কে দুটি কথা উল্লেখ না করলেই নয়। গহিরায় জন্ম মাহবুবউল আলম চৌধুরী ১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম জাতীয় ভাষা অ্যাকশন কমিটির সাথে জড়িত ছিলেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পাকিস্তানি পুলিশ ছাত্রদের উপর গুলি চালালে তিনি এই কবিতা লিখেন)।

স্বাধীনতার স্বপক্ষের পত্রিকা আজাদী ইঞ্জিনিয়ার খালেকের সময় যেমন পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল, ঠিক তেমনি ১৯৬২ সালে দায়িত্ব নেবার পর সাহসী সৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সংসদ সদস্য অধ্যাপক খালেদের সম্পাদনায় দৈনিক আজাদী একই ভূমিকা পালন করে এসেছে। সত্তরে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ফকা (ফজলুল কাদের চৌধুরী)-র বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়ানোর মত বুকের পাটা বোধকরি একমাত্র ছোটখাটো কৃশ গঠনের অধ্যাপক খালেদ সাহেবেরই ছিল।

সে সময় গোটা পাকিস্তানের দৃষ্টি ছিল এই নির্বাচনী এলাকা। অধ্যাপক খালেদ বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে এলেন। আজাদীর গর্ব তার এমন ’ক্যালিবারের’ সম্পাদক ছিল। আজাদীতে ছিলেন সাধন কুমার ধর, বিমলেন্দু বড়ুয়া, কাজী জাফরুল ইসলাম, মোহাম্মদ ইউসুফ, মাহবুবউল আলমের মত বিজ্ঞ সাংবাদিক, আছেন সাহিত্যিক অরুণ দাশ গুপ্ত। আজাদী জন্ম দিয়েছে অনেক লেখককে।

আজাদীর সাথে আমার লেখালেখির সম্পর্ক প্রায় তিন যুগের কাছাকাছি। হল্যান্ড আসার মাস দুয়েক পর (১৯৯০) সাংবাদিক বন্ধু মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের উৎসাহে দৈনিক আজাদীতে আমার লেখা শুরু। তার হাত ধরেই লেখাগুলো পৌছুত আজাদীতে। এর কিছুদিন পর সম্পাদক খালেদ সাহেবের নামে পাঠাতাম। সময়ের অভাবে মাঝে মধ্যে লেখা পাঠানোয় বাত্যয় ঘটলে, বন্ধু, নিকটজনদের কাছ থেকে তাগাদা আসতো। একজন লেখকের লিখতে তখনই ভালো লাগে যখন সে দেখতে পায় তার কিছু পাঠক সৃষ্টি হয়েছে।

আজাদীতে লেখার আনন্দটা এ যে নানা দেশ থেকে মাঝে মাঝে অবাক করা ফিডব্যাক পাই। আমেরিকা, কানাডা, ইউরোপ, এমন কী মধ্যপ্রাচ্য থেকেও। অচেনা-অজানা পাঠকদের মন্তব্য পড়তে, শুনতে ভালো লাগে, উৎসাহ পাই লেখা চালিয়ে যেতে। দৈনিক আজাদীর সাথে এ লেখালেখির আগেও একটা সম্পর্ক ছিল। তখন আমি ডেইলি লাইফের রিপোর্টার। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস দিয়ে বেরিয়েছি। পত্রিকার একমাত্র রিপোর্টার। ঢাকা থেকে মন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট এলে কভার করার দায়িত্ব আমার।

রাজা-উজিরের সাথে উঠবস করতে গিয়ে অনেক সময় নিজেকেও মনে হত তাদের কাছাকাছি। বেতন যা পাই তাতে গাড়ি ভাড়া, আড্ডা মেরে কেটে যেত, বাবার হোটেলে ছিলাম। থাকা-খাবারের চিন্তা ছিল না। মনে পড়ে প্রতিদিন সকালে একবার আন্দরকিল্লার মোড়ে দৈনিক আজাদীর পুরানো অফিসে হাজির হতাম, সে সময় আড্ডা হতো দৈনিক আজাদীর রিপোর্টার নাসিরুল হকের সাথে। দোতলার এক কোণে একটি টেবিলে অতি সাধারণ এক ব্যক্তি, চোখে চশমা, সম্পাদক অধ্যাপক খালেদ সাহেব, পাশে নিউজ এডিটর সাধন ধর, তাদের পাশে অরুণদা (অরুন দাশ গুপ্ত), বিমলেন্দু বড়ুয়া।

বয়সে, জ্ঞানে ছোট ছিলাম বিধায় তাদের পাশে বসার সাহস হতো না। আমাদের আড্ডা হতো আতাউল হাকিম ভাই, মাহবুব আলম ভাইদের সাথে। আজকের চট্টগ্রামে অনেক পত্রিকা আছে, আকারে-বাহারে সে সময়কার দৈনিক আজাদীর চাইতে বহু গুণে বেশী। কিন্তু দৈনিক আজাদীর এ সমস্ত প্রবীণ, বিজ্ঞ সাংবাদিকরা পত্রিকা অফিসে যে একটি সুস্থ, সুন্দর আবহ তৈরি করেছিলেন তা আজ কোথায়ও দেখিনে। এরা কেবল জ্ঞানে বড় ছিলেন না, মানুষ হিসাবেও ছিলেন উদার। অধ্যাপক খালেদ সাহেবের অতি ভালো মানুষির একটা উদাহরণ দিয়ে আজকের এ লেখার সমাপ্তি টানবো। দেশে এসেছি।

শুনলাম তিনি অসুস্থ। বন্ধু সাংবাদিক নাসির ভাই সহ তার বাসায় দেখা করতে যাই। সাথে স্ত্রী, কন্যা এবং নাসির ভাইয়ের স্ত্রী। শারীরিক অসুস্থতায়ও তিনি আমাদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালেন। জানালেন আমাদের আসার ক্ষণিক আগে মেয়র মহিউদ্দীন চৌধুরী তাকে দেখে গেছেন। এক পর্যায়ে মায়ের কোলে কন্যা সপ্তর্ষি ঘুমিয়ে পড়লে অধ্যাপক খালেদ নিজ হাতে ঘরের ভেতরের বিছানা ঠিক করে দিলেন, গায়ের চাদর এনে দিলেন, সপ্তর্ষিকে সেখানে শুইয়ে দেয়া হলো।

ছোট একটি ঘটনা, কিন্তু আমাদের সকলকে অভিভূত করেছে। বোধকরি এ সমস্ত মানবিক গুনাবলীর কারণে অধ্যাপক খালেদ একজন অন্য মানুষ। আজাদী পরিবারের সৌভাগ্য এমন একজন অভিভাবক তারা পেয়েছিলেন, যার হাত ধরে আজকের আজাদী আজকের অবস্থানে। দৈনিক আজাদীর বর্ষ পূর্তিতে হল্যান্ড থেকে জানাই শুভেচ্ছা। (৫-৯-২০১৫)

সৌজন্যে: দৈনিক আজাদী