সংবাদপত্রে মিথ্যাচার: প্রতিকার কী

বৃহস্পতিবার, ২৮/০৩/২০১৩ @ ৮:৩২ পূর্বাহ্ণ

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর::

media-111যে বিষয়টি নিয়ে আজ লিখতে বসেছি, তা আমার আগের কোনো লেখার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। তাই প্রথমেই পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে রাজনীতিবিদেরা প্রতিদিন একই কথা বললে, আর তা প্রতিদিন সংবাদপত্রে ছাপা হলে যদি দোষ না হয়, আমারও দোষ হবে না। শর্ত হলো—কথাটি জনগুরুত্বপূর্ণ কি না। রাজনৈতিক দলের কাছে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ইস্যুটি যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়, আমার কাছে সংবাদের তথ্যনিষ্ঠতাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদপত্রে মিথ্যা বা ভুল তথ্য প্রকাশের বিরুদ্ধে আমি এই কলামে বহু লিখেছি। আজ আবার লিখতে যাচ্ছি, কারণ এ ব্যাপারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও সমর্থন জানিয়ে এ ব্যাপারে কিছু লিখতে চাই।
বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত রিপোর্ট (১১ অক্টোবর) থেকে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে কয়েকজন মন্ত্রীর অভিযোগের উত্তরে বলেছেন, ‘সংবাদপত্রে মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করলেই সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মামলা করুন।’ ‘বৈঠকে কয়েকজন মন্ত্রী অভিযোগ করেন, গণমাধ্যমে মিথ্যা ও ভুল তথ্য দিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করা হচ্ছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শাহজাহান মিয়া পত্রিকায় তাঁদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন দাবি করে এই অভিযোগ করেন। তাঁদের এ বক্তব্য সমর্থন করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক। মন্ত্রীদের অভিযোগ শোনার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হলে আপনারা মামলা ঠুকে দেবেন। (যুগান্তর ১১ অক্টোবর, ২০১১) সংবাদের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। তা উদ্ধৃত করার প্রয়োজন দেখছি না।
মন্ত্রীরা সৌভাগ্যবান, তাঁদের ওপরে প্রধানমন্ত্রী আছেন। সাধারণ নাগরিকেরা কী করবেন? কার কাছে নালিশ জানাবেন? সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে কিছু বললে বা করলে সংবাদপত্র দ্বিগুণ উৎসাহে তার বিরুদ্ধে লিখতে থাকবে। প্রতিবাদ বা মামলা করলেও বিপদ। অনেকে অধিক ক্ষতির ভয়ে মামলা বা প্রতিবাদ জানাতে চায় না। এতে কিছু সংবাদপত্র মিথ্যা ও ভুল তথ্য প্রকাশে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এদের থামানোর মতো কোনো কার্যকর আইন, বিচারব্যবস্থা এখনো গড়ে ওঠেনি। কাগজে-কলমে সবই আছে। কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ দেখা যায় না। বিচারের পদ্ধতিটা এত দীর্ঘস্থায়ী ও হয়রানিমূলক যে, খুব কম ব্যক্তিই সংবাদপত্র বা টিভির বিরুদ্ধে মামলা করতে উৎসাহী হন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে এ প্রসঙ্গে আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই। যদিও জানি, এর অনেকটাই অরণ্যে রোদন। কারণ, এ ধরনের কথা বা প্রস্তাব এই কলামে আমি বহু লিখেছি। আরও অনেকে লিখেছেন বা বলেছেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমাদের তথ্যমন্ত্রীরা এসব ব্যাপারে খুবই নির্লিপ্ত।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘মিথ্যা তথ্যে খবর প্রকাশিত বা প্রচারিত হলেই মামলা করুন।’ মামলা করা বলা যত সহজ, করা তত সহজ নয়। সেটা যেকোনো মামলার ব্যাপারেই প্রযোজ্য। বহু আলোচনা ও সমালোচনা সত্ত্বেও আমরা আমাদের বিচারব্যবস্থাকে সহজ ও জনবান্ধব করতে পারিনি। বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও হয়তো এ ব্যাপারে উৎসাহী নন। এ দেশে সরকার বা ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চাইলে যত সহজে বিচার বা রায় পান, বিরোধী দল বা সাধারণ মানুষ চাইলে তা পান না। এটা অপ্রিয় সত্য। কথাটা ১০০ শতাংশ হয়তো সত্য নয়, তবে ৯০ শতাংশ সত্য। শুধু গত আড়াই বছরের মামলা, বিচার ও রায়গুলো পর্যালোচনা করলেই যেকোনো ব্যক্তি তা বুঝতে পারবেন। এ নিয়ে বেশি কথা বলে লাভ নেই। আমাদের রাজনীতি সুস্থ বা প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক না হলে বিচারব্যবস্থাও এ রকম থাকবে। এ নিয়ে আমরা শুধু আহাজারি করতে পারি। কোনো ফল হবে না।
বিচারব্যবস্থা অনেক বড় ইস্যু। আজ তা নিয়ে আলোচনা করব না। আজ শুধু সংবাদমাধ্যম নিয়েই কথা বলব।
সংবাদপত্রে ভুল তথ্য, অর্ধসত্য, মিথ্যা তথ্য, ভুল উদ্ধৃতি প্রকাশ নতুন কিছু নয়। সম্প্রতি ‘উইকিলিকস’ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির উদ্ধৃতিসহ যে খবর প্রচার করছে, তার সত্যতা কতটুকু, তা নিয়েও তো প্রশ্ন তোলা যায়।
মোট কথা, আমাদের সংবাদমাধ্যমে ‘তথ্য’ ও ‘মন্তব্য’ নিয়ে একধরনের অরাজকতা চলছে। যার যা খুশি তা বলছে। কী বলছে বা কী লিখছে, তা নিয়ে ভাবারও তাদের কোনো সময় নেই। পত্রিকার ওপর যাঁর মালিকানা বা পদাধিকারবলে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, তিনি যা খুশি তা করছেন। ক্ষেত্র বিশেষে এর পেছনে থাকে ক্ষমতাসীন দলের প্রশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা। নিরপেক্ষ মহলের এত শক্তি নেই। কারণ তারা উল্টাপাল্টা কিছু লিখলে সরকারি এজেন্সি, সরকারি লোক তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন। সেটা সামলানোর শক্তি কারও নেই। নিরপেক্ষ মহলকে তাই অতি সাবধানে লিখতে হয়। কথা বলতে হয়। তাদের ঘাড় মটকে দেওয়ার জন্য নানা বাহিনী ও এজেন্সি দাঁড়িয়ে আছে। তার পরও সরকারি অনেক ব্যক্তি সম্পর্কে সংবাদপত্রে মিথ্যা ও ভুল তথ্য যে প্রকাশিত হচ্ছে না, তা নয়। কয়েকজন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কাছে কতিপয় সংবাদপত্র সম্পর্কে যে অভিযোগ করেছেন, তার যৌক্তিকতা রয়েছে। তবে বেসরকারি ব্যক্তিরা অভিযোগ করলে তার সংখ্যা হবে অনেক বেশি। মন্ত্রীরা কি তা জানেন?
পৃথিবীর নানা দেশের মতো বাংলাদেশেও সংবাদমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রকাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের বিশেষ সরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তার নাম, প্রেস কাউন্সিল। বাংলাদেশে শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি অকার্যকর। এর কর্মপদ্ধতি, গঠন প্রকৃতি, বিচারব্যবস্থা, শাস্তির ব্যবস্থা প্রায় সবই ত্রুটিপূর্ণ। কোনো তথ্যমন্ত্রী, তথ্যসচিব বা সংসদীয় স্থায়ী কমিটি (বিভিন্ন আমলের) কখনো প্রেস কাউন্সিলকে কার্যকর করার চেষ্টা করেননি। বর্তমান তথ্যমন্ত্রীও এর ব্যতিক্রম নন।
প্রধানমন্ত্রী প্রেস কাউন্সিল সম্পর্কে কতটা অবহিত, আমি জানি না। তাঁর প্রেস সচিব প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করলে ভালো হয়। তথ্যমন্ত্রী যেহেতু এ ব্যাপারে নির্বিকার, সেহেতু প্রধানমন্ত্রীর কাছেই এ ব্যাপারে লবি করতে হবে। একদিন হয়তো শুনব আমাদের তথ্যমন্ত্রী কোনো বক্তৃতায় বলছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমরা প্রেস কাউন্সিলকে ঢেলে সাজাচ্ছি।’
সংবাদপত্রে কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে ভুল তথ্য বা ভুল উদ্ধৃতি দেওয়া গুরুতর অপরাধ। অনিচ্ছাকৃত ভুল তথ্য হলে পরে সংশোধনী পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা উচিত। (এখন গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হয় না।) কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে কোনো অভিযোগ ছাপা হলে সেই রিপোর্টে ওই ব্যক্তির বক্তব্য প্রকাশ করা আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক। আমাদের অনেক সংবাদপত্রে তা অনুসরণ করা হয় না। এ জন্য কোনো সংবাদপত্র প্রকাশক বা সম্পাদককে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না। কোনো কোনো সংবাদপত্র অতি উৎসাহ বা রাজনৈতিক কারণে ‘গুঞ্জনকেও’ খবরের মর্যাদা দিয়ে প্রথম পাতায় গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করেছে। বলা বাহুল্য, ‘গুঞ্জন’ প্রমাণ করার কোনো সুযোগ নেই। সম্পাদক ও রিপোর্টার দুজন মিলে গুঞ্জন সৃষ্টি করে তা খবর হিসেবে প্রকাশ করা সহজ।
প্রেস কাউন্সিলকে কার্যকর করতে পারলে মিথ্যা খবর প্রকাশ করা অনেকটা হ্রাস পেতে পারে। সম্প্রতি প্রথম আলো সম্পাদকের বিরুদ্ধে কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিন অসংখ্য মিথ্যা খবর প্রকাশ করলে প্রথম আলো সম্পাদক প্রেস কাউন্সিলে মামলা করেন। মামলায় পত্রিকা দুটির খবর মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। পত্রিকা দুটিকে প্রেস কাউন্সিল সতর্ক করে দেয়। তারা দুঃখ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়। এখানেই প্রেস কাউন্সিলের সীমাবদ্ধতা। এত বড় মানহানিকর খবর (সিরিজ খবর) প্রকাশের জন্য পত্রিকার ও সাংবাদিকের যতটা শাস্তি হওয়া উচিত ছিল তা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী এদিকে একটু দৃষ্টি দিলে ভালো হয়। সংবাদপত্রে ভুল, মিথ্যা তথ্য ও উদ্ধৃতি ছাপার জন্য (প্রমাণিত হলে) সাংবাদিক (লেখক), প্রকাশক ও সম্পাদকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকা দরকার। এই শাস্তি কোটি টাকার অঙ্কে অর্থদণ্ড (কারণ ভুল খবর মানহানিকর হতে পারে), রিপোর্টারের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড এক বা দুই বছরের জন্য স্থগিত, পত্রিকার ডিক্লারেশন সাময়িক স্থগিত, বছরে তিনবার মিথ্যা খবর ছাপালে ডিক্লারেশন বাতিল (লাল কার্ডের মতো) ইত্যাদি শাস্তি হতে পারে। কোটি টাকার অঙ্কে অর্থদণ্ডটা খুব প্রয়োজন। মানহানির একটা সান্ত্বনা থাকা দরকার।
প্রধানমন্ত্রী যদি তথ্যমন্ত্রীকে দিয়ে প্রেস কাউন্সিলকে কার্যকর করাতে পারেন, তাহলে একটা কাজের কাজ হবে। প্রেস কাউন্সিলের জুরি বোর্ডও বদলানো দরকার। এখন জুরি বোর্ডে সাংবাদিক প্রতিনিধির সংখ্যা বেশি। এটা ঠিক হয়নি। সাংবাদিকেরা কেন সংবাদপত্র বা অন্য সাংবাদিকের কাজের বিচার করবেন? জুরি বোর্ডে খ্যাতনামা আইনজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের গণ্যমান্য প্রতিনিধি থাকলে ভালো হয়। জুরি বোর্ডের বিষয়টিও ভালোভাবে পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ, তাঁদের সততা ও ইন্টেগ্রিটির ওপর বিচারকাজ অনেকটা নির্ভর করবে।
প্রচলিত আইন ও আদালতেও মামলা করা যায়। তবে তাতে অনেক সময় লেগে যাবে। ভুক্তভোগী ব্যক্তির জন্য সেই পথও খোলা রয়েছে। তবে বিচার যেন দ্রুত হয়, সেদিকে দৃষ্টি দেওয়া দরকার।
আমাদের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার উজ্জ্বল ঐতিহ্য রয়েছে। সাংবাদিকতার মানও দিন দিন বাড়ছে। শুধু কয়েকটি সংবাদপত্র ও কয়েকজন প্রকাশক-সম্পাদকের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ, দুর্নীতি, প্রতিহিংসা, অর্থলোলুপতা ও পেশাদারির অভাবের জন্য আজ সংবাদপত্র ও সাংবাদিক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হচ্ছে। এটা অভিপ্রেত নয়। সংবাদপত্র জগতের এই তথ্য-সন্ত্রাসীদের সাংবাদিকতা পেশা থেকে বিদায় করতে না পারলে এ দেশের সংবাদপত্র রাহুমুক্ত হবে না। আশা করি, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ নেবেন।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: উন্নয়ন ও মিডিয়াকর্মী। সূত্র- প্রথম আলো।

সর্বশেষ