আবদুল কালামের ভাগ্যগড়ার বিশ্বাস

বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০১৫

:: এম. এম. বাদশাহ্ ::

apj kalamঅফিস থেকে ফিরে অনেক দিন পর মঙ্গলবার বিকেলে কারওয়ানবাজারে পুরোনো কিছু সহকর্মীর সাথে আড্ডা শেষে রাত ৮ টার দিকে বাসায় ফিরলাম। এনটিভির “গীতিময়” গানের অনুষ্ঠান দেখছিলাম অলসভাবে। শেষ হতে না হতেই হঠাৎ টিভি স্ক্রলে ভেসে উঠল ভারতের ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি মিসাইলম্যান খ্যাত বিজ্ঞানী এপিজে আবদুল কালাম একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে অসুস্থ হয়ে পড়ে গেছেন। স্ক্রলটি দেখেই অজান্তে মনটা খারাপ হয়ে গেল।

মনে পড়ল ঢাকা সিটি মেয়র ও জনপ্রিয় আওয়ামীলীগ নেতা হানিফ সাহেবের কথা। ঢাকার মুক্তাঙ্গনে এক সমাবেশে বক্তৃতা করার মাঝেই হঠাৎ ঢলে পড়লেন। আমরা যারা সেই নিউজ কাভার করছিলাম দ্রুত টেলিভিশনের মাইক্রোফোন টেনে হিচড়ে নিয়ে দ্রুত হানিফ সাহেবকে বহনকরা এ্যাম্বুলেন্সের পেছনে পেছনে শাহবাগের বারডেম হাসপাতালে গিয়ে হাজির। ভাবিনি মেয়র হানিফ সাহেব মারা যাবেন। কিন্তু কিছু সময় পরেই শুনলাম তিনি আর নেই।

অবশ্যই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে টাঙ্গাইলের এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করার সময় তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দিন আহমেদও এমনি ভাবে বক্তৃতা দিতে দিতে ঢলে পড়েন। কিন্তু আল্লাহর অসীম কৃপায় বেচে আছেন তিনি। তাৎক্ষনিকের এলোমেলো ভাবনায় সত্যিই ভাবিনি উপমহাদেশের এমন বড় মাপের একজন মানুষের চলে যাওয়ার খবর আসবে এত দ্রুত। কিন্তু মহান স্রষ্টার নিয়তি, মানতে তো হবেই। চলে গেলেন রাজনীতি সমাজনীতিরও অনেক উপরের মানবনীতির এক প্রিয় মানুষ এপিজে আবদুল কালাম।

বেশ কয়েক বছর আগে এপিজে আবদুল কালামের উইংস অব ফায়ার শিরোনামে তার আত্মজীবনী পড়েছিলাম। যা পড়ে মনে হয়েছে প্রতিটি বিখ্যাত মানুষ যদি তার আত্মজীবনী লিখে যেতেন তা হলে পৃথিবী আর তার সব নবপ্রজন্ম পেত অনেক সহজ সহজ সব দিশা।

ভারতের মাদ্রাজের দ্বীপ শহর রামেশ্বরমের মধ্যবিত্ত তামিল পরিবারে জন্ম নেয়া এপিজে আবদুল কালামের বাবার ধনসম্পদ বিশেষ ছিল না, ছিল না প্রথাগত শিক্ষাও। তবে তার মায়ের বংশের লোকজন ছিল বেশ মর্যাদা সম্পন্ন।
বই পড়ার পাগল আবদুল কালামের শৈশবে বেড়ে ওঠা রামেশ্বরম দ্বীপে বই পড়া, বই সংগ্রহ করা ছিল অনেকটাই দুষ্কর। তারপরেও সেই ছোট বেলায় তার বাবার আধ্যাত্মিক তত্ত্ব তাকে এগিয়ে নিয়েছে প্রত্যাশার উচু প্রাচীরে, যা-ই এক সময়ে তাকে তুলে ধরে সাফল্যে স্বর্ন মন্দিরে।

তার বাবা জইনুল আবেদিনের আধ্যাত্মি তত্ত্বের এক উপলব্দি লিখতে গিয়ে আবদুল কালাম বলেছেন, “ প্রত্যেকটি মানুষ তার নিজের কালে নিজের স্থানে যা হয়েছে, যে অবস্থায় পৌছেছে, তাতে সমগ্র ঐশ্বরিক সত্তার এক বিশিষ্ট অংশ। তাই বাধা-বিঘ্ন, দু:খ কষ্ট, সমস্যা এলে ভয় পাবে কেন ? দুঃখ কষ্ট এলে তোমার দুঃখ কষ্ট বোঝার প্রয়োজনীয়তা বুঝার চেষ্টা করো। দুঃসময় এলেই সুযোগ আসে আত্মসমীক্ষার।”

সত্যিই দারুণ এক উপলব্দি শিখিয়েছিলেন কালামের বাবা। তাই হয়ত, সকল দুঃখ কষ্টকে জয় করেই বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ব্যক্তি হওয়ার বিজয় মুকুটে তাকেই মানিয়েছিল। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে মাত্র আট বছর বয়সে যুদ্ধের খবর জানার আগ্রহ থেকে তেতুলের বিচি সংগ্রহ করে তা বিক্রি করে পত্রিকা কিনে পড়তেন এপিজে আবদুল কালাম।

আসলে লক্ষ্য যার গগন ভেদি সে কি আর পড়ে রয়। তৎকালীন সমাজের উচু নিচুর দেয়াল ভেদ করে স্কুল শিক্ষকদের বাড়ি যাওয়া আসা আর গুরুস্নেহ অর্জনে মুসলিম ছাত্র কালামের জুরি ছিল না। আর সেকারণেই তার বিজ্ঞান শিক্ষক শিবসুব্রক্ষ্রণ্য আয়ার তাকে একদিন বলেছিলেন, কালাম, আমি চাই তুমি এমন ভাবে বেড়ে ওঠ, যাতে বড় বড় শহরের উচ্চ-শিক্ষিত লোকদের সমকক্ষ হতে পার তুমি।” শিক্ষক আয়ার মহাশয় কালামের প্রতিভার তেজের বিকিরণ তখনই দেখতে পেয়েছিলেন।

এপিজে আবদুল কালামের গনিত শিক্ষকের একদিনের বেত খাওয়ার স্মৃতি বলতে গিয়ে লিখেছিলেন, ভুলে গনিত শিক্ষক রামকৃষ্ণ আয়ারের এক অংকের ক্লাসে ঢুকে পড়ায় স্কুলের সমস্ত ছেলেদের সামনে বেত দিয়ে বেধড়ক পিটিয়েছিল স্যার। তার পর আর ঐ স্যারের সামনে পারত পক্ষে যেতাম না। কিন্তু এরপরে গনিতে এক’শর মধ্যে এক’শ পেয়ে স্যার যে প্রশংসা করেছেন তাতে সব কষ্ট আমার ভুলে গিয়েছিল।গনিত শিক্ষক রামকৃষ্ণ কালামকে নিয়ে বলেছিল, যাকে আমি বেত দিয়ে বেধড়ক পেটাই, সে-ই জীবনে অনেক বড় কিছু হয়। দেখবি এই কালাম একদিন অনেক বড় হবে, স্কুল আর দেশের মান বাড়াবে এরাই। সত্যি আগেকার মাস্টারমশাইরা আসলে ছাত্র-ছাত্রীদের অন্তরকে পড়তে পারতেন। দেখতে প্রতিভার বিচ্ছুরণ কতটা কিভাবে জ্বলে।

এপিজে আবদুল কালামের আত্মজীবনী আর তার কর্মময় জীবনের রয়েছে নানা দিক। তবে তার আত্মউপলব্দিগুলো সত্যিই আমাদের প্রত্যেকের জন্য জীবন যুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় সঞ্জিবনী নিয়ামক।

তার এক স্কুল শিক্ষক ইয়াদুরাই সলোমন সম্পর্কে এপিজে আবদুল কালাম বইয়ের এক যায়গায় লিখেছিলেন, “ (শিক্ষক ইয়াদুরাই)তিনি ছেলে মেয়েদের মধ্যে তাদের মূল্য সম্পর্কে একটা ধারণা জন্ম দিতেন।আমার নিজের মূল্যের বোধ আমার নিজের মধ্যে তিনি অনেক উচুঁতে তুলে দিয়েছিলেন। আমি যাদের সন্তান তাঁদের যদিও শিক্ষার সুযোগ হয়নি, তবুও আমিও যা হতে চাই তাই হতে পারবো।” এই বিশ্বাসও তিনি গড়ে দিয়েছিলেন এপিজে আবদুল কালামের মনে।
তাই তো আবদুল কালাম বলেছেন, “ বিশ্বাস থাকলে তুমিও নিজের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারবে, গড়তেও পারবে।”

আসলে শিক্ষকরা যে কত বড় কারিগর একেকজন বিখ্যাত মানব তৈরীতে তাদের যে কতটা অবদান তা এপিজে আবদুল কালামের আত্মজীবনীই বলে দেয়। একজন ভাল শিক্ষককের দিগদর্শনই তৈরী করতে পারে এমন একেকজন এপিজে আবদুল কালাম। একসময়ে সারা পৃথিবীর হাতে গোনা দু’একটি রাষ্ট্র ক্ষেপনাস্ত্র প্রযুক্তিতে বিশেষ দক্ষতার নিদর্শন করায়াত্ত করে রেখেছিল। সেই যায়গাতে এপিজে আবদুল কালামের হাত ধরে এসেছে বিজয়। ভারতে উড়েছে “পৃথ্বী” “ত্রিশূল” “অগ্নি”। সবই কর্মপ্রচেষ্টা আর প্রত্যাশার প্রাপ্তি।

১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর জন্ম নেয়া মানুষটি ২০০২ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ছিলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রধানব্যক্তি খেতাবের চেয়ে সাধারণের সাথে তরুণদের সাথে আলাপেই ছিল তার বেশি তৃপ্তি। বাংলাদেশ সফর করেছেন বেশ কয়েকবার। গত দুই দশকে এক কোটি ৮০ লাখ তরুণের সঙ্গে মতবিনিময়ের কথা বলেছেন এই চিরতরুন।শুনেছেন তরুনের মনের আকুতি। শ্রদ্ধার আসন গেড়েছেন বিশ্বের কোটি তরুনের মনে। পেয়েছিলেন ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারত রত্ম’ ।

সল্পসময়ে একজন মহানায়ক এক স্বপ্ন দ্রষ্টার ছিটেফোটা স্তুতি সরণ মাত্র। তবুও এই মানুষটির অন্তঃস্তিত “ ঐশ্বরিক অগ্নি”র ডানা মেলে আকাশের বুকে উড়ে যাওয়ার আশ্চার্য বৃত্তান্ত আমাদের সকল প্রজন্মের সুখ সাফল্যের হোক নিয়ামক শক্তি। ভাল রেখো খোদা তোমার এক অমর এই সৃষ্টিকে। ভাল রেখো এপিজে আবদুল কালামকে..পরপারের প্রতিটি সময় তার কাটুক ভাল রইল কায়মনো প্রার্থণা।

লেখক : সাংবাদিক।
Badsha2050@gmail.com