গণমাধ্যমের আয়নায় গণতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৮, ২০১৩

সুলতানা কামাল::

newsmediaগণমাধ্যম কথাটির তাৎপর্য হলো, একে একই সঙ্গে গণ এবং মাধ্যম হয়ে উঠতে হয়। এর সংজ্ঞার মধ্যেই গণতান্ত্রিকতা অর্থাৎ জনমুখাপেক্ষিতার ব্যাপারটি নিহিত আছে। একটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের মতামত-চিন্তা, প্রতিক্রিয়া জানা ও জানানো বিরাট গুরুত্ব বহন করে। এটাই গণতন্ত্রের সার্থকতা। জনগণ জাতীয় জীবনে কতটা অংশগ্রহণ করতে পারছে, সেটা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে। গণতন্ত্রের বড় শর্ত—সংবিধানেও লিপিবদ্ধ আছে যে, দেশের জনগণই দেশের মালিক। অতএব, দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের মতামত এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাটাও খুব জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। তার জন্য কতগুলো নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার প্রয়োজন আছে। আমরা সেগুলোকে নানা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ বা কাঠামো দিই। গণমাধ্যম সে রকমই একটি অত্যন্ত মৌলিক প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে জনগণের এই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। গণমাধ্যমের মূল দায়িত্বের মধ্যে পড়ে দেশের, অঞ্চলের বা আন্তর্জাতিকভাবে যেসব ঘটনা ঘটে, যা কিছু মানুষের জীবনকে স্পর্শ করে, প্রভাবিত করে, সেসব ঘটনা সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করা। এবং সে পরিপ্রেক্ষিতে কোথায় কী করণীয় আছে, তা নিয়েও আলোচনার সূত্রপাত ঘটানো গণমাধ্যমের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
গণমাধ্যমকে অনেক সময় প্রতিবিম্বের সঙ্গেও তুলনা করা চলে। গণমাধ্যমের আয়নায় মানুষ সরকার কিংবা দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির চেহারার প্রতিফলন খুঁজে পেতে পারে। খুঁজে পেতে পারে নিজেদের মুখচ্ছবিও। এখানে একটা কথা খুব জোর দিয়ে বলা যায়, সংবাদ পরিবেশনের বাইরেও আরও অনেক কার্যক্রম আছে, যা অনেক পত্রপত্রিকা বা গণমাধ্যম করে থাকে। এসবের মধ্য থেকে যেখানে মানুষ সবচেয়ে স্বচ্ছভাবে চেহারাটা দেখতে পায়, সেটাকেই বেছে নেয়। এ কথা আমি আগেও বলেছি এবং আবারও জোর দিয়ে বলতে চাই, বিভিন্ন গণমাধ্যমের মধ্যে থেকেও জনগণ কিন্তু প্রতিদিন তার সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পত্রিকা কিংবা চ্যানেলটা বেছে নেয়। অর্থাৎ একদিকে যেমন দেশ কারা পরিচালনা করবেন, সে বিষয়ে যেমন জনগণের একটা দায়িত্ব থাকে, একইভাবে সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত দল অথবা নির্বাচিত ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি করার হাতিয়ার হিসেবে কোন মাধ্যমকে তারা বেছে নেবে, সেটাও কিন্তু প্রতিদিন জনগণের নির্বাচনের মুখোমুখি দাঁড়াচ্ছে। তাই এক অর্থে সেই গণমাধ্যমও এভাবে জনগণেরই প্রতিনিধিত্ব করছে। প্রতিদিন যখন সচেতনভাবে একজন নাগরিক তাঁর পছন্দের পত্রিকাটি পকেটের পয়সা ব্যয় করে কিনে নিচ্ছেন, অথবা রিমোট ঘুরিয়ে একটি চ্যানেলে গিয়ে থেমে যাচ্ছেন, তখনই তিনি সেই পত্রিকা অথবা চ্যানেলটিকে নিজের প্রতিনিধি বলে নির্বাচন করে নিচ্ছেন।
অর্থাৎ একটি গণতন্ত্রে সরকার থেকে শুরু করে নানা প্রতিষ্ঠানের যে প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব রয়েছে, গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সেটা ছোট করে দেখার বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। এই গুরুত্বের সঙ্গে সঙ্গেই চলে আসবে দায়িত্বশীলতার প্রশ্নটিও। সেহেতু আগেই বলেছি, যেই গণমাধ্যম যত স্বচ্ছ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে চতুষ্পার্শ্বিক বাস্তবতাকে তুলে ধরতে পারবে এবং একই সঙ্গে নাগরিক-সচেতনতা ও দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করতে পারবে, সেই গণমাধ্যমই জনগণের প্রিয় এবং আস্থাভাজন মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
বিগত সময়ে আমরা হয় সরাসরি ঔপনিবেশিক সরকারের অধীনে অথবা নিজেদের লোকদের নিয়ে গঠিত হলেও মূলত একই ধরনের সরকারব্যবস্থার অধীনে ছিলাম। কখনো কখনো অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসনের নিচেও আমাদের বাস করতে হয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে, গণমাধ্যম মূলত তাদের মূল লক্ষ্য রেখেছে সেই সব অগণতান্ত্রিক সরকারের গণবিরোধিতা উন্মোচন করার দিকে। যখন আনুষ্ঠানিকভাবে জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকারের অধীনে আমরা বাস করছি এবং বিভিন্ন বাস্তব কারণে সরকারের সঙ্গে সমান্তরালে অনেক বেসরকারি করপোরেট শক্তিও জনগণের জীবন নিয়ন্ত্রণের মতো পরিস্থিতি তৈরি করে নিতে পেরেছে, এই নতুন বাস্তবতার প্রতি আজকের গণমাধ্যম কতখানি নজর রাখতে পারছে, সেটা হয়তো একটা প্রশ্ন হিসেবে দেখা যেতে পারে।
গণমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্বের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্বশীলতার কথাটিও মোটেই হেলা করা যায় না। কোন শক্তি, কখন, কোথায় ক্ষমতার মূল চাবিটি নাড়াচাড়া করছে, সেটা দেখার চেষ্টা করা এবং জনগণের সামনে উপস্থাপন করার একটা বড় দায়িত্ব কিন্তু গণমাধ্যমের ওপর এসে বর্তায়। এ কথা হয়তো একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মতোই গণমাধ্যমও আরেক রকমের কায়েমি স্বার্থ দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়ে থাকতে পারে। সেই স্বার্থ রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, একেবারে নিছক আর্থিক মুনাফার বিষয়ের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে, আবার একেবারে নেহাতই সরকারবিরোধিতার সঙ্গেও যুক্ত থাকতে পারে। আবার দেখা যায়, কোনো কোনো পত্রিকা বা টেলিভিশন চ্যানেল হয়তো সচেতনভাবে ও সুবিবেচনার সঙ্গে কোনো কোনো বিষয় নিয়ে যথেষ্ট অঙ্গীকারের সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করে, কিন্তু দেখা গেল যে বাণিজ্যিক কারণে ঠিক তার ঘোষিত উদ্দেশ্যের বিপরীত শক্তির সঙ্গে হাত মেলাচ্ছে। যেমন দেখা যায়, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর
সম-অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে অনেক গণমাধ্যমই যথেষ্ট সোচ্চার। আবার তারাই এমন এমন বিজ্ঞাপন প্রচার করে, যা একেবারেই তার বিরুদ্ধে চলে যায়। পরিবেশের ক্ষেত্রেও এ বিষয়টা প্রবলভাবে চোখে পড়ে। সেসব পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমকে অবশ্যই আরও কঠোরভাবে নিজেদের নীতির প্রতি নিষ্ঠা রেখে চলতে হবে।
এ ছাড়া কখনো কখনো গণমাধ্যমের নিজস্ব কর্মী অথবা প্রতিবেদকের কিছু কিছু বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়। যেখানে কিছুটা কঠোর শ্রম দেওয়ার বিষয় থাকে, সে ব্যাপারে অনীহা কিংবা ‘চমকে’ দিতে হবে এমন খবরের প্রতি উৎসাহ গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। সে বিষয়েও সাবধানতা অবলম্বন জরুরি বলে আমি মনে করি। আরেকটি ব্যাপারে আমার কিছু বক্তব্য আছে: কোনো একটি ঘটনা ঘটলে সেটির বস্তুনিষ্ঠ এবং যতটা সম্ভব সত্যের কাছাকাছি উপস্থাপন অবশ্যই বাঞ্ছনীয়। তবে, সেই উপস্থাপনা যেন কারও মর্যাদায় আঘাত না হানে। কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ঝুঁকি বাড়িয়ে না দেয়, সে বিষয়ে লক্ষ রাখাটাও আমি মনে করি গণমাধ্যমের কর্মীদের নৈতিকতার একটি বিষয় হওয়া উচিত।
সবকিছুর পরও এ কথা অনস্বীকার্য যে গণমাধ্যম আছে বলেই গণতন্ত্র অনেক সংহত হতে পেরেছে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামত দেওয়া এবং অংশগ্রহণের সুযোগও বজায় থেকেছে। সবচেয়ে বড় কথা, গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় একটি সচেতন জনগোষ্ঠীর বিকাশ সম্ভব হয়েছে গণমাধ্যমের বিকাশের হাত ধরেই।