সংবাদপত্র, সাংবাদিকতা ও ‘প্রথম আলো’

বৃহস্পতিবার, মার্চ ২৮, ২০১৩

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর::
prothom aloএকটি সংবাদপত্রের মূল শক্তি হলো স্বাধীনতা। স্বাধীনতাহীন সংবাদপত্র কোনো সংবাদপত্র নয়। তাকে বড়জোর ‘প্রচারপত্র’ বলা যায়। আমাদের সৌভাগ্য, আমাদের দেশে নানা নেতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেও আমরা সংবাদপত্র তথা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পেয়েছি। নব্বইয়ের পরের সব ‘নির্বাচিত সরকার’ (গণতান্ত্রিক সরকার বলা যায় না) আমাদের গণমাধ্যমের এই স্বাধীনতা হরণ করতে পারেনি। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অনেক স্বাধীন প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে সরকারের নানা নীতি, আচরণ ও প্রভাবের কারণে সব স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে না বা ভোগ করতে দেওয়া হয় না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যম ব্যতিক্রম। ‘বিটিভি’ ও ‘বাংলাদেশ বেতার’ ছাড়া সরকার কোনো গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। পাঠক, দর্শক ও শ্রোতা হিসেবে এটা আমাদের এক বিরাট অর্জন।
বাংলাদেশের সংবাদপত্র তথা অন্যান্য গণমাধ্যম যে আজ এত জনপ্রিয়, তার পেছনের প্রধান কারণ এই স্বাধীনতা। গণমাধ্যমের কোনো ভুল পদক্ষেপের কারণে সরকার যেন এই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে না পারে, সেদিকে আমাদের সবার সচেতন ও সতর্ক থাকা দরকার।
আমরা আশা করি, ‘সংবাদপত্র’ হবে একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। সংবাদপত্র তার নিজস্ব সম্পাদকীয় নীতি ও সাংবাদিকতার পেশাগত শর্তগুলো দ্বারা পরিচালিত হবে। সরকার, দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী—কারও স্বার্থ রক্ষা করা একটি সংবাদপত্রের কাজ নয়। সংবাদপত্রের বিবেচনায় থাকবে দেশ ও দেশের মানুষ। এটাই হবে সংবাদপত্রের স্বার্থ। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থরক্ষায় সংবাদপত্র হবে আপসহীন। আমাদের দূষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে কখনো কখনো সরকারি মন্ত্রী বা নেতারা ‘সরকার’কে ‘দেশ’ বলে ভুল ব্যাখ্যা দেন। সরকার ও দেশ এক নয়। সরকার অস্থায়ী, দেশ স্থায়ী। সরকারের সমালোচনাকে অনেক নেতা ‘দেশদ্রোহিতা’ বলে আখ্যা দেন। ‘দেশদ্রোহিতা’ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে দেশদ্রোহিতা প্রমাণ করা যায় না। দেশদ্রোহীর বিচার করতে হয়। সরকারের সমালোচনা করা প্রত্যেক নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার।
কোনো রাজনৈতিক দলের দৈনিক পত্রিকা থাকতে পারে। সেটা দোষণীয় নয়। তবে তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া উচিত। পশ্চিমবঙ্গে গণশক্তি সিপিএমের দৈনিক পত্রিকা। সবাই সেটা জানেন। আমাদের দেশে কোনো কোনো দৈনিক পরোক্ষভাবে দলের পত্রিকা হিসেবে ভূমিকা পালন করে। সেগুলো যতটা সংবাদপত্র, তার চেয়ে বেশি প্রচারপত্র। আশার কথা, এ ধরনের পত্রিকা পাঠকের সমর্থন লাভ করে না। এমনকি দলীয় কর্মীরাও ওসব পত্রিকা পড়েন না।
আজকাল পাঠক অনেক সচেতন। দলীয় কলম দিয়ে কিছু লিখলে পাঠক তা গ্রহণ করে না। পাঠক চায় দলনিরপেক্ষ বিশ্লেষণ। বস্তুনিষ্ঠ রিপোর্টিং। স্বাধীন সংবাদপত্রের প্রতি সরকার, সরকারি দল, বিরোধী দল—সবাই চটে থাকে। সরকারি দলের নেতারা তো সুযোগ পেলেই পত্রিকা বা সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করে ফেলেন। কিন্তু খুব কম মামলায় রিপোর্ট মিথ্যা প্রমাণ করা সম্ভব হয়েছে। স্বাধীন সাংবাদিকতার অর্থ এই নয় যে মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক নেতা, আমলা বা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা বা অর্ধসত্য রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে। সংবাদপত্রে মিথ্যাচারের কোনো জায়গা নেই। সংবাদপত্রের একটি ভুল রিপোর্টে একজন সম্মানীয় লোকের ভাবমূর্তি ধুলায় মিশে যেতে পারে। এটা কখনো হতে দেওয়া যায় না। নেতিবাচক প্রতিবেদন বা কলাম প্রকাশের আগে সংবাদপত্রকে দু-তিনবার চেক ও ক্রসচেক করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। দুঃখের বিষয়, কিছু আনাড়ি সম্পাদক ও সাংবাদিকের কারণে কিছু কিছু সংবাদপত্রে ভুল তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এগুলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অপপ্রয়োগ ছাড়া কিছু নয়। কোনো অনিচ্ছাকৃত কারণে পত্রিকার প্রকাশিত রিপোর্ট ভুল বলে প্রমাণিত হলে সম্পাদকের ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত।
সরকারের সমালোচনা করা হলে অনেকে অসন্তুষ্ট হন। তাঁরা এ কথা বুঝতে চান না যে সমালোচনা তো সরকারি ব্যক্তিদেরই হবে। কারণ, তাঁদের হাতে সরকারি দায়িত্ব ও ক্ষমতা। সেই ক্ষমতার অপব্যবহার হতেই পারে। বিরোধী দলের সমালোচনার ক্ষেত্র খুব সীমিত। কারণ, তাদের হাতে কোনো ক্ষমতা নেই। কাজও নেই। আমাদের দূষিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রাজনৈতিক দলের জন্য কোনো গঠনমূলক কাজ রাখা হয়নি। হরতাল, মিছিল, মিটিং করা ছাড়া তাদের কোনো কাজ নেই। সরকারি দলের অনেক নেতা তবু কিছু সরকারি ব্যবসা বা টেন্ডারের ফিকিরে থাকেন।
দেশে এখনো কয়েকটি স্বাধীন সংবাদপত্র রয়েছে বলে আমরা সরকারের নানা ব্যর্থতা ও দুর্নীতির খবর পাচ্ছি। গণতন্ত্রে স্বাধীন সংবাদপত্রের বিকল্প নেই।
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের ইতিহাসে প্রথম আলো একটি টার্নিং পয়েন্ট। ইতিহাসের দিকে যদি দৃষ্টি ফেরাই তা হলে দেখব: পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমিতে ১৯৩৬ সালে দৈনিক আজাদ-এর প্রতিষ্ঠা। অবিভক্ত বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে আজাদ একটি টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৪৯ সালে প্রথম ইংরেজি দৈনিক হিসেবে পাকিস্তান অবজারভার একটি টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৫১ সালে দৈনিক সংবাদ, ১৯৫৩ সালে দৈনিক ইত্তেফাক একটি টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৬৪ সালে দৈনিক পাকিস্তান। এসব দৈনিক পত্রিকা আমাদের সাংবাদিকতা জগৎ ও পাঠকসমাজের ওপর বড় প্রভাব সৃষ্টি করতে পেরেছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৯৮ সালে প্রথম আলো একটি টার্নিং পয়েন্ট। ইতিমধ্যে আরও কয়েকটি দৈনিক পত্রিকা বিরাট সম্ভাবনা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু কোনোটাই দীর্ঘস্থায়ী হয়নি বা সেই সম্ভাবনা বিকশিত হয়নি। দু-একটি এখন অনুল্লেখ্য দৈনিকে পরিণত হয়েছে।
প্রথম আলো গত ১৪ বছরে ক্রমে ক্রমে বিকশিত হয়েছে। পাঠকসংখ্যা ধীরে ধীরে বেড়েছে। এখন তো বাংলাদেশে সর্বাধিক প্রচারিত বাংলা দৈনিক। প্রথম আলোর জনপ্রিয়তার কারণ কী? সংক্ষেপে এভাবে বলা যায়: দলনিরপেক্ষ সাংবাদিকতা, সাহসী, বলিষ্ঠ ও তথ্যবহুল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, নিরপেক্ষ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, আকর্ষণীয় বিভিন্ন ফিচার পাতা, হিউম্যান স্টোরি, প্রতিদিন বিশেষ রিপোর্ট (যা টিভির খবরে পাওয়া যায়নি), বৈচিত্র্যময় বিষয়ে নিবন্ধ, বিশেষজ্ঞ নিবন্ধ, বিভিন্ন জাতীয় সংকটে দ্রুত একটা অবস্থান নেওয়ার ক্ষিপ্রতা, আকর্ষণীয় ফটো, ‘ছুটিরদিনে’ ও ‘রস+আলো’ ম্যাগাজিন—নানা কিছু। ইদানীং তরুণদের আকর্ষণ করেছে ‘স্বপ্ন নিয়ে’ ফিচার পাতা। প্রথম আলোর ‘নকশা’ও বহু পাঠকের প্রিয়। একটি সপ্তাহে এত বৈচিত্র্যময় নিবন্ধ, রিপোর্ট, ফিচার ও বিভাগীয় পাতা ছাপা হয় যে পাঠক পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
এত বৈচিত্র্যময় লেখা প্রকাশ করেও কি সব পাঠককে সন্তুষ্ট করা সম্ভব হয়েছে? আমি প্রায় নিশ্চিত, সম্ভব হয়নি। প্রথম আলো নিয়মিত পড়েন এমন বহু পাঠক রয়েছেন, যাঁরা পত্রিকার বিভিন্ন বিষয়ের সমালোচনা করেন। আমার নিজেরও নানা সমালোচনা রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তা আমি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিতেও এনেছি। কিন্তু তেমন কাজ হয়নি। আমি প্রথম আলোকে এভাবে দেখি: ‘যা পাচ্ছি তা কি যথেষ্ট নয়?’ যা পাচ্ছি তা অন্য দৈনিকের
চেয়ে উৎকৃষ্ট কি না, সেটাই পাঠক হিসেবে আমার প্রধান বিবেচনা। যা পাচ্ছি না তার তালিকা তো দীর্ঘ। সেই তালিকা কি কেউ পূরণ করতে পারবে? পাঠক হিসেবে সব সময় সেই অপেক্ষাতেই থাকব।
দৈনিক পত্রিকা হিসেবে প্রথম আলো পত্রিকার চেয়েও বড় একটি প্রতিষ্ঠান। সাংবাদিকতার বাইরেও দেশ ও সমাজের উন্নতির লক্ষ্যে প্রথম আলো নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে চলেছে। এসব কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমান ও আগামী দিনের পাঠকগোষ্ঠী। বিশেষ করে তরুণসমাজ। এইচএসবিসির সহযোগিতায় ‘ভাষা প্রতিযোগ’ তেমনি একটি কার্যকর কর্মসূচি। বাংলা ভাষা নিয়ে আমাদের যত আবেগ রয়েছে ততটা কাজ নেই, শুদ্ধভাবে বাংলা লেখার ব্যাপারে কোনো সামাজিক আন্দোলনও নেই। প্রথম আলোর এই কর্মসূচি সেই অভাব কিছুটা পূরণ করেছে। অ্যাসিড-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে প্রথম আলোর নিয়মিত নানা কর্মসূচি সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ‘প্রথম আলো ট্রাস্ট’ এ দেশের সংবাদপত্রশিল্পের জন্য একটি অনুকরণযোগ্য দৃষ্টান্ত। সংবাদপত্রের প্রভাব ও জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে অনগ্রসর সমাজের জন্য কিছু কাজ করা নিঃসন্দেহে প্রশংসাযোগ্য। এসব কাজ বাংলাদেশে বিরাজমান সমস্যার তুলনায় বিন্দু। তবু ‘বিন্দু’ তো করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে প্রথম আলো একটি মডেল। পত্রিকাটির নানা দুর্বলতা সত্ত্বেও যে অবদান সমাজে রেখে যাচ্ছে, তা দেশ ও জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য এক বড় দৃষ্টান্ত।

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী। সূত্র: প্রথম আলো।