অযোগ্যতার জন্য ক্ষমা প্রার্থী

Tuesday, 10/03/2015 @ 11:29 pm

:: মুহম্মদ মাহবুব উল আলম ::

kolomরাতারাতি যাঁরা ধনী অথবা মহা-ধনী হতে চান এযুগে তাদের জন্য রাজনীতি হচ্ছে সবচেয়ে সহজ পথ। ৩৭ বছর ধরে সাংবাদিকতার পেশায় থাকার কারনে আমার আসে-পাশের প্রায় সকলকেই দেখেছি এবং দেখছি রাজনীতি করে ভাগ্যের উন্নয়ন করতে। এদের অনেকেরই শুধু উন্নয়ন নয়, রীতিমত “আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে।” সুতরাং রাজনীতি করে আমার ভাগ্যেরও উন্নয়ন ঘটবে এমনটাই ছিল সকলের ধারণা।

আমার এক শুভানুধ্যায়ী এবং মুরুব্বী বিদেশে থাকেন। কয়েকদিনের জন্য দেশে এসেছিলেন, টেলিফোনে তিনি আমার খবর নিতে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন “তোমার এমন দশা হলো কি করে? সকলেরই যেখানে উন্নতি হচ্ছে সেখানে তোমার এদশা কেন?” আমার অনেক বন্ধু এবং শুভানুধ্যায়ী মাঝে মাঝেই একই প্রশ্ন করে থাকেন।

সবিনয়ে সকলকেই বলেছি ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য আমি রাজনীতি করার চেষ্টা করিনি, কারণ রাজনীতি করার আগে ২০০১ সাল পর্যন্ত আমার আর্থিক-সামাজিক অবস্থা যথেষ্ট ভালো ছিল, অবনতি যা ঘটার তা ঘটেছে ২০০১সালের পরে। আর অযোগ্যতাই এর অন্যতম কারন। আমি এতটাই অযোগ্য যে সুযোগ থাকার পরেও তা ব্যবহার করে ভাগ্যের উন্নয়ন করতে পারিনি। সুতরাং দায় একান্তই আমার এবং এজন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী।

আসলে ভাগ্যবানদের মতো ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটানোর বদলে মোটামুটি একটু সহনীয় ভাবে জীবনের বাঁকী সময় পার করার জন্য চাকরীর চেষ্টা করেছি। নিজে একটা চাকরী জোটাতে চেষ্টা করেছি। বর্তমানে আমার বয়ষ প্রায় ৫৮। পঞ্চাশ উর্দ্ধ বয়সের কারনেই হোক অথবা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সংসদ নির্বাচন করেছে সুতরাং “ডিষ্টার্বিং এলিমেন্ট” ভাবার কারণেই হোক ভাগ্যে চাকরী জেটেনি। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর প্রার্থী হিসাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করার পর সাধারণতঃ স্বাভাবিক চাকরী করার আর কোনও প্রয়োজন হয় না – সেকারনে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করার পর স্বাভাবিক চাকরী করার উদাহরণ আছে কিনা জানিনা। সুতরাং নিজের অযোগ্যতার জন্য সবশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দারস্থ হয়েছি একটি চাকরীর জন্য।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ – তিনি দুই বার নির্দেশ দিয়েছেন আমাকে একটি চাকরীর ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে তিনি একবার নির্দেশ দিলেন তাঁর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা – সহকারী একান্ত সচিব সাইফুজ্জামান শিখর’কে। যেকোন কারণেই হোক বোধহয় শিখর সাহেব আমাকে পছন্দ করতে পারেননি। সেকারনে তার নিকট ৬বার “সিভি” জমা দেওয়ার পরও কোনো চাকরী ভাগ্যে জেটেনি।

২০১১ সালের নভেম্বর মাসে একই কর্মকর্তাকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবার নির্দেশ দেন আমাকে একটা চাকরীর ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য। এ পর্যায়ে আমার ভাগ্যে জুটলো একটি বার্তা প্রতিষ্ঠানে মাসে ১২ হাজার টাকা বেতনের “সংবাদদাতা” হিসাবে একটি অস্থায়ী চাকরী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব শিখর সাহেব ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে আমাকে বলেছিলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে আমাকে একটা ভালো জায়গায় চাকরী দেওয়া হবে, কিন্তু প্রায় ৩৯ মাস পার হয়ে গেলেও অবস্থার কোনোও পরিবর্তন ঘটেনি।

২৫-৩০ বছর চাকরী করে কোনো ব্যুরোক্র্যাট যখন সচিব হন তখন তাঁকে সহকারী কমিশনার-এর নীচের পদে কেউ চাকরী দেওয়ার কথা কল্পানাতেও ঠাঁই দেবেন না। ২৫-৩০বছর সামরিক বাহিনীতে চাকরী করে যখন কেউ জেনারেল হন, তখন সেকেন্ড লেফট্যানেন্ট-এর নীচের পদে তাঁকে চাকরী দেওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাববেন না। এমন এক দুর্ভাগা পেশায় ৩৭বছর কাটিয়ে দিলাম যেখানে একটি দৈনিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক থেকে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ করছি “জুনিয়র ষ্টাফ রিপোর্টার”-এরও নীচের পদে সংবাদদাতা হিসাবে, মাসে ১২হাজার টাকা বেতনে।

অন্যদিকে, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক মনোনীত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে বগুড়া সদর আসন থেকে প্রায় ৫৫হাজার ভোট পেয়ে নিকটতম প্রতিদ্বন্দী ছিলাম। মাসে ১২ হাজার টাকা বেতনের একটি চাকরী যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক মনোনীত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর জন্য উপযুক্ত হয় তাহলে আমার কিছু বলার নেই। তবে আমাকে মাসে ১২ হাজার টাকা বেতনের একটি অসম্মানজনক পদে চাকরীর ব্যবস্থা করে দিয়ে জনাব শিখর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেই অসম্মান করেছেন কিনা – সে বিবেচনার ভার সংশ্লিষ্ট সকলের।

গত প্রায় ৩ বছরে প্রায় ৪০বার চেষ্টা করেও জনাব সাইফুজ্জামান শিখর-এর কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার সুযোগ পাই নি। উপরন্ত যে ধরনের আচরণ করা হয়েছে তাতে অপমানিত বোধ করেছি। এমতবস্থায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আবার দেখা হবে, এমন আশা ছেড়ে দিয়েছি।

২০০১ সালে বগুড়া সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে বেগম খালেদা জিয়ার বিপক্ষে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করার আগে পর্যন্ত আমার আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত স্বচ্ছল ছিল। ১৯৮২সাল থেকে আমি বগুড়া থেকে প্রকাশিত এক সময়ের বহুল প্রচারিত “দৈনিক উত্তরবার্তা”-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে নির্বাচন করার অপরাধে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের রোষের মুখে পড়ে দৈনিক উত্তরবার্তা। ফলে আর্থিক সংকটের কারনে ২০০২ সালের অক্টোবর মাস থেকে দৈনিক উত্তরবার্তা-এর নিয়মিত প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। শুরু হয় আমার ভাগ্য বিপর্যয়।

প্রায় ৩৭বছর ধরে সাংবাদিকতার পেশায় জড়িত। চারবার বগুড়া প্রেসকাবের নির্বাচিত সভাপতি ছিলাম। এক সময় স্বচ্ছল জীবন যাপনে অভ্যস্ত হলেও এখন মাসে ১২হাজার টাকায় না চলে সংসার, না মেটে চিকিৎসার খরচ। ছেলেদের লেখা-পড়ার খরচ তো বাদই রইলো। একই কারনে আর্থিক সংকটের জন্য “দৈনিক উত্তরবার্তা”-এর নিয়মিত প্রকাশনা শুরু করাও আর সম্ভব হয়ে উঠছে না।

আমি জানি বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ আমার চেয়েও দরিদ্র। কিন্তু যারা এক সময় স্বচ্ছল জীবন যাপন করে অভ্যস্ত তাদের জন্য অ-স্বচ্ছল জীবন বেশী কষ্টের। নীচ থেকে উপরে ওঠা আনন্দদায়ক হলেও উপর থেকে নীচে পড়ার যন্ত্রনা বেশী। ২০০১ সাল থেকে আমার নীচে পড়া শুরু হয়েছে, গত ১৩বছর ধরে ক্রমাগত নীচে পড়ে তলিয়ে যাচ্ছি অতলে।

রাজনীতি করে যারা ধনী অথবা মহা-ধনী হয়েছেন তারাই যোগ্য। বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী যোগ্যরাই টিকে থাকে। সুতরাং আমার মত অযোগ্যরা করুনভাবে সমাজ থেকে, জীবন থেকে হারিয়ে যাবে – এটাই প্রত্যাশিত।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, দৈনিক উত্তরবার্তা।

সর্বশেষ