আইএস ঝড়ে তোলপাড় বিশ্ব

Monday, 13/10/2014 @ 3:15 pm

:: কাজী আবুল মনসুর ::

ISIS-isil-iraq-mn-905ইরাকের মসুলের এক মুদি দোকানদার সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ‘তারা (আইএস জঙ্গি) আমার কাছে প্রতিদিন চাঁদার জন্য আসে। আমি চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে দোকানের সামনে বোমা মারে যাতে আমার শিক্ষা হয়, তারা আমাকে তুলে নিয়ে যায়, সে থেকে বেশ কয়েকবার তাদের হাতে প্রতি মাসে ১০০ ডলার করে দিয়েছি। প্রতিবারই রসিদ দিয়েছে তাতে লেখা আছে আন্দোলনের সমর্থনে এই পরিমাণ অর্থ সংগৃহিত হলো। শেষ পর্যন্ত তাদের ভয়ে দোকান বন্ধ করে দিতে হলো। আমি এখন ট্যাক্সি চালিয়ে দিন গুজরান করি।’

আইএস এখন সারা বিশ্বে আতঙ্কের নাম। তারা অমুসলিমদের ধরে জবাই করে সেটা প্রকাশ করছে ইন্টারনেটে। সাংবাদিক, ডাক্তার, প্রকৌশলী, চাকরিজীবী কারও নিস্তার নেই তাদের হাত থেকে। ইরাকের পাঁচটি তেল স্থাপনা এখন তাদের দখলে। এগুলো থেকে দৈনিক আয় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার। নগদ টাকায় অস্ত্র সংগ্রহ করছে আইএস। একের পর এক কুর্দি অঞ্চল দখল করছে। হাজারো মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে আইএস জঙ্গিরা। আমেরিকা, ফ্রান্স থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের কোন রাষ্ট্রই আজ নিরাপদ নয় আইএস এর হাত থেকে।

ব্যাপকভাবে নিন্দিত আল কায়দার নতুন সংস্করণ ইসলামিক স্টেট (আইএস) একটি ওয়াহাবি-সালাফি জঙ্গি সংগঠন। উগ্র বা কথিত সালাফি ইসলামের ভিত্তিতে ইরাক ও আশশাম তথা বৃহত্তর বা প্রাচীন সিরিয়ায় (লেবানন ও ফিলিস্তিনসহ) একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা গ্রুপটির উদ্দেশ্য। সম্প্রতি ইরাক ও সিরিয়ায় প্রতাপের সাথেই কার্যক্রম চালিয়ে নিচ্ছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

এ গ্রুপটির নানা নৃশংস কর্মকান্ড মিডিয়ার নজরে এলেও তাদের গঠন কিংবা নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রায় অন্ধকারেই রয়েছে বিশ্ববাসী। ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সেনাবাহিনীর বহু কর্মকর্তাই রয়েছেন আইএস-এর নেতৃত্বে। ইরাকে আইএস-এর জব্দ করা বহু দলিলপত্রে এর প্রমাণ মিলেছে।

এ কথা এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য যে, আফগানিস্তানে সাবেক সোভিয়েত দখলদারিত্ব ও প্রভাব মোকাবিলার জন্য আমেরিকাই লাদেনকে দিয়ে গঠন করিয়েছিল আল-কায়দা এবং আরো পরে তালেবান। তালেবান ও আল-কায়দাকে দ্বিমুখী বা ত্রিমুখী কাজে ব্যবহার করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। প্রথমত ইসলামের নাম ভাঙিয়ে একশ্রেণীর যুবককে শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা, দ্বিতীয়ত প্রথম উদ্দেশ্য হাসিলের পর তথা সরলমনা ধর্মান্ধ যুবকদের ব্যবহার করার পর ইসলামের নামে ধর্মান্ধতার বিস্তার ও জঙ্গিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে ইসলাম সম্পর্কে আতঙ্ক ও খারাপ ধারণা ছড়িয়ে দেয়া এবং তৃতীয়ত এদেরকে সন্ত্রাসী তৎপরতায় ব্যবহার করে, সেই একই সন্ত্রাস দমনের নামে দেশে দেশে হস্তক্ষেপ করতে সক্ষম হয় আমেরিকা। এর মধ্য দিয়ে দেশটির খনিজ সম্পদসহ মূল্যবান সম্পদ হাতিয়ে নেয় আমেরিকা। এরই অংশ হিসেবে বর্তমানে ইরাকে লোকদেখানো বিমান হামলা চালাচ্ছে আমেরিকা। তবে বিভিন্ন কারণে সিরিয়ায় সরাসরি অভিযান চালাতে পারছে না দেশটি।

মূল প্রসঙ্গে আসি এবার, ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার সময় সর্বপ্রথম গঠিত হয়েছিল এখনকার আইএস গ্রুপ। তখন গ্রুপটির নাম ছিল ইসলামিক স্টেট অব ইরাক (আইএসআই)। ২০০৬ সালের ১৫ অক্টোবর বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর আইএসআই’র আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের কথা ঘোষণা করা হয় এবং আবু ওমর আল-বাগদাদি গ্রুপটির নেতা বলে জানানো হয়। ২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল আবু ওমর নিহত হলে আবু বকর আল বাগদাদি এই জঙ্গি গ্রুপটির নতুন প্রধান হন এবং মধ্যপ্রাচ্যে গ্রুপটির বিস্তার শুরু হয়।

‘নয়া বিন লাদেন’ নামে খ্যাত বাগদাদিকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য মার্কিন সরকার ১০ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। বাগদাদি ২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইরাকের উম্মে কাসর শহরে একটি মার্কিন কারাগারে বন্দি ছিলেন। ২০০৩ সালের আগেও তিনি আল-কায়দার সদস্য ছিলেন বলে মনে করা হয়। তাকেসহ হাজার হাজার চরমপন্থী বন্দিকে মুক্তি দেয়া হয় উম্মে কাসর শহরের ‘বুকা’ কারাগার থেকে।

বাগদাদি ২০১১ সালে বাগদাদের একটি মসজিদ বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেন। এছাড়া ইরাকের সুন্নিদের নেতা হিসেবে খ্যাত খালেদ আল ফাহদাওয়িকেও হত্যার জন্য অভিযুক্ত হন বাগদাদী। ইরাকের কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে দক্ষ বাগদাদি এখন ছায়ামূর্তির মতো গোপনে বিচরণ করেন এবং তার কর্মী ও ভক্তরাও খুব কমই তাকে দেখতে পান। আল-কায়দার অন্য যে কোনো নেতার চেয়ে বাগদাদি অনেক বেশি উগ্র চিন্তাধারায় বিশ্বাসী। কে এই বাগদাদী? তার প্রকৃত নাম- ইবরাহিম আওয়াদ ইবরাহিম আলী আল বদরী। তবে আবু বকর আল বাগদাদি হিসেবেই বেশি পরিচিত। আলী আল বদরি শামররাই, ডক্টর ইবরাহীম, আবু দুইয়া হিসেবেও পরিচিত তিনি।

১৯৭১ সালে বাগদাদ শহর থেকে ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত সামাররা’তে জন্মগ্রহণ করেন বাগদাদী। বাগদাদ ইসলামি বিশবিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নেয়ার পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এসময় একজন ধর্মপ্রচারক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বাগদাদীর বিস্ময়কর উত্থানের পিছনে তথ্য জানতে গিয়ে জানা যায়, আইএসআইয়ের নেতৃত্ব নেওয়ার পর তিনি সংগঠনটিকে পুনর্গঠন করেন। ২০১৩ সাল নাগাদ সংগঠনটি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তারা ইরাকে একাধিক হামলা চালায়। একই সঙ্গে সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যোগ দেয় গোষ্ঠীটি। সেখানে তারা আল নুসরা ফ্রন্ট গঠন করে।

২০১৩ সালের এপ্রিলে সিরিয়া ও ইরাকে নিজের বাহিনীকে অঙ্গীভুত করার ঘোষণা দেন বাগদাদি। এর মধ্য দিয়ে গঠিত হয় ইসলামিক স্টেট ইন ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভেন্ট (আইএসআইএল) বা ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়া (আইএসআইএস)। আল নুসরা ও আল-কায়েদার নেতারা বাগদাদির এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেন। বাগদাদির অনুগত যোদ্ধারা আল নুসরা ফ্রন্ট থেকে বেরিয়ে আইএসআইএস নামে সিরিয়ায় তাদের অবস্থান বজায় রাখে।

২০১৩ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে আইএসআইএস তাদের দৃষ্টি ইরাকে ফিরিয়ে আনে। দেশটির শিয়া নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে সংখ্যালঘু সুন্নি আরব সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক বিরোধের সুযোগ নেয় আইএসআইএস। আদিবাসীদের সহযোগিতায় ইরাকের ফালুজা শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয় এই জঙ্গিগোষ্ঠী। চলতি বছরের জুনে ইরাকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মসুল দখল করে নেয় তারা। এরপর ইরাকের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে একের পর শহর-অঞ্চল নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় আইএসআইএস। ইরাক ও সিরিয়ায় নিজেদের দখলে থাকা অঞ্চল নিয়ে ২৯ জুন ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় তারা। একই সঙ্গে সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ইসলামিক স্টেট (আইএস)।

আইএস-এর নেতৃত্বে রয়েছেন আবু বকর আল-বাগদাদি। স্বঘোষিত এ খলিফার দুজন ডেপুটি রয়েছেন। যাদের একজন ইরাক, অন্যজন সিরিয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। এছাড়া তার রয়েছে একদল উপদেষ্টা। তারা নানা বিষয়ে পরামর্শ দেন। আইএস প্রধানের নেতৃত্বে রয়েছে ফাইন্যান্স, নিরাপত্তা, মিডিয়া, বন্দী ও নিয়োগের জন্য রয়েছে পৃথক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। ইরাক ও সিরিয়ায় কমপক্ষে এক ডজন প্রভাবশালী ডেপুটি রয়েছেন। তারা নিজ নিজ দেশের প্রধানদের কাছে রিপোর্ট করেন। এ ডেপুটিদের অধিকাংশই সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলে সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন।

ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান ও লেবাননের অংশবিশেষ নিয়ে একটি অঞ্চলজুড়ে কথিত ‘খিলাফত’ পদ্ধতির ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে আইএস। তাদের দাবি, সেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে শরিয়া আইনের ভিত্তিতে। লক্ষ্য অর্জনে সংগঠনটির নেতা আবু বকর আল-বাগদাদির প্রতি আনুগত্য প্রকাশে মুসলিম বিশ্বের প্রতি আহবান জানিয়েছে আইএস।

ইরাক ও সিরিয়ার প্রায় ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা আইএসের দখলে আছে বলে কেউ কেউ ধারণা করেন। কারও কারও মতে, সংগঠনটি প্রায় ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এই এলাকায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষের বাস। দখলকৃত এলাকায় কঠোর শরিয়া আইন কার্যকর করেছে আইএস। ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে লেবাননেও তৎপর গোষ্ঠীটি।

আইএসে প্রায় ১৫ হাজার সক্রিয় যোদ্ধা রয়েছে বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা। তবে ইরাকি বিশেষজ্ঞ হিসহাম আল হাসহিমির ধারণা, আগস্টের শুরুর দিকে আইএসে প্রায় ৩০-৫০ হাজার যোদ্ধা ছিল। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ মতাদর্শগত যোদ্ধা। অন্যরা ভয়ে বা বাধ্য হয়ে আইএসে যোগ দিয়েছে। তবে কারও কারও মতে, আইএসের প্রায় ৮০ হাজার প্রশিক্ষিত যোদ্ধা আছে। এর মধ্যে সিরিয়ায় আছে ৫০ হাজার এবং ইরাকে ৩০ হাজার।

আইএসের যোদ্ধারা হালকা থেকে ভারী সব ধরনের অস্ত্র চালনায় পারদর্শী। তারা ট্রাকে স্থাপিত মেশিনগান, রকেট লঞ্চার, বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র, ভুমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে সক্ষম। তাদের কাছে জঙ্গি হেলিকপ্টার, পরিবহন বিমান ও অত্যাধুনিক সব সমরাস্ত্র আছে। সিরিয়া ও ইরাকি বাহিনীর কাছ থেকে দখল করা ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ব্যবহার করছে আইএস।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম জনগণ মুসলিম নামধারী একদল সন্ত্রাসীর হাতেই প্রতিনিয়ত নিহত হচ্ছে। হত্যা ও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মুসলিম মেয়েরা কথিত জিহাদিদের হাতে। পশ্চিমা দেশগুলো প্রকৃত ইসলামি জাগরণকে সন্ত্রাসী ইসলামের মাধ্যমে প্রতিহত করতে ও বিশ্বব্যাপী ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী তৎপরতা বজায় রাখতে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন নামে জঙ্গি সংগঠন সৃষ্টি করছে।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ইরাকের একদল সেনা কর্মকর্তাকে ঘুষ দেয়ায় এক ষড়যন্ত্রমূলক সমঝোতার আওতায় ৫০ হাজারেরও বেশি সরকারি সেনা কোনো ধরনের বাধা না দিয়েই সন্ত্রাসীদের কাছে কয়েকটি শহরের প্রধান সরকারি ভবন, অস্ত্রাগার, ব্যাংক ও কারাগারগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়।

২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে সিরিয়ার বিদ্রোহীদের সমর্থক সিরীয় মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা বা এসওএইচআর বলেছে, আইএস হচ্ছে উত্তর সিরিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী গ্রুপ। আইএস-কে আমেরিকা ও ইসরাইল ছাড়াও অর্থ, অস্ত্র, রসদ ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি সরকার। এদিকে মসুলে আইএস’র অভিযানের পর ইরাকি কর্মকর্তারা সৌদি ও তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থাকে এবং ইরাকের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক আল হাশিমিকে এই অভিযানের নেপথ্য পরিচালক বলে অভিযোগ করেছে। হাশিমি আইএস’র উত্থানকে ইরাকি জনগণের স্বপ্নের বিপ্লব বলে দাবি করেছেন। ইরাকের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাষড়যন্ত্রের আওতায় অস্থিতিশীল করার জন্যই সন্ত্রাসীরা ইরাকে প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু করেছে।

james foleআইএস যেসব অঞ্চল দখল করেছে, সেখানেই নৃশংস ও জঘন্য হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। প্রকৃত মুসলমানরা যেসব জঘন্য কাজ চিন্তাও করতে পারেনা, তারা সেসব ঘৃণ্য কাজ প্রতিনিয়ত করছে। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কাউকে এরা রেহাই দিচ্ছে না। সিরিয়ায় দেখা গেছে, এসব সন্ত্রাসী মানুষ হত্যা করে নিহতদের বুক ও পেট চিরে কলিজা ইত্যাদি বের করে ফেলেছে এবং এসব দৃশ্যের সচিত্র ভিডিও ফুটেজও এরা প্রকাশ করেছে ইন্টারনেটে। অন্য এক ঘটনায় আইএস’র সন্ত্রাসীরা মসুলের কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমামকে হত্যার পর তার লাশ টুকরো টুকরো করে।

তাদের দৃষ্টিতে ওই ইমামের অপরাধ ছিল তিনি তাদের দলে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। আইএস’র সন্ত্রাসীরা ইসলামসহ নানা ধর্মের অনুসারীদের পবিত্র স্থানগুলোকে ধ্বংস করছে এবং লুটপাট ও নির্বিচার গণহত্যায় লিপ্ত হচ্ছে। এরা সিরিয়ায় সাহাবিদের মাজার ধ্বংস করেছে। ইরাকে হজরত ইমাম হাসান আসকারী (আ.) ও ইমাম আলী নাকী (আ.)-এর মাজারের গম্বুজ ধ্বংস করেছে। এরা বিশ্বনবীর নাতি হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাজার ধ্বংসের প্রতিজ্ঞা করেছে। এরাই সিরিয়ায় হজরত ইমাম হুসাইন (আ.)-এর বোনের মাজারে হামলা করেছে।

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ইরাক ও সিরিয়ায় যুদ্ধরত সন্ত্রাসী সংগঠন আইএসআইএল’র স্রষ্টা স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতেই আইএসআইএল নামে নতুন এই জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান ঘটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যকে খন্ড খন্ড করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেই সিআইএ’র পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম হয়েছে আইএস’র।

এমনকি আইএসকে অর্থ যোগানদাতার ভূমিকাও পালন করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ মাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরবকে দায়ী করছে। পলিটিসাইট ডটকম নামের একটি গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে আইএসআইএল (বর্তমান নাম আইএস) মূলত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র হাতেই তৈরি।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ ড. কেভিন ব্যারেত প্রেস টিভির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যকে আরও খন্ড খন্ড করার জন্য এবং বিভক্তি জিইয়ে রেখে মার্কিন স্বার্থ সংরক্ষণে আইএসকে গোপনে সহযোগিতা করছে আমেরিকা। খলিফা ঘোষণাকারী আল বাগদাদি সিআইয়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কেভিনের মত হচ্ছে, ইরাক সেনাবাহিনীকে মার্কিনিরা অস্ত্র সরবরাহ করলেও তা এখন হাতছাড়া হয়ে আইএস’র কাছে রয়েছে। তিনি বলেন, মালিকির সঙ্গে টানাপড়েনে ইরাক বাহিনীকে নিরস্ত্রীকরণ করা হয়েছে। আইএস’র বর্বর আক্রমণের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র ইরাক বাহিনীকে সহযোগিতা না করে নতুন সরকার গঠনে চাপ প্রয়োগ করেছিল।

এদিকে আইএস-এর রয়েছে শত শত মিলিয়ন ডলার মূল্যের যুদ্ধাস্ত্র। এর বেশির ভাগই ইরাক ও সিরিয়ার সামরিক স্থাপনা থেকে চুরি করা বলে দাবি যুক্তরাষ্ট্রের। সিরিয়ার বিদ্রোহী দলগুলোকে বিদেশ থেকে দেওয়া অস্ত্রের কিছু চালানও তারা হস্তগত করেছে বলে জানা যায়। তাদের প্রচুর অস্ত্রে লেখা দেখা গেছে, ‘এটি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সম্পত্তি।’ আইএসের প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার সমমূল্যের নগদ অর্থ বা সম্পদ রয়েছে। তাছাড়া এখন তারা নিজেরাই আয় করছে।

ইরাক ও সিরিয়ায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার তেল ও গ্যাসক্ষেত্র থেকে লাখ লাখ ডলার আয় করছে জঙ্গি গোষ্ঠীটি। এর বাইরে শুল্ক, টোল, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং দখলকৃত এলাকার ব্যাংকগুলো থেকে তারা বিপুল অর্থ আয় করে। এই সুবাদে তারা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী জঙ্গি গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, সিরিয়া আর ইরাকের পর এবার ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশেও জাল বিস্তৃত করতে চেষ্টা চালাচ্ছে ইসলামিক স্টেট (আইএস)। ভারত-পাকিস্তানের কয়েকটি শহরে এর প্রচারপত্র বিলি করা হচ্ছে । বাংলাদেশেও নাকি চলছে সদস্য সংগ্রহ অভিযান। সম্প্রতি কলকাতায় চার তরুনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, গ্রেপ্তারকৃত চারজন আইএস-এর যোগ দেয়ার জন্য বাংলাদেশে যাওয়ার প্রস্ত্ততি নিচ্ছিলেন।

এদিকে সম্প্রতি নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদিন বা জেএমবি-র ভারপ্রাপ্ত আমিরসহ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করার পর পুলিশ জানতে পেরেছে তাদের সঙ্গে ইসলামিক স্টেট বা আইএস-এর যোগাযোগ আছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে ভারতের এক শীর্ষস্থানীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেছেন, লস্কর-ই-তৈয়বা বা ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের মতো আইএস-এর তৎপরতা শুধু সশস্ত্র এবং প্রকাশ্য নয় বলে তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া কঠিন। তিনি জানান, আইএস সমর্থকরা শুধু যে কোথাও কোথাও প্রচারপত্রই বিলি করছে, তা নয়, বাড়িতে বসে, ফেসবুক, টুইটারেও কাজ করে যাচ্ছে তারা।

সম্প্রতি সিরিয়ায় ইদলিব প্রদেশের একটি গ্রামে আইএস সদস্যদের ফেলে যাওয়া একটি ল্যাপটপ উদ্ধার করেন দেশটির বিদ্রোহী কমান্ডার আবু আলি। ল্যাপটপটি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইএস সদস্যরা জৈব ও রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির গবেষণা করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিরিয়া ও ইরাকে আইএসের সাম্প্রতিক অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি তাদের এ ধরনের বিপজ্জনক অস্ত্র তৈরির সুযোগ করে দিয়েছে।

জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যরা শুধু শত্রুদের সঙ্গে যুদ্ধই করছে না, তারা দখল করা অঞ্চল নিয়ন্ত্রণও করছে। আর সেখানেই তারা এসব গবেষণা পরিচালনা করছে। যেমন ইরাকের মসুল বিশ্ববিদ্যালয় ও সিরিয়ার রাকায় তারা ল্যাবরেটরির সুবিধাও পাচ্ছে।এ পরিস্থিতিতে এ কথা বলা যায় যে, আইএস জঙ্গিদের উপস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই তারা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশই আমেরিকার সেবাদাসে পরিণত হবে।

লেখকঃ সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম।