কোন পথে পাকিস্তান?

Sunday, 07/09/2014 @ 12:34 am

:: কাজী আবুল মনসুর ::

Pakistani Politicsপাকিস্তানের রাজনীতি ফের নতুন মোড় নিয়েছে। এ অবস্থার শেষ কোথায় হবে, কিভাবে হবে কেউ বলতে পারছে না। সেনাবাহিনী কি ফের ক্ষমতা নেবে? নাকি ইমরান খান প্রথমবারের মত ক্ষমতার স্বাদ পাবেন? নাকি নওয়াজ শরীফ ক্ষমতায় থেকে যাবেন? সবকিছুই যেন অস্পষ্ট! এদিকে নিরাপত্তাহীনতা, বেকারত্ব, বিদ্যুৎ সংকট, মূল্যস্ফীতি ইত্যাদি কারণে পাকিস্তানিরা হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং এজন্য তাঁরা পরিবর্তন আশা করছেন। তবে সেনাবাহিনী বলে আসছে, এ বিষয়ে তারা হস্তক্ষেপ করবে না।

সফল একটি জাতীয় নির্বাচনের এক বছর পর সবাই যখন মনে করেছিল শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই বিরোধীদলীয় নেতা ইমরান খান পার্লামেন্টের বিলুপ্তিসহ একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন দাবি করছেন। তার দল আরো দাবি করেছে, ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নওয়াজ শরিফ কারচুপির মাধ্যমে জয়ী হয়েছেন। বর্তমানে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইমরান খান। কিন্তু তিনি নিজে সে সময় নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল এ নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু বলেছিল। এরপরও প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে আগস্টের ১৪ তারিখ ইমরান খানের নেতৃত্বে সরকার বিরোধীরা লাহোর থেকে ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

সে দেশের গণমাধ্যমের হিসেব অনুযায়ী, প্রায় দুই লক্ষ মানুষ এতে অংশ নেয়। বিরোধী নেতা এবং সাবেক ক্রিকেটার ইমরান খান এবং প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা তাহির উল কাদরি এই বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এই আন্দোলনের পেছেনে নেপথ্যে সমর্থন দিচ্ছে বেশ কয়েকটির রাজনৈতিক দল। এছাড়া এ আন্দোলনে পাক সেনাবহিনীর ইন্ধন এবং এতে আইএসআইয়ের শক্তিশালী ভূমিকা আছে বলে ভাবা হচ্ছে। গত কয়েকদিনের সরকার বিরোধী বিক্ষোভে অন্তত বেশ কয়েকজন নিহত এবং কয়েকশো মানুষ আহত হয়েছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভারতের প্রতি শরিফ সরকারের অনুকূল মনোভাবে সন্তুষ্ট নয় পাক সেনাবাহিনী। এছাড়া সরকারের আফগানিস্তান নীতিরও বিরোধী তারা।

কারাগারে থাকা সাবেক সেনাপ্রধান পারভেজ মুশাররফের ভবিষ্যৎ নিয়েও চিন্তিত পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী। এছাড়া আগস্টের ২৭ তারিখ দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা বিষয়ে নিজের নিয়ন্ত্রণ সরিয়ে নিতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এক চুক্তিতে প্রায় পৌঁছে গেছেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ। এরপর আগস্ট মাসের ২৮ তারিখে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সহায়তা করতে সেনাপ্রধান রাহিল শরিফকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানান। তবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কাও দেখছে রাজনৈতিক মহল। ১৯৯৯ সালে কার্গিল যুদ্ধের পর নওয়াজকে হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন সেনা প্রধান পারভেজ মুশাররফ। ১৪ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে ফের সেনা অভ্যুত্থানের মুখে নওয়াজ শরিফ।

পাকিস্তানের অতীত ইতিহাসে দেখা গেছে, একটা বড় সময় ধরে ক্ষমতায় ছিল সে দেশের সামরিক বাহিনী। সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির সময়েও সেনাবাহিনীর হাতে এক ধরনের ক্ষমতা ছিল। প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক উপায় নির্বাচিত শরিফ সরকারের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন সেনাবাহিনীকে আবার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় নিয়ে আসতে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।এদিকে মুখ খুলতে শুরু করেছেন পাকিস্তানের তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সদ্য বহিষ্কৃত প্রেসিডেন্ট জাভেদ হাশমি। দলের প্রধান ইমরান খান তাকে বহিষ্কার করার পরের দিনই ১ সেপ্টেম্বর হাশমি বলেছেন, ইমরান খান তাদের জানিয়েছিলেন, সেনাবাহিনীর সহায়তা ছাড়া তারা আন্দোলনের পথে অগ্রসর হতে পারবেন না। এমনকি ইমরান এ-ও বলেছিলেন, সেপ্টেম্বরেই নির্বাচন হবে, সব আগেভাগেই ঠিক করা হয়েছে।

জিও নিউজের খবরে জানানো হয়, সোমবার রাজধানী ইসলামাবাদে পার্লামেন্ট হাউসের বাইরে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের এ কথা বলেন হাশমি। ইমরান খানকে উদ্ধৃত করে হাশমি বলেন, প্রতীক ধারকেরা (সেনাবাহিনী) চেয়েছিলেন পিটিআইয়ের আন্দোলনকারীরা পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিকের (পিএটি) নেতা তাহির উল কাদরির সঙ্গে একত্রে আন্দোলন করুক। জাভেদ হাশমি বলেন, এর মানে তারা এখানে এসব পরিকল্পনা নিয়েই নেমেছে। আমি জানি না, এটা ঠিক কার পরিকল্পনা। শুধু পরিকল্পনাকারীরাই এ বিষয়ে জানে। এ পরিস্থিতিতে আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে যখন ইসলামাবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা রেডজোনের ভেতরে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করে বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সেখানে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙ্গে সচিবালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে আন্দোলনকারীরা।

পৌঁছে যায় প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির কাছাকাছি। এছাড়া হামলা চালানো হয় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন চ্যানেল পিটিভির মূল ভবনে। এ অবস্থায় সেনাবাহিনীকে ঠেকাতে নওয়াজ শরীফকে সমঝোতা করতে হবে ইমরানের সঙ্গে। আবার ইমরান ঠেকাতে তাকে সমঝোতা করতে হবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে। উভয় পরিস্থিতিই তার জন্য অস্বস্তিকর। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ফায়দা লোটার সুযোগ তাই সেনাবাহিনীর।

যদি সেনাবাহিনীকে ঠেকাতে ইমরানের দাবি মেনে নওয়াজ পদত্যাগ করেন, তবে জিতে যাবেন ইমরান, নওয়াজকে হটিয়ে রাতারাতি পাক রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে আবির্ভূত হবেন তিনি। সেটা নওয়াজের জন্য অস্বস্তিকর। আবার বিষয়টি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্যও খুব একটা অসুবিধাজনক হবে না। কারণ ইমরান খানের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলেও তার রাজনৈতিক দলের তেহরিক ই ইনসাফ এখনও সারাদেশে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। সেক্ষেত্রে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল মুসলিগ লীগের বদলে ইমরানকে বশে রাখা অনেক বেশি সহজ হবে সেনাবাহিনীর পক্ষে। সব দিক বিবেচনা করলে এটাই ধারণা হবে যে, চলমান সঙ্কটের অবসান যেভাবেই ঘটুক না কেন শেষ হাসি হাসবে সেনাবাহিনী প্রধান রাহিল শরীফ। তবে চলমান এ খেলায় যে যেভাবে জিতুক না কেন, চূড়ান্তভাবে হারলো আসলে পাকিস্তানের গণতন্ত্র। দীর্ঘ সেনাশাসনে জর্জরিত দেশটিতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে চলার যে সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিলো, বর্তমান পরিস্থিতিতে সে সম্ভাবনা নষ্ট হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে নওয়াজ শরীফ সরকারের মূল সমস্যা হচ্ছে পাকিস্তানের বর্তমান শোচনীয় অর্থনীতি। দেশটির অর্থনীতির অবস্থা বর্তমানে খুবই শোচনীয়। প্রায় ১৮ কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশটির প্রবৃদ্ধির হার মাত্র তিন ভাগ। বৈদেশিক রিজার্ভে যা আছে, তা দিয়ে মাত্র দুই মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্সের প্রবাহও কম। বাজেট ঘাটতির হার শতকরা আট ভাগ। বেহাল অর্থনৈতিক অবস্থায় পাকিস্তানিরা হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং এজন্য তাঁরা পরিবর্তন আশা করছেন। ইমরান খান ও তাহির তাঁদের নিজেদের সুবিধার জন্য বর্তমান পরিস্থিতিটাকে কাজে লাগাচ্ছেন।

জানা গেছে, আইএমএফের সঙ্গে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি নিয়ে আলোচনা আটকে আছে। বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিদ্যুৎ ঘাটতি। দিনের বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। জাতিসংঘের এইচডিআর অনুযায়ী ১৮৬টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৪৬-এ। বয়স্কদের মধ্যে শতকরা ৫৫ ভাগই অশিক্ষিত। অনেক অঞ্চল আছে, যেখানে মেয়ে শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে না। এমনকি করাচি শহরের চারভাগের একভাগ শিশু স্কুলে যায় না। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, অসমতা ইত্যাদি নানা সমস্যা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থাকে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় নিয়ে গেছে। এদিকে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বর্তমান সরকার নানা ধরনের প্রতিকূলতার মধ্যে রয়েছে।

পাকিস্তান-ইরান গ্যাস পাইপ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচন্ড আপত্তি রয়েছে। একই সঙ্গে বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন এখন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য চিন্তার অন্যতম কারণ। এছাড়া অব্যাহত জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পাকিস্তানে বিদেশি বিনিয়োগ নেই। সরকারের আয় কমে গেছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহও কম।
অর্থনীতিতে গতি আনতে গত জুনের শেষের দিকে পাকিস্তানের জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ বা এনইসি এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। পাস হওয়া এ পরিকল্পনায় বলা হয়েছে আগামী ১০ বছরে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ দ্বিগুণ করা হবে যার লক্ষ্যমাত্রা হবে ৪৫,০০০ মেগাওয়াট। ‘ভিশন ২০২৫’ নামের এ পরিকল্পনার আওতায় ১০ বছরের মধ্যে পাকিস্তানকে বিশ্বের ২৫তম অর্থনীতির দেশে পরিণত করা হবে এবং বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ ছয়গুণ বাড়িয়ে ১৫ হাজার কোটি ডলারে নেয়া হবে। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে শতভাগ শিক্ষার হার নিশ্চিত করতে সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে বলা হয়।

শরীফ সরকার ‘ভিশন ২০২৫’ নামের উচ্চাভিলাষী এ পরিকল্পনা নেয়ার পর সরকার বিরোধীরা তৎপর হয়ে উঠে। চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রভাবে এরইমধ্যে শেয়ার বাজারে দেখা দিয়েছে দরপতন। অর্থনীতিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার না বানাতে রাজনীতিবিদদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন দেশটির অর্থনীতিবিদরা। দুই সপ্তাহের সরকার বিরোধী বিক্ষোভে শুধু রাজধানী ইসলামাবাদ নয়, পাল্টাতে শুরু করেছে দেশটির অর্থনীতির চিত্রও। এ বিক্ষোভের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে । পরিসংখ্যান বলছে, বিক্ষোভ শুরুর আগে করাচি স্টক এক্সচেঞ্জের হান্ড্রেড সূচক ছিলো ৩০ হাজার চারশ পয়েন্ট। ২৭আগস্ট যা নেমে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার চারশ পয়েন্ট। একটি পয়েন্টের মূল্য সতেরো লাখ মার্কিন ডলার, পাকিস্তানী রুপির হিসেবে যার মূল্য দাঁড়ায় একশো আশি মিলিয়ন। পাকিস্তানের বর্তমান অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি ১৫শ কোটি ডলার মূল্যের প্রবাসী অর্থ।

ইমরান খানের অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে কর না দেয়ার আহবানে ঝুঁকির মুখে রয়েছে সেই রাজস্ব। পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে বড় ধরনের সঙ্কটের আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। পাকিস্তান জম্মেও পর থেকে অর্ধেক গেলো সামরিক বাহিনী দ্বারা শাসনে। বার বার গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন হয়েছে। অনেক সরকার বিরোধী আন্দোলনের ফসল শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা সামরিক বাহিনীর হাতে। ক্রিকেটার ইমরান খান ও যাজক তাহির উল কাদিরের নেতৃত্বে চলমান আন্দোলন কতটুকু সফলতা লাভ করবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

জেনারেল জিয়া উল হকের আমল থেকে পাকিস্তনে মূলত অশান্তি শুরু। বিশেষ করে আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসনের পর আমেরিকার পাকিস্তান নির্ভরতায় অস্ত্রের আনাগোনা শুরু হয়। বিভিন্ন গ্রুপের কাছে চলে যায় ভারী অস্ত্র। আমেরিকানরাই অস্ত্রের যোগান দাতা। জিয়া উল হক সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় গণতন্ত্রের আবরণে এমন একটি ব্যবস্থার চেষ্টা করে যার ফলে পাকিস্তানে রাজনীতি অনেকটা হ-য-ব-র-ল হয়ে যায়। একদিকে ইসলামী শাসন ব্যবস্থার প্রবর্তন অন্যদিকে গণতন্ত্রের বুলি মিলে দিশেহারা হয়ে যায় পাক জনগণ। নিজের শাসন টিকিয়ে রাখার জন্য ডানপন্থিদের উপর নির্ভর করেন জিয়া। সোভিয়েত ইউনিয়নকে আফগানিস্তান থেকে বিতাড়িত করার জন্য ইসলামী দলগুলোকে ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

আফগান মুজাহিদদের অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গ্রুপ পাকিস্তানে জায়গা করে নেয়। যা এখন পাকিস্তানের জন্য বিষফোঁড়া হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমেরিকানদের কথা শুনে এ সময় পাকিস্তানে গড়ে উঠে সোভিয়েত ইউনিয়ন বিরোধী আন্দোলন। দলগুলোর হাতে আমেরিকা থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র আসতে থাকে। আমেরিকানরা পাকিস্তানকে ব্যবহার করে আফগান গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দিতে। ইসলাম ধর্মকে ব্যবহার করে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে গড়ে উঠে ধর্মীয় ট্রেনিং সেন্টার। পাকিস্তানের সেন্ট্রাল পাঞ্জাব এবং দক্ষিণ পাঞ্জার নিয়ন্ত্রণ করছে একদল প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত যুবক। সুন্নি মতদর্শে বিশ্বাসী এসব প্রশিক্ষিত যুবক উত্তরাধিকার সূত্রে আফগান যুদ্ধে প্রশিক্ষণ পেয়ে আসছে। ‘লসকর- এ- জাংভি’ নামের ছত্রছায়ায় তারা পাকিস্তানে সক্রিয় রয়েছে।পাকিস্তানে জাতিগত দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় ১৯৮০ সালে। যখন দেউবন্দি মিলিট্যান্টে নামের একটি গ্রপের জন্ম হয়।

‘আনজুমান এ শিপা সাহাবা’ নামের এ দেউবন্দি গ্রুপের সাথে শিয়াদের সংর্ঘষের পর সংঘর্ষ বাধেঁ। শিয়া গোষ্ঠী এখানে প্রচুর জমির মালিক। দেউবন্দিরা টার্গেট করে শিয়া ভূ-সম্পত্তির মালিকদের। তাদের সাথে দফায় সংঘষের পর দুটি প্লাটফর্ম দাঁড়িয়ে যায়। দেউবন্দিরা গঠন করে ‘শিপাহ-এ-সাহাবা পাকিস্তান (এসএসপি)’ আর শিয়ারা গঠন করে ‘শিপাহ এ মোহাম্মদ পাকিস্তান (এসএমপি)’ । মূলত সুন্নি মতাদর্শদের ঠেকাতে শিপাহ এ মোহাম্মদ এর আত্মপ্রকাশ হয়। শিয়া ও সুন্নি দু’দলের মাঝে শত্রুতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। যা পাকিস্তানের রাজনীতি ও সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। পাকিস্তানে সুন্নিদের দল ‘এসএসপি’ ও শিয়াদের দল ‘এসএমপি’ বিরোধ অনেকটা ওপেন সিক্রেট।

পাকিস্তানকে সারা বছর ধরে অস্থিরতা জিইয়ে রাখার জন্য এ দু’দল যথেষ্ট। তাদের মধ্যে একাধিকবার বৈঠক হয় শান্তির জন্য। কিন্ত শান্তি আর আসে না। এসএসপি মুলত লসকর-ই-জাংভি নেতা রিয়াজ বসরা নেতৃত্বে সুসংগঠিত দল। দীর্ঘ বছরের পর বছর ধরে তাদের পৃষ্টপোষকাতায় পাকিস্তানে মাদ্রাসা ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠে। তাদের নেতৃত্বে অনেক উপদলও সৃষ্টি হয়। যা তাদেরকে জোট বলে পরিচিত। ১৯৫৭ সালে যেখানে মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫০টি। বর্তমানে সেখানে সাড়ে ৫ হাজার মাদ্রাসা। আর এসব মাদ্রাসার বেশির ভাগই পাঞ্জাবে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে এসব মাদ্রাসার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।

বিশেষ করে সন্ত্রাস ও জঙ্গি সম্পৃতার সরাসরি অভিযোগ রয়েছে প্রায় হাজারেরও অধিক মাদ্রাসার বিরুদ্ধে। পাকিস্তানে যত্রতত্র বোমা বিস্ফোরণসহ সন্ত্রাসবাদের পেছনে সক্রিয় মাদ্রাসা ছাত্রদের মধ্যে প্রায় ১০০০ ছাত্রের বিরুদ্ধে রয়েছে ভয়ংকর হামলার সব মামলা। পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরীফ একাধিকবার মাদ্রাসা সম্পৃক্ত জঙ্গি দমনের চেষ্টা চালায়। কিন্ত প্রতিবারই ব্যর্থ হন। পাঞ্জাবের বিভিন্ন মাদ্রাসার জঙ্গিদের গ্রেফতার করার পর তারা জামিনে বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে পাঞ্জাবের শেহবাজ শরীফ প্রশাসনও মাদ্রাসার জঙ্গি দমনে প্রচেষ্টা চালান। কিন্ত শেষ পর্যন্ত সফলতা আসে না। কারণ তারা এতই শক্তিশালী ও প্রশিক্ষিত যে তাদের দমন করা দুরুহ হয়ে উঠে। পাকিস্তানে এমনিতেই প্রতিনিয়ত জাতিগত সংঘাত তো রয়েছে।

মোহাজির ও সিন্ধি, মোহাজির ও পাঠানদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক দ্বন্দ্ব। ১৯৮৫ সালে বাসের নিচে পড়ে এক মুহাজির বালিকার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে মুহাজির ও পাঠানদের মধ্যে ব্যাপক জাতিগত সংর্ঘষ ছড়িয়ে পড়ে। যা পরবর্তিতে ভয়াবহ রূপ নেয়। পাকিস্তানে মুহাজিররা বিশাল ভূমিকা পালন করে চলেছে। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সন্ত্রাস একটি কমন ইস্যু। বলা হয়ে থাকে পাকিস্তানের জঙ্গিদের কাছে যে পরিমান অস্ত্র ও বোমা রয়েছে তা অনেক দেশের সরকারের কাছেও নেই। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠির সহায়তায় পাকিস্তানে হচ্ছে অহরহ বোমবাজি। আর প্রাণ হারাচ্ছে হাজার হাজার মানুষ।

পাকিস্তান জন্মের পর অর্ধেক শাসন সেনাবাহিনীর হাতে থাকলেও পাকিস্তানী রাজনীতিকরা দল গঠনে পিছিয়ে নেই। বর্তমানে ২২টি রাজনৈতিক দল সক্রিয় রয়েছে। মুহাজির নেতা আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে ‘মুহাজির কওমি মুভমেন্ট’ওয়ালী খানের নেতৃত্বে আওয়ামী ন্যাশনাল পার্টি, বেলুচিস্তান ন্যাশনাল পার্টি (আওয়ামী), বেলুচিস্তান ন্যাশনাল পার্টি (হাবি গ্রুপ), বেলুচিস্তান ন্যাশনাল পার্টি (মেঙ্গল), সৈয়দ মুনওয়ার হাসানের নেতৃত্বে জামাতে ইসলামী, জামহুরি ওয়াতান পার্টি, সৈয়দ মিরের নেতৃত্বে জমিয়াত এ আহলে হিদাত, ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে জমিয়াতে ই ওলামায়ে ইসলাম, সামিউল হকের জমিয়াতে ই ওলামায়ে ইসলাম, আবুল খায়ির জুবায়েরের জমিয়াতে উলেমা ই পাকিস্তান, আল্লামা সাজিদ নকবীর মিল্লাত ই জাফরিয়া, আলতাফ হোসেনের মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, মাহমুদ খান আকজাই এর পাখতুন খাওয়া মিল্লি আওয়ামী পার্টি, তাহির উল কাদিরের পাকিস্তান আওয়ামী তেহরিক, চৌধুরী সুজ্জাত হোসেনের পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কায়েদে আজম), পীর পাগারোর পাকিস্তান মুসলিম লীগ, নেওয়াজ শরীফের পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নেওয়াজ), ভুট্টো পরিবারের পাকিস্তান পিপলস পার্টি, পাকিস্তান পিপলস পার্টি (আফতাব আহমেদ), আফতাব আহমেদ খানের কওমি ওয়াতান পার্টি ও ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ।

আর এসব রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা নিজেদেও অবস্থানে কখনও স্থির থাকতে পারেন না। বার বার তারা চরিত্র বদলায়। দলগুলোর নেতাদের মধ্যে কেউ ইসলামকে ব্যবহার করে, কেউ সাধারণ মানুষের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে, কেউ নিজের প্রভাব খাটিয়ে ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করে। আবার কেউ ক্ষমতার কাছাকাছি গেলে তাকে টেনে নামানোর চেষ্টা চালায়। সব মিলিয়ে পাকিস্তানে এখনও সেনাবাহিনীর ভূমিকায় প্রধান। যে কেউ ক্ষমতায় যাক না কেন তাদের পরামর্শে দেশ চালাতে হবে। অন্যতায় ক্ষমতাচ্যুত। এভাবে চলছে দেশটি। আর ১৮ কোটি জনগণ তা তাকিয়ে দেখা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই। বর্তমান চলমান আন্দোলনের শেষ ফসলও কি সেনাবাহিনীর ক্ষমতা লাভ কিনা তা দেখতে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।

দৈনিক পূর্বকোণ, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪।