যে সাংবাদিকতা দেখতে চাই না, কিন্তু তা ও দেখতে হয়!

Monday, 18/03/2013 @ 11:31 pm

yellow jounnalismছোটবেলা থেকে সাংবাদিকতা পেশার প্রতি একটা আলাদা রকমের শ্রদ্ধা কাজ করে এসেছে আমার। যখনই কোন সাংবাদিককে দেখি, তখনই মনের ভেতর অন্যরকম একটা অনুভূতি কাজ করে। মনে হয়, আমি এমন একজনকে দেখছি, যিনি দেশের মানুষের একজন বিরাট প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন।

এই কারণে মনের মাঝে সুপ্ত আশাও ছিল যে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত করব সমাজের সাথে। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন জায়গায় সংবাদ ডিপার্টমেন্টে কাজ করেছি। বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর “শিশু” পত্রিকাটির নোয়াখালী প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছি, ন্যাশনাল চিলড্রেনস টাস্কফোর্সের নোয়াখালী সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছি। কাজ করেছি সেভ দ্য চিলড্রেনস অস্ট্রেলিয়ার ইয়ার রিপোর্টার এবং ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টার – এমএমসি এর ডিভিশনাল রিপোর্টার হয়ে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি, হয়তো গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়টি কপালে জোটে নি, তারপরও চেষ্টা করি এর কাছাকাছি থাকতে।

এবার বলবো কেন আমি এতগুলো কথা বলেছি। দুটো ঘটনা শেয়ার করছি –

১. সময় আজ সকাল সাড়ে ১১টা, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের দোতলায় দাঁড়ানো। কিছুক্ষণ আগে ছাত্রলীগ-ছাত্রশিবিরের দু’পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়ে গেছে। নতুন ছাত্র-ছাত্রীরা কিঞ্চিৎ আতঙ্কিত, কেউ কেউ বের হয়ে যাওয়ার কথা বলছে। নিচে কলাভবনের সামনের রাস্তায় বিক্ষিপ্ত ভাবে দুই চারজন শিবির কর্মী ছোটাছুটি করছে। এমন সময় রাস্তায় দেখা গেল সাদা রঙের একটি মাইক্রোবাস। সামনে একটি নতুন টিভি চ্যানেলের স্টিকার লাগানো বড় করে। চ্যানেলের নামটা না হয় না-ই বা বললাম! কারণ আমার লেখার উদ্দেশ্য চ্যানেলের সুনাম বা বদনাম নয়! তাদের অসাধারণ (!) সাংবাদিকতা দেখার অভিজ্ঞতা শেয়ার করা। যা বলছিলাম, গাড়ি থেকে নামলেন একজন রিপোর্টার আর সাথে ঝটপট নেমে এলেন একজন ক্যামেরাম্যান। কিন্তু ততক্ষণে ময়দান ফাঁকা! ধাওয়া-পালটা ধাওয়া খানিক আগেই তো শেষ! এই পরিস্থিতিতে একজন শিবির কর্মী কে দেখা গেল হাতে ককটেল নিয়ে দৌড়ে আসলেন মধুর ক্যান্টিনের দিক থেকে। তাকে দেখে রিপোর্টার তাকে উদ্দেশ্য করে যা বললেন তা শুনে আমি বাস্তবিকই থমকে গেলাম –

” ভাই, ককটেল মারবেন? তাহলে এখানে মারেন! (ক্যামেরাম্যান কে) অ্যাই! ক্যামেরা ধর! নেন ভাই মারেন!”

ওই কর্মীতো মহা উৎসাহে ককটেল চারটির বিস্ফোরণ ঘটালো কলাভবনের সামনে, তারপর সাথেই সাথেই দৌড় দিয়ে পগার পার! তার পরমুহুর্তেই শোনা গেল “ধর ধর” আওয়াজ, এই অবস্থায় উদয় হল ছাত্রলীগের একটি দল, হাতে বিশাল পাথর। সেটাকে ডাকসুর সামনে ফ্লোরে ফেলার সাথে সাথে একটি টাইলস ভেঙ্গে চুরমার হল। সেই টাইলসের ভাঙ্গা টুকরো নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু হল আবার। আবার ধাওয়া পালটা ধাওয়া, আবার মারামারি……

কিছুক্ষণ পর আবার পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার সাথে সাথেই রিপোর্টার আর ক্যামেরাম্যান গাড়িতে উঠে চলে গেলেন। তবে গাড়িতে ওঠার পূর্ব মুহুর্তে তাদের মুখে নিউজে দেয়ার জন্য ভালো শট পাওয়ার তৃপ্তির হাসিটা আমার চোখ এড়ায় নি!

দ্বিতীয় ঘটনাটি আর বলতে ইচ্ছে করছে না। কারণ ভালো কোন ঘটনা হলে হয়তো বা উৎসাহ নিয়ে বলতাম। তবে আমি আজ যে ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করলাম, সেটির পর বলতে চাই যে আমরা এমন হলুদ সাংবাদিকতা চাই না! চাই না এভাবে আর কোন সাংবাদিক নিজের খবরের ভালো কাটতির জন্য ইচ্ছে করে আবার শেষ হওয়া ঘটনাকে উসকে দিক! সংবাদকর্মীদের জন্য মানুষের হৃদয়ে যে জায়গাটুকু আছে দয়া করে সেটাকে নষ্ট করবেন না! দয়া করে এমন কিছু করবেন না, যেটার কারণে কেউ পরে নিজেকে সংবাদকর্মী হিসেবে পরিচয় দিতে লজ্জাবোধ করে!

সংবাদ সংগ্রহের মত কাজের পবিত্রতা রক্ষা করা সকল সংবাদকর্মীরই নৈতিক দায়িত্ব বলেই মনে করি। দয়া করে সেটার রক্ষক হোন, ভক্ষক নয়!
লেখক: সংবাদকর্মী।

সর্বশেষ