গ্র্যান্ডফাদার অব দ্য জার্নালিস্ট

Saturday, 19/07/2014 @ 12:09 pm

:: কাজী আবুল মনসুর ::

joseph_pulitzerজোসেফ পুলিৎজারকে বলা হয় গ্র্যান্ডফাদার অব দ্য জার্নালিস্ট। এছাড়া সর্বকালের সেরা সাংবাদিক বলে মানা হয়। হাঙ্গেরীয় বংশোদ্ভূত খ্যাতনামা আমেরিকান সাংবাদিক জোসেফ পুলিৎজার জন্মগ্রহণ করেন ১৮৪৭ সালের ১০ এপ্রিল। জন্মকালে তার নাম ছিল পুলিৎজার জোসেফ।

১৮৬৪ সালে সেখান থেকে অভিবাসিত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। আমেরিকার গৃহযুদ্ধে ফার্স্ট নিউইয়র্ক ক্যাভার্লিতে সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেন। ১৮৬৭ সালে আমেরিকার নাগরিকত্ব লাভ করেন। একই বছরে মিসৌরীর সেন্ট লুইসে অবস্থিত জার্মানভিত্তিক দৈনিক সংবাদপত্র ওয়েস্টলিসে পোস্টের প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেন। ১৮৭১ সালে তিনি সম্পাদকীয় পরিচালনার দায়িত্ব পান এবং দৈনিকের একাংশ মালিকানা লাভ করেন। কিন্তু দুই বছর পর চলে যান। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সেন্ট লুইসের রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়েন পুলিৎজার।

১৮৬৯ সালে মিসৌরীর প্রতিনিধি সভায় যোগ দেন। ১৮৭২ সালে লিবারেল রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে হোরেস গ্রীলে থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন। গ্রীলে দলের পরাজয়ের প্রেক্ষিতে পুলিৎজার ডেমোক্র্যাট সদস্য হন। আইনে স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন এবং নিউইয়র্ক সান পত্রিকার সংবাদদাতা হন। ১৮৭৮ সালে পুলিৎজার সেন্ট লুইস ইভনিং ডিসপ্যাচ এবং ইভনিং পোস্ট পত্রিকাদ্বয়ের মালিকানা ক্রয় করেন। এ দুটো পত্রিকাকে একীভূত করেন পোস্ট-ডিসপ্যাচ নামে। ১৮৮৩ সালে তিনি নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড নামে নতুন একটি দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশ করেন। তার পরিচালনায় এটি বৃহত্তম সংবাদপত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।

১৮৮৩ সালে সম্পদশালী ব্যক্তিরূপে পুলিৎজার ৩,৪৬,০০০ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে জে গোল্ডের কাছ থেকে নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড ক্রয় করেন। ১৮৮৪ সালে তিনি প্রতিনিধি সভার সদস্যরূপে নির্বাচিত হলেও সাংবাদিকতার তাড়নায় পদত্যাগ করেন। ১৮৮৭ সালে জনপ্রিয় গোয়েন্দা সাংবাদিক নেলি ব্লাইকে নিয়োগ করেন। প্রথম সংবাদপত্র হিসেবে কমিক রঙিন মুদ্র্রণ করেন। তার নেতৃত্বে প্রচার সংখ্যা পনের হাজার থেকে একলাফে ছয় লক্ষে উন্নীত হয় যা দেশের সর্বাপেক্ষা বৃহৎ সংবাদপত্রের মর্যাদা পায়।

অনুসন্ধানী ও সৃজনশীল সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তিনি কিংবদন্তি। জোসেফ পুলিৎজার ‘সেন্ট লুইস পোস্ট ডিসপ্যাচ’ এবং নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের প্রকাশক ও এ পত্রিকার মাধ্যমে নতুন এক ধরনের সাংবাদিকতার সূচনা করেন।

অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধ থেকে ঊনবিংশ শতকের সূচনালগ্ন পর্যন্ত তিনি ছিলেন একাধারে সফলতম লেখক ও সংবাদপত্র প্রকাশক। অর্জিত বিপুল অংকের অর্থ কলম্বিয়া স্কুল অব জার্নালিজম যা বর্তমানে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদান করেন।

৩১ বছর বয়সে ১৮৭৮ সালে ক্যাথরিন কেট ডেভিস নামের মিসিসিপির এক সম্পদশালী পরিবারের নারীকে বিয়ে করেন। ক্যাথরিন তার চেয়ে পাঁচ বছরের বড় ছিলেন। তাদের সংসারে সাত সন্তান জন্মগ্রহণ করে। রাল্ফ পুলিৎজার, দ্বিতীয় জোসেফ, কনস্ট্যান্স, এডিথ এবং হার্বাট তাদের সন্তান। ৩১ ডিসেম্বর, ১৮৯৭ সালে তাদের জ্যেষ্ঠা কন্যা লুসিলি পুলিৎজার টাইফয়েড জ্বরে মারা যায়।

১৯১১ সালের ২৯ অক্টোবর মৃত্যুর পর তার ইচ্ছানুসারে ও সম্মানার্থে পুলিৎজার পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। সাংবাদিকতা ও আলোকচিত্রকলার পাশাপাশি নাটক, কবিতা, ইতিহাস, পত্র, সংগীতের মতো ২১টি বিভাগে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯১৭ সালের ৪ঠা জুন প্রথম পুলিৎজার পুরস্কারের ঘোষণা দেয়া হয়। বর্তমানে প্রতি বছরের এপ্রিল মাসে পুরস্কারটি ঘোষিত হয়। একটি স্বাধীন বোর্ড বিজয়ী নির্বাচন করেন।

১৮৮০-এর দশকে পুলিৎজার নতুন সাংবাদিকতার কলা-কৌশল প্রবর্তন করে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি বৃহৎ ব্যবসা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। ১৮৯০-এর দশকে তিনি তার ওয়ার্ল্ড পত্রিকাকে নিয়ে উইলিয়াম র‌্যানডল্ফ হার্স্ট নিউইয়র্ক জার্নালের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন ও এর ফলে উভয়েই হলুদ সাংবাদিকতার পরিবেশ সৃষ্টি করে বৈশ্বিকভাবে পরিচিতি পান। সংবাদপত্র প্রকাশে ব্যাপক সংখ্যার পরিবেশ সৃষ্টি করেন যাতে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা সম্ভব হয়। সংবাদের বিভিন্নতা, বিনোদন এবং বিজ্ঞাপনের সঙ্গে পাঠকের যোগসূত্র ঘটান।

২৯ অক্টোবর, ১৯১১ মৃত্যুবরণ করেন খ্যাতনামা এই সাংবাদিক। মৃত্যুকালে তাঁর সম্পত্তির আর্থিক মূল্য ছিল ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯১১ সালে মৃত্যুর সময় পুলিৎজার কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে প্রচুর পরিমাণ অর্থ রেখে গিয়েছিলেন। এই অর্থের কিছু অংশ দিয়ে ১৯১২ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা স্কুল গঠিত হয়েছিল।

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম।