ওরিয়ানা ফালাচি ও ইয়াসির আরাফাত (শেষ)

Monday, 17/02/2014 @ 12:13 pm

:: কাজী আবুল মনসুর ::

ইয়াসির আরাফাত, ছিলেন একজন ফিলিস্তিনী নেতা। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলওর চেয়ারম্যান হিসাবে আরাফাত ইসরায়েলী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সারাজীবন সংগ্রাম করেন। তিনি প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় আরাফাত ধর্মনিরপেক্ষ ফাতাহ দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৮-১৯৬০ সালের মধ্যে তিনি এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলের অস্তিত্বের সম্পূর্ন বিরোধী থাকলেও পরে আরাফাত ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ২৪২ মেনে নিয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন।

ইয়াসির আরাফাত, ছিলেন একজন ফিলিস্তিনী নেতা। প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন বা পিএলওর চেয়ারম্যান হিসাবে আরাফাত ইসরায়েলী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সারাজীবন সংগ্রাম করেন। তিনি প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটির প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় আরাফাত ধর্মনিরপেক্ষ ফাতাহ দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫৮-১৯৬০ সালের মধ্যে তিনি এই দলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রাথমিকভাবে ইসরায়েলের অস্তিত্বের সম্পূর্ন বিরোধী থাকলেও পরে আরাফাত ১৯৮৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ২৪২ মেনে নিয়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন।

ওরিয়ানা ফালাচি : এটা অত্যন্ত কাব্যিক এবং ক’টনৈতিক উত্তর। কিন্তু আমি যে প্রশ্ন করছি তার উত্তর নয় আবু আম্মার। আমি জানতে চেয়েছিলাম, যদি জর্দান আপনাদের আর না চায়, তাহলে আপনি কি জর্দানের উপর যুদ্ধ ঘোষণা করবেন?

ইয়াসির আরাফাত : আমি একজন সৈনিক এবং সামরিক নেতা। সেজন্য আমাকে গোপনীয়তা রক্ষা করতে হবে। আমাদের ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্র কোথায় হবে তা প্রকাশ করার লোকটি আমি হতে চাই না। আল ফাতাহ আমার কোর্ট মার্শাল করবে। সুতরাং আপনি নিজেই আপনার পূর্বের বক্তব্য থেকে উত্তর খুঁজে নিন। আমি বলেছি, ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করার জন্য আমরা যুদ্ধ অব্যাহত রাখবো। আমরা যে সব দেশে আছি তারা পছন্দ করুক আর নাই করুক। এখন কিন্তু আমরা ফিলিস্তিনে রয়েছি।

ওরিয়ানা ফালাচি: আমরা জর্দানে আছি আবু আম্মার। আমি জানতে চাই ফিলিস্তিন বলতে কি বুঝায়? এমনকি ফিলিস্তিনের জাতীয় পরিচিতি কালের মাঝে হারিয়ে গেছে। এর ভৌগলিক সীমান্তও বিলুপ্ত হয়েছে। বৃটিশ ম্যান্ডেটের পূর্বে এখানে তুর্কীরা ছিল। অতএব ফিলিস্তিনের ভৌগলিক সীমান্ত কোথায়?

ইয়াসির আরাফাত: আমরা সীমান্তের প্রশ্নটা আনছি না। আমাদের সংবিধানেও সীমান্তের কথা বলিনি। কারণ তুর্কীদের পর আমাদের উপর পাশ্চাত্যের যে উপনিবেশবাদীরা আগ্রাসন চালিয়েছিল তারা সীমান্ত টেনে দিয়েছিল। একজন আরববাসীর দৃষ্টিকোণ হতে কেউ সীমান্তের কথা বলে না। বিশাল আরবের মধ্যে ফিলিস্তিন একটা বিন্দুর মতো। জাতিগতভাবে আমরা আরব। এ জাতির বিস্তৃতি আটলান্টিক থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত এবং তারও বাইরে। ১৯৪৭ এর পর আমরা চাই আমাদের ভ’মি উদ্ধার করে গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্র পুনর্গঠন করতে।

ওরিয়ানা ফালাচি: আপনি যখন একটি রাষ্ট্রের কথা বলেন তখন আপনাকে অবশ্যই বলতে হবে কোন ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে সে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছে বা হবে। আমি আবার ফিলিস্তিনের ভৌগলিক সীমান্ত সম্পর্কে জানতে চাচ্ছি।

ইয়াসির আরাফাত: আমি সামান্য ইঙ্গিত দিতে পারি যে, বৃটিশ ম্যান্ডেটের সময়ে যে সীমান্ত ছিল আমরা সেটাকে ফিলিস্তিন সীমান্ত বলে গ্রহণ করতে পারি। আমরা যদি ১৯১৮ সালের অ্যাংলো-ফেঞ্চ চুক্তিকে গ্রহণ করি তাহলে ফিলিস্তিন ভ’খন্ড উত্তরে নকুরাহ থেকে দক্ষিণে আকাবা পর্যন্ত বিস্তৃত। অপরদিকে ভ’মধ্য সাগরের উপক’ল থেকে গাজা উপত্যকা হয়ে জর্দান নদী ও নেগেভ মরুভ’মি পর্যন্ত।

ওরিয়ানা ফালাচি : কিন্তু এর মাঝেতো কিছু ভ’খন্ড আজকের জর্দানের অংশ। আমি বলতে চাই জর্দানের পুরো পশ্চিমাঞ্চল;কিসচর্দানিয়া।

ইয়াসির আরাফাত: হ্যাঁ, তা ঠিক। আমি পুনরায় বলতে চাই, সীমারেখার কোন গুরুত্ব নেই। আরব ঐক্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ওরিয়ানা ফালাচি : সীমারেখার যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে, যদি তা অন্যের ভ’খন্ডকে স্পর্শ করে বা উপর দিয়ে যায়। যেমন- জর্দান।

ইয়াসির আরাফাত: আপনি যেটাকে কিসজর্দান বলছেন, সেটা ফিলিস্তিন।

ওরিয়ানা ফালাচি : আবু আম্মার কি করে আরব ঐক্যের কথা বলা সম্ভব, যদি কোন একটি দেশের সাথে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। তাছাড়া ফিলিস্তিনিরা যদি ঐক্যে রাজী না হয়? আল ফাতাহ এবং অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে বিস্তর বিভেদ রয়েছে। যেমন পপুলার ফ্রন্টের সাথে।

ইয়ানির আরাফাত: প্রত্যেক বিপ্লবের নিজস্ব সমস্যা রয়েছে। আলজেরীয় বিপ্লবেও একাধিক সংগঠন ছিল এমন কি ইউরোপে নাৎসীদের প্রতিরোধের জন্যও বহু সংগঠন ছিল। ভিয়েতনামে বহু সংগঠন প্রতিরোধে অংশ নিয়েছে, কিন্তু ভিয়েতকংরা সংখ্যাগরিষ্ট। আল ফাতাহ ফিলিস্তিনী যোদ্ধাদের ৯৭ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে এবং ইসরাইল অধিকৃত ফিলিস্তিন ভ’মির অভ্যন্তরে এরাই লড়াই করছে। এটা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নং যে, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে মোশে দায়ান যখন এল-হেউল গ্রামের ২১৮টি বাড়ী উড়িয়ে দেয়ার সিন্ধান্ত নেয়, তখন তার বক্তব্য ছিল, “আমাদেরকে নিশ্চিত হতে হবে যে, কে এই গ্রাম নিয়ন্ত্রণ করে। আল ফাতাহ না আমরা।”

তিনি আল ফাতাহ’র কথাই বলেছেন। পপুলার ফ্রন্টের কথা নয়। ১৯৬৯ এর ফেব্রুয়ারিতে পপুলার ফ্রন্ট পাঁচ ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এর চারটিই যোগ দিয়েছে আল ফাতাহ’র সাথে। ফ্রন্টের নেতা জর্জ হাবাশ আমাদের সাথে যোগ না দিলেও শীঘ্র তিনি যোগ দেবেন। আমরা ইতিমধ্যে তাকে বলেছি, পপুলার ফ্রন্ট ও আমাদের মধ্যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কোন পার্থক্য নেই।

ওরিয়ানা ফালাচি: পপুলার ফ্রন্ট কম্যুনিস্টদের। আপনি বলেন, আপনি তা নন।

ইয়াসির আরাফাত: আমাদের মধ্যে সকল মতাদর্শের যোদ্ধা রয়েছে। সুতরাং পপুলার ফ্রন্টের জন্যও আমাদের মাঝে স্থান আছে। কেবল সংগ্রামের কোন পদ্ধতি দিয়ে আমাদের পৃথক করা যায়। যেমন, আমাদের নেতা আল ফাতাহ’র পক্ষ থেকে কখনো বিমান হাইজ্যাক করা হয়নি এবং আমরা কখনো বোমা স্থাপন করিনি বা ভিন্ন দেশ গুলি চালাইনি। আমরা নির্ভেজাল সামরিক তৎপরতা চালাতে চাই। অবশ্য তার দ্বারা ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরে, যাকে আপনারা ইসরাইল বলেন, সেখানে নাশকতা তৎপরতার পরিবর্তন বুঝাতে চাই না। আমরা জেরুজালেম, এলেত ও তেলআবিবে প্রায়ই বোমার বিস্ফোরণ ঘটাই।

ওরিয়ানা ফালাচি: এতে বেসামরিক লোকজন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অবশ্য এটা নির্ভেজাল সামরিক সংগ্রাম নয়।

ইয়াসির আরাফাত : হ্যাঁ এটা নির্ভেজাল যুদ্ধ। সামরিক বা বেসামরিক লোকজন, তারা আমাদের জনগণকে ধ্বংস করতে চাইছে বলে সমভাবে অপরাধী। আমাদের কমান্ডোদের সহায়তা করছে বলে ১৬ হাজার ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে, ৮ হাজার বাড়ী ধ্বংস করা হয়েছে। তাদের কারাগারে ফিলিস্তিনিরা নির্মমভাবে নিপীড়িত হচ্ছে। নিরীহ, নিরস্ত্র জনগণের উপর নাপাম বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। অপরদিকে আমরা কোন অভিযান পরিচালনা করি তাদেরকে এটা বুঝাতে যে, আমরা একই পদ্ধতিতে তাদেরকে ব্যস্ত রাখতে সক্ষম। এতে অনিবার্যভাবেই বেসামরিক লোকজন ক্ষতিগ্রস্থ হয়।

কিন্তু তারাই তো ইসরাইলি শাসকগোষ্ঠির প্রথম স্বার্থের বাহক। বেসামরিক নাগরিকরা যদি শাসনতন্ত্রের পদ্ধতির অনুমোদন না দেয় তাহলে তো এত সব ঘটতে পারে না। আমরা জানি অনেকে অনুমোদন করে না। যেমন, ইহুদী শরণার্থীদের আগমনের পর থেকে যারা আমাদের ভ’মি লুন্ঠনের ইচ্ছা নিয়ে এসেছে তাদের মধ্যেও অনেকে অনুমোদন করে না। কারণ তারা এখানে এসেছে নিরীহভাবে, অতীতের দুর্ভোগ বিস্মৃত হবার আশা নিয়ে। তাদেরকে পৃথিবীতে স্বর্গের দায়িত্ব নিতে তারা এসেছিল।

কিন্তু পরে তারা আবিস্কার করলো যে, স্বর্গের পরিবর্তে এটা নরক। আপনি কি জানেন তাদের মধ্যে কতজন এখন ইসরাইল থেকে পালাতে চায়? তেলআবিবে কানাডীয় দূতাবাসে ইমিগ্রেশনের আবেদনপত্রের স্ত’প অবশ্যই আপনার দেখা উচিত। হাজার, হাজার।

ওরিয়ানা ফালাচি : আবু আম্মার, আপনি কোন প্রশ্নেরই সরাসরি উত্তর দিচ্ছেন না। এবার আমি সরাসরি উত্তর আশা করবো। মোশে দায়ানের ব্যাপারে আপনার কি ধারণা?

তরুণ ইয়াসির আরাফাত, ১৯৪০ সালে তোলা একটি ছবি।

তরুণ ইয়াসির আরাফাত, ১৯৪০ সালে তোলা একটি ছবি।

ইয়াসির আরাফাত : এটা একটা বিরক্তিকর প্রশ্ন। কিভাবে এর উত্তর আমি দিতে পারি? এভাবে বলি- আমি আশা করি একদিন যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তার বিচার হবে। চাই তিনি মেধা সম্পন্ন নেতা হন, অথবা কোনভাবে নেতার উপাধি তার উপর আরোপিত হয়ে থাকুক।

ওরিয়ানা ফালাচি : আবু আম্মার, আমার মনে হয় আমি কোথাও পড়েছি যে, আপনি ইসরাইলীদের যতটা না শ্রদ্ধা করেন, তার চেয়ে আপনাকে ওরা অনেক বেশী শ্রদ্ধা করে। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আপনি কি শক্রুকে শ্রদ্ধা করতে সক্ষম?

ইয়াসির আরাফাত : যোদ্ধা হিসেবে, কৌশল নির্ধারণের ক্ষেত্রে-কখনো হ্যাঁ। একজনকে স্বীকার করতে হবে যে, তাদের কিছু যুদ্ধকৌশল বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক এবং শ্রদ্ধা পাওয়ার মত। কিন্তু ব্যক্তি হিসেবে – না। কারণ তারা সব সময় বর্বর আচরণ করছে। তাদের মধ্যে মানবতার লেশমাত্র নেই। লোকজন প্রায়ই তাদের বিজয়ের কথা বলে। ১৯৫৬ ও ১৯৬৭ সালে তাদের বিজয় সম্পর্কে আমার ধারণা আছে।

১৯৫৬ সালেরটাকে কোনভাবেই বিজয় বলা চলে না। সে বছর শুধু বৃটিশ ও ফরাসী আগ্রাসীদের পিছনে সার বেঁধে দাঁড়িয়েছিল এবং তারা আমেরিকানদের সাহায্যে জিতেছিল। ১৯৬৭ সালের বিজয়ের জন্যও তারা আমেরিকার কাছে ঋণী। আমেরিকা থেকে বিপুল অর্থ ছাড়াও তারা শক্তিশালী অস্ত্রের চালান পেয়েছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, ভালো যা কিছু ইসরাইলের আছে তা বাইরে থেকে এসেছে।

ওরিয়ানা ফালাচি : একটু সততা দেখান আবু আম্মার। তারা প্রযুক্তির উত্তম প্রয়োগ করতে পেরেছে এবং সৈন্য হিসেবেও তারা ভাল।

ইয়াসির আরাফাত : তারা কখনো তাদের ইতিবাচক কারণে জয়ী হয়নি। বরং আরবদের নেতিবাচক দিকের কারণে জয়ী হয়েছে।

ওরিয়ানা ফালাচি : সেটা যুদ্ধ কৌশলের একটা অংশ। তাছাড়া তারা সাহসী যোদ্ধা বলেই জয়ী হয়েছে।

ইয়াসির আরাফাত : না! না! না, তারা সাহসী নয়। হাতাহাতি যুদ্ধে, সামনাসামনি যুদ্ধে তারা সৈনিকের পর্যায়েও পড়ে না। মৃত্যুকে তারা ভীষণ ভয় পায়। তাদের সাহস বলতে কিছু নেই। তাই প্রমাণিত হয়েছে কারামেহ ও এল-সাফির যুদ্ধে। সীমারেখা পেরিয়ে ৪০টি ট্যাংক নিয়ে ওরা এসেছিল

ওয়াদি ফিফায়, ১০টি ট্যাংক নিয়ে এসেছিল ওয়াদি আবাতা’য় এবং ১০টি ট্যাংক ও ২০টি জীপে ১০৬টি ক্যালিবার মেশিনগান নিয়ে এসেছিল ঘিরবেত এল দিসেহ’তে। কামানের গোলার ছত্রছায়ায় তারা এসেছিল। দশ ঘন্টা পর এসেছিল বিমানবহর। নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করেছিল গোটা এলাকায়। অতঃপর হেলিকপ্টারে করে আমাদের অবস্থানের উপর মিসাইল নিক্ষেপ করেছে।

তাদের উদ্্েদশ্য ছিল এল-নিমেরী উপত্যকায় পৌছা। কিন্তু সেখানে কখনো পৌছনে পারেনি। ২৫ঘন্টা যুদ্ধের পর আমরা তাদেরকে সীমারেখার ওপারে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করি। আপনি জানেন, কেন এটা সম্ভব হয়েছিল। কারণ আমরা সাহসকে কাজে লাগিয়েছি তাদের চাইতেও বেশী। আমরা তাদেরকে ঘেরাও করেছিলাম। রাইফেলের বাট দিয়ে আক্রমণ করেছিলাম।

মুখোমুখি মৃত্যুর কোন ভয় ছিল না। ইসরাইলীদের সাথে সর্বত্র একই কাহিনী। বিমানে হামলা করতে তারা পটু। তারা জানে যে, আমাদের বিমান নেই। ট্যাংকযোগে হামলা চালায় তারা, আমাদের ট্যাংক নেই। মুখোমুখি হলে তারা দৌড়ে পালায়। জীবনের ঝুঁকি নিতে না পারলে সে ভাল সৈনিক হয় কিভাবে?

ওরিয়ানা ফালাচি: আবু আম্মার, তাদের কমান্ডোরা যেসব অভিযান পরিচালনা করেছে সে সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? যেমন, তাদের কমান্ডোরা যখন মিসরের রাডার স্টেশন খুলে নিয়ে আসে? এ ধরনের কিছু করতে অবশ্যই সাহসের প্রয়োজন আছে।

ইয়াসির আরাফাত : না, কোন প্রয়োজন নেই। তারা সব সময় খুব দূর্বল এ সহজ লক্ষ্যবস্তু বেছে নেয়। এই হচ্ছে তাদের কৌশল, যা সব সময় বুদ্ধিদীপ্ত, কিন্তু সাহসিকতাপূর্ণ নয়। তারা ছোট অভিযানেও অসংখ্য সৈন্য সমাবেশ করে সাফল্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে চায়। যখনই তারা ফেদাইনদের পূর্ণ শক্তি দিয়ে আক্রমণ করছে, তখন তাদের পরাজয় ঘটেছে। তাদের কমান্ডোরা আমাদের উপর চড়াও হতে পারেনি।

ওরিয়ানা ফালাচি : হয়তো আপনাদের উপর পারেনি। কিন্তু মিসরীয়দের তো হেনস্তা করেছে?

ইয়াসির আরাফাত : মিসরে তারা যা করছে তা আদৌ সামরিক তৎপরতা নয়। এটা মনস্তাত্বিক যুদ্ধ। এখনো মিসর তাদের শক্তিশালী শত্রু। সেজন্যে মিসরীয় বাহিনীকে হতাশ করে তোলার জন্য ইহুদীবাদীরা আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমগুলোর সহযোগিতায় মনস্তাস্তিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। আমাদের কোন প্রচার মাধ্যম নেই। কেউ জানতে পারছে না আমাদের কমান্ডোরা কি করছে।

আমাদের কোন বিষয় সকলের অজান্তে রয়ে যায়, কারণ সংবাদপত্রে খবর পৌছানোর জন্য আমাদের কোন বেতার ব্যবস্থা নেই। সুতরাং কেউ জানে যে, ইসরাইলীরা যেদিন মিসরের রাডার স্টেশন চুরি করছিল, সেইদিন আমরা একটি ইসরাইলী ঘাঁটিতে প্রবেশ করে পাঁচটি বড় রকেট বয়ে এনেছি।

ওরিয়ানা ফালাচি : আমি আপনার কথা বলছি না, আমি মিসরীয়দের কথা বলছি।

ইয়াসির আরাফাত : ফিলিস্তিনী ও মিসরীয়দের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। উভয়েই আরব জাতির অংশ।

ওরিয়ানা ফালাচি : আপনার পক্ষ থেকে এটা সত্যিই উদার মন্তব্য, আবু আম্মার। বিশেষতঃ আপনার পরিবার মিসরীয়দের হাতে নিগৃহীত হয়েছে।

ইয়ানির আরাফাত : আমার পরিবার নিগৃহীত হয়েছে ফারুকের দ্বারা; নাসেরের হাতে নয়। আমি মিসরীয়দের ভালোভাবে জানি। কারণ মিসরের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি পড়াশুনা করেছি এবং মিসরীয় বাহিনীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ১৯৫১, ১৯৫২ ও ১৯৫৬ সালে যুদ্ধ করেছি। তারা সাহসী যোদ্ধা এবং আমার ভাই।

ওরিয়ানা ফালাচি : ইসরাইলের প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। আপনি বললেন, আপনার সাথে যুদ্ধে ইসরাইলীরা বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অদ্যাবধি কত সংখ্যক ইসরাইলী আপনাদের হাতে নিহত হয়েছে বলে আপনার ধারণা।

ইয়াসির আরাফাত: আমি সঠিক হিসাবটা দিতে পারবো না। কিন্তু ফেদাইনদের সাথে যুদ্ধে যে তাদের লোক নিহত হচ্ছে ইসরাইলীরাতো তা স্বীকার করেছে। তবে ভিয়েতনামে আমেরিকানদের নিহত হওয়ার সংখ্যার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অধিক। আরো লক্ষনীয় যে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যুহার দশগুণ বেড়ে গেছে। সংক্ষেপে বলা যায়, আমাদের সাথে একটি যুদ্ধের পর যানবাহনের দুর্ঘটনায় বহু ইসরাইলী মারা পড়ে।

ইসরাইলী সংবাদপত্রগুলো এটা লক্ষ্য করেছে। আমরা জানি, ইসরাইলী জেনারেলরা কখনো যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করে না। আমি আপনাকে আমেরিকান পরিসংখ্যান সূত্র ধরে বলতে পারি যে, কারামেহ এর যুদ্ধ তাদের ১২৪৭ জন লোক হতাহত হয়েছে।

ওরিয়ানা ফালাচি : আপনাদেরকেও এ ধরনের উচ্চ মূল্য দিতে হয়?

ইয়াসির আরাফাত : আমরা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করি না। আমরা মৃত্যুর তোয়াক্কা করি না। যাহোক ১৯৬৫ থেকে আজ পর্যÍ আমাদের নিহতের সংখ্যা নয় শতের কিছু উপরে। তবে এটাও আপনাকে খেয়াল রাখতে হবে যে বিমান হামলায় ছয় হাজার বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে এবং আমাদের ভাইয়েরা ইসরাইলী কারাগারে অত্যাচারিত হয়ে মৃত্যুবরণ করছে।

ওরিয়ানা ফালাচি : নয়শত কম বা বেশী কিনা তা অবশ্য নির্ভর করে সংঘর্ষের সংখ্যার উপর। কতজন ফেদাইন সেখানে ছিল?

ইয়াসির আরাফাত : আপনাকে সে সংখ্যা বলতে হলে আমাকে সামরিক কাউন্সিলের অনুমতি নিতে হবে। আমার মনে হয় না যে তারা আমাকে এ অনুমতি দেবেন। তবু আপনাকে বলতে পারি কারামেহ এর যুদ্ধে ১৫হাজার ইসরাইলীর মোকাবেলায় আমরা মাত্র ৩৯২ জন ছিলাম।

ওরিয়ানা ফালাচি : ১৫ হাজার? আপনি বোধহয় ১৫শত বলতে চেয়েছেন আবু আম্মার।

ইয়াসির আরাফাত : না! না! না! আমি বলেছি ১৫হাজার! এর মধ্যে ভারী কামান, ট্যাংক, বিমান, হেলিকপ্টার বহরের সৈন্যরা ও প্যারাটুপাররাও আছে। শুধু সৈন্যদের দু’টি বিগ্রেড ও চারটি কোম্পানী ছিল। আমরা যা বলি তা পাশ্চাত্যের লোক, আপনারা বিশ্বাস করতে চান না। আপনারা ইসরাইলীদের কথা শোনেন, বিশ্বাস করেন এবং তারা যা বলে, আপনারা সেটাই রিপোর্ট করেন।

ওরিয়ানা ফালাচি : আবু আম্মার আপনি একজন পক্ষপাতদৃষ্ট মানুষ। আমি এখন এখানে বসে আছি, আপনার কথা শুনছি এবং এই সাক্ষাতকারের পর আপনি যা বলেছেন তার প্রতিটি শব্দ আমি রিপোর্ট করবো।

ইয়াসির আরাফাত : আপনারা ইউরোপীয়রা সব সময় তাদের পক্ষে। হয়তো আপনাদের মধ্যে কিছু লোক আমাদের বুঝতে শুরু করেছেন- কিন্তু তা এখনো শুধু অনুভব করার মত। বাস্তবে আপনারা তাদেরই পক্ষে।

ওরিয়ানা ফালাচি : এটা আপনাদের যুদ্ধ আবু আম্মার, আমাদের নয়। আপনাদের এই যুদ্ধে আমরা দর্শক মাত্র। আপনি আমাদেরকে ইহুদীদের বিরুদ্ধে যেতে বলতে পারেন না এবং আপনারও অবাক হওয়া উচিত হবে না, যদি উইরোপে ইহুদীদের প্রতি ভালোবাসা লক্ষ্য করেন। আমরা তাদের হত্যাযজ্ঞ দেখেছি। আমরা দাদের হত্যা করেছি। আমরা চাই না এর পুনরাবৃত্তি ঘটুক।

ইয়াসির আরাফাত : অবশ্যই। তাদের কাছে আপনাদের যে ঋণ তা আপনাদেরকেই পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু সেটা পরিশোধ করতে চান আমাদের রক্তে, আমাদের ভ’খন্ড দিয়ে। ইহুদীদের বিরুদ্ধে আমাদের কোন কথা নেই বরং আমরা ইসরাইলীদের বিরুদ্ধে। গণতান্ত্রিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে ইহুদীদের স্বাগত জানান হবে।

ওরিয়ানা ফালাচি : কিন্তু ইসরাইলীরা তো ইহুদী। সকল ইহুদী ইসরাইলের সাথে নিজেদেরকে পরিচিত করতে পারে না। ইসরাইলের পক্ষেও ইহুদী সনাক্তকরণ সম্ভব নয়। তাই বলে আপনি ইসরাইলের ইহুদীদেরকে আর একবার সারা বিশ্বে দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াতে বলতে পারেন না। এটা অযৌক্তিক।

ইয়াসির আরাফাত : তাহলে আপনারা চান আমরা যাযাবরের মত ঘুরে বেড়াই?

ওরিয়ানা ফালাচি : না! আমরা কাউকে সে অবস্থায় দেখতে চাই না।

ইয়াসির আরাফাত : কিন্তু আমরা এখন যে অবস্থায় কাটাচ্ছি তা ঘুরে বেড়াবার মতই। ইহুদীদেরকে আবাসভ’মি দেবার জন্যে আপনাদের যখন এতোই উদ্বেগ তাহলে আপনাদের ভ’মি দিন। ইউরোপ, আমেরিকায় আপনাদের বিস্তীর্ণ ভ’মি দিতে বলবেন না। শত শত বছর ধরে আমরা এখানে বাস করে আসছি। আপনাদের ঋণ পরিশোধের জন্য আমরা এ ভ’মি দেবো না। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও আপনারা ভুল করছেন। এটা কি করে সম্ভব যে, সভ্যতার উচ্চ শিখরে পৌছে, অগ্রগতির চরম বিকাশ সাধনের পরও ইউরোপীয়রা তাদের এ ভুলটি স্বীকার করছে না।

তদুপরি আপনাদেরকে স্বাধীনতার জন্য লড়তে হয়েছে। শুধু আপনাদের রিজোরগিমেন্টোর কথাই ভাবুন। আপনাদের ভুলটা উদ্দেশ্যমূলক। ফিলিস্তিনের ব্যাপারে আপনাদের অজ্ঞতা বলতে পারেন না। ফিলিস্তিন সম্পর্কে আপনারা ভালোই জানেন। আপনারা এখানে ক্রুসেড চাপিয়ে দিয়েছেন এবং আপনাদের ঠিক নাকের নীচে এদেশের অবস্থান। এটা আমাজোনিয়া নয়। আমার বিশ্বাস, একদিন বিবেক জাগ্রত হবে। সেদিনের আগে আমাদের সাক্ষাত না হওয়াই উত্তম।

ওরিয়ানা ফালাচি : এটাই কি আপনার কালো চশমা পরিধানের কারণ আবু আম্মার?

ইয়াসির আরাফাত : না, আমার কালো চশমা পড়ার কারণ, আমি লোকদের জানতে দিতে চাই না যে, আমি জেগে আছি অথবা ঘুমিয়ে আছি। কালো কাঁচের আড়ালে আমি সর্বদা জাগ্রত। যখন চশমা খুলে রাখি তখন আমি ঘুমাই এবং আমি খুব কম ঘুমাই। আমি বলেছিলাম, কোন ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়।

ওরিয়ানা ফালাচি : মাত্র একটি আবু আম্মার। আপনি বিবাহিত নন এবং বলা হয়, আপনার জীবনে কোন নারী নেই। আপনি কি হো চি মিনের মত হতে চান।

ইয়াসির আরাফাত : হো চি মিন—। না, বরং বলতে পারি আমি কখনো উপযুক্ত নারীর সন্ধান পাইনি। আর এখন বেশী সময় নেই। আমি ফিলিস্তিন নামের এক নারীকে বিয়ে করেছি।

সূত্র: নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট।

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম।