ওরিয়ানা ফালাচি ও ইয়াসির আরাফাত

Saturday, 11/01/2014 @ 1:13 pm

:: কাজী আবুল মনসুর ::

ওরিয়ানা ফালাচি ইতালীর বিশিষ্ট নারী সাংবাদিক। রোম থেকে প্রকাশিত ‘এল ইউরোপিও’ সংবাদপত্রে তিনি কর্মরত ছিলেন। বিশ্বের বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্রনেতাদের সাক্ষাতকার গ্রহণের মাধ্যমে ৭০ এর দশকে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। এসব সাক্ষাতকারের মধ্যে ১৪টি সাক্ষাতকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রী” নামে এক গ্রন্থ।

ওরিয়ানা ফালাচি ইতালীর বিশিষ্ট নারী সাংবাদিক। রোম থেকে প্রকাশিত ‘এল ইউরোপিও’ সংবাদপত্রে তিনি কর্মরত ছিলেন। বিশ্বের বিতর্কিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও রাষ্ট্রনেতাদের সাক্ষাতকার গ্রহণের মাধ্যমে ৭০ এর দশকে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। এসব সাক্ষাতকারের মধ্যে ১৪টি সাক্ষাতকার নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে “ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রী” নামে এক গ্রন্থ।

ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলনের নেতা ইয়াসির আরাফাতের সাক্ষাতকারের অনুবাদটি সাক্ষাতকার গ্রহণের অনেক বছর পর প্রকাশিত হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির বহু পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ‘নতুন ঢাকা ডাউজেস্ট’ ম্যাগাজিন অবলম্বনে সাক্ষাতকারের হুবহু অনুবাদ প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে সাক্ষাতকারটি গ্রহণকালীন পরিস্থিতিকেই তুলে ধরা হয়েছে।

ইয়াসির আরাফাত সম্পর্কে ওরিয়ানা ফালাচি’র মন্তব্য-

একেবারে কাঁটায় কাঁটায় যখন তিনি এলেন, মুহূর্তের জন্য আমি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিলাম। নিজেকে বললাম, না, এ তিনি হতেই পারেন না। তাকে বেশ তরুণ মনে হচ্ছিল, অতি সাধারণ। অন্ততঃ প্রথম দৃষ্টিতে আমি তাঁর মধ্যে এমন কিছু দেখলাম না যাতে তাঁকে কর্তৃত্বের অধিকারী মনে হয়। তার গোঁফ লক্ষ্যনীয়। পুরু এবং সকল আরবের গোঁফের মতই। কাঁধে ঝুলানো রাইফেল, যা তিনি কখনো খুলে রাখেন না। নিশ্চয়ই তার খুব প্রিয়। কিছুটা হাস্যকর। উচ্চতায় তিনি বেশ খাটো। আমার মনে হয় পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চি। হাত, পা ছোট ছোট, বিশেষ করে সাংসল পা, গুরু নিতম্ব ও স্ফীত উদরসহ দেহের ভার রক্ষার পক্ষে বেশ ছোট।

এসব কিছুর উপরে একটা ছোট মাথা। মুখটা যেন ফ্রেমে বাঁধা এবং মুখ দেখেই কেউ বুঝতে পারবে- এই তিনি। ইয়াসির আরাফাত। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত গেরিলা। বিশ্ব জুড়ে বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব। অন্ধকারে হাজার মানুষের মাঝে খুঁজে পাওয়ার মত মুখ। একজন অভিনেতার মুখ। শুধু তার মহাশত্রু মোশে দায়ানের এক চোখের আবরণীর মতো তার কালো চশমার কারণেই যে তিনি সবার থেকে ব্যতিক্রম তা নয়, বরং ব্যতিক্রম তার মুখোশের জন্য এজন্য তাকে মনে হয় শিকারী পাখী বা ক্রুদ্ধ মেষের মতো।

তার গাল নেই, কপাল নেই। সব কিছু লাল, পুরু ঠোঁটের সাথে একটা বিরাট মুখমন্ডলে একাকার হয়ে গেছে। একটা উগ্র নাক এবং কালো কাঁচে আবৃত চোখ দু’টো কাউকে সম্মোহিত করবে। এই চোখে তিনি এখন আমাকে দেখছেন, সৌজন্যের সাথে, কিছুটা অচেতনভাবে। নরম ও আদুরে গলায় ইংরেজীতে উচ্চারণ করলেন, ‘গুড ইভনিং। দু’মিনিটের মধ্যে আপনার সাথে বসবো।’ তার কন্ঠ কিছুটা রমনীয়।

আমার সাথে এপয়েন্টমেন্ট ছিল রাত দশটায়। সেখানে প্রায় কেউ ছিল না। অতএব তার আবির্ভাবে নাটকীয়তার সুযোগও ছিল না। কেউ যদি তার পরিচয় না জানে তাহলে তাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে ভাববে শুধু দেহরক্ষীর কারণে। দেহরক্ষী সুদীর্ঘ, লিকলিকে এবং সুসজ্জিত। চেহারায় ওয়েষ্টার্ণ লেডিকিলারের সকল বৈশিষ্ট্য। সহসা আমার ধারণা হলো, দেহরক্ষী পাশ্চাত্যের বাসিন্দা, হয়তো জার্মান। সে শুধু দেহরক্ষী নয়, আরো কিছু। এর পর এলো দোভাষী এবং আবু জর্জ, যিনি প্রশ্ন ও উত্তর লিখে নেবেন এবং আমার লেখার সাথে মিলিয়ে দেখবেন।

শেষোক্ত দু’জন আমাদের অনুসরণ করে সাক্ষাতকারের জন্য নির্ধারিত কক্ষে এলো। কক্ষে কয়েকটা চেয়ার, একটা টেবিল। ইয়াসির আরাফাত তার স্বয়ংক্রিয় রাইফেলটা টেবিলে নামিয়ে রাখলেন প্রদর্শনীমূলক ভঙ্গীমায়। সাদা দাঁতে হাসি ছড়িয়ে বসলেন। যেন নেকড়ের দাঁত। আমি জানতাম, আরাফাতের সাথে সাক্ষাতকারে উল্লেখযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যাবে না। ফিলিস্তিন প্রতিরোধের বিখ্যাত ব্যক্তি সবচেয়ে রহস্যময়ও বটে। তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে নীরবতার ভারী পর্দা ঝুলছে। বিষয়টা তাকে আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তার সাক্ষাতকার পাওয়াও খুব কঠিন কাজ।

নিয়মিত অজুহাত হচ্ছে তিনি সব সময় সফরে আছেন। এই তিনি কায়রোতে, রাবাতে, সৌদি আরবে বা মস্কোয়। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়। এ সময়ের মধ্যে তার অতীত সম্পর্কে আহরণের চেষ্টা করা যায়। যেখানেই যাওয়া হোক সবখানেই অসম্ভব রকমের নীরবতা। তারা তাদের নেতার ব্যাপারে কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করে। এমনকি জীবন বৃত্তান্ত পর্যন্ত সরবরাহ করে না। সর্বত্র বলা হয়, তিনি কম্যুনিষ্ট নন এবং কখনো তিনি কম্যুনিষ্ট হবেন না, এমন কি স্বয়ং মাও সেতুং তাকে মন্ত্র পাঠ করালেও না। তিনি একজন সৈনিক, দেশপ্রেমিক।

ইয়াসির আরাফাত জেরুজালেমে জন্মগ্রহণ করেছেন। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে কুড়ির দশকে তার জন্ম। তার যৌবন কেটেছে সুখে। পিতা প্রাচীন ঐশ্বর্যের অধিকারী ছিলেন। দেড় শতাব্দিতে সে সম্পত্তি বিভিন্নভাবে অন্যের হস্তগত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে তিনি ইহুদীদের সাথে যুদ্ধ করেন। তখন তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিলেন। তখন তিনি প্যালেষ্টাইন স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন গঠন করেন, যা থেকে আল ফাতাহর জন্ম। ডিগ্রী লাভের পর চাকুরী করতে তিনি কুয়েতে যান। ১৯৬৭ সালে তিনি পিএলও’র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

তার সাথে সাক্ষাতকার স্থায়ী হয়েছিল ৯০মিনিট। এর অধিকাংশ সময় কেটেছে অনুবাদের জন্য কারণ তিনি উত্তর দিচ্ছিলেন আরবীতে।

(১৯৭২ সালের মার্চ মাসে আম্মানে এই সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়।)

ওরিয়ানা ফালাচি : আবু আম্মার, লোকজন আপনার সম্পর্কে বহু কথা বলে অথচ আপনার সম্পর্কে কোন কিছুই জানা যায় না এবং …।

ইয়াসির আরাফাত : আমার সম্পর্কে বলার একটিই আছে যে, আমি একজন ফিলিস্তিনী যোদ্ধা। ১৯৮৭ সালে আমার পরিবারের সদস্যের সাথে আমি এর সাথে জড়িত হই। হ্যাঁ তখন আমার বিবেক জাগ্রত হয়েছিল এবংউপলব্ধি করছিলাম যে, আমার দেশের উপর কি বর্বরোচিত আগ্রাসন হয়েছে। এ ধরনের আগ্রাসন বিশ্বের ইতিহাসে আর ঘটেনি।

ওরিয়ানা ফালাচি : আপনার বয়স কত আবু আম্মার? প্রশ্নটা করছি, কারণ আপনার বয়স সম্পর্কে কিছু বিতর্ক রয়েছে।

ইয়াসির আরাফাত : কোন ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়।

ওরিয়ানা ফালাচি : আবু আম্মার, আমি শুধু জানতে চাচ্ছি, আপনার বয়স কত? আপনি তো নারী নন, আমাকে বয়স বলতে পারেন।

ইয়াসির আরাফাত : আমি বলেছি, কোন ব্যক্তিগত প্রশ্ন নয়।

ওরিয়ানা ফালাচি : আবু আম্মার আপনি যদি নিজের বয়সটা পর্যন্ত বলতে না চান তাহলে কেন সব সময় বিশ্বের দৃষ্টি আপনার প্রতি আকৃষ্ট করতে চান এবং বিশ্বকে দেখাতে চান যে, আপনি ফিলিস্তিন প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রধান?

ইয়াসির আরাফাত : আমি এর প্রধান নই এবং প্রধান হতে চাই না। আমি হলফ করে বলতে পারি। আমি শুধু কেন্দ্রেীয় কমিটির একজন সদস্য। অনেকের মধ্যে একজন। আরো সম্পষ্টভাবে বলা যায়, আমাকে মুখপাত্র হতে আদেশ দেয়া হয়েছে। আমাকে বিবেচনা করলে বিভ্রান্তির অবকাশ আছে। ফিলিস্তিন প্রতিরোধের কোন প্রধান নাই। আসলে আমরা যৌধ নেতৃত্বের নীতি প্রয়োগের চেষ্টা করছি। এর ফলে অসুবিধাও হচ্ছে। কিন্তু আমরা যেহেতু কোন একক ব্যক্তিত্বের দায়িত্ব ন্যস্ত করার নীতিতে আস্থাশীল নই, সেজন্য যৌথ নেতৃত্বেই আমাদের বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়েছে। এটা আধুনিক ধারণা এবং যারা যুদ্ধ করছে, নিহত হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে বা অবিচার না করার ক্ষেত্রে এই নেতৃত্বই সহায়ক। আমাকে যদি মরতে হয়, তাহলে আপনার আগ্রহ বিলুপ্ত হবে- আমার সবকিছুই তখন জানতে পারবেন। সেই মুহূর্ত পর্যন্ত আমার উত্তর হবে, না।

ওরিয়ারা ফালাচি : আমি এ কথা বলবো না যে, আপনার সহকর্মীরা আপনার মৃত্যুকে পুষিয়ে নিতে পারবে এবং আপনার দেহরক্ষীকে দেখে তারা ভাবেন যে, আপনার জীবিত থাকার প্রয়োজনীয়তাই অধিক।

ইয়াসির আরাফাত। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত গেরিলা। বিশ্ব জুড়ে বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব।

ইয়াসির আরাফাত। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বিখ্যাত গেরিলা। বিশ্ব জুড়ে বহুল আলোচিত ব্যক্তিত্ব।

ইয়াসির আরাফাত : না সম্ভবতঃ বেঁচে থাকার পরিবর্তে আমার মৃত্যুর উপকারিতা অধিক। আমি নিহত হলে ফিলিস্তিনী স্বার্থের প্রতি সাহার্য করা হবে। বহুবার আমার মৃত্যুর আশংকা রয়েছে- আজ রাতে তা ঘটতে পারে, আগামীকাল। আমি মারা গেলে তা কোন ট্র্যাজেডি হবে না- কাউকে তো মরতে হবে। আল ফাতাহকে প্রতিনিধিত্ব করা, যুদ্ধ পরিচালনার কাজ কাউকে অবশ্যই করতে হবে। আমি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত। আপনি যতটা ভাবছেন, নিজের নিরাপত্তার বিষয় আমি ততটা তোয়াক্কা করি না।

ওরিয়ানা ফালাচি : তা আমি বুঝি। অপরদিকে আপনি একবার একা সীমানা অতিক্রম করে ইসরাইলে প্রবেশ করেছিলেন, তাই না আবু আম্মার? ইসরাইলের বিশ্বাস আপনি দু’বার ইসরাইলে গেছেন এবং অ্যামবুশে পড়েও রক্ষা পেয়েছেন। তারা বলে, খুব চতুর লোকের পক্ষেই এটা সম্ভব।

ইয়াসির আরাফাত : আপনি যেটাকে ইসরাইল বলছেন সেটা আমার জন্মভ’মি। আমি ইসরাইলে যাইনি, আমি আমার বাড়িতে গেছি। হ্যাঁ আমি সেখানে গেছি- আমার অধিকারের জোরে গেছি। কিন্তু দু’বারের অনেক বেশী। আমি প্রায়ই যাই, যখন ইচ্ছা হয় যাই। অবশ্য এই অধিকার ভোগ করাটা বেশ অসুবিধাজনক। ওদের মেশিনগান সব সময় প্রস্তুত। কিন্তু ওরা যতটা ভাবে আমার কাছে তত কঠিন কাজ নয়। পরিস্থিতির উপর এটা নির্ভর করে। কোন দিক দিয়ে যাব তার উপর নির্ভর করে। এ ব্যাপারে আপনাকে চতুর হতে হবে। তারা ঠিকই বলেছে। এ ধরনের ভ্রমণকে আমরা বলি ‘শিয়ালের যাত্রা’। আপনি তাদেরকে জানাতে পারেন যে, আমাদের ছেলেরা, ফেদাইনরা প্রতিদিন ইসরাইলে যায়। সব সময় শত্রুকে হামলা করতে হয়। তাদেরকে পাঠানো হয় নিজেদের আবাসভ’মিকে চিনতে এবং সহজে যাতে সেখানে চলাফেরা করতে পারে সেজন্য। গাজা উপত্যকা এবং সিনাই মরুভ’মিতে আমরা অস্ত্র বয়ে নিয়ে যাই। গাজার যোদ্ধারা সমুদ্রপথে তাদের অস্ত্রের সরবরাহ পায় না। আমরা এখান থেকে পাঠাই।

ওরিয়ানা ফালাচি : আবু আম্মার, আর কতদিন এভাবে চলবে? কতদিন আপনারা প্রতিরোধে সক্ষম হবেন?

ইয়াসির আরাফাত : আমরা এখনো সেভাবে হিসেব নিকেশ করিনি। আমরা কেবল যুদ্ধের সূচনায় রয়েছি। আমরা একটা দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতির প্রাথমিক পর্যায়ে অবস্থান করছি। নিশ্চিতভাবেই এই যুদ্ধ চলবে বংশ পরম্পরায়। আমরাতো যুদ্ধের প্রথম জেরারেশন নই। বিশ্ব জানেনা অথবা ভুলে গেছে যে, ১৯২০ এর দশকে আমাদের পিতারা ইহুদী আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। ইংরেজ, আমেরিকান ও সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা সমর্থিত ইহুদীদের তুলনায় তারা দুর্বল ও নিঃসঙ্গ ছিলেন। কিন্তু ১৯৬৫ সালের জানুয়ারি থেকে আমরা শক্তিশালী। আল ফাতাহর জন্মের দিন থেকে আমরা ইসরাইলের জন্য বিপজ্জনক প্রতিবন্ধক। ফেদাইনরা অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, তারা আক্রমণ ও গেরিলা কৌশল শিখে নিচ্ছে। উল্লেখযোগ্য হারে তাদের সংখ্যা বাড়ছে। আপনি প্রশ্ন করছেন, কত দীর্ঘ সময় ধরে আমরা প্রতিরোধ করতে পারবো- এটা ভুল প্রশ্ন। আপনার প্রশ্ন করা উচিৎ, ইসরাইলের পক্ষে কতদিন প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। আমরা ঘরে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত এবং ইসরাইলকে ধ্বংস না করা পর্যন্ত থামবো না। আরব বিশ্বের ঐক্য এটাকে সম্ভব করে তুলবে।

ওরিয়ানা ফালাচি : আপনি সব সময় আরব বিশ্বের ঐক্যের কথা বলেন। কিন্তু আপনি ভালোভাবে জানেন যে, সকল আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত নয়। যারা ইতিমধ্যে যুদ্ধ করছে তাদের সাথে শান্তিপূর্ণ চুক্তি সম্ভব এবং আশাও করা যায়। এমনকি নাসের সেরকমই বলেছেন। যদি তেমন কোন চুক্তি সম্পাদিত হয়, তাহলে আপনি কি করবেন?

ইয়াসির আরাফাত : আমরা তা গ্রহণ করবো না। কখনো না। আমরা নিজেরাই ইসরাইলের সাথে যুদ্ধ অব্যাহত রাখবো, যতদিন পর্যন্ত আমরা ফিলিস্তিন ফিরে না পাই। ইসরাইলের বিলুপ্ত ঘটানো আমাদের সংগ্রামের লক্ষ্য। এর মধ্যে কোন আপোষ বা আলোচনার স্থান নাই। আমাদের বন্ধুরা এই সংগ্রামের ইস্যুগুলো পছন্দ করুক আর নাই করুক, আল ফাতাহর প্রতিষ্টালগ্নে যা নির্ধারিত হয়েছে, তাই থাকবে। প্রথমতঃ বিশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাস সৃষ্টিই আমাদের পিতৃভ’মি মুক্ত করার একমাত্র পন্থা। দ্বিতীয়তঃ বিশৃঙ্খলার মূল উদ্দেশ্য ইহুদীবাদকে সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পর্যায় থেকে বিলুপ্ত করে চিরতরে ফিলিস্তিন থেকে দিায় করা। তৃতীয়তঃ আমাদের বিপ্লবী তৎপরতা অবশ্যই দল বা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকবে। চতুর্থতঃ এ তৎপরতা হবে দীর্ঘস্থায়ী। আমরা কিছু আরব নেতৃবৃন্দের মনোভাব জানি- তারা একটা শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পরিসমাপ্তি আশা করেন। যদি এমন ঘটে, আমরা বিরোধিতা করবো।
ওরিয়ানা ফালাচি : মোদ্দা কথা হচ্ছে সবাই যে শান্তির আশা করছে, আপনি আদৌ তা চান না।

ইয়াসির আরাফাত : না! আমরা শান্তি চাই না। আমরা যুদ্ধ, বিজয় চাই। ইসরাইলের ধ্বংস হচ্ছে আমাদের কাছে শান্তি। আর কিছু নয়। আপনি যাকে শান্তি বলছেন তা ইসরাইল ও সা¤্রাজ্যবাদীদের জন্য শান্তি। আমাদের জন্য তা অবিচার ও লজ্জার। বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়ে যাবো। প্রয়োজনে দশকের পর দশক ধরে, বংশ পরম্পরায়।

ওরিয়ানা ফালাচি : একটু বাস্তবে আসুন আবু আম্মার। প্রায় সবগুলো ফেদাইন ঘাঁটিই জর্দানে, বাকীগুলো লেবাননে। লেবাননের যুদ্ধের ইচ্ছা নেই এবং জর্দান যুদ্ধের বাইরে থাকতেই পছন্দ করে। ধরা যাক এ দু’টো দেশ শান্তি চুক্তির সিন্ধান্ত নিয়ে ইসরাইলের উপর আপনাদের আক্রমণ দমন করার সিন্ধান্ত নিয়েছে। অন্যভাবে বলা যায়, তারা গেরিলাদেরকে আর গেরিলা হতে দিচ্ছে না। এমন তো ইতিমধ্যে ঘটেছে এবং আরো ঘটবে। এর মোকাবেলায় আপনি কি করবেন? আপনি জর্দান ও লেবাননের সাথেও যুদ্ধ ঘোষণা করবেন?

ইয়াসির আরাফাত : আমরা ‘যদি’র ভিত্তিতে যুদ্ধ করতে পারি না। যে কোন আরব রাষ্ট্রের ইচ্ছানুযায়ী সিন্ধান্ত নেয়ার অধিকার আছে। ইসরাইলের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পাদনের অধিকারও রয়েছে। একইভাবে আমাদের অধিকার রয়েছে, আপোষ করে দেশে ফিরতে চাওয়ার। আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কিছু নিঃশর্তভাবে আমাদের সাথে রয়েছে। অন্যেরা নেই। কিন্তু ইসরাইলের সাথে একাকী যুদ্ধ করার ঝুঁকি আমরা বিবেচনা করেছি। তারা শুরুতে আমাদের উপর যে অপমান চাপিয়েছে, যে দুর্ব্যবহার করেছে, আমরা এখনো তা করছি না। আমাদের প্রতিষ্ঠা, অনেকটা অলৌকিক ঘটনার মতো। ১৯৬৫ সালে আমরা যে মোম জ্বালিয়েছিলাম তা কালো অন্ধকারে পুড়ে শেষ হয়েছে। এখন আমাদের আলোতে গোটা আরব বিশ্বকে আলোকিত করি। এমনকি আরব ছাড়িয়েও এ আলো ছড়িয়েছে।

চলবে…

লেখক: সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম।