ওরিয়ানা ফালাচি ও জুলফিকার আলী ভুট্টো (৪)

Tuesday, 07/01/2014 @ 2:18 pm

:: কাজী আবুল মনসুর ::

ওরিয়ানা ফালাচি ও জুলফিকার আলী ভুট্টো” শিরোনামে সাক্ষাতকারটির
৩য় পর্বের শেষে যেখানে এসে থেমেছিল, সেখান থেকে শুরু. . .

তিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। বামে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো, মাঝখানে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও ডানে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জুলফিকার আলী ভুট্টোর মেয়ে এবং মুসলিম বিশ্বের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভূট্টো।

তিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। বামে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো, মাঝখানে ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও ডানে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জুলফিকার আলী ভুট্টোর মেয়ে এবং মুসলিম বিশ্বের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভূট্টো।

ওরিয়ানা ফালাচি : ইন্ধিরা গান্ধী বলেন, তার পিতা রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সন্ন্যাসী।

জুলফিকার আলী ভুট্টো : মিসেস গান্ধী তার পিতা সম্পর্কে ভুল বলছেন। বরং নেহেরু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন। পিতার অর্ধেক মেধা তার থাকা উচিত। দেখুন, যদিও তিনি পাকিস্তানের নীতির বিরোধী ছিলেন, তবু আমি সবসময় এই লোকটির প্রশংসা করি। আমি যখন তরুণ তখন তার দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম। পরে অবশ্য বুঝতে পারি অনেক ভুল, হতাশা, কঠোরতা ইত্যাদি দোষে দুষ্ট এবং তার মধ্যে স্ট্যালিন, চার্চিল বা মাও সে তুং এর মত যোগ্যতা ছিল না। মিসেস গান্ধী আর কি বলেছেন?

ওরিয়ানা ফালাচি : তিনি বলেছেন, আপনারা পাকিস্তানীরাই যুদ্ধ শুরু করেছেন।

জুলফিকার আলী ভুট্টো : হাস্যকর। প্রত্যেকে জানে তারা আমাদেরকে আক্রমণ করেছিল। ২ শে নভেম্বর পূর্বাঞ্চলীয় ফ্রন্টে তারা আঘাত হানে। পূর্ব পাকিস্তান সম্ভবতঃ পাকিস্তান ছিল না। ভালো করে একটু ভেবে দেখুন। কেউ যদি পালেরমো আত্রমণ করে, তাহলে আপনি কি এ সিন্ধান্তই নেবেন না যে ইটালী আত্রান্ত হয়েছে? কেউ যদি মার্সেলীস আক্রমণ করে তাহলে কি আপনি ভাববেন না যে ফ্রান্স আক্রান্ত হয়েছে? মিসেস গান্ধী বিতর্কিত ভূ’খন্ড কাশ্নীরে আমাদের পাল্টা আত্রমণের কথা ভুলে যেতে চাইছেন। ৩রা ডিসেম্বর কাশ্মীরের উপর হামলা হয়। আমার মনে পড়ছে ২ শে নভেম্বর ইয়াহিয়া খানের সাথে সাক্ষাত করে আমি পাল্টা হামলা করতে ব্যর্থতার ব্যাপারে তাকে বলি, “আপনি এমন ভাব দেখাচ্ছেন যে পূর্ব পাকিস্তানে কিছুই ঘটেনি। কোন পদক্ষেপ না নিয়ে আপনি ভারতের খেলায়ই অংশ নিচ্ছেন। মানুষকে আপনি এ বিশ্বাস করতে দিচ্ছেন যে, পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান এক রাষ্ট্র নয়।”

কিন্তু তিনি আমার কথা শুনলেন না। পাল্টা আত্রমণের নির্দেশ তিনি চারবার পরিবর্তন করেন। চতুর্থবারের সময় আমাদের জওয়ান ও অফিসাররা অধৈর্য হয়ে ট্যাংকে মুষ্ঠাঘাত করছিল। ঢাকা সম্পর্কে আমি বলেছিলাম, আমাদের সকল ছাউনি ঢাকায় কেন্দ্রীভ’ত করা হোক এবং একটি শক্তিশালী অবস্থান নেয়া হোক দশ মাসের জন্য, এক বছরের জন্য গোটা বিশ্ব আমাদের পক্ষে এসে যাবে। তার শুধু বক্তব্য ছিল ভারতীয়রা ক্ষুদ্র একটি ভ’খন্ড দখল ও বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করবেনা। কিন্তু যখন তিনি নিয়াজীকে আতœসমর্পনের নির্দেশ দিলেন…. হে খোদা। আমি হাজার বার মৃত্যুবরণ করলেও এর চেয়ে ভালো বোধ করতাম। মনে পড়ে, আমি নিউইয়র্কে ছিলাম। তিনি আমাকে পাঠিয়েছেন একজন পর্যটক হিসেবে এবং আমি নিজেকে জাতিসংঘের এক অদ্ভুদ অধিবেশনে দেখলাম।

ওরিয়ানা ফালাচি : এবং আপনি সেখানে সেই দৃশ্যের অবতারণা করেন।
জুলফিকার আলী ভুট্টোঃ আমি স্বীকার করি। একটি বাস্ব দৃশ্য। আমি ক্রোধে, বিরক্তিতে ক্ষিপ্ত হয়েছিলাম। ভারতীয়দের আক্রমণাত্নক ভাব, বৃহৎ শক্তি কর্তৃক ভীতি প্রদর্শন, যারা শুধু ভারতের অনুকরণ করতে চাচ্ছিল। আমি আমার ভাবাবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। আমার বক্তৃতায় সকলকে আমি জাহান্নামে যেতে বলেছি। আমি কেঁদেছি। হ্যাঁ, আমি মাঝে মাঝে কাঁদি। যখন কোন কিছু অন্যায়, অসম্মানজনক আবিষ্কার করি, আমি তখন কাঁদি। আমি খুবই আবেগপ্রবণ।

ওরিয়ানা ফালাচি : আবেগপ্রবণ, দুর্বোধ্য, জটিল এবং…. আরো অনেক বলা হয়। আমার মনে হয়, এখন আপনার ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করার সময় হয়েছে। মিঃ প্রেসিডেন্ট, এই লোকটি সম্পর্কে একটু বলুন, যিনি অত্যন্ত ধনবান, অথচ একজন সমাজতন্ত্রী, পাশ্চাত্যের লোকের মত বাস করেন অথচ তার দু’জন স্ত্রী রয়েছে।

জুলফিকার আলী ভুট্টো : আমার মধ্যে অনেক বৈপরীত্য রয়েছে- আমি সে সম্পর্কে সচেতন। আমি এসবের মধ্যে আপোষের চেষ্টা করি, সমস্যা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি সফল হতে পারি না। ফলে আমি এশিয়া ও ইউরোপের অদ্ভুত মিশ্রণ হিসেবেই রয়েছি। আমার শিক্ষা খুব কম কিন্তু ইসলামী পরিবেশে বড় হয়েছি। আমার মনটা পাশ্চাত্যের কিন্তু আত্না প্রাচ্যের। আমার দুই স্ত্রী সম্পর্কে আমি কি করতে পারি? তারা আমার মামাত বোনের সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন মাত্র তের বছর বয়সে। আমার বয়স ছিল মাত্র তের, আর আমার স্ত্রীর তেইশ বছর। এমনকি আমি জানতামও না যে একজন স্ত্রী থাকার অর্থ কি। যখন তারা আমাকে এটা বুঝানোর চেষ্ঠা করলো, আমি রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি কোন স্ত্রী চাইনি। আমি ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিলাম। আমি ত্রিকেটের দারুণ ভক্ত। আমাকে শান্ত করতে আমাকে দু’টি নতুন ক্রিকেট ব্যাট দিতে হয়েছিল। অনুষ্ঠান শেষ হওয়া মাত্র আমি ক্রিকেট খেলতে যাওয়ার জন্য দৌড় দিয়েছিলাম। আমার দেশে এমন অনেক কিছু আছে, যা আমাকে অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে। আমাকে ভাগ্যবান বলতে হবে। তারা আমার এগার বছর বয়সী খেলার সাথীকে বিয়ে দিয়েছিল বত্রিশ বছর বয়সী এক রমণীর সঙ্গে। সে সবসময় আমাকে বলতো, “তুমি ভাগ্যবান।”

পাকিস্তানের সাবেক ফার্স্টলেডি বেগম নুসরাত ভুট্টো।১৯২৯ সালে ইরানের ইস্পাহানে এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম। ১৯৫১ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে তার বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন মিস্টার ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী। ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনামলে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসি দেয়া হলে নুসরাত ভুট্টো পিপিপির হাল ধরেন।গত শতকের আশির দশকে তিনি দুবার পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে। সে সময় তিনি মেয়ে বেনজিরের কাছে দলের দায়িত্ব দিয়ে লন্ডনে যান চিকিৎসার জন্য। সবশেষ গত ২৪ অক্টোবর, ২০১১ সালে ৮২ বছর বয়সে দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে মারা যান প্রভাবশালী এই নারী।

পাকিস্তানের সাবেক ফার্স্টলেডি বেগম নুসরাত ভুট্টো।১৯২৯ সালে ইরানের ইস্পাহানে এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্ম। ১৯৫১ সালে জুলফিকার আলী ভুট্টোর সাথে তার বিয়ে হয়। তিনি ছিলেন মিস্টার ভুট্টোর দ্বিতীয় স্ত্রী। ১৯৭৯ সালে জেনারেল জিয়াউল হকের সামরিক শাসনামলে জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসি দেয়া হলে নুসরাত ভুট্টো পিপিপির হাল ধরেন।গত শতকের আশির দশকে তিনি দুবার পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে তাঁর ক্যানসার ধরা পড়ে। সে সময় তিনি মেয়ে বেনজিরের কাছে দলের দায়িত্ব দিয়ে লন্ডনে যান চিকিৎসার জন্য। সবশেষ গত ২৪ অক্টোবর, ২০১১ সালে ৮২ বছর বয়সে দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে মারা যান প্রভাবশালী এই নারী।

আমি যখন আমার দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রেমে পড়লাম, তখন আমার বয়স তেইশ বছর। সেও ইংল্যান্ডে পড়াশুনা করছিল। যদিও সে একজন ইরানী অর্থ্যাৎ তার দেশে বহু বিবাহ একটি রীতি, আমাকে বিয়ে করার জন্য তাকে রাজী করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। মাত্র দুটি কথা ছাড়া তাকে বুঝানোর মত যুক্তি আমার ছিল না, “তাতে কি, ওসব বাদ দাও।” আমার প্রথম স্ত্রীকে তালাক দেয়ার ধারণা কখনো আমার মাথায় আসেনি। সে যে আমার মামাত বোন, সে কারণে নয়, কারণ তার প্রতি আমার একটি দায়িত্ব আছে। একটি বালকের সাথে এই অবাস্তব বিয়ের কারণে, এই অবাস্তব রীতি যেখানে আমরা বড় হয়েছি- সে কারণে তার গোটা জীবনটা বরবাদ হয়ে গিয়েছিল। সে আমার লারকানার বাড়ীতে বাস করে।

মাঝে মাঝে আমাদের সাক্ষাত হয়। প্রায় সবসময় সে একা কাটায়। এমনকি তার কোন সন্তানও নেই।- আমার চারটি সন্তান দ্বিতীয় স্ত্রীর। আমি খুব অল্পসময় তার সাথে কাটিয়েছি। বড় হওয়ার পরই পড়াশুনা করতে আমি পাশ্চাত্যে চলে যাই। এটা আসলে অবিচারের একটি কাহিনী। বহুবিবাহ নিরুৎসাহিত করতে আমার পক্ষে যা সম্ভব সবকিছু করবো। বহুবিবাহ অর্থনৈতিক সমস্যাও সৃষ্টি করে। কখনো স্ত্রীরা বিভিন্ন শহরে বা ভিন্ন বাড়ীতে বিচ্ছিন্নভাবে বাস করে- যেমনটি আমার বেলায় হয়েছে। তাছাড়া আমার যা সাধ্য তা সবার নেই। যদিও যেমনটি আপনি বলেছেন, আমি তেমন বিত্তবান নই।

ওরিয়ানা ফালাচি : না?

জুলফিকার আলী ভুট্টো : না। আপনার কাছে বিত্তবান অর্থ ডুগন্ট বা একজন রকফেলার হওয়া। আমাদের কাছে আরো অনেক কম। এদেশে যারা ধনী তারা বিস্তর জমির মালিক, কিন্তু আসলে সে ইউরোপীয় ব্যারণদের চেয়ে ধনী নয়। ব্যারণদের জাঁকজমকপূর্ণ ভিলা থাকে এবং বেঁচে থাকার জন্য গিগোলা খেলে। আমার ভ’মি শুষ্ক এবং এতে উৎপাদন হয় কম। অতএব ধনী বলার চেয়ে বলুন, আমি তুলনামূলকভাবে ধনী। আমি ভালভাবে বাস করি। আমার বোনেরা ভালভাবে থাকে, আমার ভাইদের অবস্থাও ভালো। অবস্থা ভালো হলেও আমরা অর্থ অপচয় করি না। আমি কখনো প্লেবয় ছিলাম না। যখন আমি আমেরিকায় এবং আক্সফোর্ডে ছাত্র ছিলাম, আমি কখনো গাড়ি কিনিনি। আমি বুদ্ধিমানের মতই অর্থ ব্যয় করেছি, যেমন; গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাত করতে ও বই কেনার মত কাজে। আপনি যদি আমার লাইব্রেরীটা দেখেন, তাহলেই দেখবেন আমার অর্থের একটা ভালো অংশ আমি কোথায় ব্যয় করেছিঃ- বই কিনতে।

আমার হাজার হাজার বই আছে। অনেক বই পুরোনো এবং সুন্দর। আমি সবসময় পড়তে দারুণ ভালবাসি। খেলাধুলার মত। ভালো পোশাক পরার জন্য অনেকে আমার দোষারোপ করে। কথাটা সত্য। কিন্তু তাদের অভিযোগ পোশাকে আমার অর্থব্যয়ের কারণে নয়, আমি পরিচ্ছন্ন থাকি সেজন্যে। আমি গোসল করতে এবং পোশাক পাল্টাতে পছন্দ করি। আমার পক্ষে কখনো ভারতীয় ও পাকিস্তানী রাজপুত্রদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি- কারণ তারা নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত। আমার বাড়িগুলো সুন্দর ও আরামদায়ক- এটাও সত্য। কিন্তু দীর্ঘদিন আমার বাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না। আমি আপ্যায়ণ করতে ভালবাসি।- কিন্তু কখনো বাজে লোককে নয়। আমি নাচতে জানি, কারণ আমি সঙ্গীত পছন্দ করি। এবং অন্যেরা যখন নাচে তখন দেয়ালে টানানো ফুলের মত থাকতে ঘৃণা করি বলে। এবং….।

ওরিয়ানা ফালাচি : এবং একজন লেডীকিলার হিসেবে আপনার সুনাম আছে বলে- একজন ডন জুয়ান। এটা কি সত্য মিঃ প্রেসিডেন্ট?

জুলফিকার আলী ভূট্টো : এ কথাটাও একটু অতিরঞ্জিত। আমি একজন রোমান্টিক- আমি মনে করি না যে, রোমান্টিক হওয়া ছাড়া আপনার পক্ষে রাজনীতিবিদ হওয়া সম্ভব। একজন রোমান্টিক হিসেবে আমি মনে করি প্রেম ছাড়া অনুপ্রেরণামূলক আর কিছু হতে পারে না। প্রেমে পড়া এবং একজন রমণীর হৃদয় জয় করার মধ্যে দোষ কোথায়- তার জন্যে আমার দারুণ দুঃখ হয়, যে প্রেমে পড়ে না। আপনি শতবার প্রেমে পড়তে পারেন। আমিও প্রেমে পড়ি। কিন্তু আমি অত্যন্ত নৈতিক মানুষ এবং নারীদের শ্রদ্ধা করি। মানুষ ভাবে যে মুসলমানরা নারীদের শ্রদ্ধা করে না। এটা মারাত্নক ভুল। নারীকে শ্রদ্ধা করা ও তাদের রক্ষা করা নবী মুহাম্মদ (সঃ) এর শিক্ষার অন্যতম।

একবার আমি এক লোককে বেত্রাঘাত করেছিলাম, যদিও আমি নিজেকে দৈহিক নির্যাতনের পক্ষে মনে করি না কিন্তু খুব নির্দয়ভাবে বেত মেরেছিলাম, রক্তপাত না হওয়া পর্যন্ত। আপনি বলতে পারেন, কেন? কারণ সে একটি ছোট্ট বালিকাকে ধর্ষণ করেছিল। আজ সকালেও যখন আমি পড়লাম যে, কয়েক’শ ছাত্র করাচীর সমুদ্র সৈকতে কিছু সংখ্যক ছাত্রীর উপর হামলা ও তাদের কাপড় খুলে ফেলেছে, আমি রাগে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। স্ক্রাউন্ড্রেল। আমি ওদেরকে সামরিক আইন বিধির আওতায় ফেলবো। আপনাকে কথাটা বলতে চাই। আমি যদি নিশ্চিত হই যে, আমাদের সৈন্যরা সত্যি সত্যিই বাংলাদেশের নারীদের উপর অত্যাচার করেছে তাহলে আমি অবশ্য তাদের বিচার করবো ও শাস্তি দেব।

ওরিয়ানা ফালাচি : অন্য প্রসঙ্গে আসা যাক মিঃ প্রেসিডেন্ট। আপনার মার্ক্সবাদের কথাই বলি। আপনার যে সুযোগ সুবিধা এবং মুসলিম হিসেবে আপনার যে বিশ্বাস তার সাথে কি করে এর সাথে আপোস করেন?

জুলফিকার আলী ভূট্টো : আমি অর্থনৈতিক প্রেক্ষিতে আমাকে মার্ক্সবাদী বলি। তাহলো, আমি মার্ক্সবাদের ততটুকুই গ্রহণ করেছি, যতটুকু অর্থনীতির সাথে জড়িত। মার্ক্সের ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক ব্যাখ্যা, জীবন সম্পর্কিত তত্ত্ব, ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন- এসবকে আমি মানি না। মুসলিম হিসেবে আমি আল্লাহকে বিশ্বাস করি। সঠিক হোক আর ভ্রান্তই হোক- আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ আছেন। বিশ্বাস এমন একটি জিনিস তার অস্তিত্ব থাকুক আর নাই থাকুক তার বিশ্বাসে দুর্বলতা নেই। যদি তিনি থাকেন, তাহলে এনিয়ে তর্ক করা বৃথা। তিনি আমার মধ্যে। মার্ক্সবাদের দার্শনিক অথবা কাল্পনিক ব্যখ্যায় আমি আল্লাহর নিন্দা করতে পারি না। একই সাথে আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, একজন মার্ক্সবাদী এবং একজন মুসলিম পাশাপাশিই চলতে পারে- বিশেষ করে পাকিস্তানের মত একটি উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ছাড়া আমি কোন সমাধান দেখি না।

আমি পাকিস্তান বলছি এজন্যে যে, আন্তর্জাতিক ক্রুসেড শুরু করার মত কোন প্রসঙ্গ উপস্থাপন করছিনা। আমি অন্যের ব্যাপারে নাক গলাচ্ছি না। আমি শুধু আমার দেশের বাস্তবতার মধ্যে সীমাবদ্থ থাকতে চাই। না, আমি এও স্বীকার করছি যে, বিপ্লবের কোন প্রক্রিয়ায় নয়। আমি শপথ করে বলতে পারি আমি একজন বিপ্লবী। কিন্তু আমি হঠাৎ ও রক্তাক্ত একটি বিপ্লবের ভার বহন করতে পারি না। পাকিস্তান সে ধরনের বিপ্লবের ভার সইতে পারবে না, সেটা হবে বিপর্যয়। অতএব আমাকে অগ্রসর হতে হবে ধৈর্যের সাথে। সংস্কারের মাধ্যমে : পরিমাপ করে ক্রমশঃ দেশকে নিতে হবে সমাজতন্ত্রের পথে।

যখন সম্ভব হবে জাতীয়করণ করতে হবে এবং যখন প্রয়োজন হবে জাতীয়করণ বাদ দিতে হবে। বিদেশী পুঁজি যা আমাদের প্রয়োজন তাকে শ্রদ্ধা করতে হবে। আমার সময়ের প্রয়োজন। একজন সার্জনের মত সয়ে সয়ে ছুরি চালাতে হবে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আমাদের সমাজটা অসুস্থ। যদি অস্ত্রোপচারে মরে না যায় তাহলে সতর্কতার সাথে তাই করতে হবে। একটি আঘাত সেরে উঠার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সংস্কারকে সংহত করতে হবে। বহু শতাব্দী আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। একটি ভূমিকম্পের আচমকা ধাক্কায় নিজেদের জাগাতে পারি না। লেনিনকেও শুরুতে আপোস করতে হয়েছিল।

ওরিয়ানা ফালাচি : মিঃ প্রেসিডেন্ট, বহু মানুষ আপনাকে বিশ্বাস করে না। তারা বলেন, আপনি শুধু ক্ষমতাই চান, আর কিছু নয় এবং ক্ষমতা ধরে রাখার জন্যে আপনি সবই করতে পারেন।

জুলফিকার আলী ভূট্টো : না, এটা সত্যি নয়। গত তিন মাসে আমি যে কৃষি সংস্কার করেছি তাতে আমার পরিবার পঁয়তাল্লিশ হাজার একর জমি হারিয়েছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি হারিয়েছি ছয় থেকে সাত হাজার একর। আমাকে আরো জমি হারাতে হবে। আমার সন্তানরাও হারাবে। আল্লাহ আমার সাক্ষী যে, আমি সমাজতন্ত্রের নামে খেলছি না এবং কোন সংকীর্ণ স্বার্থ সামনে রেখে আমি ধীরে ধীরে অগ্রসর হই না। যেদিন থেকে আমি মার্ক্স পড়েছি সেদিন থেকে আমার মালিকানায় কোনকিছুই দান করতে আমি আর ভয় পাই না। এখনো তার স্থান ও সময় বলতে পারিঃ বোম্বে ১৯৪৫ সাল। আমি শুধু ক্ষমতার অভিলাষী এ অভিযোগ প্রসঙ্গে আমি বলতে চাই যে আসলে আমরা ‘ক্ষমতা’ শব্দটির দ্বারা কি বুঝি।

ইয়াহিয়া খানের যে ক্ষমতা ছিল ক্ষমতা দ্বারা আমি তা বুঝি না। ক্ষমতা দ্বারা আমি বুঝি যা ব্যবহার করে পর্বতকে সমতল করা যায়, মরুভ’মিকে পুষ্পিত করে তোলা যায়, এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যায় যেখানে জনগণ ক্ষুধা ও অত্যাচারে মারা যাবে না। আমার কোন অসৎ উদ্দেশ্য নেই। আমি একনায়ক হতে চাই না। কিন্তু যতটুকু আমি বলতে পারি তাহলো আমাকে অত্যন্ত শক্ত হতে হবে, এমনকি কর্তৃত্ববাদী হতে হবে। ভাঙ্গা জানালা আমি মেরামত করছি। জানালার ভাঙ্গা টুকরো আমি দূরে নিক্ষেপ করছি। অসতর্কভাবে যদি এগুলো নিক্ষেপ করি তাহলে আমি একটি দেশ পাবো না, আমি পাবো একটি বাজার।

পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভূট্টো ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।ভুট্টো সম্পর্কে সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচির প্রথম মন্তব্য, “তীক্ষ্ম বুদ্ধিমান। ধূর্ত, শিয়ালের মতো বুদ্ধিমান। মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে। বিভ্রান্ত করতেই তার জন্ম।”

পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভূট্টো ও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।ভুট্টো সম্পর্কে সাংবাদিক ওরিয়ানা ফালাচির প্রথম মন্তব্য, “তীক্ষ্ম বুদ্ধিমান। ধূর্ত, শিয়ালের মতো বুদ্ধিমান। মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে। বিভ্রান্ত করতেই তার জন্ম।”

সে যা হোক, শুধু হাসিঠাট্টা করার জন্যে কেউ রাজনীতি করে না। রাজনীতি করার উদ্দেশ্যই হলো ক্ষমতা হাতে নেয়া এবং তা রক্ষা করা। এর উল্টো যদি কেউ বলে তাহলে সে মিথ্যুক। রাজনীতিবিদরা সবসময় আপনাকে এ বিশ্বাস দিতেই সচেষ্ট যে তারা ভালো, নৈতিক এবং ভারসাম্যপূর্ণ। কিন্তু কোনদিন তাদের ফাঁদে পা দেবেন না। ভালো, নৈতিক ও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনীতিবিদ বলে কিছু নেই। রাজনীতি হলো দেয়া নেয়ার বিষয়। আমার পিতা বলতেন, “কারো দ্বারা দু’বার আঘাতপ্রাপ্ত হবার প্রস্তুতি না নিয়ে কখনো কাউকে আঘাত করবে না।” এরপর কিছু শিখেছি বয়স্কাউট থাকাকালে কিন্তু আমি অনেক কিছু ভুলেও গেছি।

ওরিয়ানা ফালাচি : তারা বলে, আপনি মুসোলিনী, হিটলার ও নেপোলিয়ন সম্পর্কিত বইপত্রের একনিষ্ট পাঠক।

জুলফিকার আলী ভূট্টো : অবশ্যই। তাছাড়া দ্য’গল চার্চিল, স্ট্যালিন এর উপর লিখিত বইও পড়ি। আপনি কি আমাকে এ কথা স্বীকার করাতে চান যে আমি একজন ফ্যাসিস্ট। না, আমি ফ্যাসিস্ট নই। একজন ফ্যাসিস্ট প্রথমতঃ সংস্কৃতির একজন শত্রু। কিন্তু আমি সংস্কৃতি দ্বারা পরিশীলিত একজন বুদ্ধিজীবী। একজন ফ্যাসিস্ট ডানপন্থী, কিন্তু আমি বামপন্থী। একজন ফ্যাসিস্টের চরিত্র পেটি বুর্জোয়ার। কিন্তু আমি এসেছি আভিজাত্য থেকে। কোন লোক সম্পর্কে পাঠ করার অর্থ তাকে আপনার নায়ক হিসেবে সৃষ্ঠি নয়।

আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমার কিছু নায়ক ছিল। কারো মাঝে নায়কের অস্তিত্ব চুইংগামের মত-চিবিয়ে চিবিয়ে ফেলে দেয়া বা বিভিন্ন আকার দেয়ার মত- বিশেষ করে আপনি যখন তরুণ। আপনি যদি জানতে চান কাদেরকে আমি দীর্ঘদিন চিবিয়েছি, জেনে নিন- চেঙ্গিস খান, আলেকজান্ডার, হ্যানিবল, নেপোলিয়ান। হ্যাঁ, নেপোলিয়নকেই সবচেয়ে বেশী ভাল লাগত। কিন্তু আমার মনে মাজিনি, ক্যাভর, গ্যারিবল্ডিরও কিছু কিছু স্থান ছিল। রুশোর প্রভাব ছিল যথেষ্ট। আপনি নিজেই আমার মধ্যে বিস্তর স্ববিরোধিতা দেখতে পাচ্ছেন।

ওরিয়ানা ফালাচি : তাই বলুন। আপনাকে আর একটুকু ভালোভাবে বুঝার জন্যে প্রশ্ন করতে চাই, আমাদের সময়ের কোন নেতাকে আপনি খুব ঘনিষ্ঠ বলে অনুভব করেন- যাদেরকে আপনি পছন্দ করেন অথবা যারা আপনাকে বেশী পছন্দ করে।

জুলফিকার আলী ভূট্টো : একজন সুকর্ণ। তিনি আমার ভক্ত এবং আমি তার ভক্ত। তার সকল দুর্বলতা সত্ত্বেও তিনি একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। যেমন নারীর সাথে তার সম্পর্কটা অমার্জিত। এটা প্রয়োজনীয়ও নয়, কিংবা পৌরুষোচিত- ও নয়। কিন্তু তিনি সেটা উপলব্ধি করেন না। তাছাড়া তিনি অর্থনীতি বুঝেন না। দ্বিতীয়জন নাসের। তিনি অত্যন্ত উচু দরের ব্যক্তিত্ব। তার সাথে আমার ভাল সম্পর্ক ছিল। তিনি আমাকে ভালবেসেছেন; আমিও তাকে ভালোবাসতাম। ১৯৬৬ সালে আমাকে যখন সরকার ত্যাগে বাধ্য করা হয়, তখন নাসের আমাকে মিসর আমন্ত্রণ করেন এবং রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদায় আমাকে স্বাগত জানান। তিনি বলেছেন, যতদিন আমার প্রয়োজন আমি সেখানে থাকতে পারি।

এরপর ধরুন স্ট্যালিনের কথা। হ্যাঁ স্ট্যালিন। তার প্রতি বরাবর আমার গভীর শ্রদ্ধা। অন্তর থেকে অনুভব করি সে শ্রদ্ধা, ঠিক ক্রুশ্চেভের প্রতি যতটা বিদ্বেষ অনুভব করি সেরকম। ক্রুশ্চেভকে আমি কখনো পছন্দ করিনি একথাটা বললেই বোধকরি আপনি ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। আমি সবসময় তাকে ভেবেছি একজন দাম্ভিক হিসেবে। সবসময় তার সদম্ভ আচরণ, চীৎকার, রাষ্ট্রদূতদের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ, মদ্য পান…. এবং সবসময় আমেরিকানদের গালিগালাজকে আমি পছন্দ করিনি। ক্রুশ্চেভ এশিয়ার অনেক ক্ষতি করেছেন।

সবশেষে বলতে চাই…. আমি জানি আপনি আমার থেকে মাও সে তুং সম্পর্কে কিছু শোনার প্রতীক্ষা করছেন। কিন্তু মাও সে তুং এর মত মহান ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আমার কাছে কি শুনতে চান? বরং চৌ এন লাই সম্পর্কে আমার পক্ষে বলা সহজ। তিনি এমন একজন যাকে আমি ভালোভাবে জানি। তার সাথে দীর্ঘসময় ধরে আমি কথা বলেছি, আলোচনা করেছি। অফুরন্ত আলোচনা, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনের পর দিন। কমপক্ষে বছরে একবার আমাদের সাক্ষাত হতো। ১৯৬২সাল থেকে আমি চীনে যাচ্ছি এবং চৌন এন লাইএর সঙ্গে সাক্ষাত করছি। আমি তার প্রশংসা করি।

ওরিয়ানা ফালাচি : মিঃ প্রেসিডেন্ট, যাদের কথা বললেন তাদের সকলকেই ক্ষমতা লাভের জন্য অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু আপনি তো তা করেননি।

জুলফিকার আলী ভূট্টো : আপনি ভুল বলছেন। এখানে পৌছাটা আমার জন্য খুব সহজ ছিল না। আমি কারারুদ্ধ ছিলাম। অনেকবার আমার জীবনের উপর ঝুঁকি এসেছে। আইয়ুব খানের সময়ে, ইয়াহিয়া খানের সময়ে। তারা আমার খাবারে বিষ প্রয়োগ করে হত্যার চেষ্টা করেছে, গুলিবর্ষণ করেছে। ১৯৬৮ সালে দু’বার আমার প্রাণনাশের চেষ্ঠা হয়, ১৯৭০ সালে একবার দু’বছর আগে সংঘরে ইয়াহিয়া খানের প্রেরিত হত্যাকারীদের সাথে পাল্টা গোলাগুলীর মধ্যে আমি ঘন্টাখানেক আটকা ছিলাম। আমাকে ঘিরে রাখা এক ব্যক্তি নিহত হয়। অন্যেরা গুরুতর আহত হয়।

এছাড়া মানসিক পীড়নের কথাই ভাবুন- আপনার জন্ম হয়েছে ধনবান পরিবারে এবং রূপান্তরিত হয়েছেন সমাজতন্ত্রীতে- কেউ আপনাকে বিশ্বাস করবে না। আপনার ঘনিষ্ট বন্ধুরাও এনিয়ে হাসিঠাট্টা করবে। এমনকি দরিদ্র লোকজন আপনার নিষ্টার প্রতি আস্থাশীল হবে না। বুলেটের হাত বা বিষ থেকে রক্ষা পাওয়া আমার জন্যে কঠিন কাজ নয়। আমাকে যে কিছুলোক বিশ্বাস করছে না, সেটাই আমার কাছে গুরুতর। যে প্রাচুর্যের মধ্যে আমি জন্মগ্রহণ করেছি তা আমাকে আলাদিনের উড়ন্ত গালিচায় বসায়নি। রাজনীতিকে যদি আমার পেশা হিসেবে না নিতাম…।

ওরিয়ানা ফালাচি : এ পেশার সূচনা হলো কিভাবে?

জুলফিকার আলী ভূট্টো : আমি যখন একজন বালক, তখন থেকেই এটা ছিল। কিন্তু আমরা যদি মনো বিশ্লেষক হিসেবে কাজ করতে চাই, তাহলে বলতে হয়, আমি এর উত্তরাধিকার পেয়েছি আমার পিতার নিকট থেকে। আমার পিতা একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ ছিলেন। কিন্তু বেশ আগেই তিনি রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন- একটি নির্বাচনে পরাজিত হবার পর। রাজনীতি সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল টনটনে- অভিজাতের রাজনীতি জ্ঞান। আমাকে এমনভাবে বলতেন, তাতে আমার মধ্যে অনুপ্রেরণা জাগত। তিনি আমাকে লারকানায় ঘুরিয়ে আনতেন।

প্রাচীন মন্দির, জাঁকজমকপূর্ণ বাড়ী, আমাদের সভ্যতার কীর্তি দেখাতেন এবং বলতেন, “রাজনীতি হচ্ছে একটি মন্দির বা ভবন নির্মাণের মত” তিনি আরো বলতেন যে, রাজনীতি সঙ্গীত রচনার মত অথবা কবিতা লেখার মত। তিনি ব্রাহমা, মাইকেল্যাঞ্জেলো’র কথা বলতেন। আমার মা ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন। তিনি এসেছিলেন দরিদ্র পরিবার হতে এবং অন্যান্য লোকের দরিদ্র তাকে পীড়িত করতো। তিনি বার বার শুধু বলতেন, “আমাদেরকে দরিদ্রের প্রতি যত্নবান হতে হবে, দরিদ্রদের সাহায্য করতে হবে; দরিদ্রের পৃথিবীতে বাঁচতে দিতে হবে ইত্যাদি।

আমি যখন আমেরিকা গেলাম, তার এসব কথা আমার কানে বাজতো। আমি একজন সংস্কারবাদী হলাম। আমি আমেরিকায় ইউনিভার্সিটি অব ক্যালফোর্নিয়া’য় পড়াশুনা করতে গিয়েছিলাম, যেখানে আন্তর্জাতিক আইনের একজন বিখ্যাত জরিস্ট পড়াতেন। আমি আন্তর্জাতিক আইনে আমার ডিগ্রি নিতে চেয়েছিলাম। তখন যুগটা ছিল ম্যাকাথিজমের। কমিউনিষ্ট অনুসন্ধানের সময় আমার ইচ্ছা উবে গেল। সানসেট বুলভার্ড থেকে, লাল নেইল পলিশ করা মেয়েদের থেকে দূরে থাকার জন্যে আমি ম্যাক্সওয়েল স্ট্রীটে নিগ্রোদের সাথে বসবাস শুরু করলাম।

এক সপ্তাহ, এক মাস। ওদের সাথে আমার ভাল লাগলো- তাদের মাঝে কৃত্রিমতা নেই। তারা জানতো কি করে হাসতে হয় আমি যখন স্যান ডিয়েগোতে গেলাম, একটা হোটেলে থাকার জায়গা পেলাম না, কারণ তামাটে চামড়ার রং এ আমাকে একজন মেক্সিকানের মতই দেখতে। এরপর আমি ইংল্যান্ড গেলাম। তখন আলজিরিয়ার বিপ্লবের সময়। আলজিরীয়দের পক্ষ নিলাম আমি। কিন্তু ১০ নং ডাউনিং স্ট্রীটের সামনে আমি শ্লোগান দিতে যেতাম না। হয়তো আমি কিছুটা লাজুক ছিলাম। জনতার মধ্যে মিশে যেতে আমি কখনো পছন্দ করতাম না, বিক্ষোভে অংশ নিতাম না। আমি সবসময় লেখার মাধ্যমে আলোচনাকে প্রধান্য দিয়েছি, রাজনীতির খেলায় সংগ্রাম করতে পছন্দ করেছি। এটা অনেক বুদ্ধিদীপ্ত এবং পরিশীলিত।

রাজনীতিবিদ আহমদ রাজা কাসুরিকে হত্যার দায়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর বিচার শুরু হয় ১৯৭৭ সালের ২৪ অক্টোবর। এর আগে সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জিয়াউল হক। ১৯৭৯ সালে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

রাজনীতিবিদ আহমদ রাজা কাসুরিকে হত্যার দায়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর বিচার শুরু হয় ১৯৭৭ সালের ২৪ অক্টোবর। এর আগে সামরিক আইন জারি করে ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জিয়াউল হক। ১৯৭৯ সালে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

ওরিয়ানা ফালাচি : আমার শেষ প্রশ্ন মিঃ প্রেসিডেন্ট। এই নির্দয় প্রশ্নের জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন। আপনি কি ক্ষমতায় থাকতে পারবেন বলে মনে করেন?

জুলফিকার আলী ভূট্টো : জবাবটা এভাবে দেই। আমি আগামীকালই শেষ হয়ে যেতে পারি। কিন্তু এযাবত যারা পাকিস্তান শাসন করেছে আমি তাদের যে কারো চেয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকবো বলেই মনে করি। প্রথমতঃ আমি স্বাস্থ্যবান ও শক্তিতে পরিপূর্ণ- আমি কাজ করতে পারি, এমনকি দৈনিক ১৮ ঘন্টা কাজ করি। দ্বিতীয়তঃ আমি এখনো তরুণ- আমার বয়স বড়জোর চুয়াল্লিশ, মিসেস গান্ধীর চেয়ে দশ বছরের ছোট। তৃতীয়তঃ আমি জানি, আমি কি চাই। আমিই তৃতীয় বিশ্বের একমাত্র নেতা যে দু’টি বৃহৎ শক্তির বিরোধিতা সত্ত্বেও রাজনীতিতে ফিরে এসেছে।

১৯৬৬সালে আমাকে বিপদগ্রস্ত দেখে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই খুশি হয়েছিল। আমি যে বিপদ অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছি, তার কারণ আমি এই পেশার মৌলিক নীতি জানি। সে নীতিটি কি? রাজনীতিতে আপনাকে কখনো কখনো এমন ভাব করতে হয়, যাতে অন্যেরা বিশ্বাস করে যে, একমাত্র তারাই বুদ্ধিমান। কিন্তু এটা করতে একটু হালকা এবং শিথিল অঙ্গুলি থাকতে হবে এবং…..। আপনি কি কখনো পাখীকে তার বাসায় ডিমের উপর তা দিতে দেখেছেন। একজন রাজনীতিবিদের সেই হালকা আঙ্গুল পাখীর নীচের ডিমগুলো সরিয়ে আনার যোগ্যতা থাকতে হবে। একটি একটি করে। যাতে পাখীটি কিছুতেই টের না পায়।

(করাচী, এপ্রিল ১৯৭২)

লেখক : সম্পাদক, প্রেসবার্তাডটকম