সাংবাদিকতা : অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

Saturday, 23/11/2013 @ 10:01 pm

:: সাখাওয়াত হোসেন ::

newsmediaঅর্থনৈতিক প্রতিবেদক কিংবা অর্থনৈতিক সংবাদদাতা এখন নতুন কিছু নয়। প্রতিটি হাউজেই রয়েছে এই পদবীর সাংবাদিক। তারা অন্য সব সাংবাদিকের মতো সংবাদ সংগ্রহ করেন এবং তা সংবাদ প্রকাশ করেন। বড় জাতীয় দৈনিকগুলো থেকে শুরু করে ৮ কিংবা ১২ পৃষ্ঠার একটি পত্রিকায় স্বাভাবিকভাবেই এই একটি সেক্টরের জন্য আলাদা একটি পাতাই রাখা হয়। মালিক পক্ষের দিক থেকে এই পাতাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। আর একটু ভেতরে বিবেচনা করলে এই একটি বিটকে সংবাদ পত্রের প্রাণই বলা যায়।

প্রশ্ন থাকতে পারে, যদি সংবাদপত্রের প্রাণ হয়ে থাকে অর্থনৈতিক বিট তাহলে এই সম্পর্কিত সংবাদ কেন প্রতিদিন লীড বা প্রধান শিরোনাম হয় না। কেন রাজনৈতিক প্রতিবেদন দিয়ে প্রতিদিন দেশের প্রধান সংবাদপত্রগুলো প্রধান শিরোনাম করে থাকে? প্রাণ বলার অর্থ এই না যে রাজনৈতিক বিট কম গুরুত্বপূর্ণ।

আমি প্রাণ বলতে পত্রিকার আয়ের দিকটিকে বোঝাতে চাইছি। আমার জানা মতে, প্রতিটি বড় হাউজেই এই একটি বীটে কম হলেও ৪ থেকে ৫ জন সাংবাদিক রয়েছেন। যারা শুধু দেশের অর্থনৈতিক অবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করেন।

অর্থনৈতিক বিটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছে- বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্লানিং কমিশন, পুঁজিবাজার, বিজনেস বডি, বীমা, বিনিয়োগ বোর্ড, অর্থমন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভিন্ন গবেষনা সংস্থা ইত্যাদি।

তবে পত্রিকাগুলোতে অর্থনৈতিক বিট বলতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বানিজ্যিক ব্যাংক, প্লানিং কমিশন, পোশাক শিল্প, অর্থমন্ত্রণালয়, পুঁজিবাজার ও বীমা, বিনিয়োগ বোর্ডকেই গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এবং এই প্রতিটি বিটের জন্য একজন করে সাংবাদিক থাকে। তারা সবাই তাদের নিজেদের সেক্টরে দক্ষ। আর দক্ষতার বদৌলতেই প্রতিদিন অর্থনৈতিক সেক্টরগুলোর সঠিক তথ্য পৌছে যায় পাঠকের কাছে।

পত্রিকার প্রাণ বলেছি যে অর্থে তা আরো একটু স্পষ্ট করা যেতে পারে। পত্রিকার মালিক সাংবাদিক নিয়োগ করেন। সাংবাদিকরা কাজ করে মাস শেষে বেতন পান। কিন্ত যিনি মালিক তাকে কে বেতন দেবে। বলতে পারেন, তার তো টাকা আছে, তার কেন বেতন লাগবে। একটি প্রবাদ বাক্য আছে, বসে বসে খেলে নাকি রাজার ধনও ফুরিয়ে যায়। যদি মালিকের সম্পদ ফুরিয়ে যায় তাহলে সাংবাদিকদের বেতন দেবেন কিভাবে আর সংবাদপত্রই বা প্রকাশ করবেন কিভাবে?

প্রচারের প্রসার। আরো একটি প্রবাদ বাক্য। এই বাক্যের কারণেই হয়তো বিজ্ঞাপনেরর জম্ম হয়েছে। আর আপনার পণ্যের বিজ্ঞাপনেরর জন্য প্রয়োজন দ্রুত কার্যকর বা দ্রুত প্রচলন ক্ষমতা সম্পন্ন একটি বস্তুর। যা মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার করবে। আর এর একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে টিভি বিজ্ঞাপন আর সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপন। এই বিজ্ঞাপনের পুরো বিষয়টি সম্পৃক্ত অর্থনীতির সঙ্গে।

আপনি রাজনৈতিক বিটের একজন সাংবাদিককে সহসায় বলতে পারবেন না, আজ ওমুক পণ্যের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান আছে সেটা কাভার করতে। সে সহজ উত্তর দেবে, অর্থনৈতিক বিটের কাজ এটা। আর পত্রিকার মালিকের মূল আয়ই হচ্ছে এই বিজ্ঞাপন। প্রচার ও প্রসারে পণ্যের প্রচার করার জন্যই আলাদা করে এই পাতাটির জম্ম।

এখন অর্থনৈতিক বিট নিয়ে আসি। কিভাবে করবেন এই বিটে কাজ। এজন্য যে আপনাকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স, অনার্স কিংবা ডিগ্রি অর্জন করতে হবে তা নয়। আপনাকে ঠিক বুঝে নিতে হবে এ সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ ট্রার্ম গুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষেত্রে সুদের স্প্রেড বাড়লে কি হবে, কলমানি মার্কেট কি, ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার মানে কি, মন্দা ঋণ বাড়লে ব্যাংকের কি ক্ষতি, খেলাপী ঋণ হয় কিভাবে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকের জন্য সময় সময় যে সব নোটিশ জারি করা হয় সেগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে। ব্যাংকিং সেক্টরে এই বিষয়গুলোকেই বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।

আর পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে বলে রাখা ভালো যে, আগে পত্রিকা হাউজগুলোতে এই বিটের জন্য আলাদা কোনো সাংবাদিক রাখা হতো না। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংক বিট যে সাংবাদিক করতো সেই সাংবাদিকই পুঁজিবাজার বিটের জন্য নিয়োজিত থাকতো। এখন অবশ্য প্রেক্ষাপট ভিন্ন। সব হাউজগুলোতেই এখন পুঁজিবাজারের জন্য ১জন নয় কোনো কোনো হাউজে ২জনও আছে। শুধু এই পুঁজিবাজারের জন্য। এখানে কি কি বিষয় জানা প্রয়োজন। অনেকেই আছেন এই বাজার সম্পর্কে ধারনা নিতে আগ্রহী, আবার অনেকেই এই সেক্টরটাকে ভয়ই পান।

আমার মতে পুঁজিবাজার হচ্ছে পত্রিকার সব বিটের মধ্যে একমাত্র বিট যে বিটে প্রতিদিন নতুন সংবাদ তৈরি হয়। শুক্রবারও একটি হয় সাপ্তাহিক পুঁজিবাজার। আর শনিবার যদি কারো বিশেষ কিছু থাকে। এছাড়া রোববার থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিদিনই নতুন নতুন নিউজ। কিভাবে? প্রতিদিন লেনদেনে প্রতিদিন নিউজ। হয় সূচক বাড়ছে না হয় সূচক কমছে। এটা গদবাধা নিউজ।

কিন্ত স্পেশালের একটি চাপ থাকেই। হোক সেটা পুঁজিবাজার কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক, কিংবা রাজনীতি। পুঁজিবাজারের স্পেশালের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোর প্রতি নজর রাখা যেতে পারে সেগুলো হচ্ছে-সূচকের উত্থান-পতন কিভাবে হয়, লেনদেনের হালচাল, কোম্পানির ক্যাটাগরি, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন, মূল্য সংবেদনশীল তথ্য, কোম্পানির পিই অনুপাত, ইপিএস, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সময় সময় নির্দেশনা ইত্যাদি।

এগুলোর উপর ভিত্তি করেই মূলত পুঁজিবাজারের স্পেশালগুলো দাঁড় করানো হয়ে থাকে। আর বাকি যে বিটগুলো আছে এরমধ্যে এনবিআর, প্লানিং কমিশনের জন্য আলাদা রিপোর্টার রাখা হয়। এছাড়া বীমা, ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর কমম্বাইন্ড করে পরিচালনা করা হয়।

আর অর্থমন্ত্রণালয় যারা করেন তাদের জন্য আলাদা একটি এক্রিডেশন কার্ড থাকে। তারা সেখান থেকে সময় সময় অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য, বিভিন্ন বিষয়ে অর্থমন্ত্রনালয় ও অর্থমন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো চিঠিপত্রের সূত্রে নিউজ করে থাকেন।

এই মূলত অর্থনীতি। আর একটি কাজ আছে যা বিজ্ঞাপন থেকে নির্দেশনা থাকে। বিশেষ ব্যাক্তির ইন্টারভিউ, বিশেষ পণ্যের ব্যাপারে গুরুত্ব দেয়া, পাতায় বিজ্ঞাপন বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রেস বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা। এই কাজগুলো মূলত অর্থনৈতিক বিটের কার্যতালিকায় থাকে।

লেখক: সাংবাদিক, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ।