কোর্ট রিপোর্টিং ও সংবাদপত্র বিষয়ক আইন

Monday, 08/07/2013 @ 2:30 pm

অ্যাডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান ::

newsmediaজনমত গঠনে সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের প্রভাব সবচেয়ে বেশি, তবুও সাংবাদিকতাকে একটি ঝুকিপূর্ণ পেশা ও সংবাদপত্রকে একটি ঝুঁকিবহুল শিল্পের নাম বলা হয়। কেননা সাংবাদিক এবং সংবাদপত্র হচ্ছে গোপনীয়তার শত্রু। যেখানেই সমাজ বিরোর্ধী দুর্নীতিবাজ স্বার্থন্বেষী অশুভ চক্রের ষড়যন্ত্র, সেখানেই সাংবাদিক তৎপর হন জানমালকে বাজি রেখে। স্বাধীনতা-স্বার্বভেীমত্ব, জাতীয় স্বার্থ মানবাধিকার উন্নয়নে ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণে সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের ভুমিকা সবচেয়ে বেশী। এজন্য প্রবন্ধকার প্রতিটি সাংবাদিক বন্ধুদের একজন মানবাধিকার কর্মী মনে করেন। যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সবচেয়ে বেশি সেখানে গনতন্ত্র তত বেশি স্বচ্ছ। কেননা স্বাধীন সংবাদপত্র ও স্বৈরাচার একসাথে চলতে পারেনা। স্বাধীনতা এমন একটি অধিকার যা কখনো দায়িত্বশীলতার সীমা অতিক্রম করতে পারেনা। সংবাদকর্মীদের স্বাধীনতার সীমা কোথায় টানা হবে সে সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভের প্রয়াস চালাতে হবে। তবে বস্তুনিষ্ঠ, সত্য সংবাদ জাতীয় স্বার্থে প্রকাশ করার অধিকার অলংঘনীয় হওয়া চাই। একে পরোক্ষ সেন্সরশীপ,প্রেস এডভাইজ বা আর্থিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্থ হবে। স্বাধীন সাংবাদিকতার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতার সাংবাদিকতা বাঞ্চনীয়। প্রেস‘ল বা সংবাদ বিষয়ক আইন সে সমস্ত আইন সমুহকে বলে, যে সকল আইন দ্বারা সাংবাদিক,সংবাদপত্র,ছাপাখানা এবং এদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে।

প্রেস কাউন্সিল আইন বলতে বুঝায় সম্পাদক, সম্পাদকীয় লেখক, সংবাদ সম্পাদক, উপ-সম্পাদক, ফিচার লেখক, রিপোর্টার, কপি পরীক্ষক, কার্টুনিস্ট, আলোকচিত্রী, লিপি বিশারদ, প্র“পরিডার প্রভৃতি সাংবাদিক শ্রেণীভূক্ত। আমাদের দেশে সম্পূর্ণরূপে ঝুকিমুক্ত সংবাদপত্র কল্পনা করা যায়না।এখানে সংবাদ কর্মী কিংবা সংবাদপত্র যাই লিখুকনা কেন তাকে চোখ, কান সজাগ রাখতে হয় পেছনের দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখতে হয়। প্রচলিত আইনে তিনি কোন বিপদে পড়ছেন কিনা। সাদা পোশাকে সরকারী এজেন্সী তাকে ধরে নিয়ে বিচারের সম্মুখীন করার পুর্বেই আটকাদেশ দিতে পারে কিংবা সমন ,ওয়ারেন্ট তার মাথায় ঝুলতে পারে,পত্রিকার ডিক্লারেশন কেন বন্ধ করে দেওয়া হবেনা মর্মে জরুরী শো কজ জারী করা হতে পারে। এজন্য একজন সাংবাদিক ও সংবাদপত্র সংশ্লিষ্টদের সাংবাদিকতা এবং সংবাদ বিষয়ক আইন সম্পর্কে ভালো জ্ঞান থাকা চাই । নইলে একজনের সামান্য অসতর্কতার জন্য একটি পত্রিকার প্রতিবেদক, সম্পাদক, প্রকাশক সহ গোটা সংবাদ পরিবারই বিপদগ্রস্থ হতে পারেন।

তাই আইন সংবাদ কর্মীকে কতটুকু স্বার্ধীনতা দিয়েছে কিংবা আইন আদালত তার অধিকার কতটুকু সংরক্ষণ করে সে সম্পর্কে তাকে অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হতে হয়। একদিকে তাকে আইন সম্পর্কে সজাগ থাকতে হয়, অন্যদিকে সচেতন থাকতে হয় পাঠকের অনুসন্ধিৎসা সম্পর্কে । রিপোর্টারকে জানতে হয় কিসে জনশান্তি বিনাশ হয়, কিসে মানহানি হয় এবং আদালত অবমাননার মতো অপরাধ হতে পারে। সর্বাত্বক আইন সম্মত বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন প্রস্তুতে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হয় । সাংবাদিক ও সংবাদপত্রকে যে সকল অপরাধের শাস্তির মুখোমুখি হতে পারে সেগুলো হচ্ছে –
১। মানহানি ২। রাস্ট্রদ্রোহ ৩। অশ্লীলতা ৪। গণশান্তি বিনাশ ৫। শ্রেণী শত্রুতা বৃদ্ধি ৬। ধর্ম বিশ্বাসে আঘাত ৭। নির্বাচন সম্পর্কে মিথ্যা বিবৃতি ৮। আদালত অবমাননা। ৯। সংসদ অবমাননা ইত্যাদি।

আমাদের দেশে সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রকে যে সকল আইনদ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা হয় সেগুলো নিুরূপঃ-
১) আদালত অবমাননা আইন,১৯২৬(১৯২৬ এর ১২ নং আইন),
২) বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪
৩) প্রিন্টিং প্রেস এন্ড পাবলিকেশন এ্যাক্ট( ডিক্লারেশন এন্ড রেজিঃ ১৯৭৩)
৪) বাংলাদেশ দন্ডবিধি।
৫) ফৌজদারী কার্যবিধি।
৬) কপি রাইট আইন ।
৭) প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট, ১৯৭৪
৮) অফিসিয়াল সিক্রেট এ্যাক্ট ১৯২৩
৯) পোস্ট অফিস এ্যাক্ট
১০) চিলড্রেন এ্যাক্ট ১৯৭৪
১১) নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩)
১২) বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (৪২ নং আইন)।
১৩) তথ্য অধিকার আইন ২০১১ ইংত্যাদি।
ক) ১৯৬৯ সনের শিল্প সম্পর্ক অধ্যাদেশ
খ) ১৯৬৫ সালের শ্রমিক নিয়োগ(স্থায়ী আদেশ) ইত্যাদি।

কোর্ট রিপোর্টিং:
যেদেশে জনবিষ্ফোরণ প্রধান জাতীয় সমস্যা,অশিক্ষা আর কুশিক্ষা সমাজটাকে করে রেখেছে তামাসাচ্ছন্ন। অর্থনৈতিক চাপ জীবনটাকে করেছে বিপর্যস্থ প্রতিনিয়ত,সেখানে অপরাধ সংঘঠিত হবেই। তাই মানুষ সংঘর্ষে লিপ্ত হবে,ছুটবে আদালতে,শাস্তি যাই হোকনা কেন তার তোয়াক্কা না করেই তারা সামাজিক অপরাধ করে চলেছে। তাই বিবাহ বিচ্ছেদ,যৌতুকের কারণে উদ্ভুত নারকীয় পরিস্থিতি, প্রতিহিংসার জলন্ত উদাহরণ হিসেবে এসিড নিক্ষেপ , হত্যা ,ধর্ষণ, পাচার, রাহাজানি, ছিনতাই এমনকি রাজনৈতিক ঘটনা পর্যন্ত আদালতে গড়াচ্ছে। ফলে বাদীকে ধর্ণা দিতে হচ্ছে আইনজীবীর কাছে, বিবাদী নিজেকে রক্ষার প্রাণপণ চেষ্টায় শক্তিশালী কৌসুলির জোরালো যুক্তি তর্কের উপর নির্ভর করে টাকা ঢালছে অঢেল। এই মামলায় এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কাবু করার প্রয়াসে কৌশল আটছে। আইনের নানা ফাঁকফোকর খুঁজে প্রতিপক্ষ তাকে ক্ষুরধার যুক্তির অবতারণার মাধ্যমে ঘায়েল করে বাঁচতে চাইছে। অপরাধ কিংবা অভিযোগকে মিথ্যা প্রমাণ করতে চাইছে। বিচারক নিরপেক্ষতার মানদন্ড নিয়ে দুই পক্ষের শুনানীর পর সুচিন্তিত রায় ঘোষণা করেছেন। এভাবে নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত প্রতিনিয়ত চলছে আইনি লড়াই। চাঞ্চল্য কর সব মামলার সংবাদ জনগন জানতে চায় তাদের এ খোরাক মিটিয়ে থাকেন একজন কোর্ট রিপোর্টার। কোর্ট রিপোর্টিং সাংবাদিকতা একটি ষ্পর্শকাতর এবং ঝুকিপূর্ণ দায়িত্ব। বিচারাধীন মামলার সংবাদ প্রকাশে সাংবাদিককে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হয়। রিপোর্টের কারণে যাতে আদালত অবমাননা, মানহানি না হয়,জনস্বার্থ রক্ষা হয় এসব বিষয়ে কোর্ট রিপোর্টারকে সতর্ক থাকতে হয়। একজন রিপোর্টারকে অত্যন্ত তীর্যক দৃষ্টি নিয়ে আইন আদালতের বিবরণী রচনা ও প্রকাশ করতে হয়। এই কাজে কোন অন্যমনষ্কতা যেকোন রিপোর্টার কিংবা সম্পাদক অথবা খবরের কাগজের মালিককে হয়তো বিপদগ্রস্থ হতে হবে।

মামলার বিবরণ পড়তে যেহেতু পাঠকের আগ্রহ অপরিসীম। সেহেতু যেকোন কোর্ট রিপোর্টারকে একদিকে আইন সম্পর্কে সজাগ থাকতে হয় অপরদিকে সচেতন থাকতে হয় পাঠকের অনুসন্ধিৎসা সম্পর্কে। তার আগ্রহকে মনে রেখে পত্রিকার‘প্রাণ’কে বাঁচিয়ে তাকে রিপোর্ট রচনা করতে হয়। তাই রিপোর্টারকে জানতে হয় কিসে আদালত অবমাননা হতে পারে। বিচারক কোন কারণে ক্ষুদ্ধ হতে পারেন। এই সব বিচার ও প্রাসঙ্গিক খুটিনাটি সম্পর্কে সচেতন থেকে কলমে যে রিপোর্ট রচনা করা যায় তাই হয় সার্থক ও আইন সম্মত। সুতরাং এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কোর্ট রিপোর্টিং এর গুরুত্ব আমাদের দেশে সাংবাদিকতায় অপরিসীম এবং ঝুকিপূর্ণ হলেও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
আমাদের দেশের মানুষ প্রচলিত আইন,শাস্তি সম্পর্কে বিস্তারিত অবগত নন। জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্যও কোর্ট রিপোর্টিং প্রয়োজন। রিপোর্টারকে সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে এখানে সংবাদ পরিবেশন ও অপরাধ নির্দেশক হিসেবে কাজ করতে হয় ।

এক সময় কোর্ট রিপোটিং নিষিদ্ধ ছিল। পর্যায়ক্রমে যুগের চাহিদার কারণে সর্বপ্রথম বৃটেনের হাউজ অব কমন্স আদালত বার্তা সম্পর্কিত একটি নতুন আইন পাশ করেছিল। এই আইনের বলে বিচারকগণ আদালত বিবরণীর যে অংশ রিপোর্ট করতে নিষেধ এবং যে বিচার গোপনে হবে,সে গুলোর বিরুদ্ধে আপীল করা যাবে।

চার বছর সংগ্রাম চালিয়ে যাবার পর বৃটিশ সাংবাদিকগণ এই অধিকার প্রতিষ্টা করেছিলেন। ওল্ড বেইলি পত্রিকার আদালত বার্তা পরিবেশনে টিম ক্রুক বৃটেনের তিনটি বিভাগীয় আদালতের এবং ইউরোপের তিনটি আদালতের বিধিনিষেধ সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ করে এবং এ সম্পর্কে প্রচারাভিযান শুরু করেন। এ ব্যাপারে তিনি নাগরিক অধিকার সম্পর্কিত জাতীয় আইনজীবী সমিতি, সাংবাদিক ইউনিয়ন(এন ইউজে), কেন্দ্রীয় ফৌজদারী আদালত, সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং বৃটিশ সংবাদপত্র লিন্ড এর সমর্থন আর্থিক সহযোগিতা লাভ করেন।
ক্রুক বলেছেন এই অভিযানের সাফল্যে আমি অভিভূত। তবে আমি কিছুটা সন্ধিহান এইজন্য যে,লর্ড গ্রীক, জাস্টিস লর্ড লেইন এই ব্যাপারে আপীল কোর্টকেই চূড়ান্ত রায় দেওয়ার ক্ষমতা প্রদানের জন্য লবিং করছিলেন যাতে বিষয়টি প্রয়োজনে হাউজ অব লর্ডসে না যেতে পারে। কিন্তু আমি(ক্রুক) এমন কোন আপীলের কথা জানিনা যাতে আপীল কোর্ট চূড়ান্ত রায় দেওয়ার অধিকারী এবং তা হাউজ অব লডর্সে পাঠানো হয়না ।

অন্যদিকে সানিস্টিক জেনারেল স্যার প্যাট্টিক ম্যাথু কমন্স সভায় বলেছেন কোর্ট রিপোটির্ং ২৪ ঘন্টার মধ্যে হওয়া বাঞ্চনীয়। রিপোর্টাররা তার কথার সূত্র ধরে বলেছেন- “আপীলই দ্রুত হওয়া উচিৎ অন্যতায় খবর বাসী হয়ে গেলে রিপোর্ট করার অর্থ হয়না”।
বাংলাদেশ দীর্ঘ দুইশ বছর বৃটিশ উপনিবেশ হিসেবে বৃটিশের শাসনাধীন ছিল। সেই সুবাধে বৃটিশ আইনকে আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে এখনো বহন করে আসছি। বৃটিশ আইনের ভিত্তি হচেছ “ রাজা কোন অন্যায় করতে পারেনা”। আদালত রাজার পক্ষে হয়ে (বর্তমানে সরকারের পক্ষ হয়ে) বিচার করে। ফলে ধরে নিতে হবে আদালত কোন অন্যায় করেনি। অনেক সময় দেখা যায় একই মামলায় ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট যে রায় দিয়েছেন,হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন ভিন্ন। সুপ্রীমকোর্র্টও পৃথক রায় দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও বলা যাবেনা কোন আদালত ভুল বা অন্যায় রায় দিয়েছেন। প্রতিটি কোর্ট তার নিজ বুদ্ধি এবং বিবেচনায় রায় দিয়েছেন। তাই কোন কোর্টের রায়কে সমালোচনা করা যাবেনা। অন্য দিকে আমেরিকাসহ পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশে আদালতের রায়কেও সমালোচনা করার রেওয়াজ আছে। সেখানে আদালতের রায়কে সমালোচনা করা হলেও আদালত অবমাননার আইনের মুখোমুখী হতে হয়না।

ইউএস সুপ্রীম কোর্টের রায় এর সমালোচনা:
বিশেষ ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্ত রাষ্টে্রৃর সুপ্রীম কোর্টের রায়ের সমালোচনা করা যায়। সংবাদপত্র প্রকাশিত রায়ের এভাবে সমালোচনা করতে পারে যেমন রায়টি প্রদানের পূর্বে বিচারকগণ কোন কোন বিষয় বিবেচনায় আনেননি, আনলে রায়টি কেমন হতো ইত্যাদি।
বাংলাদেশে কোর্ট রিপোর্টিং এর সময় একজন কোর্ট রিপোর্টারকে শুধুমাত্র আদালত অবমাননা আইনকেই সামনে রাখতে হয়না উপরন্তু তার সামনে থাকে প্রেস এ্যান্ড পাবলিকেশন এ্যাক্ট বিশেষ ক্ষমতা আইন। সর্বোপরি বর্তমান আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উভয় অদৃশ্য বাধা। এসব বাধা এবং আইনকে সামনে রেখেই কোর্ট রিপোর্টারকে কলম ধরতে হয় ।
কোর্ট রিপোর্টিং এর গুরুত্ব:
কোর্ট রিপোর্টিং এর গুরুত্ব সম্পর্কে কিছু বলার আগে বাংলাদেশের স্বার্ধীনতা সংগ্রামের কথা এসে যায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিক আন্দোলনে যে কটি বিষয় বা ইস্যু কাজ করেছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তার মধ্যে অন্যতম। এ ইস্যুটিকে বহন করে স্বাধীনতার সংগ্রামকে বেগবান করতে যারা অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন কয়েকজন রিপোর্টারও। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দৈনিক আজাদ এর তৎকালীন চীপ রিপোর্টার জনাব ফয়েজ আহমদ, তৎকালীন এপিপির রিপোর্টার পিআইবির বর্তমান মহা-পরিচালক বিশিষ্ট সাংবাদিক আমানউল্লাহ, তৎকালীন পাকিস্তান অবজারভার এর চীফ রিপোর্টার শহীদুল হক, জনাব আতাউসসামাদ, কোর্ট রিপোর্টার হুমায়ুন কবীর চৌধুরী, এপিপির মোজাম্মেল হক, পাকিস্তানি আমলের মর্নিং নিউজ এর ডিপি বড়–য়া। তাদের প্রতিদিনের রিপোর্ট পড়ে বাংলাদেশের মানুষ অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক আন্দোলন বেগবান হয়ে ওঠে। আইয়ুব খান রাজনৈতিক মঞ্চ ত্যাগে বাধ্য হয়। অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। পরবর্তীতে স্বাধীনতা আন্দোলন। সফল মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ ।

এছাড়া বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে কোর্ট রিপোর্টিং এর অনেক গুরুত্ব রয়েছে। এদেশের জনবিষ্ফোরণ, অশিক্ষা, কুশিক্ষাসহ আর্থ-সামাজিক কারণে প্রতিনিয়ত অপরাধ ঘটছে ও অপরাধ প্রবনতা বাড়ছে। আইন ও অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা কম। সঠিক কোর্ট রিপোর্টিং এর মাধ্যমে মানুষ আইন ও শাস্তি সম্পর্কে সচেতন হয়। ফলে অপরাধপ্রবণতা কমে। উদাহরণ হিসেবে যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ সম্পর্কিত রিপোর্ট ও পরবর্তী অবস্থা উল্লেখ করা যায়। এছাড়া কোর্ট রিপোর্টিং যেহেতু অধিকাংশ অপরাধ সম্পর্কিত সে কারণে অপরাধের উৎস এবং এর পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সর্বস্তরের মানুষের জানার কৌতুহল অপরিসীম । তারা এ রিপোর্র্টগুলো আগ্রহ নিয়ে পড়ে, ফলে মানুষের পাঠাভ্যাস বাড়ে । উদাহরণ হিসেবে চাঞ্চ্যল্যকর নীহার বানু হত্যা মামলা, রীনা হত্যা মামলা, ইত্যাদির কথা উল্লেখ করা যায়। রাজনৈতিক মামলা সম্পর্কেও মানুষের জানার কৌতুহল অপরিসীম । আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিবরণী এদেশের অধিকাংশ মানুষ হয় নিজে পড়েছে বা অন্যকে দিয়ে পড়িয়ে শুনেছে। এতে সাধারন মানুষের পাঠাভ্যাস বেড়েছে।

কোর্ট এবং কোর্ট এর পরিবেশ:
কোর্ট রিপোর্টে যাবার আগে কোর্ট এবং বাংলাদেশ কোর্টের পরিবেশ সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। কোর্ট একটি প্রাচীনতম প্রতিষ্টান। ন্যায় বিচারের পবিত্র পাদপীঠ, কোর্ট অতীতে ছিল,বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে । অতীতে কোর্টে অর্র্থাৎ কাজীর বিচার সম্পর্কে মানুষের শ্রদ্ধাবোধ ছির অকৃত্রিম। মানুষ বিশ্বাস করতো কোর্ট হচ্ছে ন্যায় বিচারের পাদপীঠ। সর্বস্তরের মানুষ কোর্ট আইনে সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে সচেষ্ট হতো। কোর্ট অঞ্চলে মিথ্যাচার ও দুর্র্নীতি ছিল অকল্পনীয় । কোর্ট পরিবেশের সেই অবস্থা এখন আর নেই । সময়ের সাথে সাথে এর বিস্ময়কর পরিবর্তন এসেছে। এখন মানুষ কোর্টের প্রতি শ্রদ্ধার চেয়ে ভীতির মনোভাবই পোষণ করে বেশি। বৃটিশ এর শাসন আমল থেকেই মানুষ মানুষকে অভিশাপ দেয় মামলায় জড়িয়ে পড়ার জন্য।

কোর্ট অঙ্গনের বর্তমান পরিবেশ সম্পর্কে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিশিষ্ট বিচারক মিঃ গোপাল দাস খোসলা লিখেছেন “যদি মেগাস্থিনিসের প্রেতাত্তা এখন এদেশে সফরে আসতেন তাহলে এদেশের অপরাধী ও মামলার পক্ষগনের চরিত্রহীনতা এবং তারা যে যে মিথ্যাচারে পারদর্শী তা দেখে অবাক হতেন। তিনি শুনতে পেতেন একজন অন্যজনকে বলছেন এবার সত্য কথা বল এটা কোর্ট নয় । তিনি দেখতে পেতেন মানুষ আদালতের প্রতি কত তুচ্ছ সম্মান পোষণ করে, এমনকি সরকারী কর্মকর্তারাও যারা বিচারকার্যে নিয়োজিত তাদের প্রতি কতটা অবমাননাকর মনোভাব পোষণ করে। তিনি জজ ও ম্যাজিষ্ট্রেটদের, উশৃংখল মামলাবাজদের অসম্মানজনক গুঞ্জন ধ্বনির জীর্ণ ও কুৎসিৎ এজলাসে বসা অবস্থায় দেখে হতবাক হয়ে যেতেন, ধুলা ও মাছি, নোংরা মেঝে, ভাঙ্গা চেয়ার টেবিল, ছেড়া ও সিক্ত টেবিল আচ্ছাদনী, সেকেলে ও অপর্যাপ্ত গ্রন্থাগার, অকর্মনা কর্মচারীদের অসংখ্য নথির মধ্যে ঝিমানোই অধিকাংশ আদালতের দৃশ্য। এটা অবশ্যম্ভাবী যে, অপরাধ মোকাদ্দমা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বিচারকার্য হতাশায় পর্যবশিত হচ্ছে। প্রতি বছর শত শত খুনি দন্ড এড়িয়ে যাচ্ছে এবং নির্দোষ মানুষ ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলার ঘঠনাও বিরল নয়। চোর বাটপার, অপহরণকারী, প্রতারকরের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটছে। (জিকে খোসলা আওয়ার জুডিশিয়াল সিস্টেম।)

মিঃ খোসলার এই উক্তির বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় অধুনা বোম্বেতে নির্মিত বানিজ্যিক ছবি গুলোতে। সেখানে একজন পুলিশ অফিসার কোর্টের বিচারকার্যের অসহায়ত্ব দেখে শেষ পর্যন্ত সে নিজ হাতেই আইন তুলে নেয়। তবে লক্ষ্যনীয় হচ্ছে শেষ পর্যন্ত যে পুলিশ অফিসার আইন নিজ হাতে তুলে নিলেন কোর্টের কাছে সে নিজকে সমর্পন করে। কোর্টের অব্যবস্থার কথা তুলে ধরে সমাজের ন্যায় বিচারের প্রতীক এই প্রতিষ্টানের প্রতি সে আনুগত্য প্রকাশ করে। একজন কোর্ট রিপোর্টারের অবশ্যই কোর্টের প্রতি, প্রচলিত আইনের প্রতি অনুগত থাকতেই হবে ।

বাংলাদেশ কোর্টের পরিবেশ সম্পর্কে ২৯ মার্চ ১৯৮৫ সালের সাপ্তাহিক বিচিত্রার এক “ আদালত পাড়ার বিচিত্র পেশা” শীর্ষক প্রচ্ছদ কাহিনীতে দৈনিক বাংলার খন্ডকালীন কোর্ট রিপোর্টার খায়রুল ইসলাম বিস্তারিত প্রতিবেদন লিখেছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন “পেশকার একজন দুঃসাহসী কোর্ট কর্মচারী। লাল শালুর ওপারে হাকিম বসে বিচারকার্য করেন এবং এপারে বসেন পেশকার। দুরত্ব পাঁচ ফুটের অধিক নয়। সন্ধানী দৃষ্টিতে লক্ষ্য করলে হয়ত দেখা যাবে বিচারক একটি ঘুষের মামলা বিচার করছেন। আসামী কাঠগড়ায় দুর্নীতি ও ঘুষের মামলায় অবনত মস্তকে দন্ডায়মান। হাকিম সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করে ঘুষের অভিযোগে যখন আসামীকে দন্ডাদেশ প্রদান করছেন হয়ত ঠিক সেই মুহুর্তেই দেখা যাবে পেশকার মামলার বিবাদী পক্ষের নিকট থেকে ঘুষ গ্রহন করছে। ছোট বড় কারেন্সী নোটে তার পকেট এবং ড্রয়ার পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এই দৃশ্য এজলাশের নিত্য-নৈমত্যিক দৃশ্য। পেশকারকে অসন্তুষ্ট করার অর্থ পৌনঃপৌনিক ভোগান্তি।”

এছাড়া তিনি ভাড়াটে স্বাক্ষী: “শপথপুর্বক মিথ্যা স্বাক্ষ্যদান”, “সেরেস্তাদার ও কোর্ট দারোগা: একই সময়ে ডাবের পানি এবং চা পান অভ্যস্থ” “ভাড়াটে জামিনদার : ট্যাক্সের রশিদ একমাত্র পুজি”, “গেজেটেড অফিসার : সার্টিফিকেট বিক্রির মহাজন” “ক্রিমিনাল ল’ইয়ার বনাম ল’ইয়ার ক্রিমিনাল” “আদালতের টাউট” “মফস্বল আদালতের টাউট : গোমস্তা গিরি যাদের পেশা” “মাহনগরী আদালতের টাউট: মানুষ শিকারই যাদের পেশা ” “নারী টাউট ” ইত্যাদি উপশিরোনামে বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেছেন । কিন্তু এসব লিখে রিপোর্টার বা সম্পাদক আদালত অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হননি। কারণ রিপোর্টার নিজে একজন আইনজ্ঞ, আইন বাঁচিয়েই রিপোর্ট করেছেন। অথচ এই বিচিত্রাই ৯-১-৮১ ইং তারিখে প্রকাশিত “করাচিতে লেনদেন শীর্ষক” একটি প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের একটিমাত্র বাক্যের জন্য আদালত অবমাননার মামলায় জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীকালে আদালত বিচিত্রাকে ক্ষমা করে দয়ে।

উল্লেখিত উদ্বৃতি একজন কোর্ট রিপোর্টারের জানা প্রয়োজন, তার সীমাবদ্ধতা ও সুযোগ সম্পর্কে অবহিত হবার জন্য। একজন আইনজীবীর প্রধান অবলম্বন হচ্ছে আইনের ফাঁক। সে ফাঁক যত সুক্ষই হোকনা কেন তা খোজে বের করে তার মক্কেলকে পার করে আনাই তার কাজ । একজন কোর্ট রিপোর্টার এর বেলায় একই কথা কম বেশী প্রযোজ্য। অর্থাৎ আইনের ফাঁক ফোকর খোঁজেই একজন রিপোর্টারকে এগুতে হয়।

সাংবাদিকতায় কোর্ট রিপোর্টিং:
সাংবাদিক পরিপক্ক হয় কোর্ট এবং স্পোর্টস রিপোর্টিং এর পুর্ব অভিজ্ঞতা নিয়ে । যেকোন রিপোর্টিং এর প্রধান বৈশিষ্টই হল ১) যথার্থ ২) যুক্তিযুক্ত ৩) সংক্ষিপ্ত ৪) ভাবাবেগ বর্জিত ৫) উচ্চভিলাস বর্জিত ৬) পক্ষপাতমুক্ত ৭) তথ্য নির্ভর ৮) তদন্তধর্মী পরামর্শবর্জিত। কিছু রিপোর্টের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে আবেগ অলংকার এবং মন্তব্য রিপোর্টের চাহিদা হলেও কোর্ট রিপোটিংএ উল্লেখিত ৮ টি বৈশিষ্ট্য অবশ্যই থাকতে হবে। সাধারন সংবাদ পরিবেশনের একটি উদ্দেশ্য থাকে। কোর্ট রিপোর্টে উদ্দেশ্য কোন মোটিভেটেট হবেনা। এখানে সব বিষয় সমভাবে তুলে ধরতে হবে। সাধারন রিপোর্টের মত এরও একটা ইন্দ্রিয় থাকবে। পরে সংক্ষিপ্ত আকারে রিপোর্টের বিস্তার ঘটবে। যদি কোর্টে কোন মামলার শুনানী চলতে থাকে তাহলে প্রতিদিনের রিপোর্টে এর প্রতিটি দিকই সমানভাবে তুলে ধরতে হবে যাতে একজন পাঠক সে মামলার শুনানী সংক্রান্ত ধারাবাহিক রিপোর্টের মাঝখান থেকে পড়া শুরু করলেও তিনি যেন একটি রিপোর্র্ট পড়েই পুরা মামলা সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করতে পারেন। আর এজন্যই বলা হয় কোর্ট রিপোর্টিং এর আর এক নাম পরিশ্রম ও নিষ্ঠা।

কোর্ট রিপোর্টিং এর ভিত্তি হচ্ছে সমাজ। কোর্টের প্রতিটি রিপোর্টই হয় ফৌজদারী মামলা বা রীট আবেদনের উপর ভিত্তি করে প্রনীত হয়। ক্রাইম বা অপরাধ মানে হচ্ছে সমাজ বা রাষ্ট্রের কোন বিধি লংঘন । আর রীট হচ্ছে স্বাধীনতার অধিকার,সম্পত্তির অধিকার,জীবনের অধিকার ইত্যাদি। আর একারণেই দেখা যায় দেওয়ানী সংক্রান্ত ঘটনাবলী আদালত সংক্রান্ত রিপোর্টের বিষয় হয়না কারণ সেটা কম বেশী দু পক্ষের মধ্যকার বিষয়, সমাজের নয়। তবে জমিনদারী মামলা বা এ ধরনের অন্যান্য দেওয়ানী মামলা ,যেগুলোর অধিকভাবে সমাজে বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে সেগুলোও কোন কোন সময় আদালত সংক্রান্ত বিষয় হয়ে ওঠে।

প্রায় সবদেশের নাগরিকরা আইনসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়। আইন বইয়ে এবং সরকারের প্রকাশিত গেজেটগুলোতে আইনসমুহ লিপিবদ্ধ থাকে। জনসাধারণ সেগুলো সম্পর্কে বিশদভাবে জানেননা। কিন্তু আইনের ধারণা বলতে যা বোঝায় সেটা হচ্ছে কোন একজনকে এটা সম্বন্ধে এমনকি সর্র্বশেষ আইন প্রসঙ্গে পুরোপুরি জ্ঞান থাকতে হবে। কোন আইন গেজেটে প্রকাশিত হওয়া মাত্রই এ সম্বদ্ধে সরকারের দায়িত্ব শেষ। কাজেই অনুন্নত দেশগুলোতে যেখানে জনসাধারণ শিক্ষিত নয় সেখানে এই আইন বোঝার ব্যাপারে সমস্যার সৃষ্টি হয় । তাই কোর্ট সংক্রান্ত রিপোর্ট রচনার মাধ্যমে আমরা জনগনকে আইন সম্পর্কে কিছু শিক্ষা দান করতে পারি। কিকি কাজ আইনবিরোধী,কিভাবে একটি মামলার বিচারকাজ চলে এবং অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া হয়, সে সম্বদ্ধে আমরা জনগনকে পরিষ্কার একটা ধারণা দিতে পারি।

একজন ব্যক্তি যদি কোন অপরাধের শাস্তির মাত্রা সম্পর্কে জানে তাহলে সে সে ধরণের অপরাধ করার আগে অবশ্যই অনেকভার চিন্তা ভাবনা করবে। ফৌজদারী বিচারের আর একটা উদ্দেশ্যে হচ্ছে সমাজে এই ধরনের অপরাধ বন্ধ করা বা কমানো । হত্যার দায়ে কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানোর মাধ্যমে কি পায়? কিছুই পায়না। কিন্তু তবুও এ ধরনের শাস্তি দানের উদ্দেশ্য হচ্ছে হত্যার শাস্তি কঠোর, এটাই দেখানো। দেখলে বা জানলে অপরাধ প্রবনতা কমে যাবে এটাই সবার ধারণা।

আদালত অবমাননা:
বৃটিশ প্রবর্তিত আইনের ভিত্তি হচ্ছে “রাজা কোন অন্যায় করতে পারেনা”। আদালত রাজার হয়ে তথা সরকারের পক্ষ হয়ে বিচার করে। অনেক সময় দেখা যায় একই মামলায় ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট যে রায় দিয়েছেন, হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন ভিন্ন। সুপ্রীম কোর্টও পৃথক রায় দিয়েছেন। তা সত্বেও বলা যাবেনা কোন আদালত ভুল বা অন্যায় রায় দিয়েছেন। প্রতিটি কোর্ট তার নিজ বুদ্ধি এবং বিবেচনায় রায় দিয়েছেন। তাই কোন কোর্টের রায়কেই সমালোচনা করা যাবেনা। অথচ আমেরিকা সহ আধূনিক বিশ্বের বহু দেশে আদালতের রায়কে সমালোচনা করার অধিকার নিয়ে কথাবার্তা উঠেছে জন স্বার্থে বিচার কার্যের নিরেপেক্ষ ও যুক্তি সংঘত সমালোচনা আদালত অবমাননা নয়। সংবাদপত্র সংবাদ কর্মীকে খেয়াল রাখতে হবে সংশ্লিষ্ট রিপোর্টটি যেন ১) আদালত কে খাটো না করে। ২) বিচারাধীন কোন মামলার রায় প্রদানের ক্ষেত্রে প্রভাব না ফেলে এবং ৩) কোন পক্ষ সম্পর্কেই যেন বেশি বলা না হয়ে যায়। ৪) প্রকাশনাটি বিচারের সঠিক ধারাকে বাধা কিংবা জন মনে যেন পুর্বে ধারণার জন্ম না দেয়।

আদালত অবমাননার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ইচ্ছাকৃতভাবে আদালত অথবা আইন ব্যবস্থাকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা অসম্মান প্রদর্শন করা। এটা এমন কোন আচরণকে বুঝায় যা আইনের কর্তৃত্ব ও ব্যবস্থায় অসম্মান প্রদর্শন করে। অথবা বিচারাধীন কোন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে”।
আদালত অবমাননার অপরাধ নিস্পত্তি করার ইখতিয়ার একমাত্র হাইকোর্ট বিভাগের। তবে অধঃস্থন আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে যদি অবমাননাকর কাজটি দন্ডবিধির অধীনে শাস্তি যোগ্য হয় সে ক্ষেত্রে হাইকোর্ট বিভাগ কেসটি গ্রহন করবেন না। আদালত অবমাননার শাস্তি কারাদন্ড যার মেয়াদ ছয় মাস পর্যন্ত হতে পারে অথবা জরিমানা যার পরিমাণ দুই হাজার টাকা হতে পারে অথবা উভয়ই। ক্ষমা প্রার্থনা করলে অবমাননার আসামীকে মুক্তি দেয়া যায়। আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদ সুপ্রীম কোর্টকে তদন্ত/দন্ডাদেশ সহ প্রয়োজনীয় আদেশ প্রদানের চুড়ান্ত ক্ষমতা দিয়েছে। দন্ডবিধির ১৭২-১৯০, ২২৮ ধারা ও ফৌজদারী কার্যবিধির ৪৭৬, ৪৮০-৪৮৭, ১৯৫ ধারা আদালত অবমাননার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। দেওয়ানী ও ফৌজদারী যে কোন আদালতের কোন আদেশকে অমান্য করাকেও আদালত অবমাননা বলে।

যেসব বিষয়ে আদালত অবমাননা হতে পারে:
ক) বিচারাধীন কোন বিষয়ে মতামত প্রকাশ করা আদালত অবমাননা,
খ) এমন কিছু প্রকাশ করা যা বিচারাধীন কোন মামলার বিষয়কে প্রি-জুডিস বা ক্ষতিগ্রস্থ করে,
গ) এমন কিছু প্রকাশ করা যা আদালতের ফলাফলকে প্রভাবান্বিত করে,
ঘ) বিচারাধীন অভিযুক্ত আসামীকে “নির্দোষ” অথবা “দোষী” মন্তব্য সহকারে সংবাদ পরিবেশন ও ন্যায় বিচারকে বিঘিœত করতে পারে।
ঙ) সংবাদপত্রে অপমানজনক শিরোনাম সহ আসামীর ফটো প্রকাশ অবমাননা।

ব্যতিক্রম:
আদালতের মর্যদা ক্ষুন্ন না করে নিস্পত্তিকৃত মামলা সম্বন্ধে সম্পাদকীয় মন্তব্য অবমাননাকর নহে। মামলা সংক্রান্ত আদলতের কার্যাবলীর কোন কিছু গোপন বা অতিরঞ্জিত না করে ভুল বর্ণনা না দিয়ে যদি সঠিকভাবে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা যায়। তবে ঐ প্রকাশনা আদালত অবমানান কর হবেনা। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সৎ সমালোচনা করা আদালত অবমাননার আওতায় পড়বেনা। রায়ের সৎ ও আইন সম্মত মন্তব্য আদালত অবমাননা নহে। জনস্বার্থে বিচার কার্যের নিরপক্ষে ও যুক্তি সংঘত সমালোচনা আদালত অবমাননা নহে। যখন বিচারকের বিরুদ্ধে অসংঘত উদ্দেশ্য নিয়ে সমালোচনা করা হয় তখন প্রকৃত সমালোচনার গন্ডি অতিক্রম করা হয়।

আমরা এর আগেও দেখেছি যে,আদালত সংক্রান্ত রিপোর্ট বা বিচার সংক্রান্ত রিপোর্ট তৈরি করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই আদালত অবমাননার মত মামলার সুত্রপাত ঘটেছে। আমাদের অবশ্যই জানা থাকা উচিত, কি কি কারণে আদালত অবমাননা হয় বা হতে পারে। উত্তারিধার সুত্রে আমরাই বৃটিশদের প্রথা অনুসরণ করে আসছি এবং বৃটিশদের প্রথা অনুযায়ী আদালতের মর্যদা ও পবিত্রতা আরও সংরক্ষিত। তাই আদালত হলো পুরো বিচার ব্যবস্থার কেন্দ্র বিন্দু। “রাজা কোন ভুল করতে পারেনা” এই অনুশাসন বাক্যটির মধ্যেই বিচার ব্যবস্থার এই ধারণা নিহিত রয়েছে। নির্বাহী বিভাগ, আইন ও বিচার বিভাগ এই রাজাকে ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। কাজেই মূুল উদ্দেশ্য হচ্ছে শুধু বিচারই করোনা বরং পুরো বিশ্বকে দেখাও এখানে বিচার পাওয়া যাচ্ছে।

এ কারনইে আমরা মাঝে মধ্যে দেখি যে,কোন নির্দিষ্ট আদালতে হয়ত সুবিচার পাবেনা মনে করে কখনও কখনও কোন পক্ষ মামলাটি অন্য আদালতে প্রেরণের আবেদন জানায়। এমনকি সে পক্ষ আদালতের বিচারকের সামনে হাজির হয়ে বলতে পারে যে আমি কারণগুলোর জন্য আপনার কাছ থেকে বিচার পাবোনা ।

তবে যেকোনভাবেই হোক অবমাননার অভিযোগ থেকে রেহাই পেতে হলে আদালতের প্রতি সম্মান ও মর্যদা বজায় রাখতে হবে। আদালত অবমাননার দায়ে কারদন্ড বা জরিমানা উভয় দন্ড হতে পারে।

একজন রিপোর্টার যখন আদালত বা বিচার সংক্রান্ত রিপোর্ট লিখবেন তখন তাকে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। রিপোর্টারকে অবশ্যই খেয়াল করতে হবে তার রিপোর্টটি যেন ১) আদালত খাটো না করে ২) বিচারাধীন কোন মামলার রায় প্রদানের ক্ষেত্রে প্রভাব না পড়ে এবং ৩) কোন পক্ষ সম্বন্ধেই যেন বেশি বলা না হয়ে যায়। এমনকি আদলতের বিচারকের নাম উল্লেখ করাও বিধিসম্মত নয়। বিচারকের নাম উল্লেখ করাও একটা আদালত অবমাননা হতে পানে কারণ এটা জানা নেই যে সে রিপোর্টার বিশেষ কোন উদ্দেশ্য বা আদালতের কোন অনিষ্ঠ করার জন্যে বিচারকের নাম উল্লেখ করেছে কিনা।

ভাল উদ্দেশ্য, অজ্ঞানবশত বা খারাপ কোন উদ্দেশ্য না নিয়ে রিপোর্ট লিখলেও অনেক সময় দেখা যায় তা আদালত অবমাননার সামিল হয়ে যায় কারণ রিপোর্ট তৈরির সময় রিপোর্টার এটা ভেবে দেখেননি যে তার রিপোর্ট পাঠকদের মনে কি প্রভাব ফেলবে। এ প্রসঙ্গে আমার প্রবন্ধের সুচনা পর্বে দেওয়া উদাহরণ এর সাথে আরো কয়েকটি উদাহরণ সংযোজন করছি। ১) রাষ্ট্র বনাম আব্দুস সালাম সম্পাদক পাকিস্তান অবজারভার ১০ ডিএলআর ২২৫ ২) রাষ্ট্র বনাম এস ডব্লিউ লকিয়তউল্লাহ, ১০ ডিএলআর ঢাকা ৩০৯ ৩) গ্লোনস বনাম রাষ্ট্র ১৬ ডিএলআর (এসসি) ৫৩৫।

প্রথম ও দ্বিতীয় মামলার বিষয় অভিন্ন। এস ডব্লিউ লকিয়তউল্লাহ নামের বরিশালের একজন আইনজীবী ঢাকা হাইকোর্টে প্রাকটিস করার জন্য চেম্বার পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। পরীক্ষা নেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন হাইকোর্টের দুইজন বিচারক। বরিশালে ফিরে এসে জনাব লকীয়তউল্লাহ পরীক্ষা গ্রহনের পদ্ধতি নিয়ে হাইকোর্টের রেজিষ্ট্রারের কাছে একটা পত্র লেখেন। তিনি পত্রে লেখেন এই পদ্ধতির আওতায় এই বিচারকদের কাছ থেকে কেউই বিচার আশা করতে পারেননা। যদিও পরীক্ষা গ্রহন আদালতের বিষয়ভূক্ত কোন ব্যপার নয় তথাপি বিচারকদ্বয় সম্পর্কে মন্তব্য করায় জনাব লকিয়ত উল্লাহর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। জনাব লকিয়ত উল্লাহ আদালতে হাজির হইয়া দোষ স্বীকার করেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তার ক্ষমা প্রার্থনা মঞ্জুর হয় কিন্তু যেহেতু সেদিন বিকেল ৪ টা বেজে গিয়েছিল এবং বিচারকদ্বয় ওঠতে যাচ্ছিলেন সে আদালতের সভাপতিত্ত্ব কারী বিচারক বললেন আমরা ক্ষমা প্রার্থনা মঞ্জুর করছি তবে রায় দেওয়া হবে আগামীকাল।

মামলার রিপোর্ট পাকিস্থান অবজারবার এ প্রকাশিত হয়। রিপোর্টার তার রিপোর্টে বলেন বিচারকগণ ক্ষমা প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন,আজ জনাব লকিয়ত উল্লাহ খালাস পেতে পারেন। রায় না দেওয়া পর্যন্ত এ কথাটি লিখতে পারেননা। বিচারকরের রায় ঘোষনা করার পুর্বেই একজন রিপোর্টার সে রায় প্রকাশ করতে পারেননা। কাজেই এই রিপোর্ট প্রকাশ করার জন্য অবজারভার পত্রিকার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। সম্প্রতি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় সম্পাদক মাহমুদুর রহমান “চেম্বার জজ মানে ষ্টে আদালত” মর্মে সংবাদ পরিবেশন করেন। আর এজন্য তাঁর বিরুদ্ধে আদালত সম্পর্কে অবমাননার অভিযোগ এনে তাকে ও রিপোর্টার অলি উল্লাহ নোমানকে হাইকোর্ট তলব করে। কিন্তু তারা কোন ক্ষমা না চাওয়ায় তাদের জেল, জরিমানা সাজা হয়। বাংলাদেশে সম্ভবত এটাই প্রথম সংবাদ কর্মীকে আদালত অবমাননার সাজা ভোগ করার নজির।

তৃতীয় মামলাটি হচ্ছে একজন সাবেক আইসিএস এবং তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের আইন সচিব মিঃ স্রেলশন এর বিরুদ্ধে। ১৯৫৮ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসার পরপর তিনি বিভাগীয় সচিবালয় গুলোতে সার্বিক কাঠামো নিয়ে বক্তব্য রাখছিলেন। তিনি বক্তব্যে বলেন মাত্র একটি রীট ছাড়া হাইকোর্ট থেকে ইস্যুকৃত সকল রীটই সুপ্রীমকোর্ট কর্তৃক রদ হয়েছে। তিনি বলেন হাইকোর্ট জানেননা যে মৌলিক অধিকার স্থগিত রাখার পর সে কোন রীট ইস্যু করতে পারেনা।

এটা ছিল একটা পরিস্কার আদালত অবমাননা। যদিও তথ্যগত দিক দিয়ে তিনি সঠিক বলেছিলেন, কারণ লাহোর হাইকোর্ট যেভাবে আইনের ব্যাখ্যা করতো সে অনুযায়ী তারা তাদের রায় প্রদান করতো। কাজেই কোন রায় সম্পর্কে কোন মিথ্যা দুর্নাম দেওয়া সম্ভব ছিলনা। এরপর লাহোর হাইকোর্ট আদালত অবমাননার দায়ে মিঃ স্র্রে­লসনকে দোষী সাভ্যস্থ করেন এবং আপীলের প্রেক্ষিতে সুপ্রীম কোর্ট ও এই রায় বহাল রাখেন। যদিও লাহোর হাইকোর্টের একটিমাত্র রীট ছাড়া আর সকল রীটই রদ করেছিলেন। মিঃ স্লেলসনকে জরিমানা করা হয়। তিনি পাকিস্তান থেকে ইংল্যান্ড চলে যান।

বৃটিশ আইনে আদালতের রায়ের সমালোচনা (গঠনমুলকভাবে) করার ব্যবস্থা রয়েছে তবে আদালতের মোটিভ সম্পর্কে নয়। কিন্তু আজ পর্যন্ত এমন কোন উদাহরণ নেই যে সমালোচনা করার পর তার শাস্তি হয়নাই। একমাত্র মার্কিন ব্যবস্থায় এটা অনুমতি যোগ্য।
কোন একটি রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করার সময় আমরা দেখি যে শূধূমাত্র রায় এরই সমালোচনা করা হয়। ১) বিজ্ঞ বিচারক আইনে কোন ভূল করেছেন ২) পয়েন্টটি উপলব্ধি করতে ব্যার্থ হয়েছেন। ৩) রায়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে ইত্যাদি। কিন্তু এগুলোর ও একটা মাত্রা আছে। যদি এই মাত্রা অতিক্রম করা হয় তাহলে আইনজীবীও আদালত অবমাননার দায়ে দায়ী হতে পারেন।
রাষ্ট্র বনাম এ আর তর্কবাগীশ এবং ডেইলি মনিং নিউজ ১০ ডিএলআর (ঢাকা) ৫৬৮.

জননেতা আব্দু রশিদ তর্কাবাগীশের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, এক বক্তৃতাদানকালে তিনি বলেছিলেন মুসলিম লীগের শাসনামলে বিচারবিভাগ প্রভাবিত ছিল। তার বক্তব্য মর্নিং নিউজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

রাষ্ট্র বনাম শেখ মনি (অপ্রকাশিত) অভিযোগ আনা হয়যে জাতীয় যুবলীগের প্রধান শেখ মনি এক বক্তব্যদানকালে এক পর্যায়ে বলেন— “এই ব্যাক্তিরা আদালতের শাস্তি থেকে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে—-” বহুল প্রচারিত সংবাদ পত্রিকায় এই বক্তব্য প্রকাশিত হয়। অন্যান্য পত্রিকায় এই সংবাদ পরিবেশন করা হয়নাই। এ দিকে শেখ মনি এই বক্তব্যকে এই কারণে অস্বীকার করেন যে অন্যান্য পত্রিকায় এটা প্রকাশিত হয়নি। সংবাদ দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

কাজেই রিপোর্ট লেখার সময়ে বা তা সম্পাদনা করার সময় আমাদেরকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে। ভঙ্গিটা এমন হলে ভাল যেমন: কথিত অপরাধ— , অভিযোগে গ্রেফতার——, অভিযোগে দোষী—-, কথিত হাতেনাতে গ্রেফতার। (এমনকি এটাও বলা যাবেনা যে সে হাতে নাতে গ্রেফতার) এমনকি এটা লেখা উচিত “খুনের দায়ে সে দোষী সাব্যস্থ। আপনাকে লিখতে হবে খুনের অভিযোগে সে দোষী সাব্যস্থ।”

আপনি এমন কোন রিপোর্ট করতে পারেননা যা সামাজিক বিশৃংখলাকে প্ররোচিত করবে এমনকি তা যদি সত্যিও হয়। আমি বলতে চাই আপনার রিপোর্টকে হতে হবে সমাজকে ভিত্তি করে,এর কল্যাণকে ভিত্তি করে।

মানহানি : লিখিত কুৎসা অপবাদ
ঐতিহাসিক কারণে আমাদের সমাজে বৃটিশের অনেক কিছু অনুসরণ করা হয়। আমরা আতœাভিমান এবং সংস্কারে (প্রাইড এবং প্রিজিৃডিস) বিশ্বাস করি। বার্ণাড তার ম্যান অব ডেসটিনি গ্রন্থে বলেছেন- “নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের কাছে তারা হতে পারে বাধা” আইন হচ্ছে একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি। কাজেই মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কারো সম্মানের উপর কলঙ্ক আরোপ করা যাবেনা। মানহানি দন্ড বিধির ৪৯৯ ধারায় বলা হয়েছে ‘—যদি কোন মুখের কথা বা লেখার মাধ্যমে —– কোন ব্যক্তি সম্পর্কে প্রকাশিত কোন মন্তব্যের মাধ্যমে —- ঐ ব্যক্তির সম্মান —- ইত্যাদি।

ইংরেজ লেখকদের মতে লিখিত কুৎসা বা অপবাদ হচ্ছে একজন ব্যক্তি দ্বারা কারো ভাবমুর্তির বিরুদ্ধে ক্ষতিকর কিছু তৃতীয় কারো কাছে তুলে ধরার জন্যে প্রকাশ করবে।’
উদাহরণ : মর্নিং নিউজের খাজা নসরুল্লাহ বনাম হামিদুলহক চেীধূরী ১৫ ডি এল আর (ঢাকা)
মনিং নিউজ লেখে যে, “দেশের অর্থনীতিকে ধবংশের চেষ্টা ভারতের ডাল মিয়া জৈল এর সাথে চুক্তি” দেশের এক কোটি রুপি ক্ষতি। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন সে সময় হামিদুল হক চেীধূরী। এখানে দেখা যাচ্ছে, পত্রিকাটি তদন্তের জন্য কোন আহবান না জানিযে বিষয়টি সম্পর্কে তাদের রায় দিয়ে দিয়েছে এবং সেখানে একজন মন্ত্রী ও তার সম্মানকে জড়িত করেছে।
মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে ও মান হানিকর কিছু বলা উচিত নয়। —–এটা তাদের পরিবারের সদস্য বা অন্যন্য সদস্যদের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে।” এ প্রসঙ্গে ৪৯৯ বাংলাদেশ দন্ড বিধি উল্লেখযোগ্য।

মান হানির বিরুদ্ধে দেওয়ানী ফৌজদারী উভয় পদক্ষেপ গ্রহন করা যায়। দেওয়ানী কার্যবিধি অনুসারে মানহানির জন্য ক্ষতিপুরণ চেয়ে মামলা হতে পারে, যেমনটি জনাব হামিদুল হক চৌধুরী করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে ক্ষতিপুরণ দেওয়া হতে পারে।
হামিদুল হক চৌধুরীকে আদালত ক্ষতি পুরণ দিয়েছিলেন। মান হানি লিখিত কুৎসা বা অপবাদের জন্য দন্ডবিধি অনুসারে কাউকে শাস্তি দেওয়া যেতে পারে। কিছুদিন আগে রিপোর্টার পত্রিকার বিরুদ্ধে চিত্র নায়িকা ববিতার মানহানি মামলা দায়ের করার কথা আপনারা অনেকেই জানেন। পত্রিকাটির এক রিপোর্টে লেখা হয়েছিল যে, “ববিতার বিছানায় পুরুষ” আপনারা জানেন সে সময় ববিতা বিবাহিতা ছিলেন না। এ ক্ষেত্রে বাদী কোন ক্ষতিপুরণ পাবেননা। কিন্তু দোষী ব্যক্তির জন্য জেল বা জরিমানা দন্ড হতে পারে। কাজেই কোন ব্যক্তি সম্পর্কে লিখার আগে রিপোর্টারকে অবশ্যই তার সম্পর্কে আগে জানতে হবে। কোন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে লিখতে হলে রিপোর্টারকে আগে তথ্যগুলো যাচাই করে নিতে হবে। রিপোর্টারের একক মত অন্যজনের মতের চেয়ে ভিন্ন হতে পারে। কাজেই প্রতিবেদকের রিপোর্টের তথ্যের সত্যতা সম্বন্ধে আগে নিশ্চিৎ হতে হবে। এটাকে অবশ্যই সঠিক হতে হবে। যদি এটা তথ্য নির্ভর বা অনুসন্ধান ধর্মী হয় তবে রিপোর্টে অবশ্যই কোন ব্যক্তিকে সরাসরি জড়িত করা যাবেনা। একজন কোর্ট রিপোর্টার এর দেশের প্রচলিত আইন সম্পর্কে সচেতন থাকাই শূধু নয় এটা তার নখদর্পনে থাকতে হবে।

মিথ্যা অপবাদ দিয়ে কারো সম্মানের উপর কলংক আরোপ করা , মানহানি,দন্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় বলা হয়েছে——— যদি কোন মুখের কথা বা লেখার মাধ্যমে কোন ব্যক্তির সম্পর্কে প্রকাশিত কোন মন্তব্যের মাধ্যমে ———- ঐ ব্যক্তির সম্মান নষ্ট করবে অতঃপর সে ব্যক্তি ব্যতিক্রম ক্ষেত্র সমুহ ব্যতীত উক্ত ব্যক্তি মানহানি করেছে বলে গন্য হবে।
দন্ড বিধির ৪৯৯-৫০২ ধারায় মানহানির সংজ্ঞা , বিষয়বস্তু , শাস্তি, ব্যতিক্রম ইত্যাদি উল্লেখ আছে।
মৃত ব্যক্তি সম্পর্কেও মানহানিকর কোন উক্তি করলে তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। মানহানির বিরুদ্ধে দেওয়ানী ও ফেীজদারী উভয় পদক্ষেপেই গ্রহন করা যায়। দেওয়ানী কার্যবিধি অনুসারে মানহানির জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা হতে পারে।

ব্যতিক্রম:
জনমঙ্গলের জন্য সত্য দোষারূপ করণ, জনগনের প্রতি সরকারী কর্মচারীর আচরণ সম্পর্কে সদবিশ্বাসে অভিমত প্রকাশ করা , কোন বিচারালয়ের প্রায় সম্পূর্ণ সত্য কার্য বিবরণীর রিপোর্ট প্রকাশ করা, আদালতের সিদ্ধান্তকৃত মোকদ্দমার দোষ ও গুন বা স্বাক্ষী সমুহের ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করা, গণঅনুষ্টানের গুনাবলী বর্ননা করা, কর্তৃত্ববান ব্যক্তি কর্তৃক অধস্তন ব্যক্তিকে সদবিশ্বাসে তিরস্কার করা, কর্তৃত্ব সম্পন্ন ব্যক্তির নিকট সদ বিশ্বাসে অভিযুক্ত করা, কোন ব্যক্তি কর্তৃক তার বা অন্য কারো স্বার্থ রক্ষার্থে সদ বিশ্বাসে দোষারোপকরণ এবং গণ কল্যাণার্থে কোন ব্যক্তিকে সতর্ক করা ইত্যাদি ৯ টি ক্ষেত্রে মানহানির অপরাধ হবেনা।

মানহানির শাস্তি:
যে ব্যক্তি অন্যকোন ব্যক্তির মানহানি করে সে ব্যক্তি বিনাশ্রম কারাদন্ডে যার মেয়াদ দুই বৎসর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। দেওয়ানী আদালতেও হানহানির উপযুক্ত ক্ষতিপূরনের দাবীতে মানী মামলা করা যায়।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন -২০০০ (সংশোধিত-২০০৩):
উক্ত আইনের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে যে, সংবাদ মাধ্যমে নির্যাতিতা নারী ও শিশুর পরিচয় ব্যাপারে সংগঠিত অপরাধ বা তৎ সম্পর্কে আইনগত কার্যধারায় সংবাদ বা তথ্য বা নাম ঠিকানা বা অন্যবিধ তথ্য কোন সংবাদ হতে বা অন্য কোন সংবাদ মাধ্যমে এমনভাবে প্রকাশ বা পরিবেশন করা যাবে যাতে উক্ত নারী ও শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়। এ বিধান লংঘনের শাস্তি দুই বৎসর কারাদন্ড বা এক লক্ষ টাকা দন্ড বা উভয় দন্ড।

১৯৭৪ সালের শিশু আইনের ৪৬ ধারায় শিশু সম্পর্কিত রিপোর্ট বা ছবি প্রকাশের দন্ড:
যিনি উক্ত আইনের ১৭ ধারার বিধান মতে প্রবেশন অফিসারের রিপোর্ট গোপনীয় বলে গন্য হবে। বিধানবলী লংঘন করে কোন রিপোর্ট বা ছবি প্রকাশ করেন তিনি দুই মাস পর্যন্ত কারাদন্ড বা দুইশত টাকা পর্য›ত অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন। এ ধারার অপরাধ আদালতে কগনিজেবল/গ্রাহ্য মর্মে বিবেচিত হবে।

সংসদ কার্যবিবরণীর উপর রিপোর্ট রচনা:
আইনের উৎস হচ্ছে জাতীয় সংসদ। সুতরাং একজন কোর্ট রিপোর্টারকে সংসদ রিপোর্টিং সম্পর্কেও ভাল জ্ঞান রাখতে হবে। সে কারনে সংসদ রিপোর্টিং এর প্রয়োজনীয় অংশ বর্তমান প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হলো।
রিপোর্টারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে সংসদ বা আইনসভা হচ্ছে প্রথম, এরপর বিচার বিভাগ এবং তারপর নির্বাহী বিভাগ। আইনসভা আইনকে প্রয়োগ করতে পারে, তাই এটা হচ্ছে সর্বোচ্ছ আদালত। বিচার বিভাগের দায়িত্ব হচ্ছে আইনের ব্যাখ্য বিশ্লেষণ করা এবং বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা দেখা। পার্লামেন্ট প্রনীত আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে কিনা তা দেখা। পার্লামেন্ট প্রণীত আইন প্রয়োগ করা হচ্ছে কিনা সে খুটিনাটি বিচার করে দেখা। এজন্যেই যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত প্রধান বিচারপতি মার্শাল বলেছেন ‘‘ আদালত হচ্ছে আইন প্রয়োগের একটি যন্ত্র,এটার অন্য কিছু করার ক্ষমতা নেই।”

সব সময় মনে রাখতে হবে যে আইনবিভাগ হচ্ছে একটি সর্বোচ্ছ আদালত। আর এজন্যই সংসদের ষ্পীকার এর প্রটোকল সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতির আগে সংসদ কার্যাবলীর ওপর ভূল প্রতিবেদন রচনা আইনসভা অবমাননার পর্যায়ে পড়বে।
স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানের ন্যাশনাল এসেম্বলী তার কার্যবিবরণীর উপর ভূল রিপোর্ট সংশোধনের জন্য পত্রিকাগুলোর প্রতি অনেকবারই নোটিশ জারি করেছিলো।

বাংলাদেশ আমলে জনাব মাহমুদ উল্লাহ যখন জাতীয় সংসদের ষ্পীকার ছিলেন তাঁর নামের বানান ভুল লেখার জন্য বাংলাদেশ অবজারবার পত্রিকার প্রতি নোটিশ ইস্যু করেছিলেন।
এ বিষয়ে সবচেয়ে মজাদার ঘটনাটি ঘটেছিল ভারতে। ষাটের দশকে ভারতীয় এক বিধান ষ্পীকার কোন এক অভিযোগে পরিষদের দুজন সদস্যের প্রত্যেককে দুদিনের কারাদন্ড দেন। এরপর সে সদস্য দুজন মুক্তি চেয়ে এলাহাবাদ হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। দুজন বিচারকের সমন্বযে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ মামলা গ্রহন করেন ও ষ্পীকারের আদেশ স্থগিত রাখেন । ষ্পীকার সে দুজন বিচারকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেন এবং সংসদ অবমাননার অভিযোগ আনেন। বিচারক দুজন গ্রেফতার এড়ানোর জন্য সরে পড়েন। পরে লোকসভার ষ্পীকার এবং ভারতের প্রধান বিচারপতির হস্তক্ষেপে বিষয়টির নিস্পত্তি হয়।

সংসদ অবমাননা (Contempt of Parliament ):
আদালতকে বা আদালতের নির্দেশকে ইচ্ছাকৃতভাবে অসম্মানপ্রদর্শন কিংবা হেয় প্রতিপন্ন করাকে আদালত অবমাননা বলে। ঠিক সেভাবে সংসদ অবমাননা বলতে এমন সব আচরণকে বুঝায় যা মহান সংসদের সম্মান, মর্যদাকে ক্ষুন্ন করে এবং এর কাজে বাঁধার সৃষ্টি করে। সংসদ অবমাননার সারার্থে এবং নীতিগতভাবে আদালত অবমাননার মতই। আদালত এর অখন্ডতা, মর্যদা এবং কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য পাহারা দেন। যেকোন তরফ থেকে আদালতের সহজ ন্যায় নীতির গতিকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা সৃষ্টি করা অথবা তৎমর্মে উদ্যোগ গ্রহন করা শাস্তিযোগ্য অপারাধ এবং হাইকোর্ট সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে অবমাননাকারীকে শাস্তি প্রদান করে থাকেন। একইভাবে যদি কোন দিকে থেকে সংসদের ক্ষমতা কিংবা বিশেষ অধিকার ক্ষুন্ন করা হয় বা ভঙ্গ করা হয় অথবা তৎমর্মে উদ্যোগ নেয়া হয়, তবে সংসদ এর ব্যাপারে উপযুক্ত শাস্তির বিধান করতে ক্ষমতাবান। সংসদ একটি আইনপ্রণয়নকারী সংস্থা, (আইনসভা) সুতরাং এর মর্যদা, ক্ষমতা, বিশেষ অধিকার ও কর্তৃত্বকে সুরক্ষা করতে সংসদ অবমাননা একটি দন্ডনীয় অপরাধ। সংসদ অবমাননার দ্বারা এমন কোন কাজ করা অথবা না করা (omission) কে বুঝায় যা সংসদরে কার্যধারায় বাধা সৃষ্টি করে অথবা সংসদ সদস্য বা সংসদের কোন কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে অথবা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঐ ধরণের ফলাফল সৃষ্টি করে তা সংসদ অবমাননার অপরাধ(Mays`s parliamentary practice, page-136)

এ প্রসঙ্গে ইংল্যান্ডের কমন্স সভার সিলেক্ট কমিটির মন্তব্য অত্যন্ত গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ।
“কোন কাজ যদিও প্রকৃত প্রস্তাবে সংসদের কোন সদস্যের বিশেষ অধিকার লংঘন করে না, কিন্তু তাদের কর্তব্য সম্পাদনে বাধা প্রদান করে বা ঐ ধরণের কোন ফলাফল সৃষ্টি করে তবে সে কাজটি আইনসংগত হওয়া সত্বেও সংসদ অবমাননার পর্যায়ে পড়বে।”

সংবাদপত্র কর্তৃক সংসদ অবমাননা:
সংবাদ পত্রের স্বাধীনতা গনতন্ত্রের জন্য একান্ত অপরিহার্য একটি পূর্ব শর্ত। যেখানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নেই সেখানে গনতন্ত্র আশা করা বাতুলতামাত্র। কিন্তু তাই বলতে আদালত অথবা সংসদ অবমাননার বক্তব্য প্রকাশ করার অধিকার সংবাদপত্রকে দেয়া হয়নি।

নিম্নে সংবাদপত্র কর্তৃক সংসদ অবমাননার কতিপয় দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা হলোঃ-
ক) সংসদের কার্যবিবরণী, বিতর্ক বা সংসদ কমিটির কার্যাবলী বা সংসদে কোন সদস্যের বক্তৃতার উপর মিথ্যা, ভিত্তিহীন, আংশিক, ক্ষতিকর ও বিকৃত বিবরণ প্রকাশ করা। যারা এরূপ সংবাদ পরিবেশন করবেন, তারা সংসদ অবমাননার জন্য দায়ী হবেন এবং শাস্তি প্রাপ্ত হবেন। উদাহরণ-১৯৬৭ সনের ২৭ শে মার্চ তারিখে দ্ইুজন সংসদ সদস্য হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকার বিরুদ্ধে স্পীকারের নিকট বিশেষ অধিকার সংক্রান্ত দুইটি নোটিশ প্রদান করে অভিযোগ করেন যে হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকা মার্চ ২৪,১৯৬৭ সংখ্যায় সংসদের কার্যধারার বিকৃত বিবরণী প্রকাশ করে। এতে তাদের একজনের বক্তব্য বিকৃতরূপে ছাপা হয়েছে।

স্পীকার প্রথা অনুযায়ী পত্রিকার সম্পাদককে এই ব্যাপারে তার বক্তব্য প্রদান করতে বলেন। হিন্দুস্থান টাইমস পত্রিকার সম্পাদক ক্ষমা চেয়ে উল্লেখ করেন যে, ভুলবশতঃ উক্ত সংবাদ ছাপা হয়েছিল। সংসদ ঐ ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহন করতঃ নির্দেশ প্রদান করেন যে, উক্ত পত্রিকা সংশ্লিষ্ট সদস্যের বক্তব্য এবং ক্ষমা প্রার্থনা পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করবেন। উক্ত পত্রিকা অনুরূপ আদেশ পালন করেন।
সংসদ সংবাদপত্রের সম্পাদকের নিকট ব্যাখ্যা চাওয়ার পরিবর্তে বিষয়টি সংসদের বিশেষ অধিকার কমিটির নিকট উপস্থাপন করতে পারতেন। সাধারণতঃ সংসদ এর কার্যধারার বিকৃত বিবরণী প্রকাশ করার কারণে সংবাদপত্রের বিরূদ্ধে গুরতর পদক্ষেপ গ্রহন করেন না। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে যেখানে ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়, সেখানে ক্ষমা গ্রহন করে উক্ত ক্ষমা পরবর্তী সংখ্যায় প্রকাশ করার আদেশ দেয়া হয়।

খ) সংসদের বাদ দেয়া কার্যবিবরণী প্রকাশ করা (Publication of Expunged Proceedings):
সংসদের যে কার্যবিবরণী মুছে ফেলবার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা সংসদ অবমাননা। এ প্রসঙ্গে ইন্ডিয়ান সুপ্রীম কোর্ট উল্লেখ করেন যে, স্পীকার কোন সংসদ সদস্যের বক্তৃতার যে অংশ মুছে ফেলবার জন্য নির্দেশ দেন, তা আইনগতঃ ঐ সদস্য কর্তৃক বলা হয়নি বলে ধরে নিতে হবে। মুছে ফেলবার আদেশকৃত বক্তব্যসহ সমস্ত বক্তৃতার উপর রিপোর্ট আইনে বিকৃত (perverted) এবং অবিশ্বস্থ (unfaithful) রিপোর্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। ঐরূপ রিপোর্ট সংবাদপত্রে প্রকাশ করা সংসদের বিশেষ অধিকারের লংঘন করার শামিল।(M.S.M.Sharma V.Srikrisna Sinha,Air 1959)

গ) গোপন অধিবেশনের কার্যবিবরণী প্রকাশ করা ( publication of proceedings of Secret Sessions):
যতক্ষণ পর্যন্ত না বাধা উত্তোলন করা হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সংসদের গোপন অধিবেশনের কার্যবিবরণী অথবা সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা সংসদের বিশেষ অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন।

ঘ) সংসদ কমিটির কোন কার্যবিবরণীর সারাংশ অথবা কমিটির নিকট প্রদত্ত স্বাক্ষ্য অথবা দলিল ইত্যাদির বিষয় কমিটি কর্তৃক সংসদে রিপোর্ট দেওয়ার পুর্বে প্রকাশ করা সংসদ অবমাননা । এ প্রসঙ্গে (Sundarayya case) এ ভারতীয় লোকসভার বিশেষ অধিকার কমিটি উল্লেখ করেন যে,It is in accordance with the Law and practice of the privileges of parliament that while a committee of parliaments is Holding its sittings from day to day,its proceedings should not be published nor any documents or papers which it may have been presented to the committee or the conclusions to which it may have arrived at referred to in the press— it is highly desirable that no person including a member of parliament or press should without proper verification make or publish a statement or comment abouth any matter which is under consideration investigation by a committee of parliament.(Sundarayya case –CPR ILS PP-2-3)

একইভাবে সংসদ কমিটি কর্তৃক কোন খসড়া রিপোর্ট অথবা অনুমোদিত রিপোর্ট সংসদে পেশ করার পুর্বে প্রকাশ করা বিশেষ অধিকার সমুহের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঙ) সংসদের চরিত্র,আচার বা কার্যবিবরণীর উপর আঘাত করে কোন কিছু প্রকাশ করা সংসদ অবমাননা ।

গণশান্তি নামে প্ররোচনা ও রাষ্ট্রদ্রোহ:দন্ড বিধির ১৪১-১৬০ এবং ৫০৫ ফৌজদারী কার্যবিধি এর ১০৮/১৪৪ ধারায় শ্রেণী শত্র“তা ও গণশান্তি নামে প্ররোচনায়, শাস্তির বিধান রয়েছে। দন্ডবিধির ১২৪-ক ও ১২৩ ধারা দুটি রাষ্ট্রদ্রোহমূলক সংবাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। আইন বলে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রতি বিদ্বেষ সৃষ্টি করার অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন, তিন বছর মেয়াদী কারাদন্ড তৎ সংগে অর্থদন্ড হতে পারে। বিদ্বেষ সৃষ্টি বা সৃষ্টির উদ্যোগ না নিয়ে আইন সম্মত উপায়ে সরকারের কার্যকলাপের গঠনমূলক সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধ হবে না।

অশ্লীলতা: দন্ড বিধির ২৯২-২৯৩ ধারার বিধান মতে অশ্লীল প্রকাশনা, প্রকাশ, প্রচার, বিক্রি, আমদানী ইত্যাদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর শাস্তির মেয়াদ তিন মাস পর্যনত, সাথে অর্থ দন্ড বা উভয় দন্ড হতে পারে। কোন ব্যক্তি ২০ বছরের কম ব্যক্তির নিকট অশ্লীল প্রকাশনা বিক্রয়, বিলি করলে ছয় মাস কারাদন্ড, অর্থদন্ড কিংবা উভয় দক্ষ হতে পারে। জনকল্যানের সীমাকে লংঘন না করে ধর্ম বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং শিল্পের উন্নয়নের জন্য যে রচনা নিবেদিত তা যত সংশোধনী হোক না কেন তা অশ্লীল নয়।

নির্বাচন সম্পর্কে মিথ্যা বিবৃতি: দন্ড বিধির ১৭১-ছ ধারায় নির্বাচন সম্পর্কে মিথ্যা বিবৃতি প্রকাশ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। নির্বাচনের ফলকে ব্যহৃত করার জন্য প্রার্থীর ব্যক্তিগত চরিত্র ও আচরনের উপর মিথ্যা কলংক লেপন করার শাস্তি যে কোন পরিমানের অর্থ দন্ড।
সংবাদপত্র কর্মচারীদের চাকুরীর শর্ত বিষয়ক আইন ঃ ১৯৭৪ সালের সংবাদপত্রের কর্মচারীদের চাকুরীর শর্ত বিষয়ক আইনে সংবাদপত্র ও সংবাদপত্র কর্মচারীদের সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। এ আইনের বিধানমতে ১৯৬৯ সালের কর্মচারী সংক্রান্ত বিধানাবলী সংবাদপত্রের কর্মচারীদের উপর প্রযোজ্য হবে। সংবাদ পত্রের কর্মচারীদের উপকারার্থে প্রভিডেন্ড ফান্ড, কাজের সময়, চাকুরীর শর্ত ইত্যাদি উক্ত আইনে নিয়ন্ত্রন হয়। যে সংবাদপত্র সংস্থায় ২০ জন বা ততোধিক কর্মচারী নিযুক্ত আছেন সে সংবাদ সংস্থার ক্ষেত্রে ১৯৬৫ কর্মচারী নিয়োগের অস্থায়ী আদেশ প্রযুক্ত হবে। সাংবাদিক ছাটাইয়ের নিয়মাবলী উক্ত আইনে উলে।লখ আছে যা সাংবাদিক ও সংবাদপত্র মালিককে অবহিত হতে হয়। বর্তমানে সংবাদ পত্র মালিক ও কর্মচারীদের মধ্যে যৌথ চুক্তি যা ওয়েজ বোর্ড নামে অভিহিত তা বাস্তবে প্রয়োগ হতে চলেছে। সংবাদপত্র শিল্প নিয়ন্ত্রনে শিল্প সম্পর্কে আইন ও কারাখানা আইনও প্রযোজ্য হয়ে থাকে। সংবাদ কর্মীদের দেনা পাওনায় মোকদ্দমা শ্রম আদালতে বিচার্য সংবাদ ক্ষেত্রে সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, পন্য বিক্রয় আই, উইলের আইন, কপি রাইট আইন, রেজিষ্ট্রেশান আইনও প্রযোজ্য হয়ে থাকে যা এতো স্বল্প সময়ে আলোচনায় আনা সম্ভব নয়।

সংবাদপত্রের উৎস প্রকাশে সাংবাদিক বাধ্য কিনা: প্রেস কাউন্সিল আইনে সাংবাদিক খবরের উৎস জানাতে বাধ্য নন। এটা শুধু প্রেস কাউন্সিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অন্যত্র সাংবাদিক এ অধিকার ভোগ করেন না। আদালতে মামলা মোকদ্দমায় সাংবাদিকতার তথ্য সূত্রে গোপন রাখতে পারেন না। কারো লেখা প্রকাশ করা বা না করার ব্যাপারে সম্পাদকের অধিকার চুড়ান্ত। তবে প্রকাশিত সংবাদে আহত ব্যক্তির প্রতিবাদ তাকে ছাপাতেই হবে।

সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের বিশেষাধিকার: আমাদের মনে রাখতে হবে প্রচলিত ব্যবস্থায় একজন সাংবাদিক একজন সাধারণ নাগরিকের চেয়ে কোনক্রমেই বেশী সুযোগ পাওয়ার অধিখারী নহেন। একজন সাংবাদিক জনস্বার্থ জড়িত বিষয়ে উপর মতামত পেশ করার অধিকার রাখেন ততক্ষণ যতক্ষন না তিনি স্বচ্ছ ও পক্ষপাতহীন মতামতের সীমা অতিক্রম করেন। অথবা বিদ্ভেষের বশবর্তী হয়ে কিছু না করেন, তবে তার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা দায়ের করা যাবে না।

অজ্ঞতা কিংবা অনুপস্থিতির জন্য পত্রিকায় মালিক, সম্পাদক, প্রকাশক, মুদ্রাকর, রেহাই পাবেন না। তাদের অনুপস্থিতি কিংবা নিষেধ সত্বেও কোন দন্ডনীয় সংবাদ ছাপানো হয়েছে অজুহাতে অপরাধের অভিযোগ থেকে তারা রেহাই পাবেন না।

বিচারালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার: বিচার আদালতে সকল নাগরিকের মত সাংবাদিকেরও প্রবেশাধিকার আছে। তবে আদালত কক্ষে স্থানাভাব হলে বিচারক প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রন করতে পারেন। অফিসিয়াল সিক্রেট এ্যাক্ট অনুযায়ী আদালত বিবাহ বিচ্ছেদের ক্যামেরা ট্রায়েলের সময় আদালত কক্ষে প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে পারেন।

সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের জন্য নীতিমালা: সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের জন্য প্রেস কাউন্সিল কর্তৃক কতিপয় নীতিমালা রয়েছে যা সংশ্লিষ্টদের মেনে চলতে হয়। প্রেস কাউন্সিলের বিচার্য বিষয় ৩ টি যথাক্রমে- (১) সাংবাদিকতার নীতিবহিভুত কাজ (২) জনগনের রুচি বহির্ভূত কাজ ও (৩) পেশাগত অসদাচরন, প্রেস কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত ও রায়, প্রকাশের জন্য কাউন্সিল, সকল সংবাদ পত্রকে নির্দেশ দিতে পারে। ১জন সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতি কিংবা তৎ যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তি প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হন, রাষ্ট্রপতি তাকে মনোয়ন দেন। তারপরে ৩ জন কর্মরত সাংবাদিক, তিন জন সংবাদ সংস্থার সম্পাদক, ৩ জন সংবাদ পত্র ও সংবাদ সংস্থার মালিক বা ব্যবস্থাপক, ৩ জন শিক্ষা, বিজ্ঞান ও কলা সাহিত্য এবং আইনে বিশেষজ্ঞ এবং ২জন সংসদ সদস্য সহ সর্বমোট ১৫জন নিয়ে প্রেস কাউন্সিল গঠিত। প্রেস কাউন্সিলের অভিযোগের তদন্তে দোষী প্রমানিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা সংস্থাকে তিরস্কার, নিন্দা বা হুশিয়ারী শাস্তি দিতে পারে। এর শাস্তির বিরুদ্ধে কোন আপীল নেই।

উপরোল্লেখিত আইন সমুহ ছাড়াও সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেসী এ্যাক্ট, পোষ্ট অফিস এ্যাক্ট, টেলিগ্রাফ এ্যাক্ট, সাক্ষ্য আইন ইত্যাদি প্রযোজ্য হয়। সংবাদ পত্র বিষয়ক আইনের মতো ব্যাপক ও বি¯তৃত বিষয়ে সংবাদ কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। প্রেস ইনিষ্টিটিউটের পাশাপাশি মানবাধিকার আন্দোলন, প্রেস ক্লাব, সংবাদপত্র কর্তৃপক্ষ এব্যাপারে নিয়মিত প্রতিক্ষনের ব্যবস্থাকালে আমাদের সংবাদপত্র শিল্পের মান বহু উন্নত ও আধুনিক হবে। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রেস কাউন্সিলে মামলায় প্রবনতার চাইতে ফৌজদারী আইনে মামলা দায়েরে প্রবনতা সংবাদ কর্মীদের আতংকিত রাখে। বিশেষ করে কোন সংবাদে সরকার ক্ষুব্ধ হলে প্রেস কাউন্সিলে না গিয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইন সহ তাদের হাতে থাকা কঠিন অস্ত্র সমুহ ব্যবহার করে। এটা মুক্ত বুদ্ধি চর্চা ও স্বাধীন সংবাদ পত্রের নীতিমালা বিরোধী। জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষনার ১৯ ধারায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে “প্রত্যেকেরই বাক স্বাধীনতা এবং চিন্তার স্বাধীনতা থাকতে হবে।প্রত্যেকের নিজস্ব মত পোষনে কোন বাধা থাকবে না। এবং যে কোন সংবাদ গ্রহন ও বিতরণ করার বিধি নিষেদহীন অধিকার থাকবে।” বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা সংবাদ ক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হলেও অসংখ্য কালা কানুনের শৃংখলে আবদ্ধ সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র। আমরা কি পারি না সাংবাদিকতা ও সংবাদ পত্র বিষয়ক সকল অভিযোগ অপরাধের বিচারিক আদালতের অধিক্ষেত্র হিসাবে প্রেস কাউন্সিলকে গ্রহন করতে। প্রেস কাউন্সিলকে আরো শক্তিশালী করে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতা বিষয়ক সকল মামলা তার অধীনে নিস্পত্তি হওয়া দরকার। প্রেস কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া কোন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারী অভিযোগ যেন দায়ের না হয় এধরনের একটি রক্ষা কবচ এঝুঁকিপূর্ন পেশার জন্য জররুরী। এব্যাপারে সংবাদকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠন সমুহকে জনমত গঠনে জোড়ালো ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক: আইনজীবি।
সৌজন্যে- bdlawnews.com