যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতা নিয়ে সাংবাদিকতা

Sunday, 07/07/2013 @ 11:56 pm

আনিস আলমগীর ::

anis alamgirসাংবাদিকতায় ‘সংঘাত ও সহিংসতা’ নিয়ে প্রতিবেদন করা আজকের বিশ্বপরিস্থিতিতে সাধারণ ঘটনায় রূপ নিতে যাচ্ছে। যুদ্ধ সাংবাদিকতা বলতে আমরা যেটা বুঝি বা বোঝাতে চাই, সেটাও এর থেকে দূরের কোনো পরিভাষা নয়। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সংঘাত ও সহিংস ঘটনার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে মিডিয়াকর্মীদের আজ প্রায় যুদ্ধক্ষেত্রের সংবাদ সংগ্রহের মতোই কাজ করতে হচ্ছে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে জীবনবাজি রাখছেন কেউ কেউ। প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন তারা। অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছেন পাঠক বা দর্শকদের সবার আগে সংবাদ দেওয়ার জন্য।

বাংলাদেশে অনেক সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বা সংবাদ প্রকাশ করার জন্য নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর দ্বারা আহত বা হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে এখানে যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতার সংবাদ সংগ্রহ করতে কারও মৃত্যু হয়েছে আমার মনে পড়ছে না। অতিসম্প্রতি সরকার ও বিরোধী দলের পরস্পরের প্রতি সহিংস আচরণ, বিরোধী রাজনীতিতে সহিংসতার মাত্রা যে রূপ ধারণ করেছে, তার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের জীবন বিপন্ন হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে ঢাকার শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ডাকা সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনা সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও সামনে নিয়ে এসেছে। সাংবাদিকদের অনেককে সাধারণ ড্রেসের পরিবর্তে বুলেটপ্রুপ জ্যাকেট ও হেলমেট পরে রাজধানীতে সংবাদ সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। সহিংসতা এত জঙ্গি রূপ ধারণ করেছে যে হেফাজতের সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলোতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে পরিচয়পত্র দেখিয়েও সাংবাদিকরা হামলা, নির্যাতন থেকে রক্ষা পাননি। সাংবাদিকরা কে কোন ধরনের, কোন মতের মিডিয়ায় কাজ করেন, সেটাও বিবেচ্য বিষয় ছিল না হামলাকারীদের। নির্বিচারে তারা সাংবাদিকদের পিটিয়েছে। শুধু রাজধানী নয়, হেফাজত তাদের সাম্প্রতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নকালে রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রামেও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার কয়েকজন সাংবাদিককে মারাত্মকভাবে পিটিয়েছে। তাদের ক্যামেরা কেড়ে নিয়েছে।

অনেকে আবার মনে করছেন, মৌলবাদী গোষ্ঠী প্রগতিশীল সাংবাদমাধ্যমকে এবং প্রগতিশীল গোষ্ঠী মৌলবাদী সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের টার্গেট করেও সাম্প্রতিককালে সাংবাদিক নির্যাতনের সংস্কৃতি চালু করেছেন। ব্যাপক অর্থে না হলেও শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চের সংবাদ সংগ্রহেও বিরোধী মতের গণমাধ্যমগুলোর কর্মরত সাংবাদিকরা বাধাপ্রাহপ্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। এতে করে মনে হচ্ছে, স্বাধীনভাবে সব অনুষ্ঠানের সংবাদ সংগ্রহ করা বাংলাদেশের সাংবাদিকদের জন্য দিন দিন আতঙ্কের বিষয় হয়ে উঠছে। কোনো কোনো সাংবাদিক নিজের গায়ে রাজনৈতিক রং লাগানোর কারণেও এই হামলাকারীদের টার্গেট হচ্ছেন, যদিও সাংবাদিকদের গায়ে রাজনৈতিক রং থাকা সাংবাদিকতার নীতিতে পড়ে না। প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক রংও তার গায়ে থাকার কথা নয়।

দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশেও ‘সংঘাত ও সহিংসতা’ নিয়ে রিপোর্ট করা একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ আসে এবং আসতে পারে রাষ্ট্র, মিডিয়া হাউস ও পরিবার- সব দিক থেকেই। তাই সতর্কতা, পূর্বপ্রস্তুতি না থাকলে পুঙ্গুত্ব বরণ বা জীবন বিপন্ন হতে পারে একজন সাংবাদিকের। একজন সাংবাদিককে সংঘাত ও সহিংসতা নিয়ে রিপোর্ট করতে হলে আমি প্রথমেই কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে বলব।

১. ইতিহাস: তিনি যে বিষয়টি কাভার করতে যাচ্ছেন, তার ইতিহাস জানা খুব জরুরি। সংঘাত ও সহিংসতায় জড়িত দেশ, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস না জানলে তিনি কখনোই সঠিক সংবাদ পরিবেশন করতে পারবেন না।

২. পরিবেশ-পরিস্থিতি: পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি সংঘাত ও সহিংসতায় বা যুদ্ধে জড়িত গোষ্ঠীগুলোর মনোভাব ও আচরণ। সাংবাদিকের এবং সংঘাতে লিপ্ত দুই পক্ষের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকাও নির্ভর করছে সে পরিবেশের ওপর।

৩. আইন: আইন কী বলে সেটা সব সময়, সব বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই যেখানে তিনি কাজ করছেন, সেখানকার আইন সম্পর্কে জানতে হবে সাংবাদিককে। জানতে হবে, যে বিষয় নিয়ে তিনি কাজ করছেন, আইনে সে সম্পর্কে কী বলা আছে। সর্বোপরি জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইনগুলো, যা সাংবাদিকের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যেমন দরকার, তেমনি সংঘাতসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর আচরণ ও পরিণতি সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরতেও জানা দরকার।

৪. মিডিয়ার ভুল কোথায়: যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতা নিয়ে রিপোর্ট করতে গেলে মিডিয়া যেসব ভুল করে বসে, সেটা যদি মিডিয়ার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আগে থেকে জানা থাকে, তাহলে তারা সে ভুল করবেন না।

৫. মিডিয়ার কী করণীয়: মিডিয়া যদি জানে যুদ্ধ ও সংঘাতে তার করণীয় কী, তাহলে সহিংসতা কমে আসতে বাধ্য। জনমতের একটি চাপ কাজ করে সংঘাতে জড়িত গোষ্ঠীগুলোর ওপর। সেই জনমত তৈরি করতে মিডিয়ার ভূমিকাই মুখ্য।

ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সেফটি ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত যুদ্ধ-সংঘাতের সংবাদ দিতে গিয়ে ৯৬টি দেশের প্রায় এক হাজার ব্যক্তি খুন হয়েছেন। তার মধ্যে ৯২১ জন পুরুষ আর ৭২ জন নারী। অজ্ঞাতপরিচয় সাতজন। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টসের (সিপিজে) তথ্যমতে, ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আগ্রাসনের পর থেকে পরবর্তী ১০ বছরে শুধু ইরাকেই নিহত হয়েছেন ১৫০ জন সাংবাদিক এবং ৫৪ জন মিডিয়া সহযোগী কর্মচারী। এই সংখ্যা এখনো পর্যন্ত যেকোনো যুদ্ধে নিহত সাংবাদিকদের সংখ্যার চেয়ে বেশি।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন তাদের ২০০৬ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, “সংবাদপত্রের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের খুঁটি। অতএব, সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং কোনো সংবাদপত্রসেবীর বিরুদ্ধে যদি কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, তার বিচারের দায়িত্বও রাষ্ট্রের ওপর বর্তাবে।”

এখানে সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব সুস্পষ্ট করা হয়েছে, যেটি কোনো সাংবাদিক অন্য দেশে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলেও প্রযোজ্য হবে।

সাংবাদিকদের নিরাপত্তার বিষয়ে শুধু রাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব দিয়ে বসে থাকলে হবে না। সংঘাত ও সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নিজেদেরও কিছু বাধ্যবাধকতা পালন করতে হবে। মিডিয়া হাউসের দায়িত্বও রয়েছে এখানে। আমরা প্রথমে সাংবাদিকদের নিজস্ব দায়িত্ব কী কী, সেগুলো দেখি।

রিপোর্টারের নিজের দায়িত্ব
– অবজ্ঞা, অবন্ধুসুলভ বা আগ্রাসী আচরণ করা থেকে বিরত থাকা;
– গুপ্তচরবৃত্তি করা বা সে ধরনের কোনো আচরণ করা থেকে বিরত থাকা;
– যুদ্ধবন্দীসহ যে কাউকে জনসম্মুখে লজ্জা দেওয়া, ছোট করা, অপমান করা থেকে বিরত থাকা বা যারা এটা করছে তাদের উৎসাহ দেওয়া থেকে বিরত থাকা;
– সশস্ত্র সংঘর্ষে বা যুদ্ধে সিভিলিয়ানদের বিরুদ্ধে সহিংসতা উসকে দেওয়া থেকে বিরত থাকা;
– কোনো অবস্থাতেই সন্ত্রাস উসকে না দেওয়া;
– প্রতিবেদককে এটা মনে রাখতে হবে যে, তার প্রতিবেদনের তথ্যের সত্যতা একসময় প্রশ্নের মুখোমুখি হলে তথ্যসূত্র জানাতে বাধ্য হবেন তিনি। সেটা বিশেষ ক্রাইম ট্রাইব্যুনালেও হতে পারে।

সংঘাত-পরিস্থিতিতে রিপোর্টারের আচরণ
– শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কৌশল অবলম্বন করা;
– এমন আচরণ থেকে বিরত থাকা যাতে সাংবাদিককে অবন্ধুসুলভ ও যুধ্যমান মনে না হয়;
– হস্তক্ষেপ না করা;
– ব্যঙ্গপূর্ণ আচরণ থেকে বিরত থাকা।

মনে রাখতে হবে, পাঠক সংবাদপত্রে যা পড়ে বা দর্শক টিভির পর্দায় যা দেখে, সেটাই বিশ্বাস করার প্রবণতা তাদের মধ্যে আছে। সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাই সাংবাদিকদের চূড়ান্ত সতর্কতা ও সততা দরকার। পরিশ্রম দরকার। এই কাজ করতে গিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা এবং জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি প্রায় মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়ায়। সাংবাদিক হিসেবে একজন দেখছেন সংবাদ সংগ্রহে তার অধিকারের বিষয়, আর যিনি নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন তিনি দেখছেন জনগণের জানমালের বিষয়টা। তার কাছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং সংগত কারণ থাকলে সাংবাদিককে বাধা দেওয়ার অধিকার তিনি তখন রাখেন। হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের শাপলা চত্বর ত্যাগ করতে বাধ্য করার সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ভূমিকা সাম্প্রতিককালে অনেকের হয়তো চোখে পড়েছে। শুধু হেফাজতের কর্মীদের দ্বারা নয়, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে কয়েকজন সাংবাদিক র্যা বের হাতেও ওই রাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

সংবাদ সংগ্রহের আরেকটি চ্যালেঞ্জ থাকে ঘটনায় জড়িত পক্ষগুলোর বক্তব্য সমানভাবে তুলে ধরার বিষয়ে। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিক এই পরিস্থিতিতে সুচারুভাবে তার দায়িত্ব পালনে সফল নাও হতে পারেন। তবে সেটাও পাঠক বা দর্শকদের সততার সঙ্গে জানাতে হবে।

মিডিয়ার দায়িত্ব
– সংঘাত, সহিংসতা বা যুদ্ধের সময় মিডিয়ার দায়িত্ব সীমিত থাকা উচিত নয়। তারা তখন শুধু দুই পক্ষের হতাহতের সংখ্যাক তুলে ধরবে এবং ভূমি বা অঞ্চল দখলের খবর দিয়ে দায়িত্ব শেষ করবে- এটা হয় না।
– মিডিয়া মানবিক বিপর্যয়ের সংবাদ তুলে ধরবে অত্যন্ত গঠনমূলক, সৎ, সঠিক ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে। মানবিক বিপর্যয়ের সংবাদগুলো হাইলাইটেড হবে।
– কোনো অজুহাতেই পক্ষপাতদুষ্ট রিপোর্ট করা যাবে না।
– যতটুকু সম্ভব ভালো তদন্ত ও তথ্যের সঠিকতা যাচাই করে রিপোর্ট করতে হবে।
– সন্ত্রাস ও ভয়াবহতাকে মহত্ত্ব দেওয়া যাবে না। মানবিক মূল্যবোধ, মানুষের মর্যাদা তুলে ধরতে হবে বেশি করে।
– যুদ্ধ ও সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে কী ক্ষতি ও মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা আছে, সেদিকে আলোকপাত করতে হবে আগে। মিডিয়া পরোক্ষভাবে সংঘাত/যুদ্ধ বন্ধে জড়িত পক্ষগুলোকে বাধ্য করতে পারে।
– মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তুলে ধরে মিডিয়া সংঘর্ষ, সহিংসতা ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত তৈরিতে সহায়তা করবে। কোনো কোনো রাষ্ট্র তাদের যুদ্ধদুর্বলতা ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়ে সেনাবাহিনী অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে অস্বীকার করে।
– যুদ্ধ, সহিংসতা আর সংঘাতের রিপোর্ট এমন হওয়া চাই, যাতে ১০ বছর পরও রিপোর্টার তার রিপোর্টের পক্ষে অবস্থান নিতে পারেন।

মিডিয়ার সীমাবদ্ধতা
১. শারীরিক, মানসিক, আবেগ ও রাজনৈতিক চাপ;
২. প্রতিদ্বন্দ্বী মিডিয়ার সঙ্গে আগ্রাসী প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া;
৩. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন, চুক্তিসমূহ নিয়ে ধারণা না রাখা;
৪.মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদনের সংবাদমূল্য না দেওয়া।

মিডিয়া ভুল করে কোথায়?
এক. রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো;
দুই. বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হওয়া;
তিন. আন্তর্জাতিক বা দেশীয় নিউজ এজেন্ডা বাস্তবায়ন;
চার. সেল্ফ সেন্সরশিপ;
পাঁচ. সাংবাদিকদের দলীয় সমর্থক হয়ে যাওয়ার প্রবণতা।

প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ
আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই শেয়ার করি। ২০০১ সালে আফগান যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে দু-একবার শুনেছিলাম- তোমার ইনস্যুরেন্স করা আছে? কত টাকার? তেমন পাত্তা দেইনি এসব প্রশ্নের। কিন্তু ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বারবার এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রায় সব সাংবাদিক, সংবাদকর্মীর ইনস্যুরেন্স করা ছিল। তাদের প্রতিষ্ঠানের করা গ্রুপ ইনস্যুরেন্স ছাড়াও ব্যক্তিগত ইনস্যুরেন্স ছিল। আমার কোনো রকম ইনস্যুরেন্স নেই শুনে অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। অনেকে হেসেছেন। অপ্রাসঙ্গিক হলেও এখানে বলি, যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আমার স্যাটেলাইট ফোন নেই দেখেও অনেকে কিছুটা অবাক হয়েছেন। যখন তাদের বললাম, আমি বহন করব কি, আমাদের দেশের একজন রাষ্ট্রপতি [হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ] তার বাড়িতে স্যাটফোন রেখেছেন বলে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র মামলা করেছে- এটা শুনে তারা আরও বিস্মিত হয়েছেন।

যুদ্ধ বা সংঘাত-সহিংসতার সংবাদ সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে সাংবাদিক বা সংবাদকর্মীদের জন্য ইনস্যুরেন্স ও অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন থাকার যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সেটা আমরা সম্প্রতি হেফাজতের কর্মসূচিতে নির্যাতিত সাংবাদিকদের দেখেও অভিজ্ঞতা লাভ করতে পারি। প্রতিষ্ঠান থেকে তারা চিকিৎসার জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়তা পাননি। একজন সাংবাদিককে নাকে মারাত্মক আঘাত পাওয়ায় বিদেশে চিকিৎসাও নিতে হয়েছে নিজের খরচে। একজন নারী সাংবাদিক নির্যাতিত হয়ে চিকিৎসার সুযোগ দূরে থাক, তিনি যে টেলিভিশনে কাজ করেন সেখানে নির্যাতনের খবরটিও ভালো করে সম্প্রচার করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

যারা সংঘাত-সহিংসতার সংবাদ সংগ্রহ করবেন, সেসব রিপোর্টারের জন্য পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তার প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে ভাবতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি কিছুটা নতুন, তাই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও এটা নিয়ে ভাবতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে সাংবাদিকদের জন্য এ-সংক্রান্ত কী কী সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, তা দেখে সাংবাদিক নেতারা এ দেশের জন্য উপযোগী করে তাদের দাবি পেশ করতে পারেন মিডিয়ার মালিক ও সরকারের কাছে। দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার কথা চিন্তা করে প্রতিটি হাউসের উদ্যোগে যদি সম্ভব না হয়, মালিকরা সম্মিলিতভাবেও কোনো ফান্ডের ব্যবস্থা করতে পারেন, যার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া আহত বা নিহত সাংবাদিক ও তাদের পরিবারকে সহায়তা দেয়া যাবে। যেসব প্রতিষ্ঠান সাংবাদিকদের জন্য গ্রুপ ইনস্যুরেন্স করেছে বা করবে, তাদের ইনস্যুরেন্স পলিসিতে স্বাভাবিক মৃত্যু, দায়িত্বরত অবস্থায় মৃত্যু এবং প্রতিপক্ষের দ্বারা হত্যার শিকার- এই বিষয়গুলো পলিসিতে সুস্পষ্ট করতে হবে।

সংঘাত ও সহিংসতায় রক্ষা পেতে সবার জন্য করণীয়
যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতার সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের জন্য বিপদ কোন দিক থেকে আসবে, সেটা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তবে ‘ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সেফটি ইনস্টিটিউশন’সহ অনেক আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন নিরাপত্তা রক্ষায় কয়েকটি করণীয় দিক উল্লেখ করেছেন, যা মেনে চললে হয়তো শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয়ের মাত্রারটা কমিয়ে আনা যেতে পারে। কর্মরত সাংবাদিকরা যাতে এসব মেনে চলেন বা এর পক্ষে জনমত তৈরি করেন, সেটাও আশা করে আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সম্প্রদায়। এর বাস্তবায়নে মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো হচ্ছে:

১. নিজের জীবন রক্ষার চেয়ে কোনো কিছুই মূল্যবান নয়। সাংবাদিক, সংবাদকর্মী, ফ্রিল্যান্স- সবাইকে মনে রাখতে হবে, রিপোর্টের জন্য অন্যায্য ঝুঁকি অগ্রহণযোগ্য এবং দৃঢ়ভাবে এটা নিরুৎসাহিত করতে হবে। সংবাদমাধ্যমকেও পারস্পরিক প্রতিযোগিতার চেয়ে সাংবাদিকের নিরাপত্তাকে আগে গুরুত্ব দিতে হবে।

২. সংবাদকর্মীকে জোর করে যুদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার অ্যাসাইনমেন্টে পাঠানো যাবে না। যারা স্বেচ্ছায় সেখানে যেতে চান, তাদের নিয়োজিত করা যাবে। সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে যাদের ভালো অভিজ্ঞতা আছে, তারা ফিল্ডে যাবেন এবং তাদের তত্ত্বাবধানে অন্যরা থাকবেন। যারা ঝুঁকিপূর্ণ সংবাদ সংগ্রহে রাজি হবেন না, তাদের সাংবাদিকতা পেশাকে হুমকির মধ্যে ফেলা বা তাদের পদোন্নতি ও অন্যান্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সম্পাদক বা সিনিয়র সাংবাদিক যারা ফিল্ডে আছেন, তারা পরস্পর আলোচনার মাধমে ঝুঁকিপূর্ণ অ্যাসাইনমেন্ট বাতিলও করবেন।

৩. এ ধরনের সংবাদ যারা সংগ্রহ করবেন, তারা অবশ্যই প্রশিক্ষণ নেবেন এবং প্রতিষ্ঠান তাদের ফিল্ডে পাঠানোর আগে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেবে।

৪. যে সাংবাদিককে ঝুঁকিপূর্ণ ফিল্ডে পাঠানো হচ্ছে, তিনি তার অ্যাসাইনমেন্টের বিষয়ে কতটা জানেন ; রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক দিকটা নিয়ে কতটা সচেতন; সর্বোপরি জেনেভা কনভেনশনসহ মানবাধিকার সম্পর্কিত আইনগুলো কতটা জানেন- এসব দেখার বিষয় তার নিয়োগকর্তার।

৫. নিয়োগকর্তা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পাঠানো সাংবাদিক বা নিয়োজিত ফ্রিল্যান্সদের পর্যাপ্ত হুমকি মোকাবেলায় কার্যকর সেফটি ইকুইপমেন্ট, ওষুধপত্র এবং স্বাস্থ্যরক্ষার অন্যান্য সামগ্রী নিশ্চিত করবেন।

৬, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যাওয়ার আগে সব সাংবাদিকের- আহত বা নিহত হলে সুবিধা নিশ্চিত করা হয় এমন- ব্যক্তিগত বীমা থাকতে হবে। এখানে সাংবাদিক, সংবাদকর্মীদের সঙ্গে ফ্রিল্যান্সের কোনো ব্যবধান থাকতে পারবে না।

৭. সাংবাদিক একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক। তাই কোনো মিডিয়াকর্মী কোনো অবস্থায় আগ্নেয়াস্ত্র বহন করতে পারবেন না।

৮. সরকার, সেনাবাহিনী ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দায়িত্বরত সাংবাদিকের নিরাপত্তা বিধানসংক্রান্ত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হবে। তারা অবশ্যই খামাখা বাধা দিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, তথ্য সংগ্রহ ও সরবরাহের অধিকার খর্ব করবেন না। নিরাপত্তাকর্মীরা সাংবাদিকদের আইনসংগতভাবে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে কোনোভাবেই হয়রানি, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করতে পারবেন না।

আনিস আলমগীর: সাংবাদিক ও শিক্ষক।

কৃতজ্ঞতা: আন্তর্জাতিক রেডক্রস সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল নিউজ সেফটি ইনস্টিটিউশন, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস।
সৌজন্যে- নতুন বার্তা