সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার

Friday, 14/06/2013 @ 12:22 pm

প্রেসবার্তাডটকম ডেস্ক ::

newsmediaভাষা হলো আমাদের আত্ম প্রকাশের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ভাষার প্রধান কাজ ভাবনাকে একজনের নিকট হতে অন্যের নিকট পৌছে দেয়া। তবে ভাষা দুই ধরনের:

ক) মুখের ভাষা ও
খ)লেখার ভাষা।
কথা বলার সময় অসম্পূর্ণ ভাষার ব্যবহার করেও অন্যকে অর্থ বোঝানো সম্ভব। কিন্তু ভাষা লিখিত আকারে প্রকাশ করতে হলে তার সাথে যোগ হয় সম্পূর্ণ ও শুদ্ধ বাক্য, আঞ্চলিক ভাষা প্রয়োগ না করা, বানান ও ব্যাকরণের শুদ্ধতা, যতিচিহ্নের সঠিক ব্যবহারের তাগিদ। কিন্তু তা সত্ত্বেও লিখিত ভাষার একটা অসাধারণ সুবিধা আছে , এর মাধ্যম যেহেতু লিখিত তাই এর ভিত্তিতে ভাষার ক্ষমতা প্রকাশ পায়।

চলমান জীবনের প্রতিদিনের ইতিহাস হলো সংবাদপত্র। এটি সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। বেশির ভাগ সামাজিক,যোগাযোগের আমরা আনুষ্ঠানিক ভাষার প্রয়োগ করে থাকি। সংবাদপত্র হলো খবরের বাহন, আর এই খবরের বাহন হলো ভাষা ও ছবি। সংবাদপত্রের ভাষা লেখ্যভাষার জগৎ থেকে আগত ভাষা। এই লেখ্য ভাষার মাধ্যমে সংবাদপত্রে বিভিন্ন ঘটনার খবর বাণীবদ্ধ থাকে।

তবে সংবাদপত্রের ভাষার কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট থাকে। যেমন, সংবাদপত্রের ভাষা হবে সহজ, সরল ,স্বচ্ছ যেন পাঠক ও শ্রোতা তা সহজেই বুঝতে পারেন। যেহেতু পাঠক-শ্রোতার মধ্যে যেমন সুপন্ডিত আছে, তেমনি রয়েছেন নামমাত্র সাক্ষর ব্যক্তি তাই এতে ব্যবহৃত ভাষা হবে সহজ যেন সকলেই তা বুঝতে পারেন। তবে বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে-
“সহজ কথা বলতে আমায় কহযে,
সহজ কথা যায় না বলা সহজে।”
তবে কাজটি যতই কঠিন হোক না কেন সাংবাদিকের লেখাতে স্বচ্ছতা ও সরলতা থাকা প্রয়োজন।

# সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহারের ইতিহাসঃ-

সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার ব্যবহার শুরু হয় বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশিত হবার সময় থেকে, তবে বাংলা সংবাদপত্রের আবির্ভাবকালে বাংলা গদ্যের অবস্থা ছিলো অনেকখানি বিশৃঙ্খল। তারপর ও বাংলা সংবাদপত্র এই বিশৃঙ্খলার দ্বারা আক্রান্ত হয়নি। বরং বিশঙ্খলা দূর করতে সমর্থ হয়েছিলো। এ সম্পর্কে সুকুমার সেনের মন্তব্য অগ্রাহ্য যোগ্য নয়-
“সাধারণ পাঠকের অপযোগী সংবাদ ও সরস কাহিনী পরিবেশনের দ্বারা সাময়িকপত্রে বাঙ্গালা গদ্যের পঙ্গুত্ব ঘুচাইয়া ইহাকে প্রতিদিনের কাজ কর্মের উপযোগী এবং সর্বসাধারণের উপভোগ্য রস সৃষ্টির বাহন করিয়া তোলে।” (বাঙ্গালী সাহিত্যে গদ্য তৃতীয় সংখ্যা,কলিকাতা ১৩৫৬ পৃ : ৪৭)
১৮০১-১৮১৭ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ থেকে প্রকাশিত বাংলা বই যা করতে পারেনি ১৮১৮-১৮৩৫ সালের মধ্যে বাংলা সাময়িকপত্র তা পেরেছিল। পরবর্তীকালে দৈনিক পত্রিকার আবির্ভাবের সাথে সাথে সংবাদপত্রের জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। সংবাদপত্রের আগের দায়িত্বের সাথে তার কাজের ধারায় যুক্ত হয় দ্রুততা ।এছাড়া আন্তর্জাতিক সংবাদ বিনিময়ের ব্যবস্থায় ও বিস্ময়কর অগ্রগতি আসে। এতসব চাহিদা মেটাতে সংবাদপত্রের ভাষায় আসে অসমৃণ বৈচিত্র্য। তবে সংবাদপত্রের ভাষা সম্পর্কে একটি অভিযোগও পাওয়া যায়, তা হলো সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার প্রকৃতি ও ব্যকরণ অগ্রাহ্য করে তা ব্যবহার করা হচ্ছে।

প্রথমত , বাংলা গদ্যের আবির্ভাবের পর ১৮১৭-১৮১৮ সালে বাংলা সংবাদপত্রের যাত্রা শুরু হয় “দিকদর্শন” ও “সমাচার দর্পন” এর মাধ্যমে। পরবর্তীতে “সংবাদ কৈমুদী” ‘জ্ঞান অন্বেষণ’ এর আবির্ভাব হয়।১৮৩৩ সালে সাপ্তাহিক হিসেবে যাত্রা শুরু করে “সম্বাদ প্রভাকর”। ১৯৩৯ সালে বাংলা “ দৈনিক সম্বাদ প্রভাকর” এর অভিযাত্রা শুরু।

ব্রিটিশ শাসনের সময়ে বাংলা সংবাদপত্রগুলো বিট্রিশ শোষকদের অত্যাচার অবিচার এবং সমাজের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিয়ে সংবাদ প্রচার করলে পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হলো সমাজ সংস্কার ও ধর্ম সংস্কারের ভাষা। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে সংবাদপত্রে স্থান পেতে শুরু করলো সাহিত্যের ভাষা।

# সংবাদপত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহারের নিয়ম ঃ –

একথা অস্বীকার করা যায় না যে ,দেশে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দৈনিক ,সাপ্তাহিক , পাক্ষিক ,মাসিক পত্রিকার সংখ্যা অগণিত ,এগুলো প্রকাশে আমাদের মাতৃভাষা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে । কিন্তু সংবাদপত্রের ভাষায় নানাবিধ পরিবর্তন আসলেও সংবাদপত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহারে কিছু নিয়ম রয়েছে, যার কারণে বাংলা ভাষার শুদ্ধ প্রয়োগের জন্য ‘বাংলাদেশ প্রেস ইনষ্টিটিউট’ প্রায় প্রতি বছরই সাংবাদিকদের বিশেষ প্রক্ষিনের ব্যবস্থা করে থাকে।

*শব্দের সঠিক ব্যবহার :

সংবাদপত্রে খবর প্রকাশের জন্য সঠিক স্থানে সঠিক শব্দটি বসানো প্রয়োজনীয়। এ প্রসঙ্গে বুদ্ধদের বসু বলেন-
“ঠিক জায়গায় ঠিক কথাটি বসানোতেই লেখকের বিশেষত্ব” (লেখার ইস্কুল )
সঠিক স্থানে সঠিক শব্দ ব্যবহৃত হলে ব্যবহৃত ভাষায় প্রাঞ্চলতা আসে।

*বাহুল্য শব্দ প্রয়োগ :

প্রয়োজনের অতিরিক্ত শব্দ ব্যবহার হলো বাহুল্য দোষ। সংবাদপত্রকে যথাসম্ভব এই দোষ পরিহার করা উচিত, তা না হলে সংবাদটি অস্পষ্ট হয়ে পড়ে । যেমন :

“উচ্ছেদ অভিযান টিমের উপস্থিতিতে দোকানীদের অবৈধ দোকান সরানোর চেষ্টা করবে দেখা গেলেও টিম চলে যাবার পরক্ষণেই পূর্বাবস্থা দেখা গেছে।” (দৈনিক ব্রাহ্মনবাড়িয়া, ১৩.৪.৯৭)
এর পরবর্তীতে যদি লেখা হতো, “উচ্ছেদ টিমের উপস্থিতিকালে অবৈধ দোকান সরানোতে দোকানীদের ব্যস্তভাবে দেখা গেলেও টিম চলে যাওয়া মাত্রই পূর্বাবস্থা দেখা গেছে।তবে ভাবটি আরো প্রাঞ্চল হতো।

“যে কথা বললেন পাঠকরা নিজেরাই” (প্রথম আলো,২০০৪) ; এটি লেখা যেত Ñ যে কথা বললেন পাঠক নিজেরাই , বা যে কথা বললেন পাঠকরা নিজে ।

*শব্দ ও বাক্যের শুদ্ধতা :

সংবাদপত্র অনেকের জন্য ভাষা শিক্ষার প্রধান বাহন। তাই সাংবাদিকের শুদ্ধ শব্দ ও বাক্য ব্যবহারে সচেতন থাকা প্রয়োজন । তাই বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানানের নিয়ম (১৯৯২) অনুসরন করা প্রয়োজন । যেমন ;
“ এই প্রেক্ষিতে আমাদের আবেদন . . . . .”
কিন্তু শব্দটি হবে পরিপ্রেক্ষিতে বা প্রেক্ষাপটে। সংবাদপত্রের পাতার এমন ভুল বানানের অনুপ্রবেশ পাঠকে পীড়া দেয় । “ প্রথম আলো ” – তে ২০০৭ সালের ২৫ মার্চ প্রথম পৃষ্ঠায় তিন জন্য পরিচ্ছতা কর্মীর ছবি ছেপেছে । চিত্র পরিচিতিতে লিখেছে ;পরিচ্ছন্ন কর্মী ।যা একটি ভুল শব্দ। এছাড়া ও বাংলা সংবাদপত্রে যে সকল শব্দের বানান সমূহ প্রায়ই ভুল ছাপানো হয়। তা হলো; মোহ্যমান,পঙক্তি,আকাক্স্ক্ষা ,গণ্ডার ,আবিষ্কার ,
রূগণ ,উর্ধ্ব, বুদ্ধিজীবি, গড্ডলিকা, দুর্বিষ্হ, নিয়ন্ত্রণ পুরস্কার, পোশাক, বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্যবসা, ব্যয়, ব্যর্থ বিদ্যুৎ, অত্যধিক ।

*সরল বাক্যের প্রয়োগ :

জটিল ও যৌগিক বাক্য ব্যবহার না করে ছোট ও সরল বাক্যের ব্যবহার অর্থকে সহজবোধ্য করে, ভাষাতে আসে গতিশীলতা। গবেষনায় দেখা গেছে, একেকটি বাক্যে পনেরটির বেশি শব্দ ব্যবহৃত হলে তা আর সহজবোধ্য থাকে না, এতে পাঠকের অসুবিধা হয়। উদাহরণ ঃ

“আম বাংলাদেশের এমন জনপ্রিয় ফল যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছেও পছন্দসই খাবার হিসেবে বিবেচিত। ”
বাক্যটি হতে পারতো এমন-
“বাংলাদেশের জনপ্রিয় ফল আম যা বিশ্বেও পছন্দসই খাবার হিসেবে বিবেচিত।”

*বাক্যের পদ বিন্যাস :

বাংলা বাক্যের প্রথমে কতৃপদও সর্বশেষ ক্রিয়াপদ বলে যা অনেক সময় সংবাদপত্রে অনুসৃত হয় না। যেমন: প্রথম আলো পত্রিকায় ২৮ জুন,২০০৯ এ ছাপানো হয় “আকালে ঝরে গেল মেধাবী ছাত্রী নিতা” নিয়ম অনুসরনে বাক্যটি হওয়া প্রয়োজন ছিলো “মেধাবী ছাত্রী নিতা অকালে ঝরে গেল ।”

*বহুবচনের সঠিক প্রয়োগ :
বাংলায় আমরা এক সাথে একাধিক বহুবচন চিহ্নের ব্যবহার করি না। তাই সংবাদপত্র কখনো এমন শব্দ লেখা উচিত নয় যে, “পাঁচজন লোকেরা”

*বিভক্তির প্রয়োগ :

বচনের পাশাপাশি বিভক্তির ব্যবহারেও সাংবাদিকের সচেতনতার প্রয়োজন। উদাহরণ ঃ “১০ জন ছাত্র বহিস্কার সিদ্ধান্ত নিয়েছে” (দৈনিক খবর, ১৯-০৯-৮৭) -যেখানে বিভত্তির ব্যবহারে ভুল হয়েছে যার কারণে বাক্যের অর্থ দ্যর্থবোধক মনে হয়। পুরো খবর পড়ে বোঝা যায় এখানে একটি অনুচ্চারিত কর্তা আছে অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১০ জন ছাত্রকে বহিস্কার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

*অর্থ-দ্বৈততা :

সংবাদপত্রের সংবাদ প্রকাশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো অর্থ দ্বৈততা।
“অসাংবিধানিক পত্রিকায় নির্বাচিত সরকারকে সরানো যাবে নাঃ প্রধানমন্ত্র্ ী”(ইত্তোফাক, ১১ এপ্রিল,২০০৮)
এই শিরোনামে ভাবের ও অর্থের অসম্পূর্ণ বিদ্যমান। সংবাদটি হওয়া প্রয়োজন ছিলো :
“নির্বাচিত সরকারকে অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সরানো যাবে না।”
যথাযথ শব্দ প্রয়োগ না করলেও বাক্যের অর্থ বিপর্যক ঘটে। যেমন:
“যৌতুকের টাকা না পেয়ে পাষান্ড স্বামীর স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যা।” (ইত্তোফাক ১১, এপ্রিল, ২০০৮)
-এই শিরোনামে স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে হত্যার বিষয়টি প্রথমেই ষ্পষ্ট নয়।

*শব্দ/প্রত্যয় ব্যবহারের পৌন: পুনিকতা:

সুন্দর ও গতিশীল গদ্য সংবাদপত্রের প্রাণ। আর এই সৌন্দর্য ও গতিশীলতা নিকতা বর্ণনা করা বাঞ্ছনীয়। যেমন:
“কিন্তু তার আগেই দেশজুড়ে চলছে একুশে কেন্দ্রিক নানা অনুষ্ঠান। দিন দিনই বাড়ছে এই অনুষ্ঠান । সোমবার হরতালের দিনও অনুষ্ঠিত হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। শহীদ মিনার, বাংলা একাডেমী সব জায়গাতেই হয়েছে অনুষ্ঠান। শহীদ মিনারকে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। (জনকণ্ঠ, ১৫,ফেব্র“য়ারী, ২০০৫)
এই সংবাদে অনুষ্ঠান শব্দটি সাত স্থানে ধ্বনিজাত হয়েছে যা অত্যন্ত শ্র“তিকটু ও পঠন কষ্টসাধ্য ।

*একাধিক বিশেষণ :

যথেচ্ছ বিশেষণ ব্যবহার প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা কমায় । “সাবেক স্বৈরশাসক”, ‘দুর্নীতিবাজ’ , ‘সাম্প্রদায়িক মনোভাব সম্পন্ন ’ ইত্যাদি আরো অনেক বিশেষণ এক সাথে পাঠকের সাথে গ্রহণযোগ্য হয় না। তাই বিশেষণ ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

*পরিভাষার ব্যবহার :

বিদেশী সংবাদসমূহ আমরা বিদেশী ভাষার মাধ্যমে পাই। এই সংবাদ অনুবাদ করে লেখার সময় বিদেশী বা অপরিচিত শব্দ ব্যবহারের প্রতি দুর্বলতা সংবাদপত্রের লেখকদের রচনায় লক্ষ্য করা যায়। এক্ষেত্রে ঐ বিদেশী শব্দের অর্থ বিশ্লেষণ করে তা ব্যবহার করা উচিৎ। যেমন, সিডর শব্দটি ব্যবহারের আগে যেমন তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে; তেমনি সুনামি, আইলা এ সব শব্দ ব্যবহারের শুরুতে তার ব্যাখ্যা প্রদত্ত করা হয়েছে ।এছাড়া প্রতিদিন সংবাদপত্রে প্রেসিডেন্ট, আইটেম,কমান্ডো, গার্মেন্টস, টিম, ডায়রিয়া, প্রাইভেটকার, ফ্যাক্টরী, ভিসি, ব্রিজ, মার্কেট, রিলিফ, শো-কজ, নোটিশ, সাবলেট এসব ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করা । এসব শব্দ বাংলা শব্দ ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে। তবে অপ্রচলিত বিদেশি শব্দ ব্যবহারের আগে তার ব্যাখ্যা দেয়া আবশ্যক ।
*যতি ও বিরামচিহ্ন :

লেখার সময় আরেকটি বিষয়ে বাংলা সংবাপত্রে বিশেষ নজর দেয়া উচিত তাহলো যতি চিহ্ন/বিরামচিহ্ন। সোজা বাংলায় “থামবার সংকেত” ;যেখানে থামার দরকার সেখানে যদি তা না হয় তাহলে যেমন শ্রতিমধুর হয় না, তেমনি যেখানে বিরামচিহ্নের প্রয়োজন সেখানে তা না দেয়া হলে বা ভুল দেয়া হলে পাঠক অসুবিধায় পড়েন। তাই সাংবাদিকদের বিরাম চিহ্নের সঠিক ব্যবহার করা প্রয়োজন। উদাহরণ:-
“মেয়েরা স্বাধীন : তবে সম্পূর্ণ নিরাপদ নয় ” (বাংলা, ২১-৮-৮৭)
এখানে ভুল বিরামচিহ্ন ব্যবহৃত হয়েছে, এখানে হবে- মেয়েরা স্বাধীন হলেও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।

*জার্নালিজ শব্দ :

সংবাদপত্রে কিছু শব্দ ব্যবহার করতে করতে জীর্ণ হয়ে পড়েছে। এগুলোকে জার্নালিজ শব্দ বলে। এরকমই লিখতে লিখতে কিছু বানান আমরা চালু করে ফেলি এবং বলি , “যা চালু তাই শুদ্ধ” ; যেমন: ফলশ্রুতি, পদক্ষেপ, সহসা, ইতিমধ্যে, পৃথকীকরণ , বক্তব্য রাখেন, উদ্বেগ প্রকাশ, তৎপরতা, আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আইনের চোখকে ফাঁকি দেয়া ইত্যাদি । এসব শব্দের ব্যবহার পরিহার করলে সংবাদপত্রের ভাষা আরো শ্রতিমধুর হয়।

*ব্যক্তি/বইয়ের নাম :
কোন বিখ্যাত মানুষের নাম, বইয়ের নাম লেখার সময় সচেতনতা ও সতর্কতা জরুরি, যেমন: রুশ লেখক টলস্তয়/তলস্তয়, গ্রীক নাটক ইডিপাস/অদিউপাস/এ্যডিওপাস ইত্যাদি ভিন্ন বানানে দেয়া যায় কারণ এগুলো বিদেশী ভাষার শব্দ। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে বইরে’ , নজরুল ইসলাামের ‘অগ্নিবীনা’ ইত্যাদি গ্রন্থনামে হাইফেন ব্যবহার আবশ্যক।
দৈনিক প্রথম আলো (২০০৬ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি ) ছাপায় :
“ ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি রাতে ছাত্রদের মনোভাব বুঝতে পেরে কমিনিস্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে শহীদুল্লাহ কায়সার এসেছিলেন মেডিকেল হোস্টেলে ।”
কিন্তু এখানে শহীদুল্লা নামটির ব্যবহার ভুল হয়েছে ।

*সাহিত্যের ভাষা ও সংবাদপত্রের ভাষার মধ্যে পার্থক্য :

সংবাদপত্রের ভাষা আলোচনায় যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলো, সংবাদপত্রের ভাষা ও সাহিত্যের ভাষা এক নয়।
প্রথম চৌধুরীর মতে : “ভাষা মানুষের মুখ থেকে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ থেকে মানুষের মুখে নয়” (নিরীক্ষা ১৯৮৯, পৃষ্ঠা: ২৯)
বর্তমানে কিছু সংবাদপত্রে গদ্য স্টাইলে নতুন ধারা এসেছে কিন্তু গুরু সংবাদের ক্ষেত্রে তা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। সাহিত্যের ভাষা কাব্যিক, তথ্য ভিত্তিক বর্ণনাত্মক, বিশ্লেষনাত্মক হতে পারে। কিন্তু সংবাদের ভাষা অবশ্যই তথ্য ভিত্তিক হবে। তবে বর্তমানে ফিচার ধর্মী সংবাদগুলো বিশ্লেষণাত্মক।

*শিরোনাম কৌশল :

শিরোনাম হলো সম্পূর্ণ ঘটনার সার-সংক্ষেপ। তাই সাংবাদিককে শিরোনাম নির্ধারনে সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বেশ বড় বড় অক্ষরে শিরোনাম ছাপানো হলে ঃ
“ইটালী মেয়েরা চ্যাম্পিয়ান।” (দৈনিক বাংলা, ২-৯-৮৭)

যা একটি ভুল শিরোনাম , হওয়া প্রয়োজন ছিল – ইটালীয় মেয়েরা চ্যাম্পিয়ান। আবার অনেক সময় থাকে যে:
“পরিস্থিতি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ”- শিরোনাম হিসেবে এটি চমৎকার হলেও ব্যাকরণবিদগণ মনে করেন; “খাদ্য পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ আছে”- এই শিরোনামই সঠিক। তবে শিরোনামে কম শব্দে মূল ভাবটি প্রকাশ পেলে এবং তা পাঠককে আকৃষ্ট করলে তা হবে যথার্থ শিরোনাম।

*অনুবাদ প্রসঙ্গ :

বিশ্বায়নের এই যুগে আমরা অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হতে সংবাদ সংগ্রহ করি, যা আমাদের সংবাদপত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এই প্রাপ্ত সংবাদগুলো বেশির ভাগই ইংরেজি ভাষায় রচিত। ইংরেজি ভাষা হতে বাংলায় অনুবাদের সময় সতর্কতার প্রয়োজন। কখনো কখনো সাংবাদিকরা ইংরেজির ধাঁচে বাংলা লেখে যার কারণে বিভ্রান্তি বেড়ে যায়। যেমন: “রোববার এখানে ফাইনেলে ইটালি ৯৭-৮৯ পয়েন্টে চীনকে হারিয়ে ফরাসি উন্মুক্ত মহিলা বাস্কেট বলে চ্যাম্পিয়ান হয়েছে।”

যা অতি বিভ্রান্তিকর সংবাদ, এটা অনুবাদের সমস্যা। ইংরেজি বাক্যের গঠনরীতি ও অন্বয় অক্ষুন্ন রেখে বাংলায় অনুবাদ হয়েছে বলে সংবাদটি অষ্পষ্ট ও বিভ্রান্তিকর। তাই অনুবাদের সময় লেখা পড়ে বুঝে নিয়ে তা কিভাবে বাংলায় প্রকাশ সম্ভব তা ঠিক করে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

#উপসংহারঃ-

লেখার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সংবাদপত্রে ,তাই ভাষার গতি-প্রকৃতি নির্ধারনে সংবাদপত্র বিশাল ভূমিকা পালন করে । তবে আবুল কাসেম ফজলুল হক এর মতে ,
“সন্দর্ভ , প্রবন্ধ ,রচনা ,কবিতা , গল্প , উপন্যাস ,নাটক, সম্পাদকীয় , উপ-সম্পাদকীয়, সংবাদ সব ধরনের লেখাতেই বেশকিছু ভাষাগত সমস্যা আছে যা সকল লেখককেই মোকাবিলা করতে হয় । এতে লেখকদের অনেক চিন্তাশক্তি ও শ্রম ব্যয় হয় । বাংলা ভাষার মূল উপাদানগুলোকে কেন্দ্র করে আসে হয় এ সমস্যা । সমস্যাকে কেন্দ্র করে আসে ভাষাগত জটিলতা ও ত্র“টিবিচ্যুতি । সমস্যার ও ত্র“টি-বিচ্যুতির রূপ সবচেয়ে প্রকট সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাতে। ”
কিন্তু বাংলা ভাষার স্বার্থ রক্ষায় সংবাদপত্রের ভাষাকে হওয়া উচিত নির্ভুল ও নির্ভেজাল। সংবাদপত্রের ভাষা নিয়ে গুনীজনের বক্তব্যকে প্রাধান্য দেয়া যেতে পারে। “সংবাদপত্রে বাংলা ভাষা” শীর্ষক প্রবন্ধের প্রকাশনা উৎসব হয়েছিল ১৯৮৯ সালে, যেখানে তৎকালীন সংবাদপত্র “দৈনিক বাংলা”-র সম্পাদক সাংবাদিক আহমেদ হুমায়ুন বলেছিলেন ;
“সংবাদ পৌছানোর পদ্ধতি খুব সরাসরি, খুব প্রাঞ্চল ও মানুষকে চট করে ধরবে এরকম হওয়া প্রয়োজন এবং সেরকম একটা নিরাভরন গদ্য যদি আমরা এখানে তৈরি করতে পারি তাহলে মানুষের সাথে সংবাদপত্রের সম্পর্ক নিবিড়ভাবে হবে বলে আমি মনে করি এবং এ গদ্য তৈরী করার প্রয়োজন আছে।” (নিরীক্ষা আগষ্ট, ১৯৮৯) ।
ঐ অনুষ্ঠানে এ সাংবাদিক আখতার-উল-আলম বলেন Ñ “সংবাদপত্রের ভাষা ব্যবহারের সময় খেয়াল রাখতে হবে যাতে ভাষাগত ও ব্যাকরণগত সমন্বয়টা ঠিক থাকে, সচেতন থাকতে হবে যেন মারাত্মক কোন ভুল না হয়ে যায়। সাথে সাথে কথাও মনে রাখতে হবে সংবাদপত্রের ভাষা আলাদা। ” (নিরীক্ষা আগস্ট , ১৯৮৯ )

তবে সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্রে বাংলা ভাষার অপপ্রয়োগ ও অপব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে সংবাদপত্রগুলো যেমন সমালোচনার শিকার হচ্ছে, তেমনই ভাষাকে যারা ভালভাবে রপ্ত করতে আগ্রহী তারা বিভ্রান্ত ও হতাশা হন। তাই সংবাদপত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারের আগে তার উপযুক্ত শিক্ষা, সচেতনতা এবং ব্যবহার বা প্রয়োগ অভিজ্ঞতা ভূলভ্রান্তি ও বিচ্যুতি দূর করতে পারে।