মফস্বল নয় সবাই সাংবাদিক

Thursday, 02/02/2017 @ 9:31 am

:: আবুল বাশার শেখ ::

kolomইংরেজি ‘জার্নাল’ এবং ‘ইজম’ থেকে জার্নালিজম বা সাংবাদিকতার উৎপত্তি। ‘জার্নাল’ শব্দের অর্থ কোনো কিছু প্রকাশ করা এবং ‘ইজম’ শব্দের অর্থ অনুশীলন বা চর্চা করা। সে হিসেবে কোনো কিছু জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য যে চর্চা বা অনুশীলন তাকে সাংবাদিকতা বলা হয়। সাধারণ অর্থে বলতে গেলে যিনি সংবাদপত্রের জন্য সংবাদ সংগ্রহ করেন ও লিখেন, তিনিই সাংবাদিক। তবে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সীমিত গ-ির মধ্যে সাংবাদিকতাকে আটকে রাখা যায় না। মার্কিন সাংবাদিক আর ডি ব্লুমেনফ্রেল্ডের মতে, যিনি সংবাদ সংগ্রহ করে তা প্রকাশ উপযোগী করেন এবং সংবাদ-সংক্রান্ত কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনিই সাংবাদিক।

সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা। এটাকে কেউ কেউ আবার নেশা হিসেবে মানতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ও ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপান্তরের যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তাতে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিকস মিডিয়ায় মফস্বল সাংবাদিকতার অবদানও কম নয়। প্রতিনিয়ত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা প্রতিনিধি তার কর্ম এলাকার অবহেলিত, অনুন্নত, উন্নয়নবঞ্চিত জনপদের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন। খুন, ধর্ষণ, বাল্যবিবাহ, ইভটিজিং, অশিক্ষা, অপচিকিৎসা, যৌতুক, গ্রামের সরল মানুষদের নানাভাবে প্রতারিত হওয়া, জবরদখল, সন্ত্রাস, দলাদলি, অগ্নিকা-, পাহাড়ধস, বিদ্যুতের লোডশেডিং ইত্যাদির শিকার হওয়া মানুষগুলোর পক্ষে কথা বলেন। তারা দুর্ঘটনা, উন্নয়ন, অনিয়ম, খেলাধুলা, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন প্রকার সংবাদ পরিবেশন করে থাকেন। পত্রিকার প্রধান কার্যালয়গুলোতে বিভাগ ভিত্তিক আলাদা রিপোর্টার থাকলেও মফস্বল সাংবাদিকদের বেলায় আলাদা কোনো বিভাগ নেই। তাদের প্রতিটি বিষয়েই সংবাদ ও প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। এতে করে তাদের দক্ষতাকে খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। মফস্বল সাংবাদিকরা চতুর্মুখী যে শ্রম দেন তার বিনিময়ে তারা তেমন কিছুই পান না।

মফস্বল সাংবাদিকদের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন সাধন করতে হলে হতে হবে নিবেদিতপ্রাণ, কঠোর পরিশ্রমী, সময়ানুবর্তী, সাহসী, কৌতূহলী, বুদ্ধিদীপ্ত, প্রখর স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন, দল নিরপেক্ষ, সৎ, ধৈর্যশীল, রস ও সাহিত্যবোধ সম্পন্ন। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের বই পড়া ও লেখার অভ্যাস সাংবাদিকদের জন্য অতিরিক্ত গুণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাংবাদিকতাকে পেশা কিংবা নেশা হিসেবে নেওয়া সাংবাদিক বা সংবাদকর্মীরা এসব গুণাবলি চর্চার মাধ্যমে সফল সাংবাদিক হওয়ার পথে এগিয়ে যান। এছাড়া, পেশাদারিত্ব অর্জনের জন্য দেশ-বিদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা জরুরি। দেশ-বিদেশের সংবাদপত্র পড়া, টিভির সংবাদ দেখা, ইন্টারনেটে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলো ব্রাউজ করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিচরণ করা ভালো সাংবাদিক হওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

আমরা চাই, ভালো সাংবাদিকদের সাহচর্যে হলুদ সাংবাদিকদের অবসান হোক। ‘একটি ভালো সংবাদপত্র নিজেই দেশের কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে’ সাংবাদিক আর্থার মিলারের এ কথা আমরা বিশ্বাস করতে চাই। আমরা চাই, সাংবাদিকদের লেখনী সমাজের আয়নায় পরিণত হোক, যা দেখে মানুষ সচেতন হবে। তাদের লেখা পড়ে মানুষ ভালো কিছু শিখবে, উৎসাহিত হবে, ভালো কাজ করতে অনুপ্রেরণা পাবে। পাশাপাশি অপরাধমূলক সংবাদ পড়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে যাতে সমাজে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সাধিত হয়। আমরা চাই, এলাকার অন্যায়, অত্যাচার, বঞ্চনা, শোষণের বিপক্ষে সাংবাদিকের কলম ও ক্যামেরা যথাযথ কাজ করুক ও ভালো কাজের প্রশংসার বাস্তব চিত্র ফুটে উঠুক, মফস্বল সাংবাদিকতার মাধ্যমে সমাজ উপকৃত হোক।

গ্রাম বাংলার কল্যাণে মফস্বল সাংবাদিকদের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশ গ্রামপ্রধান দেশ। তাই গ্রামীণ তথা মফস্বল সাংবাদিকদের উপেক্ষা করে কোনো সংবাদপত্রই সফল অবস্থানে পৌঁছতে পারবে না। আগে ঢাকার বাইরের খবর মফস্বল খবর হিসেবে ধরা হতো, কিন্তু এখন সে যুক্তি অচল। সব খবরই খবর। এখন পত্রিকাগুলো ঢাকার বাইরের খবরও শিরোনাম করে থাকে। কিন্তু যেসব মফস্বল সাংবাদিক দেশের ৮৫ ভাগ মানুষের লঞ্ছনা, বঞ্চনা ও অভাব অভিযোগের খবর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করে পত্রিকায় পাঠিয়ে থাকে, তাদের খোঁজখবর পত্রিকার মালিক-সম্পাদক হয়তো কমই রাখেন! আবার এমন কিছু সংবাদ আছে, যা সংগ্রহ করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনের পরোক্ষ হুমকি, প্রভাবশালীদের চোখ রাঙানি, এমনকি প্রাণনাশের হুমকিও আসে। তারপরও থেমে নেই মফস্বল সাংবাদিকদের পথচলা। এত সব সত্ত্বেও মফস্বলে কোনো সাংবাদিক হাল ছেড়েছেন এমন নজির নেই। তবে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে লাঞ্ছিত বা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। আমার সাংবাদিকতা জীবনে দেখেছি অনেক সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এখন সাংবাদিক এবং সংবাদপত্রের মানোন্নয়ন হয়েছে নিঃসন্দেহে। আগে মফস্বল সাংবাদিকদের সংবাদ পাঠাতে ৩০-৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো ফ্যাক্স করার জন্য। আর এখন হাতের মুঠোয় সব যোগাযোগ! তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে সাংবাদিকতা অনেক সহজ হয়েছে। কদর বেড়েছে সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের।

বর্তমানে সাংবাদিকতার ধরন পাল্টেছে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে। এখন আর প্রিন্ট হওয়া সংবাদপত্রের খবরের জন্য কেউ বসে থাকে না সংবাদপত্র প্রিন্ট হওয়ার আগেই মানুষ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো মুহূর্তের মধ্যে হাতের মুঠোয় পেয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রেও কিন্তু মফস্বল সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হয়। তবে আজ এ কথা বলতে দ্বিধা নেই, এখন আর মফস্বল নয় সকলেই সাংবাদিক। এই সাংবাদিকরা বের করে আনেন খবরের ভেতরের খবর। এ কারণে সংবাদপত্রগুলো মফস্বলের সংবাদের গুরুত্ব অনুধাবন করছে। যার প্রেক্ষিতে রাজধানীর বাইরের খবরে আজকাল বেশ বৈচিত্র্য এসেছে। মফস্বল সাংবাদিকরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। সাংবাদিকদের এ সুযোগ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি)। আশা করা যায়, পিআইবি এই ধারা অব্যাহত রেখে আরও প্রসারিত করবে। রাজধানী এবং বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরে আজকাল জেলা শহরগুলো থেকে অনেক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তাদের উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।

লেখক : সাংবাদিক, কবি, গল্পকার