সংবাদমাধ্যম যখন ‘বিরোধী দল’

Saturday, 28/01/2017 @ 10:00 am

:: মশিউল আলম ::

আমেরিকান সাংবাদিকতা এখন এক অভিনব পরিস্থিতির মুখোমুখি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, তাঁর দেশের সাংবাদিকেরা হলেন পৃথিবীর সবচেয়ে অসৎ মানুষ। এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ চলছে।

নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্পর্ক খুব খারাপ। নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্টসহ প্রভাবশালী অনেক পত্রিকা প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। তারা ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল যে তাঁরা যেন ট্রাম্পকে ভোট না দেন। এই ব্যক্তি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে দেশটির কী কী ক্ষতি হবে ইত্যাদি যুক্তি তুলে ধরে সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশ করেছিল কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক। সংবাদমাধ্যমের ট্রাম্পবিরোধী প্রচারণা এত ব্যাপক ও প্রবল ছিল যে তিনি নির্বাচনে জয়ী হবেন, এটা কেউ বুঝতেই পারেনি। তাই নির্বাচনের উল্টো ফল ট্রাম্পবিরোধী সংবাদপ্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু বিস্মিতই করেনি, কিছুটা বিব্রতও করেছিল।

নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রকাশক ও নির্বাহী সম্পাদক পাঠকদের উদ্দেশে একটা যৌথ চিঠি প্রকাশ করেছিলেন, যেখানে তাঁরা স্বীকার করেছিলেন যে ট্রাম্পের প্রতি এত বেশি জনসমর্থন আছে, তা তাঁরা আগে বুঝতে পারেননি। তাই তাঁরা নির্বাচনের ফলকে বর্ণনা করেন ‘নাটকীয় ও অপ্রত্যাশিত’ বলে। কিন্তু সে জন্য তাঁরা পাঠকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেননি। কিন্তু ট্রাম্প টুইটারে লেখেন, নিউইয়র্ক টাইমস ‘আমার সম্পর্কে খারাপভাবে সংবাদ পরিবেশনের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তার পাঠকদের উদ্দেশে একটা চিঠি লিখেছে।’

নিউইয়র্ক টাইমস-এর সঙ্গে ট্রাম্পের খারাপ সম্পর্ক ভালো হওয়ার একটু লক্ষণ দেখা দিয়েছিল, ২২ নভেম্বর যখন ট্রাম্প তাঁর কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে পত্রিকাটির সম্পাদকীয় কার্যালয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন পত্রিকাটির প্রকাশক, সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে ট্রাম্পের দীর্ঘ আলোচনা হয়। সেই আলোচনার রেকর্ড করা ভাষ্যের সুদীর্ঘ শ্রুতলিখন প্রকাশ করা হয় পত্রিকাটির অনলাইন সংস্করণে। তাতে সাংবাদিকতা প্রসঙ্গে বিশেষ কিছু ছিল না। একদম শেষের দিকে নিউইয়র্ক টাইমস কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবেন কি না। ট্রাম্প প্রশ্নটার পেছনের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করতে বলেন, ‘আমার মনে হয় আপনাদের কোনো সমস্যা হবে না। আমার মনে হয়, আপনারা ভালোই থাকবেন।’

কিন্তু আমেরিকায় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্প সরকারের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়ে চলেছে। সর্বশেষ হোয়াইট হাউসের প্রধান কৌশলবিদ স্টিফেন ব্যানন সংবাদমাধ্যমকে ‘বিরোধী দল’ (দ্য অপোজিশন পার্টি) বলে বর্ণনা করা শুরু করেছেন।

কট্টর শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী হিসেবে পরিচিত এই ভদ্রলোক ব্রেইটবার্ট নিউজ নামে একটা ওয়েবসাইট পরিচালনা করতেন, যার প্রধান কাজ হচ্ছে হোয়াইট সুপ্রিমেসি বা শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্বের চেতনা প্রচার করা, মুসলমান ও অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানো। ট্রাম্প যখন তাঁকে হোয়াইট হাউসের চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট পদে নিযুক্ত করেন, তখন তীব্র সমালোচনা হয়। কিন্তু তাঁর নিয়োগকে ‘চমৎকার’ সিদ্ধান্ত বলে প্রশংসা করেন একসময়ের কুখ্যাত শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী সংগঠন কু ক্লাক্স ক্ল্যানের সাবেক নেতা ডেভিড ডিউক।

স্টিফেন ব্যানন গত বুধবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলের পর ‘সংবাদমাধ্যমের লজ্জা পাওয়া উচিত, তাদের গ্লানি বোধ করা উচিত এবং চোপা বন্ধ করে কিছু সময় শুধু শুনে যাওয়া উচিত (অন্যরা কী বলে)।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংবাদমাধ্যম এখানে একটা বিরোধী দল। তারা এই দেশকে বোঝে না। তারা এখনো বুঝতে পারছে না, কী কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।’

ব্যানন বলতে চাইছেন, আমেরিকান সমাজে জাতীয়তাবাদ ও জাত্যভিমানের জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু ‘এলিট মিডিয়া’ তা দেখতে পাচ্ছে না। সে কারণেই তারা বুঝতে পারেনি যে নির্বাচনে ট্রাম্পের জয় হবে। তিনি মনে করেন, নির্বাচনী প্রচারণাকালে ট্রাম্পবিরোধী প্রচারণার দায়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের অনেক সাংবাদিকের চাকরি যাওয়া উচিত। কারণ তাঁরা সাংবাদিকের দায়িত্ব পালন করেননি, হিলারি ক্লিনটনের প্রচারণার পক্ষের ‘অ্যাকটিভিস্টের’ ভূমিকা নিয়েছিলেন।

নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছে, এই স্টিফেন ব্যানন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক রূপকল্প (ন্যাশনালিস্ট ভিশন) বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছেন। অত্যন্ত প্রভাবশালী এই ব্যক্তির রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দর্শন হচ্ছে শ্বেত বর্ণের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা। ডোনাল্ড ট্রাম্প গরিব ও বেকার আমেরিকানদের জন্য চাকরিবাকরির ব্যবস্থা করবেন—এই মনোরঞ্জনবাদী বাগ্মিতার চেয়ে বড় সত্য হচ্ছে তিনি স্টিফেন ব্যাননদের মতো লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে আমেরিকাকে ‘আবার শ্রেষ্ঠত্বের মহিমা দান করতে’ চান আমেরিকান সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের বিপরীত দিকে যাত্রা করে।
আমেরিকার মূলধারার সংবাদমাধ্যম ট্রাম্প ও তাঁর পারিষদের এই প্রতিক্রিয়াশীল ও পশ্চাৎমুখী স্বপ্ন বা ভিশনটা ধরতে পেরেছে। তারা বুঝতে পেরেছে, আমেরিকান সমাজের কয়েক শ বছরের অগ্রগতির উল্টো পথ রচনা করতে এসেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও স্টিফেন ব্যাননের মতো লোকেরা। তাই বস্তুনিষ্ঠভাবে সংবাদ পরিবেশনের সঙ্গে সঙ্গে ভাবাদর্শগত অবস্থানও তারা স্পষ্টভাবেই তুলে ধরছে। স্টিফেন ব্যানন সংবাদমাধ্যমকে ‘বিরোধী দল’ হিসেবে বর্ণনা করছেন মূলত সে কারণেই। কিন্তু এ রকম ‘বিরোধী দল’ হতে মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বিশেষ আপত্তি আছে বলে মনে হচ্ছে না। কারণ, তারা দেখতে পাচ্ছে, আমেরিকান গণতন্ত্রের মূল শক্তি যে বহুত্ববাদ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর দল তার শিকড় ধরে টান দিতে উদ্যত হয়েছেন। এখন সংবাদমাধ্যম ‘চোপা বন্ধ করলে’ আমেরিকান গণতন্ত্রই বিপন্ন হবে। স্টিফেন ব্যানন ইতিমধ্যে হুমকি উচ্চারণ করেছেন, ‘আমরা সংবাদমাধ্যমকে জবাবদিহির আওতায় আনব।’

এই হুমকির মানে অনেক গভীর পর্যন্ত যেতে পারে। মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনী ধরে টান দেওয়ার মতো কুমতলবও জাগতে পারে ট্রাম্পের প্রশাসনে। কিংবা সংবাদমাধ্যমের চোপা বন্ধ করার উদ্দেশ্যে নানা ধরনের কালাকানুন প্রণয়নের খায়েশও জাগতে পারে। তাই মার্কিন সংবাদমাধ্যমকে আমরা হয়তো সামনের দিনগুলোতে আরও বেশি করে ‘বিরোধী দলের’ ভূমিকায় দেখতে পাব।

মশিউল আলম: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।
mashiul.alam@gmail.com
সূত্র: প্রথম আলো