মিলন ভাই, সাংবাদিকতা ও বিভক্ত ইউনিয়ন

Tuesday, 14/06/2016 @ 2:56 am

:: সোহরাব হাসান ::

habibur-rahman-milonআজ ১৪ জুন সাংবাদিক হাবিবুর রহমান মিলনের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। প্রতিটি মৃত্যুই শোকের। কিন্তু গুণী মানুষের মৃত্যু মনের মাঝে অনেকটা শূন্যতা তৈরি করে। হাবিবুর রহমান মিলন ছিলেন সেই শূন্যতা তৈরি করা মানুষ।
যে দেশে জীবিত মানুষের কদর নেই, সেই দেশে মৃত্যুর পর বিনা মাশুলে কেউ কাউকে স্মরণ না করাটাই রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। না হলে যিনি জীবনের অর্ধশত বছরেরও বেশি সাংবাদিকতা পেশা ও সাংবাদিক ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন, মৃত্যুর পর ইউনিয়ন বা জাতীয় প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে একটি স্মরণসভা না করার কী যুক্তি থাকতে পারে? তাঁকে নিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান পিআইবি একটি স্মরণসভা করেছে, আর কেউ নয়।
আমরা প্রয়াতদের স্মরণ করি কেন? তাঁরা তো সবকিছুর ঊর্ধ্বে। স্মরণ করি এ কারণে যে তাঁদের রেখে যাওয়া কর্ম ও সাধনা আমাদের ভবিষ্যৎ পথ চলতে অনুপ্রেরণা জোগায়।
সাংবাদিকতাই ছিল হাবিবুর রহমান মিলনের ধ্যান-জ্ঞান। সহকর্মী বা ইউনিয়নের নেতা হিসেবে তিনি সদস্যদের নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। নবীন ও প্রবীণ সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন। বয়সে যত কনিষ্ঠই হোক না কেন, ‘লিডার’ বলে সম্বোধন করতেন। এটি ছিল তাঁর বিনয়।

অনেকের কাছেই বিস্ময়কর শোনাবে যে বিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নের যে নেতারা এখন একসঙ্গে কাজ করাকে মহা অন্যায় মনে করেন, তঁারাই একসময় এ প্যানেল ও প্যানেলে ভাগ হয়ে নির্বাচন করতেন। আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিক ফোরামের নেতা হাবিবুর রহমান মিলনও একবার ‘স্বপক্ষ’ ত্যাগ করেছিলেন। আরেকবার আনোয়ার জাহিদকে সভাপতি ও ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সমঝোতা প্যানেল হয়েছিল। তখন সাংবাদিক ইউনিয়ন এক থাকলেও নির্বাচন হতো দুটি প্যানেলে, যার নেতৃত্ব দিত দুটি ফোরাম। একটি ফোরাম আওয়ামী লীগ-সিপিবি সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল; আরেকটি চীনাপন্থী-বিএনপি সমর্থক হিসেবে। সেই নির্বাচনে আবেদ খান যেমন চীনপন্থী প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, তেমনি সৈয়দ জাফরের মতো চীনাপন্থী সাংবাদিক আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেল থেকে। এ নিয়ে নিজ নিজ ফোরামে ক্ষোভ-অসন্তোষ থাকলেও ইউনিয়নে সবাই এক হয়ে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক পরিচয়কে পেছনে ফেলে সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট থেকেছেন। এ কারণে শাসকগোষ্ঠী কিংবা মালিকপক্ষও ইউনিয়নকে সমঝে চলত।
অবিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়ন কোনো আন্দোলনে পিছু হটেছে মনে পড়ে না। কিন্তু স্বৈরাচারের পতনের পর সাংবাদিক সমাজে দলীয় রাজনীতি এতটা প্রকট হয়ে পড়ে যে ইউনিয়ন অফিস ভাগ হয়ে যায়, নেতারাও হয়ে পড়েন ব্র্যাকেটবন্দী। এতে সাংবাদিক সমাজ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আজ সাংবাদিক ইউনিয়নকে সরকার কিংবা বিরোধী দল নিজ নিজ স্বার্থে কাজে লাগালেও প্রাপ্য মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা, নিম্ন ও উচ্চ আদালতের আইনজীবীরা এক ব্যানারে কাজ করতে পারলেও আমরা পারছি না। বিভক্ত সাংবাদিক ইউনিয়নকে এক করার ব্যাপারে মিলন ভাই শেষ দিন পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন; কিন্তু সফল হননি।
হাবিবুর রহমান মিলনের সাংবাদিকতা শুরু ১৯৬৩ সালে সংবাদ-এ সহসম্পাদক হিসেবে। এরপর পয়গাম, আজাদ ও দৈনিক বাংলায় বিভিন্ন পদে ছিলেন। তাঁর ভাই আহমেদুর রহমান ছিলেন ইত্তেফাক–এর সহকারী সম্পাদক, যিনি ‘ভিমরুল’ নামে কলাম লিখে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। কিন্তু ১৯৬৪ সালে বৈরুতে পিআইএর কায়রোগামী উদ্বোধনী বিমান দুর্ঘটনায় তিনি নিহত হন। এরপর তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার আমন্ত্রণে মিলন ভাই ইত্তেফাকে যোগ দেন। প্রথম কয়েক বছর তিনি এই পত্রিকায় ফিচার ও মফস্বল বিভাগের সম্পাদক হিসেবে কাজ করতেন। পরে যোগ দেন সম্পাদকীয় বিভাগে। সেই থেকে হাবিবুর রহমান মিলন ‘ঘরে বাইরে’ কলাম লিখেছেন ‘সন্ধানী’ ছদ্মনামে। এই কলামে তিনি দেশের যেসব আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা তুলে ধরেছেন, তা থেকে আমরা এখনো মুক্ত হতে পারিনি।
তাঁর একটি লেখার কিছু অংশ এখানে উদ্ধৃত করছি: ‘আমাদের দেশের রাজনীতি মূলত চারটি ধারায় বহমান। যথা—হিংসা, বিদ্বেষ, গালাগাল ও সুবিধাবাদ।…পূর্বাপর আমরা গণতান্ত্রিক রাজনীতির কথা বলেছি; কিন্তু ভুলে গেছি, গণতন্ত্রে মুরসি পাট্টা নিয়ে কেউ ক্ষমতায় আসে না। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত মেয়াদ। মেয়াদকালে যদি কিছু ভালো কাজ করা সম্ভব হয়, তাহলে ক্ষমতা করায়ত্ত রাখা সম্ভব। ঠিক সে রকম আমরা এ কথাও ভুলে গেছি যে প্রতিপক্ষকে হেয়প্রতিপন্ন করে সাময়িক সুবিধা আদায় করা গেলেও যেতে পারে; কিন্তু স্থায়ী সুফল লাভ করা যায় না।’ আরেকটি কলামে তিনি লিখেছেন, ‘শৃঙ্খলিত সংবাদপত্র যদি শৃঙ্খলিত সমাজের প্রতীক হয়, তাহলে সাংবাদিকের বাধাগ্রস্ত কলমও সমাজ প্রগতির বাধা হতে বাধ্য।’ এই কথাগুলো কি আজও সমভাবে প্রযোজ্য নয়?
২০০৬ সালে ‘ঘরে বাইরে’ কলাম নিয়ে প্রকাশিত সংকলনগ্রন্থের ভূমিকায় হাবিবুর রহমান মিলন লিখেছেন,….হতদরিদ্র বঞ্চিত মানুষ এবং চটকল শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবনকাহিনি আজও অনুরণিত হয় আমার চেতনায়। তাই ইত্তেফাকের উপসম্পাদকীয় লেখার দিন থেকে কখনো বাম ছেড়ে ডানে যেতে পারিনি।’ কিন্তু দুঃখের বিষয় রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি—সর্বত্রই আজ ডানের জয়জয়কার।
হাবিবুর রহমান মিলন একুশে পদক পেয়েছেন। দৈনিক ইত্তেফাক–এর মতো ঐতিহ্যবাহী পত্রিকার উপদেষ্টা সম্পাদক হয়েছেন, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু এসব পরিচয় ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে, তিনি ছিলেন ‘আমাদেরই একজন’। ইউনিয়নের বেশির ভাগ নেতা ‘আমাদের একজন’ হতে পারেন না। অবিভক্ত ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকলেও কখনোই তিনি নেতার ‘বড়াই’ করেননি। অন্যদের থেকে কিছুটা হলেও মিলন ভাই আলাদা ছিলেন।
গত এক বছরে আমরা আরও কয়েকজন খ্যাতনামা সাংবাদিককে হারিয়েছি। সাদেক খান, মাহফুজুল হক খান, সৈয়দ ফাহিম মুনয়েম। তাঁদের সবার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। সাদেক খান কেবল সাংবাদিক ছিলেন না, ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক ও অভিনেতা। আমাদের সাংবাদিকতা পেশা যে কত ঝুঁকিপূর্ণ, তার অন্যতম উদাহরণ মাহফুজুল হক খান। যে প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি তিন দশকেরও বেশি সময় কাটিয়েছেন, সেই প্রতিষ্ঠানটি তাঁর ন্যায্য পাওনাটুকুও দেয়নি।
কেবল মাহফুজুল হক খান নন, আরও অনেকেই অনেক প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁদের পাওনা বুঝে নিতে পারেননি। এসব ব্যাপারে কি সাংবাদিক ইউনিয়নের কোনো দায় নেই?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

সৌজন্যে: প্রথম আলো।