ক্যামেরার লেন্স আর লেখার কলম

Sunday, 30/10/2016 @ 2:18 am

:: সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ::

pavelবাংলাদেশের যে কজন ফটোসাংবাদিক তাঁদের কাজে মেধা ও মননের সাক্ষর রেখেছেন অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে, হঠাৎ সামনে আসা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে স্মরণীয় অনেক ছবি তুলেছেন এবং ছবির ফ্রেমে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসকে বাঙ্ময় করে গেছেন, পাভেল রহমান তাঁদের একজন। পিঠে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান লিখে পুলিশের গুলিতে জীবন দিলেন যে শহীদ নূর হোসেন, তাঁর সেই অমর ছবিটা তুলেছিলেন পাভেল।

এ রকম আরও অনেক ছবি আছে তাঁর, মনকে যাঁরা নাড়ায়, স্মৃতির রাস্তায় আমাদের নিয়ে যায় এবং সময়ের ব্যবধানেও ফেলে আসা ছবির ওই সময়গুলোর উত্তাপ অথবা অভিঘাতকে আমরা আবার অনুভব করি। শুধু দেশে নয়, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাময়িকী নিউজউইক-এও তাঁর ছবি ছাপা হয়েছে। তিনি কলকাতার প্রথম সারির দুটি সংবাদপত্রের এবং প্যারিসের একটি ফটো এজেন্সির জন্য কাজ করেছেন। দেশ-বিদেশে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয়েছে। অসংখ্য পুরস্কারও যুক্ত হয়েছে তাঁর অর্জনের তালিকায়।

এ বছর এপ্রিলে ৬০ বছরে পা রাখা পাভেল অবশ্য এখনো তাঁর ব্যক্তিত্বে ও কাজে যৌবনের উদ্যম এবং একাগ্রতা ধরে রেখেছেন। এখনো ছবি তোলার দরকার পড়লে বিশাল লেন্স লাগানো ক্যামেরাগুচ্ছ নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। এখনো সমান সক্রিয় নিজের কাজে এবং সর্বশেষ লেখালেখিতে। এ বছর ফ্রেব্রুয়ারিতে বের হয়েছে তাঁর বই সাংবাদিকতা আমার ক্যামেরায়।

৩০৩ পৃষ্ঠার এই বইতে আছে ঐতিহাসিক কিছু ছবি—বঙ্গবন্ধুর কিছু দুর্লভ এবং অন্তরঙ্গ ছবি, সত্তরের দশকের শেষ দিকের কিছু বিক্ষোভের ছবি, ‘সাধারণ অথচ অসাধারণ’ শিরোনামে শেখ হাসিনার হাস্যোজ্জ্বল কিছু ছবি, তাঁর সঙ্গে পাভেলের কিছু স্মৃতিনির্ভর ছবির একটি অ্যালবাম, ‘ঝড়ের পরে উরির চরে’ মানবিক বিপর্যয়ের কিছু স্তম্ভিত করার মতো ছবি, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত কাঁটাতারের শাসনকে নিয়েও কিছু ছবি আছে, এরশাদের গ্রেপ্তার হওয়া বা থেঁতলে দেওয়া শরীরের এক রাজনৈতিক কর্মীর ছবি, আছে তাঁর বাবার তোলা পাভেলের মায়ের ছবি। ‘বাবার শখের ক্যামেরাটা ছিল আমার খেলনা,’ পাভেল জানান। বাবা তাঁর জীবনের বড় অনুপ্রেরণা।

তবে পাভেলের বইটি যতটা কিছু ছবি দিয়ে সাজানো একটি অ্যালবাম, তার থেকে বেশি সেসব ছবি তোলার ইতিহাস, স্মৃতিচারণ—এসব নিয়ে লেখা একটি বই। ফলে বইটিকে প্রধানত পড়তে হবে পাভেলের জীবনাভিজ্ঞতার একটি বয়ান হিসেবে। সতেজ ভাষায়, সাবলীল ও মেদহীন গদ্যে ১৫টি পরিচ্ছেদে তাঁর নিজের ইতিহাস ঘুরে আসার বর্ণনা দেন তিনি। পাভেলকে আমি চিনি তাঁর ছবির সুবাদে। অথচ বইটি পড়তে পড়তে আবিষ্কার করলাম, একজন সংবেদী গদ্যলেখক লুকিয়ে আছেন তাঁর মূল পরিচিতির আড়ালে।

বইটি জন্য পাভেলকে ধন্যবাদ। তাঁর ক্যামেরা দিয়ে তিনি তুলেছেন কিছু অনুপম ছবি, এখন সেগুলো আরও জীবন্ত হলো তাঁর লেখার কলমের টানে।

সূত্র: প্রথম আলো