‘ডন’-এর সাংবাদিকতা বনাম ভারতের গণমাধ্যম

Monday, 17/10/2016 @ 2:10 am

:: মানিনি চট্টোপাধ্যায়::

kolomভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদাম্বরম সম্প্রতি সে দেশের গণমাধ্যমের কাছে প্রশ্ন রাখেন, ‘কেন তারা চাপের কাছে নতিস্বীকার করছে? কেন তারা আত্মসমর্পণ করছে? কেন তাদের এমন একটি অপ্রত্যাশিত জায়গা থেকে অনুকরণীয় সাংবাদিকতা শিখতে হচ্ছে। যে দেশে গণতন্ত্রের বালাই নেই, যে দেশের কাছ থেকে আমরা ঘৃণা করা ছাড়া কিছুই শিখিনি, সেই পাকিস্তানই এখন বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করছে।’
পি চিদাম্বরমের এত সব প্রশ্ন ও খেদের পেছনে কাজ করেছে পাকিস্তানের বহুল প্রচারিত দৈনিক ডন পত্রিকার সাম্প্রতিক একটি খবর। ডন পত্রিকা গত বুধবার তাদের সম্পাদকীয়তে ৬ অক্টোবর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয়। পত্রিকাটির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সিরিল আলমেইদার লেখা ওই প্রতিবেদনে পাকিস্তানের সরকার ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকের কথা উল্লেখ করা হয়। ওই বৈঠকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে দমন না করায় পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মহলে একঘরে হতে চলেছে। বৈঠকে জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় কী কী পন্থা অবলম্বন করা হবে, তা নিয়েও আলোচনা করা হয়। বৈঠকে পাকিস্তানের বেসামরিক সরকার সামরিক নেতৃত্বকে এই বলে হুঁশিয়ার করেছে যে পাকিস্তানের ভেতরে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী দমনে সরকার যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে তারা যেন নাক না গলায়।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর (হাক্কানি অথবা লস্কর-ই-তাইয়েবা) রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে চলেছে। আর আইএসআইয়ের এই অবস্থান নিয়ে সরকার ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে চরম টানাপোড়েন। এ প্রতিবেদন প্রকাশের পর গোটা পাকিস্তানে হইচই পড়ে যায়। পাকিস্তান সরকার এ ধরনের কোনো বৈঠকের কথা অস্বীকার করে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে তিন দফায় সেই প্রতিবেদনকে মিথ্যা দাবি করা হয়। এর পরপরই গত মঙ্গলবার বিকেলে সাংবাদিক সিরিলের ওপর দেশ ছেড়ে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে পাকিস্তান সরকার। তাঁকে এখন রাখা হয়েছে ‘এক্সিট কন্ট্রোল লিস্ট’-এ। এই তালিকায় থাকা কোনো নাগরিক দেশের বাইরে পা ফেলতে পারেন না। ডন ছাড়াও পাকিস্তানের অনেক সংবাদমাধ্যম সিরিলের প্রতি সমর্থন জানিয়ে শরিফ সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার সমালোচনা করেছে (শনিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে)।
ডন পত্রিকা তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, সিরিল যা লিখেছেন, তার সত্যতা যাচাই করা হয়েছে বিভিন্ন সূত্রের মাধ্যমে, সব তথ্য খতিয়ে দেখে তবেই খবর প্রকাশ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন নিয়ে অপপ্রচার চালিয়ে সরকার প্রকৃতপক্ষে দৈনিকটিরই ভাবমূর্তি নষ্ট করতে উঠেপড়ে লেগেছে বলে তাদের দাবি। কারণ, ওই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল, ‘আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ নজিরবিহীনভাবে সেনাবাহিনীকে সতর্ক হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী চাইছেন, সেনাবাহিনী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে মদদ দেওয়া বন্ধ করুক।’
নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ সাংবাদিকতার জন্য ডন-এর খ্যাতি শুধু পাকিস্তানেই নয়, বিদেশেও রয়েছে। পত্রিকাটির সম্পাদক লিখেছেন, ‘তথ্যের দ্বাররক্ষী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে সেগুলোর সত্যতা যাচাই করা, ক্রস চেক করা। এই পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে এগুলো করার একক দায়িত্ব আমার এবং সিরিলের প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে আমি তা করেছিও। সরকারের এখন উচিত সিরিলের নাম এক্সিট কন্ট্রোল লিস্ট থেকে প্রত্যাহার করা।’
ডন-এর সম্পাদকীয়তে আরও লেখা হয়েছে, ‘সাংবাদিকতা হচ্ছে এমন একটি পেশা, যেখানে হাজারো চাপের মধ্যে পাঠককে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়। তাদের সঠিক খবরটি জানানো হয়। আমরা সেই চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। আমরা সব সময় জনগণের স্বার্থে কাজ করেছি। কারও চাপের কাছে কখনো নতিস্বীকার করিনি।’
করাচিভিত্তিক সংবাদপত্রটি আরও লিখেছে, ভারতীয় গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ এখন আর নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা করে না। তারা মনে হয় সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা, সত্যতা যাচাই, প্রশ্ন করা—এসব কাজ করা ছেড়ে দিয়েছে।
ডন-এর এই অভিযোগের সমর্থন পাওয়া যায় ভারতীয় সাংবাদিক সিদ্ধার্থ ভরদরাজনের মন্তব্যে। তিনি ৮ অক্টোবর অনলাইনভিত্তিক সংবাদপত্র দ্য ওয়ার-এ লিখেছেন, ‘ভারতীয় যেসব সেনা পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়েছিলেন, তাঁরা হয়তো হতাহত হওয়া ছাড়াই বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু এই হামলা আমাদের সাংবাদিকতা পেশাকে গভীরভাবে আহত করেছে।’ তিনি লিখেছেন, বেশির ভাগ সংবাদ চ্যানেলই জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে পাকিস্তানে ভারতীয় হামলা–সংক্রান্ত খবর কাটছাঁট করেছে, নয়তো অতিরঞ্জিত করে পরিবেশন করেছে।
সিদ্ধার্থ লিখেছেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির সরকার রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ভারতের সেনাদের রক্তকে কাজে লাগাচ্ছে—রাহুল গান্ধীর এই মন্তব্যকে প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নেয় ভারতের অন্যতম সংবাদ চ্যানেল এনডিটিভি। এ ছাড়া সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পি চিদাম্বরমের একটি সাক্ষাৎকারও প্রচার না করার সিদ্ধান্ত নেয়। অথচ চ্যানেলটি একসময় এই বলে প্রচার করেছিল যে বিশ্বাসযোগ্যতাই তাদের একমাত্র শক্তি। এখন জাতীয় স্বার্থ ও দেশপ্রেমের দোহাই দিয়ে চ্যানেলটি সংবাদ কাটছাঁট করছে, অনেক সত্য কথাই প্রচার করছে না।
সিদ্ধার্থ আরও লিখেছেন, ‘ভারত যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করত বা জরুরি অবস্থা ঘোষণা করত, তাহলে এনডিটিভির দর্শকেরা হয়তো তা দেখতে পেতেন না। এখন আমার প্রশ্ন হচ্ছে, ভবিষ্যতে যদি কাশ্মীরে নিরীহ জনগণের ওপর নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায়, তাহলে কি এনডিটিভি সেটি প্রচার করবে?’
এনডিটিভি চিদাম্বরমের সাক্ষাৎকার প্রচার না করায় তিনি ভারতীয় সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এখন পাকিস্তানের মতো দেশ থেকে তাঁদের নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা শিখতে হবে।
হয়তো চিদাম্বরমের কথাই ঠিক। কেননা, কেউ জানে না ক্ষমতাসীনেরা কোনো কিছু চেয়ে বসেন কি না, কেউ জানে না ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলা হবে কি না যে কাউকে কোনো প্রশ্ন কোরো না অথবা তাদের সরকারের অস্ত্র হওয়ার জন্য বলা হবে কি না, যদিও ভারতে সত্যিকার অর্থে কোনো যুদ্ধ শুরু হয়নি, কেউ জানে না পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে তাদের কয়েকজনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য পাকিস্তানের প্রস্তাবে রাজি না হতে ভারতীয় চ্যানেলগুলোকে নিষেধ করেছিল কি না—যেমনটি তারা বেশ কয়েকজন পশ্চিমা সাংবাদিককে নিয়ে গিয়েছিল তাদের এই দাবি প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে ভারত কোনো সার্জিক্যাল হামলা পাকিস্তানে চালায়নি। অথবা কেউ আমরা এ ধরনের ‘দেশপ্রেমবর্জিত’ অ্যাসাইনমেন্ট করার জন্য চ্যানেলগুলোকে বন্ধ করে দেওয়া হয় কি না। কেউ জানে না চাপিয়ে দেওয়া সেন্সরশিপ এবং নিজস্ব সেন্সরশিপের মধ্যে পার্থক্য কী? সত্য এবং অপপ্রচারের মধ্যে পার্থক্য কী? সাংবাদিকতা এবং দেশপ্রেমের মধ্যে পার্থক্য কী?
ইংরেজি থেকে অনূদিত, দ্য টেলিগ্রাফ থেকে নেওয়া। অনুবাদ: রোকেয়া রহমান।
মানিনি চট্টোপাধ্যায়: ভারতের সাংবাদিক, লেখক।

সৌজন্যে: প্রথম আলো।