নুয়ে পড়া সাংবাদিকতা…

Tuesday, 30/08/2016 @ 8:38 pm

:: সাহেদ আলম ::

kolomএই লেখাটা কতটা সমীচিন হবে তা ভাবতে ভাবতেই সময় পেরিয়ে গেল। আদৌ লেখা উচিৎ হবে কিনা সেটা ভাবছি, যে গাল টিপলে দুধ বেরোনোর মত সেদিনের এতটুকু ছেলের মুখে, বড় ভাই আর বটগাছ তুল্য সাংবাদিকতার গুরুদের নিয়ে এই লেখা কি আমার নিজের মুখের উপরেই থুতু ছিটানোর মত নয়?

পরে ভাবলাম, সাংবাদিকতা তো আসলে সময়ের দর্পণ, সমাজের দর্পণ, সেই সময় এবং সমাজ দুটোর কোনোটা কি মেনেছে, প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে যেগুলি বলেছেন আমাদের সাংবাদিকতার গুরুরা? একটা অংশ তো মেনে নিয়েছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই অংশটা অনেক কম মানুষের, যারা বাদ বাকী সবই মেনে নেন সুবোধ বালকের মত।

খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক, এবং সাবেক চেয়ারপার্সন ড. গীতি আরা নাসরিন ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়ায় লিখেছেন, ‘এই সাংবাদিকতা ক্লাসে শেখানো সম্ভব নয়! আজকের সংবাদ-সম্মেলনের ভিডিও নথি প্রত্যেক সাংবাদিকতা বিভাগে সংরক্ষণ করা হোক।’

অন্য একজন শিক্ষক ফাহমিদুল হক লিখেছেন, ‘ঘরের বাইরে থাকায় সাংবাদিক তামাশাটা মিস করলাম।’ এর পরে তিনি আরেকটি কথা লিখেছেন বোধ করি এই সাংবাদিকতা নিয়েই লিখেছেন, ‘তোমরা, যাদের আমি পুষি, তোমাদের কাজে আমি বড় খুশি… কই, এসো!’

অর্থাৎ আমাদেরকে হাতে কলমে যারা সাংবাদিকতা শেখান তারা বলছেন, এটা এক ধরনের তামাশা আর আরেক জন ইতিহাসের প্রয়োজনে সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতা মূল্যবোধ, জনবোধ ইত্যাদির প্রয়োজন বিশ্লেষণের জন্য এই সংবাদ সম্মেলন এর প্রতিটি কথা সংরক্ষণ করার প্রয়োজন অনুভব করেছেন। আমাদের অগ্রজরা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সেটা নিয়ে দেশ আর সমাজের যখন ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া এমন তখন একটি বিষয়ে অন্তত বিবেক জাগিয়ে রেখেই নিজ পেশার এই চ্যুতি তুলে ধরতেই লিখছি।

হোক না সে তাদের কে নিয়ে, অন্তত যাদেরকে আমরা অগ্রজ হিসেবে মেনে নিয়েছি। এই কথাটা কি বলা জরুরী নয় যে, তারাই এই পেশার পথিকৃত নয়, বরং একদিন সত্যিই তাদের এই সাংবাদিকতা বইয়ের পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হবে। আরও একটা বিষয় ভেবে লিখছি, সেটা হলো তারা জানুক, যে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের কার্যকলাপ দেখছে, এবং সেটাকে তারা প্রত্যাখান করছে।

সিকানদার আবু জাফর রচিত অনেক প্রতিবাদী কবিতার একটি কবিতা, ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা আজ জেগেছে এই জনতা, এই জনতা/ তোমার গুলির, তোমার ফাঁসির, তোমার কারাগারের পেষণ শুধবে তারা ও জনতা এই জনতা এই জনতা/ তোমার সভায় আমীর যারা, ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলবে তারা।’ -এই কবিতা লেখার প্রেক্ষাপট ছিল নাকি আইয়ুবের স্বৈরশাসন আমল।

সেখানে সাংবাদিকতার টেবিলে বসে আঁকি-বুকি করে অনেক কথাই লিখতেন সিকানদার আবু জাফর। ‘জনতার সংগ্রাম চলছে, জনতার সংগ্রাম চলবেই’ প্রভৃতি। স্বৈরশাসনের সে সময়ে আইয়ুবকে তল্পীবাহক মেনে নিশ্চয়ই কবিতা হয়েছে সে সময়ও, কিংবা সে সময়ের সাংবাদিকতাও হয়েছে, কিন্তু ইতিহাসে ঠিকই ঠাঁই হয়েছে সিকানদার আবু জাফরের সে অমর লাইনগুলি, সেই সাথে তার নাম। এমন আরও উদাহরণ আছে যেখানে সাংবাদিকতা আসলে সময়ের দর্পণ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সমাজের আয়নায় এটা কার প্রতিচ্ছবি দেখা গেল ২৭ আগষ্টের সংবাদ সম্মেলনে!

সবার কথা নিশ্চয়ই বলছি না। সবার মধ্যে কেউ না কেউ যে বুক উঁচু করে প্রধানমন্ত্রীর মুখের উপর ‘রামপাল প্রকল্প রি কনসিডার’ করার বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন যিনি সচরাচর বঙ্গভবনে যান না। জনকণ্ঠের সাবেক চৌকস এ সাংবাদিক আর যাই হোক, নিজের পছন্দের নেতা বা নেত্রীর সামনে নিজের লুটিয়ে পড়া চেহারা না প্রদর্শন করে অন্তত বুক ফুলিয়ে সমাজের কথা জানতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে।

যে কথা মানুষ জানতে চায়, যে অসম এবং দেশের স্বার্থ যেই প্রকল্পে বড় ধরনের হুমকির মুখে, সেই প্রকল্প রি কনসিডার বা পূনর্বিবেচনা করবেন কিনা। উত্তরে যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তাতে তিনি তো বটেই, অন্যেরাও বোধ করি ভয় পেয়েছেন, যে কি দরকার, এত কিছু জিঙ্গেস করার!

বলছিলাম, মাছরাঙার প্রধান বার্তা সম্পাদক রেজওয়ানুল হক ভাইয়ের কথা। একাত্তর টিভির মোজাম্মেল হক বাবু ভাই আমাদের কাছের বড় ভাই, তিনি যদিও দাবী করেছেন মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে পাশ করেছেন এবং পরিবেশ নিয়ে আন্দোলনকারীদের চেয়ে বেশি জানেন, সেটা মেনে নিতেই হয়। কেননা, তার মত আমুদে মানুষ খুব কমই আছে গণমাধ্যম মালিকানায়।

তার একটা আলাদা পরিচয় আছে, যেটা তিনি গর্ব করে বলেন সব সময়। সেটা হলো বঙ্গবন্ধু, আর আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি ভালো লাগা আর দায়বদ্ধতার কথা। সেটার প্রমান তিনি দিয়ে যাচ্ছেন ব্যক্তিগতভাবে, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার একাত্তর টিভি দিয়েও। তার বক্তব্যের বিরুদ্ধে তর্জমা করব না। তবে এতটুকু বলি, তার ভয় কিসে?

যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজ যেমন দলের প্রচারমাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পেয়েও জনপ্রিয় একটি মাধ্যমে পরিগনিত, দেশে তিনি একাত্তর টিভিকে সেই ভাবে পরিচিত এবং জনপ্রিয় করতে পেরেছেন। তার নিজের কলিজাটা সবার চেয়েই বড় হওয়ার কথা, কেননা তার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি কোনো সাংবাদিকের বসবাস আছে বলে জানা নেই আমার।

তিনি তো একাত্তরে সে কাজটিই করেন, যে অনেক বিতর্কিত ব্যক্তি এবং গোষ্ঠী যাদেরকে অন্য টিভিতে কালো তালিকাভুক্ত করা, এমন ব্যক্তিদের নিয়ে আসেন, সরকারের নানান বিষয়ে তাদের কথা বলার সুযোগ করে দেন। তিনি কেনইবা প্রশ্ন করার সুযোগটা নিয়ে নিজের মহত্ব প্রচার করে, ‘আপনার প্রস্তাবের সাথে আছি’ বলে থেমে গেলেন? প্রধানমন্ত্রী তো প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে সমর্থন চাননি, চেয়েছেন প্রশ্ন, তিনি কেন প্রশ্নের বদলে প্রস্তাব রাখতে গেলেন? বোধোগম্য নয়।

বাকিদের বিষয়ে লিখবো না, কেননা তারা একটি নির্দিষ্ট গোত্রের সাংবাদিকতাকে মূল ধারায় নিয়ে এসেছেন, যেখানে দিন শেষে নেতাগিরি, রাজউকের প্লট, একটি লাল গাড়ী, আর প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী হিসেবেই তৃপ্ত থাকেন। বলব একুশে পদক প্রাপ্ত একজন সাংবাদিকের কথা। কি অসাধারণ তার ব্যক্তিত্ব। মনে আছে তার সেই কথা।

২০০১ সালে বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী মহলে যখন সে নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করার প্রবল চাপ, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘নিজের কর্মের জন্যেই হেরেছে আওয়ামী লীগ, নির্বাচনে কারচুপির দোষ দিয়ে লাভ নেই।’ কিংবা এই তো সেদিন কাদের মোল্লার ফাঁসি না হয়ে যাবজ্জীবন রায় হলো যেদিন, সেদিন একটি বিচারাধীন বিষয়কে পাত্তা না দিয়েই বড় হেডলাইন করলেন, ‘এ রায় মানি না।’

এই লেখায় তার জেল জরিমানা হতে পারতো! তিনি পরোয়া করেননি। পরদিন থেকেই তো শাহবাগের নতুন ইতিহাসের সূচনা হলো। প্রিয় সেই সাংবাদিকের এ কোন্ চেহারা আর সাহস দেখলাম সেদিন আমরা?

একটি অনলাইনে, প্রশ্নকর্তাদের প্রশ্ন নিয়েই শুধু একটি প্রতিবেদন হয়েছে! ভাবুন একবার, শুধু প্রশ্নই যখন প্রতিবেদনের খোরাক হয় তখন বুঝতে হবে প্রশ্নের মধ্যেই সংবাদ আছে, প্রশ্নের উত্তরে নেই। সেখান থেকে নেয়া ক’টা লাইন তুলে দিচ্ছি যেখানে একুশে পদকপ্রাপ্ত একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করতে গিয়ে বলছেন, ‘আপনি অনেক সময় বলেন, প্রশ্ন করেন, প্রশ্ন করেন। কিন্তু প্রশ্ন করার তেমন কিছুই নেই।

আমরা আপনার সঙ্গে কিছু যোগ করতে পারি। সেক্ষেত্রে এটি বলি যে, আপনি আজ যে কথাগুলো বললেন, আমার কেন জানি মনে হয়, আরও আগে যদি এগুলো বলা হতো, তাহলে এই পর্যায়ে তারা যেতে পারত না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমি বলছি, সারা দেশে ব্যাপকভাবে প্রচার করা। কালকে সংবাদপত্রে ছাপা হবে, আজকে টেলিভিশনে যাচ্ছে, কিন্তু সারাদেশে এটা চলা দরকার। যারা এর বিরুদ্ধে কাজ করছে, তারা কিন্তু যথেষ্ট শক্তিশালী।

আর আমি একটা কথা বলতে চাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে, আপনার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিনি দেশের ক্ষতি করছেন, দেশকে বিক্রি করছেন। কিন্তু যিনি দেশের জন্য জীবন দিতে পারেন, তাকে নিয়ে এই কথা। আমি মনে করি এর জোরালো প্রতিবাদ হওয়া প্রয়োজন।’

যে কথা গোপালগঞ্জের কোনো এক নব্য রাজনৈতিক কর্মীর পদ পদবী পাওয়ার জন্য কিংবা দলীয় প্রধানের আনুকূল্য পাওয়ার জন্য বলার কথা সেই কথাগুলি একজন একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিকের মুখ থেকেই শুনেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তার পাওয়া তো অনেক বড়। একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক তার কাছ থেকে এমন পরিস্কার অবস্থান আর সমর্থন একজন প্রধানমন্ত্রীর জন্য নিশ্চয়ই অনেক বড় পাওয়া।

হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রপ্রধানকে যখন প্রশ্ন করা হয় তখন, সাংবাদিকেরা, ইওর এক্সিলেন্সি, কিংবা অনারেবল প্রেসিডেন্ট বলেন না। সেটা সাংবাদিকতার চর্চা নয়, আমলাতন্ত্রের চর্চা। একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানের অধীনে কাজ করেন না সাংবাদিকরা। প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতা যখন জনগণের হয়, আর জনগণ যখন প্রতিনিয়ত সরকারকে জবাবদিহিতায় আনতে চায়, তখন জনগণের প্রতিনিধি হয় সাংবাদিকরাই।

রাষ্ট্র আর জনগণের মাঝের সেতুবন্ধন সাংবাদিক। প্রজাতন্ত্রের কর্মী নয়, যে প্রজাতন্ত্রের প্রধানের সামনে সাংবাদিকতার পরিচয়ে কুর্নিশ করবে। বরং সরকার কতটা জনগণের সেটা প্রমাণিত হয়, সেই রাষ্ট্রের গণমাধ্যম কতটা শক্ত আর জবাবদিহিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে সেটা বিবেচনায়।

সেই অর্থে, সাংবাদিকদের সামনে কুর্নিশ করবে প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ কর্মচারী। কথাগুলো মানতে কষ্ট হলেও, এটাই সত্য যে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের শীর্ষ কর্মচারী, তার সামনে আপনি জনগণের দাবি আর প্রশ্ন নিয়ে হাজির হচ্ছেন, তার অনুকম্পা পাওয়ার জন্য নয়, বরং জনগণের ন্যায্য হিস্যাটা জানার জন্য, বোঝার জন্য। সেটা যদি ভুলে থাকেন আপনারা, তাহলে সাংবাদিকতার বড় কুৎসিত দিকটাই আপনারা চর্চা করছেন। দয়া করে এগুলো আগামি প্রজন্মকে শেখাবেন না।

হ্যাঁ বলতে পারেন, দেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। সময় ভিন্ন। তাইতো এত কথা বলার সাহস পাচ্ছি আমি দুর থেকে। আমি প্রতিবাদ করে বলতে চাই, প্রয়োজনে দূরে থাকেন, গনভবন থেকে। প্রয়োজনে দূরে থাকেন প্রশ্ন করা থেকে। প্রয়োজনে দূরে থাকেন সাংবাদিকতা থেকে, প্রয়োজনে দূরে থাকেন দেশ থেকে। তবুও একুশে পদকের অসম্মানটা আমরা দেখতে চাই না।

এটা আমার অহঙ্কার পাকিস্তানী বুলেটকে তীব্র ভাষায় প্রতিবাদ করার ইতিহাসের ফসল। আপনার মুখের ভাষা, কলমের ভাষা যেন কেউ কেড়ে নিতে না পারে সেজন্য আমাদের পূর্বসূরীরা যে আত্মত্যাগ দেখিয়েছেন, সেটার নামেই এই পদক। এই পদকের সাংবাদিকতা, নুয়ে পড়া সাংবাদিকতা নয়, আর যাই হোক।

নিউইয়র্ক ২৯ আগস্ট ২০১৬.

সাহেদ আলম : সাংবাদিক।
shahedalam1@gmail.com

সৌজন্যে: পরিবর্তনডটকম