সতীত্বহারা সাংবাদিক যেনো ‘দাসী চরণে আপনার’

Monday, 29/08/2016 @ 9:00 pm

:: পীর হাবিবুর রহমান ::

peer habibপ্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র সাংবাদিকদের সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের বাইরে অতিরিক্ত বন্দনা, সরকারি সিদ্ধান্তের গুণকীর্তন, গলা ডুবিয়ে সমর্থন যেভাবে টেলিভিশনে লাইভে প্রচারিত হয়েছে তাতে তারা লজ্জিত না হলেও পেশাদার সংবাদকর্মীরা লজ্জায় অপমানে মাথা নত করেছেন! এতো তেলের নহর, এমন করে লাজ-শরমের মাথা খেয়ে প্রশ্ন নেই, মন্তব্যের নামে স্তুতিবাক্যের নির্লজ্জতায় দেশের মানুষ বিস্মিত। প্রধানমন্ত্রী অবাক। উপস্থিত নেতাকর্মী, বাইরের সমর্থকেরা তাজ্জব। তবু তারা লজ্জিত নন। গণমাধ্যম থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে-এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। তাদেরকে সমালোচনায় ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে। বহুবার সংবাদ সম্মেলনে সিনিয়র সাংবাদিকদের সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন না করে নেত্রী ও সরকার বন্দনা পেশাগত ভাবমুর্তিকে কতোটা ধূলায় লুণ্ঠিত করে তা নিয়ে লিখেছি।

প্রতিটি নাগরিক যিনি যেকোনো পেশায় থাকুন না কেন, যেকোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি তার দুর্বলতা বা সমর্থন থাকতেই পারে। কিন্তু তাই বলে সুন্দরবনের কাছে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ ইস্যুটি যখন জাতীয় পর্যায়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুরুত্ব বিবেচনায় এ নিয়ে অসংখ্য প্রশ্নের জবাব নিয়ে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছেন তখন এ ধরনের তেলের নহর বইয়ে দেয়ার মতো বেশরম চাটুকারিতা সাংবাদিকতাকে কতোটা নিম্নস্তরে নিয়ে যায়! এমন দলকানা দলদাস কর্মীও তো দলে নেই। দলের সভা ডাকলেও নেতাকর্মীরা অনেক আলাপ, অনেক প্রশ্ন করতেন সুযোগ পেলে। কর্মীদের এখন আর দলের সরকারের প্রশস্তি গাইতে হয় না।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করতে না করতেই ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকেরা যেভাবে বক্তৃতা শুরু করেছিলেন, যেভাবে দলীয় কর্মীদের চেয়েও বেশি জান কুরবান করছিলেন তাতে টেলিভিশনের সামনে যারা বসেছিলেন, তারা অবাক বিস্ময়ে ভেবেছেন, গণমাধ্যমে ‘গণ’ শব্দটির কিভাবে রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে মুসলমানি হচ্ছে, আর মাধ্যমটি সরকারের পদতলে কেমন করে সমর্পণ করা হচ্ছে। আত্মমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিবান পেশাদার সাংবাদিকদের পক্ষে এমনটি দৃশ্য পৃথিবীর কোথাও ঘটে না।

মাছরাঙা টিভির রেজওয়ানুল হক রাজাই পূর্ণ পেশাদারিত্বের ওপর দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করেছেন। আর তার সঙ্গে এক দুটি মন্তব্য জুড়ে দিয়ে হলেও প্রশ্ন করেছেন একুশে টিভির মনজুরুল আহসান বুলবুল, এশিয়ান টিভির মনজুরুল ইসলাম, আনিস আলমগির আর এটিএন বাংলার নাজমুল হক সৈকত। বাকিদের মনে হয়েছে লাজ-লজ্জা চোখের পর্দা ফেলে ব্যক্তিস্বার্থ আর মতলববাজির কারণে রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য যেনো জীবন উৎসর্গ করতে গেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনীতি ও শাসনামলের অনেক সমালোচনা করা যায়। কিন্তু তার শত্রু পক্ষ বলবেন, তিনি একজন মিডিয়াবান্ধব রাজনীতিবিদ। সংবাদকর্মীদের কাছে পেলেই কথা বলেন। সংবাদ সম্মেলনে যেকোনো প্রশ্নের জবাব দিতে কার্পণ্য করেন না। প্রশ্ন যতোই সুচোলো হোক, উত্তর যতোই অপ্রিয় হোক তার স্বভাবসুলভ চারিত্রক গুণাবলি হচ্ছে সাহসের সঙ্গে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া ।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এহসানুল করিম শুরুতেই বলেছিলেন, রামপালের বাইরে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। কিন্তু মনজুরুল আহসান বুলবুল যখন দাঁড়িয়ে এর বাইরে প্রশ্ন করা যাবে কিনা জানতে চাইলেন, তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সানন্দে শতফুল ফুটতে দিলেন। উন্মুক্ত প্রশ্নের দুয়ার খুলে দিলেন। সেখানেই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির ঢাকা সফরসহ নানা বিষয়ে সংবাদকর্মীরা প্রশ্ন করার সুযোগ পেলেন।

সংবাদ সম্মেলনে এমন দৃশ্যপট একদিনে হয়নি। পঞ্চম সংসদে শেখ হাসিনা যখন বিরোধী দলের নেত্রী তখন থেকেই আওয়ামী লীগ ও তার বিট কাভার করেছি রিপোর্টার জীবনে। তখন আমরা দাঁড়িয়েছি, সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেছি, উত্তর নিয়ে এসেছি। এতে গণমাধ্যম রাজনীতি, দেশ ও মানুষের কল্যাণে দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছে। তখনও কেউ কেউ প্রশ্ন কায়দা করে করতেন। যাতে শেখ হাসিনা বা আওয়ামী লীগের রাজনীতির অনুকূলে উত্তর যায়। সেটিরও মুন্সিয়ানা ছিলো। কূটনৈতিক কায়দা-কানুন ছিলো। আজকের মতো এতোটা নির্লজ্জ নগ্নতা ছিলো না। বঙ্কিম উপন্যাসের নায়িকার মতোন, সখী তুমি কার? দাসী চরণে আপনার অবস্থা আজ।

২০০৮ সালে ওয়ান ইলেভেনের (১/১১) চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নিজের কারিশমায় গণরায় নিয়ে কঠিন দুঃসময় পাড়ি দিয়ে শেখ হাসিনা যখন ক্ষমতায় ফিরলেন, হোয়াইট হাউজ স্টাইলে দিল্লি সফরের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাইরে সবুজ লনে কুয়াশা ভেজা শীতের বিকেলে সংবাদ সম্মেলন ডেকেছিলেন, সেইদিন প্রথম সকল সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক যারা দাঁড়ালেন তারা তৈলাক্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের গুণকীর্তনে তুমুল প্রতিযোগিতায় নামলেন সেটিও লাইভ প্রচার হয়েছিলো। ওয়ান ইলেভেনে যারা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে টকশো’তে কথা বলতেন, তাদের সঙ্গে উঠাবসা করতেন, তারাও তেলের নহর বইয়েছিলেন। সেই সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন এএফপির ঢাকা ব্যুরো প্রধান ফরিদ আহমেদ ছাড়া কেউ সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করেননি। ইত্তেফাক থেকে তাড়িয়ে দেওয়া এক সাহিত্তিক ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক প্রতিযোগিতায় কুলিয়ে উঠতে না পেরে নিজের লেখা কলাম পাঠ শুরু করলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অসীম ধৈর্য‌্য নিয়ে বারবার জানতে চাইলেন-প্রশ্ন কোথায়? প্রশ্ন কোথায়? তখন তিনি ভাষণ শুরু করলেন। বললেন, আপনাকে দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব নিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তখন রসিকতা করে বলছিলেন, আমাকে নেতৃত্ব দিচ্ছে কে? এরপরও এই নির্লজ্জরা থামেনি।

সেইদিন পেশাদার রিপোর্টাররা হাত গুটিয়ে সংবাদ সম্মেলনে চুপ করে বসেছিলেন। সামনে পাহাড়ের মতো তেলের বাটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিকদের অতিক্রম করে প্রশ্ন করার সাহস পাননি। এই চিত্র শুধু যে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয় বা গণভবনের আঙিনায় ডাকা সংবাদ সম্মেলনের চিত্র তা নয়। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনেও একই চিত্র দেখা গেছে। বিএনপির সুবিধাভোগী সাংবাদিকেরা এভাবেই গুণকীর্তন করে তেলের নদীতে চিরাচরিত চাটুকারিতায় সংবাদ সম্মেলন ভাসিয়ে দিতেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাইতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এতোটা মিডিয়াবান্ধব নন।

শেখ হাসিনার মতো তির্যক প্রশ্নের জবাব দিতেও তিনি অভ্যস্ত নন। তবুও এখনও খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলন লিখিত বক্তব্য পাঠ করেই শেষ করানো হয়। না হয় দলদাসদের গুটিকয়েক প্রশ্ন করার সুযোগ পায়। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজনীতি, মানুষ ও গণমাধ্যম। এমনিতেই গণমাধ্যম করপোরেট সংস্কৃতিতে এসে কোনো কোনো বিনিয়োগকারীর ব্যবসা-বাণিজ্য পাহারার মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে দিন দিন। একসময় গ্রামের স্বচ্ছল বা জোতদার বাড়িতে কুকুর পুষতেন। সেই কুকুর চোর-ডাকাতদের উপদ্রব থেকে তার এবং গ্রামের বাড়িঘর পাহারা দিতো। পরবর্তীকালে বাংলা সিনেমায় শোভা পেতো ঢাকার অভিজাত এলাকায় ধনাঢ্যদের বাড়ির গেটে লেখা: “কুকুর হতে সাবধান”। এখন সেটি সিকিউরিটিজ কোম্পানি দখলে নিয়েছে। একুশ শতকের সংবাদ বহু রৈখিক। পুঁজির বিনিয়োগ মোটা অঙ্কের যতো বাড়ছে, গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ না হয়ে গণমানুষের বাহন বা আয়না না হয়ে করপোরেট হাউজের সম্পদ পাহারা থেকে নানা মহলের সঙ্গে ক্ষমতাবানদের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি বা দরকষাকষি মাধ্যমে পরিণত হচেছ দিন দিন। আর ক্ষমতাবানেরাও ততোটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারেন।

গণমাধ্যমকে বলা হয়, ফোর্থ স্টেট। এটি একটি প্রতিষ্ঠান। এখান থেকেই চলমান সিনিয়ররা অনুজদের এমনিতেই বিভক্ত রাজনীতির দুইটি দলের ধারায় কর্মীর কাতারে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। গণমাধ্যমও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধই হচ্ছে না, মানুষের আস্থার জায়গা থেকেই সরছে না, নড়বড়ে হয়ে যাচেছ। এটা সরকার, বিরোধীদল, রাজনীতিই নয় রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের জন্য শুভ ও কল্যাণ বয়ে আনছে না। নেতিবাচক ইঙ্গিত বহন করছে। যারা সরকার বা রাজনৈতিক নেতাদের নানা পদক্ষেপ কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিতে চান, সমালোচনা করতে চান বা আনন্দে গদগদ হয়ে বুকের রক্ত ঢেলে দিতে চান তাদের জন্য গণমাধ্যম খোলা কলাম বা মুক্তমত, টকশোর ব্যবস্থা রেখেছে। এমনকি সরকার ও রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা মতবিনিময়ে ডাকলে সেখানে সকল আবেগ, অন্ধপ্রেম, ও মুগ্ধতা ঢেলে সমর্থন আর পরামর্শ দিতে পারেন।

এমনিতেই গণমাধ্যমে আকাল লেগেছে। কেউ তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আবুল মনসুর আহমদ, জহুর চৌধুরীর উত্তরাধিকারিত্ব বহন না করে শাসক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক শক্তির করুণাসৃত জীবন, পদ-পদবী, সরকারি প্লট, রাষ্ট্রীয় বিদেশ সফরসঙ্গী হবার জন্যই বেশি লালায়িত হচ্ছেন। কেউ কেউ টিভি, বেতারের মালিক হচ্ছেন! যা খুশী হন, যা করার করুন, প্রধানমন্ত্রী বা রাজনৈতিক নেতার সংবাদ সম্মেলন মূলত সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে জাতীয় সকল ইস্যুতে মানুষের তথ্য ও সত্য জানার অধিকারের জায়গা। সেই সংবাদ সম্মেলনকে গুণকীর্তনে, তৈলাক্ত ভাষণের মাধ্যমে সত্য জানার পথকে রুদ্ধ করে দেওয়ার দায়িত্ব কেউ নিতে পারেন না। সংবাদকর্মীদের এখন নিজেদের সতীত্ব রক্ষার সময়।

প্রধানমন্ত্রীসহ রাজনৈতিক জাতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে আবেদন, সংবাদ সম্মেলনে দেশি-বিদেশি পেশাদার রিপোর্টারদের ডাকুন। সিনিয়র সম্পাদক ও মালিকদের যেকোনো সময় চা-চক্রে মতবিনিময়ে ডাকুন, সংবাদ সম্মেলনে নয়। প্রধানমন্ত্রীসহ রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আবেদন, সংবাদ সম্মেলন হোক আপনাদের বক্তব্য আর সংবাদকর্মীদের সুনির্দিষ্ট প্রশ্ননির্ভর। না হয় আমাদের পেশাদারিত্বের সতীত্ব বলে আর কিছু থাকছে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি সবাইকে চিনি। কে, কোন কথা, কেন বলেন, মুখ হা করলেই টের পাই। প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় এটিও জানেন, আজ তিনি প্রধানমন্ত্রী বলেই ডাক দিতেই সংবাদ সম্মেলনের সামনের সারি দখল করে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে যারা তোষামোদ করছেন তারা এখন খালেদা জিয়া ক্ষমতায় নেই বলেই ওখানে যাচ্ছেন না। কাল ক্ষমতায় উনি আসলেই তারা সেখানে ছুটে যাবেন। এভাবে চললে যারা আওয়ামী লীগ-বিএনপির সঙ্গে কপাল বেঁধেছেন তাদের অসুবিধা নেই। কিন্তু যারা পেশাদারিত্বের সঙ্গে জীবন জড়িয়েছেন তাদের জন্য সর্বনাশ।

গণমাধ্যমকে প্রাতিষ্ঠানিকতার জায়গায় শক্তিশালী করতে আগামী দিনে সংবাদ সম্মেলন ডাকতে প্রধানমন্ত্রীকেই বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীকেই সংবাদকর্মীদের সতীত্ব রক্ষার দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, এটি রক্ষায় অনেক সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক ব্যর্থই হননি, নিজেদের সতীত্ব হারিয়েছেন। আর সংবাদকর্মীদের এখানে মেরুদণ্ড সোজা করে বসতে হবে। নড়তে হবে।

সৌজন্যে: পূর্বপশ্চিমবিডি.নিউজ