হে সাংবাদিক, আপনি এত মোসাহেব কেন?

Monday, 29/08/2016 @ 8:47 pm

:: লুৎফর রহমান হিমেল ::

lutfur rahman himelআমাদের গ্রামের শাহাবউদ্দিন মেম্বার। প্রয়াত এই ইউপি সদস্য আমার দূরসম্পর্কের নানা ছিলেন। তিনি পাঁচ পাঁচবার মেম্বার নির্বাচিত হয়েছিলেন। আমার শৈশব ও কৈশোরে ওনার অনেক শালিস-দরবারে উপস্থিত থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। তার শালিসে শেখার মতো অনেক কিছু থাকতো। তাই মিস করতাম না ওনার শালিস।

একবার প্রতিবেশী এক গ্রামে চোর ধরা পড়েছে। বিরাট মাঠে শালিস বসেছে। মানুষে গমগম করছে। মেম্বার নানা সবাইকে চুপ করতে অনুরোধ জানালেন। চোরকে তিনি কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চান। নানা চোরের কানের কাছে গিয়ে সেই প্রশ্নটি করলেন। চোরকে খুব লজ্জিত মনে হল। সবাই তখন জানতে চাইল, ‘মাতব্বর সাহেব। চোরকে আপনি কি বলেছেন যে তাকে ভীষন অনুতপ্ত দেখাচ্ছে?’

নানা তখন মৃদু একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘আমি চোরকে কঠিন কোনো প্রশ্ন করিনি। শুধু বলেছি, তুমি এতো চোর কেন? আমি জানি, এরচেয়ে বড় লজ্জা দেওয়ার মতো কোনো প্রশ্ন এখন তার জন্য জমা নেই।’ নানার এরকম সামান্য অথচ তীর্যক প্রশ্নের পর কোনো চোর আর জীবনে কখনো চুরি করেনি।

দুই.
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে দেশের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের মধ্যে তোষামোদির একটি প্রতিযোগিতা দেখলাম আমরা। এ নিয়ে দু’দিন ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় তোলপাড় চলছে। পাঠকরা হাহাকার করছেন সিনিয়র সাংবাদিকদের এহেন আত্মসমর্পন দেখে। অথচ প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে কোনো চাপ বা আক্রমণ ছিল না।

এরা নিজেরাই এদিন তোষামোদিতে পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন। সামান্য রুটি রুজির জন্য সমাজের শীর্ষমুখ এই বুদ্ধিজীবীদের এমন উন্মুক্ত মোসাহেবি আচরণ আমাদের বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিল। তাদের আচরণে বুদ্ধিজীবীর সংজ্ঞা নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে।

সাংবাদিকদের বিরাট একটি অংশের কারণে আজ এ পেশার প্রতি সবার শ্রদ্ধা এমনিতেই কমে গেছে। এখন লোভ-মোহ-স্বার্থহীন সাংবাদিক খুঁজতে হারিকেন লাগে। আমি পিআইডি’র একটি গবেষণা কাজের জন্য ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল নাগাদ এ দেশের সকল পত্রিকার উল্লেখযোগ্য ক্লিপিংস পড়ার সুযোগ পেয়েছিলাম।

সেই ক্লিপিংসগুলো পড়ে পাকিস্তান আমলেও অনেক সাংবাদিকের নির্মোহ, সাহসিকতার নমুনা দেখেছি তাদের লেখায়। তাদের লেখার বিশাল ভক্তশ্রেণী তৈরি হয়েছিল তখন। তাদের উপ-সম্পাদকীয়গুলোও ছিল এক কথায় ক্ষুরধার, তুলনাহীন। তাদের নির্ভীকতায়, তাদের চিন্তার স্বচ্ছতায়, তাদের জ্ঞানের গভীরতায় মুগ্ধ হতো পাঠক।

৮০’র দশকে মফস্বলের এক সাংবাদিকের লেখনীতে গোটা দেশের পাঠককূল যারপর নাই আকৃষ্ট হতেন। পাঠকরা তখন উন্মুখ হয়ে থাকতেন তার লেখা পড়ার জন্য। ৯০’র দশকেরও নির্ভীক-সৎ-দাপুটে সাংবাদিকরা এ ক্ষেত্রে বিচরণ করেছেন। আর এখন শাদা মনের নিবেদিতপ্রাণ, সৎ সাংবাদিকের সংখ্যা হাতের কড়া দিয়ে গোনা যায়।

এখন শাদাকে শাদা দেখনেওয়ালা, কালোকে কালো বলনেওয়ালা সাংবাদিকের বড় অভাব। অদ্ভূত এক মন্ত্রবলে সবাই পুতুল এখন। কেউ বিদেশ সফরের উপঢৌকনে, কেউ সামান্য মাসোহারার বিনিময়ে, কেউ প্লট-ফ্ল্যাট লাভের মাধ্যমে নিজেদের বিকিয়ে দিয়েছেন। সামান্য সংবাদ সম্মেলনে মানহীন বিস্কুট-কোক-পেপসি নিয়ে কাড়াকাড়ি করে খাওয়ার নজির আমরা প্রায়শই দেখি। যারা এভাবে বিকৃত-বিক্রিত, তাদের থেকে আমরা ‘মহান পেশার’ সার্ভিস আশা করতে পারি না।

তিন.
রামপাল নিয়ে যে সংবাদ সম্মেলনের সাংবাদিকতাটা আমরা দেখলাম, আমি মনে করি এটি বাংলাদেশে সাংবাদিকতা শিক্ষার সর্বোচ্চ অবনমনের স্তর বা ডিগ্রি। আমার শ্রদ্ধাভাজন এক শিক্ষক ইতোমধ্যে ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘এই সাংবাদিকতা ক্লাসে শেখানো সম্ভব নয়! আজকের সংবাদ-সম্মেলনের ভিডিও নথি প্রত্যেক সাংবাদিকতা বিভাগে সংরক্ষণ করা হোক।’

বিষয়টি যে ক্ষোভের প্রকাশ, সন্দেহ নাই। তিনি যেই ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক সেই ডিপার্টমেন্টের ছাত্ররা প্রধানমন্ত্রীকে যেভাবে হাজার শব্দের রচনামূলক প্রশ্ন করলেন, তাতে ওনার ‘বিষম প্রতিক্রিয়া’ হওয়ারই কথা।

আমি নিজেও সেই বিষয়ের সাবেক ছাত্র। আমিও এদিন সংবাদ সম্মেলন দেখব বলে আগেভাগেই টিভি খুলে বসেছিলাম। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন মিস করা যায় না। অন্য সময় হলে আমি হয়তো এ রকম সংবাদ সম্মেলন এড়িয়ে যেতাম এবং সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারদের বলতাম রিপোর্টটি কাভার করতে।

কিন্তু এদিন কি দেখলাম! সিনিয়র সাংবাদিকরা মোসাহেবিতে অতীতের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেন। যেসব সিনিয়র একে একে প্রশ্ন করতে উঠে দাঁড়ালেন তারা প্রশ্নতো করলেনই না, বরং সরকারের সিদ্ধান্তের সমর্থনে দিয়ে চললেন অপ্রাসঙ্গিক বক্তৃতাবাজি। কারো তরফে কোনো গঠনমূলক প্রশ্ন বেরিয়ে এল না।

অথচ প্রধানমন্ত্রী কয়েকদিন আগেই সাংবাদিকদের ‘গঠনমূলক সমালোচনার’ আহ্বাণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো সাংবাদিক সে পথে গেলেন না। দেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিকদের এহেন সাংবাদিকতা দেখে ‘সাংবাদিক সম্মেলন’ আর ‘সংবাদ সম্মেলনের’ সংজ্ঞাই গুলিয়ে ফেললাম।

চার.
সাংবাদিকতাকে মহান পেশা বলা হয়। যখন মহান শব্দটার অর্থই বুঝতাম না, তখন সেই ছোটকাল থেকে শুনে আসছি কথাটা। তবে এখন বুঝি, পেশাটাকে মহান রাখতে গেলে সাংবাদিককেও মহান হতে হয়। সেই মহান হয়ে উঠার জন্য সাংবাদিককে অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয়, ঝড়ঝাপটা সইতে হয়।

জীবিকার জন্য সৎ থাকার নিরন্তর দুঃসহ এক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। এই যুদ্ধটা করতে গিয়ে অনেক সময় তিনি খেই হারান। তিনি কথিত সুশীলের খাতায় নাম লেখান। অর্থকড়ির পেছনে ছোটেন। ক্ষমতাসীনের স্বার্থ, কর্পোরেট পুঁজির রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এভাবে তার মহান হবার পথ রুদ্ধ হয়। কিন্তু পাঠকসমাজে তিনি নিজেকে সেই মহান বুদ্ধিজীবি সাংবাদিক হিসেবেই পরিচয় দেন।

তখনই মূলত শুরু হয় সমস্যার। পাঠকসমাজ মনে করে, তিনি মহান বুদ্ধিজীবি সাংবাদিকই আছেন। আসলে তিনি ক্ষমতাসীন দলের বা কর্পোরেট স্বার্থের পক্ষের সুশীল হয়ে গেছেন ততদিনে। এই দু’য়ের পার্থক্য আসল রূপচাঁদা আর নকল রূপচাঁদা মাছের মধ্যকার বিভ্রান্তির মতো। দুটোর স্বাদ আকাশ আর পাতাল।

পুনশ্চ:
এই ক্ষণে মেম্বার নানার মতো স্বজাতি জ্যেষ্ঠদের উদ্দেশ্যে বলতে ইচ্ছে করে, ‘হে সাংবাদিক! আপনি এতো মোসাহেব কেন?’

লুৎফর রহমান হিমেল : কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।
himel_tangail@yahoo.com

সৌজন্যে: পরিবর্তনডটকম