গণমাধ্যমের ক্রমবিকাশ

Wednesday, 13/07/2016 @ 11:40 pm

:: এবিএম মূসা ::

ABM-Musaদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন সংবাদমাধ্যম বলতে ছিল চারটি অর্পিত সম্পত্তি তথা পরিত্যক্ত সংবাদপত্র, একটি উত্তরাধিকারী সূত্রে প্রাপ্ত টেলিভিশন, আর একটি রেডিও। ছিল তিনটি ব্যক্তিমালিকানাধীন দৈনিক। বঙ্গবন্ধুর শাসন আমল, বাকশাল, জিয়া-এরশাদের শাসনামল, এ দেশের বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস আলোচনা করার জন্য যে পরিসর দরকার, তা এখানে নেই।

শুধু সাম্প্রতিক কালের গণমাধ্যম নিয়ে একটুখানি আলোচনা করা যাক। দীর্ঘ ৩৯ বছরে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে: মালিকানা তথা প্রকাশনা জগতে, পেশাদারির নৈপুুুুুণ্য ও বৈচিত্র্যে এবং কারিগরি, যান্ত্রিক ও প্রকৌশল প্রয়োগে ইলেকট্রনিক মিডিয়া বেসরকারি টেলিভিশনের বিস্তার ঘটেছে। অন্যদিকে, দায়বদ্ধতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে নতুন চেতনার উদ্ভব ঘটেছে। প্রথমটি সম্পর্কে বলব, এখন এ গণমাধ্যম সামগ্রিকভাবে একটি প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক উদ্যোগ। এখন শুধু ব্যক্তিগত উদ্যোগে নয়, বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গণমাধ্যম প্রকাশনায় সংশ্লিষ্ট হয়েছে। অতীতের রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক সাংবাদিকতাও এখন অনেকখানি গৌণ, অর্থনৈতিক বিশ্বায়নের কাছে সমর্পিত।

এরশাদ শাসনামলের শেষের দিকে সরকারি নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে একাধারে তিন দিন সংবাদপত্র বন্ধ রেখেছিলেন সাংবাদিক সমাজ। আইয়ুব আমলেও ১৯৬২ সালে সংবাদপত্র প্রকাশনা ও সংবাদ পরিবেশনা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কালো আইন হয়েছিল। সম্পাদক-সাংবাদিক মালিক সম্মিলিত আন্দোলনের কারণে আইনটি সংশোধন করা হয়। সংবাদপত্র প্রকাশনা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রণীত এই আইন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার নতুন নামে কঠোরতর বিধান অন্তর্ভুক্ত করে পুনঃপ্রণয়ন করে। সেই আইনটি এখনো আছে, তবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অনেকাংশে সংশোধন করেন। এখনো সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে সক্ষম সরকারের হাতে এমন অর্ধশতাধিক আইনি পদ্ধতি রয়েছে। তা সত্ত্বেও বলব, পৃথিবীর অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম অনেকটাই স্বাধীন এবং এই স্বাধীনতার অনেকটাই সাংবাদিক সমাজ নিজেরা চর্চা করে যেমন আদায় করে নিয়েছেন, তেমনি এটা গণতান্ত্রিক পরিবেশের সুফল হিসেবে লাভ করা গেছে। এখন গণমাধ্যমের প্রায় পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা সব মহলে তাদের দায়বদ্ধতার প্রশ্নটিকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। সামরিক আমলে অথবা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে দায়বদ্ধতা ছিল শুধু শাসকের তথা সরকারের কাছে। এখন দায়বদ্ধতা নিজের বিবেকের কাছে, পাঠকের কাছে, এমনকি গণমাধ্যমের বাহনগুলোর নীতিনির্ধারক মালিকদের কাছে।

স্বাধীনতা-পূর্বকালে শুধু রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গণমাধ্যমের একটি নির্দিষ্ট ভূমিকা ছিল। স্বাভাবিক কারণেই সেই রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতিও একান্তভাবে জড়িত ছিল। বাঙালির দীর্ঘ কয়েক যুগের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই এই বক্তব্যের গুরুত্ব ও বিশেষত্ব অনুধাবন করা যাবে। এখন গণমাধ্যম রাজনীতি-অর্থনীতির ক্ষেত্রে যতখানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, ঠিক ততখানি দায়িত্ব পালন করছে সমাজ-সচেতনতা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন, সামাজিক অবক্ষয় রোধে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। এই প্রসঙ্গে এসিড নিক্ষেপ, বখাটেপনা প্রতিহত করার জন্য জনমত গঠন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরবর্তী সেবা কার্যক্রম ইত্যাদি উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যেতে পারে। মুদ্রিত ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কৃষি, বিজ্ঞান ও শিক্ষা, ব্যক্তি-উদ্যোগবিষয়ক প্রতিবেদন অধিকতর গুরুত্ব পাচ্ছে। স্বাধীন দেশের গণমাধ্যম প্রতিবাদী-সমালোচকের ভূমিকা গ্রহণের পাশাপাশি উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচার, প্রসার, উৎসাহ প্রদান ও উদ্দীপনা সৃষ্টিতে প্রশংসনীয় অবদান রেখে ব্যতিক্রমী সাংবাদিকতা প্রতিষ্ঠা করেছে। পাঠকের রুচিবোধ, গণমাধ্যমের কাছে চাহিদারও রূপান্তর ঘটেছে। এই বিবর্তনকে স্বাধীন দেশের নবযুগের উন্মেষ বলা যায়।

সর্বশেষ সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম নিয়ে আমার সংক্ষিপ্ত আলোচনায় অবশ্য সাংবাদিকদের জীবনধারায় পরিবর্তনের বিষয়টি অবশ্যই স্থান পাবে। গত দু-তিন দশকে গণমাধ্যমের ব্যাপক ও ত্বরিত বিস্তারের কারণে সাংবাদিক জগতে বিভিন্ন ধরনের স্বার্থসংশ্লিষ্টতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাংবাদিকদের মধ্যে বিভক্তি, অতিমাত্রায় রাজনৈতিক মেরুকরণ ব্যক্তিস্বার্থ সাংবাদিকতার স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। গণমাধ্যমের ভাবমূর্তি একটুখানি বিনষ্ট করেছে। এত সব সত্ত্বেও বলব, স্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমানকালে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা ক্রান্তিকাল পেরিয়ে প্রযুক্তির বিস্তারে পেশাগত মানোন্নয়নে ও সর্বসাধারণ্যে প্রচার ও প্রভাব বিস্তারে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। এই অগ্রযাত্রা দেশের বিদ্যমান গণতান্ত্রিক পরিবেশের কারণেই সম্ভব হয়েছে।

এবিএম মূসা: সাংবাদিক
(লেখাটি ০১-০১-২০১১ তারিখে প্রথম আলো’য় প্রকাশিত)