একজন রীমা এবং একজন নচিকেতা…

Saturday, 23/01/2016 @ 4:58 pm

:: মোরশেদ তালুকদার ::

Morshed Talukdar‘ডাক্তার মানে সেতো মানুষ নয়
আমাদের চোখে সেতো ভগবান
কসাই আর ডাক্তার একইতো নয়
কিন্তু দুটোই আজ প্রফেশান
কসাই জবাই করে প্রকাশ্য দিবালোকে
তোমার আছে ক্লিনিক আর চেম্বার
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার।’

সেই ২০০৪ সালে ডাক্তার সম্পর্কে তাঁর শ্রোতাদের গানে গানে কিঞ্চিত ধারণা দেয়ার চেষ্টা করেছিলেন দুই বাঙলার জনপ্রিয় শিল্পী নচিকেতা। তখন কলকাতার ডাক্তার সমাজ গানটি নিয়ে প্রকাশ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন কী না আমার জানা নেই। তবে তারা যে মনে মনে নচিকেতার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করেছিলেন তাতে আমি নিশ্চিত। সেই সময়কার কোন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে নচিকেতা হয়তো গানটি গেয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় এক যুগ পরে এসেও গানটির সমকালীন বাস্তবতা বিদ্যমান; অন্তত বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে। বিশেষ করে গত ২০ জানুয়ারি থেকে চট্টগ্রামের ‘ডাক্তার সমাজ’ যখন ধর্মঘট আহবানের মধ্য দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম থেকে বিরত রয়েছেন এবং এর ফলে সাধারণ রোগীরা কষ্ট পাচ্ছেন তখন একযুগ আগের গানটি আবারো বর্তমান হয়ে উঠে। অন্তত আমার কাছে।

২. ডাক্তাররা মানুষ। তাই তারাও ভুল করবেন। একইভাবে আর দশজন পেশাজীবী মানুষ যেভাবে তাদের কর্মস্থলে অবহেলা করেন সেভাবে ‘পেশাজীবী ডাক্তাররা’ও তাদের পেশাগত জায়গায় অবহেলা করতেই পারেন। হতে পারে এ অবহেলা ‘অবচেতন মনে’ কিংবা অর্থের প্রতি অতি লোভ থেকে। এখন প্রসঙ্গটি যখন অবহেলার তখন অন্যান্য পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিষ্ঠান এ অবহেলাকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন। কিন্তু যেসব চিকিৎসক স্বাধীনভাবে তাদের ডাক্তারি পেশা চালিয়ে যান তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থা নিবে? যদি একজন চিকিৎসক কোন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে রোগী দেখেন তখন অবহেলার জন্য ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারেন। কিন্তু এখানেও সমস্যা থেকে যায়। কারণ, অনেক সময় ওই চিকিৎসা কেন্দ্রের সেই ডাক্তারই অবহেলা করেছেন যিনি খোদ প্রতিষ্ঠানটির মালিক। তখন?

এমন পরিস্থিতিতে পেশাগত জায়গায় চিকিৎসক অবহেলা করেছেন অভিযোগ এনে একজন ভুক্তভোগী বা তার স্বজনরা আদালতের দ্বারস্থ হতেই পারেন। যেমনটি করেছেন একজন বাবা। চিকিৎসকের অবহেলায় তার মেয়ের মৃত্যু হয়েছে দাবি করে তিনি গত ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা করেন।

এখানে আরেকটু স্পষ্ট করার জন্য সংবাদপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে পারি, ‘গত ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বেসরকারি হাসপাতাল ‘সার্জিস্কোপে’ প্রসব পরবর্তী মারা যান মেহেরুন্নেসা রীমা (২৫) নামের এক গৃহবধূ। রীমা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি’র ছোট ভাইয়ের মেয়ে। চিকিৎসকের অবহেলায় রীমার মৃত্যু হয়েছে দাবি করে ওইদিন রাতে সার্জিস্কোপ হাসপাতাল ভাঙচুর করে নিহতের স্বজনেরা। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শামীমা সিদ্দিকী রোজি ও তাঁর স্বামী মাহবুবুল আলমের বিরুদ্ধে ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে মামলা করেন রীমার বাবা খায়রুল বাশার’।

৩. রীমার বাবার দায়ের করা মামলাটি কোনভাবে অযৌক্তিক হতে পারে না। অথচ মামলটিকে ‘হয়রানিমূলক’ মন্তব্য করে এর প্রতিবাদে ২০ জানুয়ারি বিকেল থেকে হঠাৎ করে সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অপারেশনসহ সব ধরনের চিকিৎসা সেবা বন্ধ রাখে চিকিৎসকরা। পাশাপাশি ব্যক্তিগত চেম্বারেও রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছেন তারা। এতে চিকিৎসকদের কিছু না হলেও সাধারণ রোগীরা দুর্ভোগে পড়েছেন।

আমার ধারণা, চিকিৎসকরা মামলার বিষয়টিকে তাদের আত্মসম্মানে আঘাত বিবেচনা করে এ ধরনের কর্মসূচী চালিয়ে যাচ্ছেন। অবশ্যই এ পেশার লোকজনকে অতীতেও এ ধরনের কার্যক্রমে অংশ নিতে দেখেছি বহুবার। পান থেকে চুন খসলেই ইন্টার্ন চিকিৎসকদের কর্মবিরতিতে যাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চয় আপনারা অসংখ্যবার খেয়াল করেছেন।

এবার আসি, পরিবারের দাবি অনুযায়ী চিকিৎসকের অবহেলায় মারা যাওয়া মেহেরুন্নেসা রীমা প্রসঙ্গে। যেসব চিকিৎসক দায়ের করা মামলটিকে হয়রানিমূলক দাবি করছেন তাদের বিনয়চিত্তে বলছি, বিষয়টি যখন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে তখন ওখানেই যান আপনারা। আদালতেই প্রমাণ করুন এ মামলা ‘হয়রানিমূলক’। যখন যাচ্ছেন না তাতে আমরা তো এটাই বলেতে পারি, ‘হয়রানিমূলক’ শব্দটি মুখে উচ্চারণ করলেও এতে আপনাদের মনের জোর নেই। কারণ, হয়তো আপনারাও বিশ্বাস করেন একজন চিকিৎসক সবার আগে মানুষ এবং একজন মানুষ হিসাবে তিনি ভুল বা অবহেলা করতেই পারেন।

৪. আমার মা মারা গিয়েছিলেন যখন আমি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। আমার মায়ের মৃত্যু হয়েছিল একজন গ্রাম্য চিকিৎসকের অবহেলায়। তখন ছোট ছিলাম বুঝতে পারে নি। এতবছর পর সেটা উপলব্ধি করতে পারি। চিকিৎসকের অবহেলায় মায়ের মৃত্যু হয়েছিল বলে ডাক্তারদের উপর আমার অবিশ্বাস যেমন নেই তেমনি তাদের প্রতি কোন ক্ষোভও নেই। এখনো তারা আমার কাছে নমস্য। অসুস্থ্য হলে তারায় শেষ ভরসা। কিন্তু মাঝেমধ্যে তারাও অন্যান্য পেশাজীবীদের মত অবহেলা করতে পারেন সেটা আমি বিশ্বাস করি এবং মন থেকে।

রক্তের দিক দিয়ে আমার খুব নিকটাত্মীয়ের মধ্যে অনেক চিকিৎসক আছেন। এদের মধ্যে স্বাস্থ্য ক্যাডারও (বিসিএস হেলথ) আছেন। অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও আছেন চিকিৎসক। এলাকায়ও আছেন অনেকে। বন্ধু মহলেও ডাক্তার আছেন। আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড লিস্টেও আছেন কয়েকজন ডাক্তার। তবুও আমি জোর গলায় বলব, ‘একজন চিকিৎসক যখন পেশাজীবী তখন তিনি অবচেতন মনে ভুল করতে পারেন। একজন চিকিৎসক যখন পেশাজীবী তখন তিনি স্বেচ্ছায় হোক অনিচ্ছায় হোক অবহেলা করতে পারেন। অতএব অন্যান্য পেশাজীবীরা যেমন ভুল করলেও শাস্তির আওতায় আসেন তেমনি একজন পেশাজীবী চিকিৎসকের ভুল বা অবহেলার জন্য শাস্তি দাবি করা যেতেই পারে। তা নাহলে সাধারণ মানুষরা একসময় প্রশ্ন করবে, চিকিৎসকরা কি আইনের উর্ধ্বে?

৫. ব্যক্তিগতভাবে ঘনিষ্ট একজন চিকিৎসক আমাকে একবার বলেছিলেন, অপারেশনের মধ্য দিয়ে একজন মা যখন সন্তান প্রসব করেন তখন ওই মায়ের স্বাস্থ্যগত নানা ঝুঁকি থাকে। কিছু সময় পার হলে স্বাস্থগত কন্ডিশনও পরিবর্তন হয়। এপরিবর্তন হয়তো ইতিবাচক নয়তো নেতিবাচক তথা স্বাস্থ্যগত অবনতি। এক্ষেত্রে যে চিকিৎসক অপারেশন করিয়েছেন তার দায়িত্ব হচ্ছে তার রোগীকে পর্যবেক্ষণে রাখা। যদি তিনি অপারেশন করে বাসায় চলেও যান তবুও হাসপাতাল বা ক্লিনিকের সেবিকাদের মাধ্যমে বা হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক কিংবা অন্যান্য কর্তব্যরত চিকিসকের মাধ্যমে রোগীর বিষয়ে খবর নেয়া এবং দিকনির্দেশনা দেয়া। এককথায় মনিটরিং করা তার দায়িত্ব। কিন্তু একাজটি অনেক সময় করেন না সংশ্লিষ্ট রোগীর চিকিৎসক। যা অনেক সময় বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।

মনিটরিংয়ের জায়াগায় একজন চিকিৎসকের অবহেলার কারণ জানতে চাইলে আমার পরিচিত সেই চিকিৎসক আমাকে বলেছেন, ‘অনেক সময় বিজ্ঞ ডাক্তাররা একজন রোগীকে অপারেশন করিয়ে অন্য আরেকজনের অপারেশন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে সেবার চাইতেও অনেক সময় আর্থিক বিষয়টিই বড় হয়ে উঠে’।

পরিচিতি ডাক্তারের এ বক্তব্যের সূত্রে চলুন আবারো ফিরে যায় নচিকেতায়…

`ও ডাক্তার, ও ডাক্তার…
তুমি কতশত পাস করে এসেছ বিলেত ঘুরে
মানুষের যন্ত্রণা ভোলাতে, ও ডাক্তার, ও ডাক্তার…
তোমার এম.বি.বি.এস নানা এফ.আর.সি.এস
বোধহয় এ টু জেড ডিগ্রী ঝোলাতে, ও ডাক্তার, ও ডাক্তার…
ডাক্তার মানে সেতো মানুষ নয়
আমাদের চোখে সেতো ভগবান
কসাই আর ডাক্তার একইতো নয়
কিন্তু দুটোই আজ প্রফেশান
কসাই জবাই করে প্রকাশ্য দিবালোকে
তোমার আছে ক্লিনিক আর চেম্বার
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার।।
ডাক্তার চাইবেন রক্ত রিপোর্ট,
ক্লিনিকের সন্ধানও তিনিই দেবেন
একশত টাকা যদি ক্লিনিকের বিল
অর্ধেক দালালী তিনিই নেবেন
রোগীরা তো রোগী নয় খদ্দের এখন
খদ্দের পাঠালেই কমিশান
ক্লিনিক আর ডাক্তার কী টুপি পড়াচ্ছে
বুঝছেনা গর্দভ জনগন
কসাই জবাই করে প্রকাশ্য দিবালোকে
ওদের আছে ক্লিনিক আর চেম্বার
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার।।
নিজেদের ডাক্তার বল কেন?
তার চেয়ে বলনাকো ব্ল্যাকমেলার
রোগীর আত্মীয়দের ঘটি বাটি চাটি করে
করো সুযোগের সদ্ব্যবহার
সরকারি হাসপাতালের পরিবেশ
আসলেতো তোমরাই করছো শেষ
হাসপাতাল না থাকলেই জনগন
নার্সিং হোমে যাবে অবশেষ
সেখানে জবাই হবে উপরি কামাই হবে
মানুষের সেবার কী দরকার!
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার।।
বাঁচানোর ক্ষমতাতো তোমারই হাতে
তুমি যদি মারো তবে কোথা যাই
অসহায় মানুষের তুমিইতো সবকিছু
করজোড়ে নিবেদন করছি তাই
তোমার গৃহিনী যে গয়না পড়েন
দেখেছ কী তাতে কত রক্ত
তোমার ছেলের চোখে দেখেছ কী
কত ঘৃণা জমা অব্যক্ত
তোমারও অসুখ হবে, তোমারই দেখানো পথে
যদি তোমাকেই দ্যাখে কোন ডাক্তার
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার!!’

লেখক: স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।