পাঠ্যপুস্তকে সাংবাদিকের প্রতিবেদন, প্রণব বল’কে অভিনন্দন

Wednesday, 06/01/2016 @ 1:44 am

:: সিদ্দিক আহমেদ ::

newsmediaসংবাদপত্রে প্রতিদিন প্রতিবেদন ছাপা হয়। প্রতিবেদনেরও অনেক রকমফের আছে। এই পার্থক্য হল নিউজ ও ফিচারে। নিউজের গঠন কাঠামো এক ধরনের আর ফিচারের গঠন বিন্যাস ভিন্ন আদলের। পত্রিকা মানেই নিউজ এন্ড ফিচার। প্রতিদিনই পত্রিকায় নিউজ ছাপা হয়। ফিচার ছাপা হয়। পাঠকরা নিউজ বা সংবাদের জন্যই পত্রিকা কিনেন। সব পাঠক ফিচার পড়েন না। কিছু পাঠক আছেন যারা পত্রিকার আদ্যপানত্ম পড়েন। পত্রিকায় সম্পাদকীয় থাকে। কোনো কোনো পত্রিকায় সম্পাদকীয় থাকে না। ফিচারধর্মী লেখা ছাপা হয়। কোনো কোনো পত্রিকায় তাও থাকে না। শুধু নিউজ, শুধু সংবাদ।

পত্রিকায় ফিচারের জন্য আলাদা জায়গা নির্দিষ্ট করা থাকে। কোনো কোনো পত্রিকায় আবার এই নির্দিষ্টতা নিয়ে বাতিক নেই। জিনিস থাকলেই হলো। পাঠক/ পাঠিকার পছন্দের বিষয় থাকলেই হলো। অনেক পত্রিকায় থাকে শুক্রবারের বিশেষ প্রতিবেদন কিংবা অমুক দিনে বিশেষ প্রতিবেদন নামে চমৎকার কোনো প্রতিবেদন। এগুলোকে পুরোপুরি সংবাদও বলা যাবে না, প্রতিবেদনও বলা যাবে না। এগুলোর উপস্থাপন আলাদা। এই লেখার ঘরানাও আলাদা। এই ধরনের লেখাকে কেউ কেউ রিপোর্টাজ বলেন। বস্তুতঃ সব লেখালেখির উদ্দেশ্য কিংবা লক্ষ্যই হলো পাঠক। পাঠকের শ্রেণী বিভাগ আছে। থাকতেই হবে। সমাজেই তো শ্রেণী বিভাজন আছে, সেটা অবশ্য অর্থনৈতিক শ্রেণী বা ইকোনোমিক ক্লাস। পাঠকদের মধ্যেও বোধ জ্ঞানের শ্রেণী বিভাজন থাকে। এটা না থাকলে এতো বিচিত্র ধরনের লেখালেখি হতো না। বিচিত্র ধরনের পাঠকও পাওয়া যেতো না। পাঠ্যাভ্যাসের ব্যাপারটাও থাকতো না।

পত্রিকার রিপোর্টাজগুলো পাঠে মন ছুঁয়ে যায়। প্রতিবেদন রচয়িতা চান পাঠক আক্রানত্ম হোক। তার বোধে ঘা লাগুক। কোন রিপোর্টাজ পাঠে পাঠক খুশিতে ঝলঝলিয়ে উঠুক। আবার কোন প্রতিবেদন পাঠ করে পাঠক উত্তেজিত হয়ে উঠুক। রাগে গরগর করুক। অজানেত্মই তার হাত দুটি মুষ্টিবদ্ধ হোক এবং ক্রোধে চিৎকার দিয়ে উঠুক তার কোন পাঠক পাঠিকা। অনেক প্রতিবেদনকারী গোপনে এমন ধরনের ইচ্ছে পোষণ করতে পারেন। ব্যক্তিগতভাবে বলতে পারি রিপোর্টাজধর্মী লেখা বরাবরই পড়তে ভালোবাসি। বিখ্যাত পরিচয় পত্রিকা (সাহিত্য পত্রিকা) বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশকে নিয়ে একটা সংখ্যা করেছিল। যেখানে দীপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের (তখন তিনি পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন) একটা অসাধারণ রিপোর্ট করেছিলেন বাংলাদেশের জন্মকে স্বাগত জানিয়ে। এটা এক অনন্যসাধারণ রিপোর্টাজ। একই লেখকের আর একটা অসাধারণ লেখা পড়েছিলাম। ভিয়েতনামের জনগণের বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে রচিত হয়েছিল প্রতিবেদনটি। দীপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় অনেক পরিচয়, তার অনেক কীর্তি। আজকের লেখায় তিনি মুহূর্তের উপলক্ষ মাত্র। তবে তার ‘রিপোর্টাজ’ গ্রন্থটি পাঠ করার জন্য তরুণ সংবাদ কর্মীদের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে। এই মুহূর্তে আর একটি বইয়ের কথা বলতে চাই। বইটি এখন পাওয়া যায় না। কোন পুনঃমুদ্রণ হয়েছে এমন সংবাদ আমার জানা নেই। বইটির নাম হলো- ‘একসঙ্গে’। বইটির লেখক গোলাম কুদ্দুস। তেভাগা আন্দোলনের দেশ কাঁপানো নেত্রী ইলা মিত্রকে নিয়ে তার একটি বিখ্যাত কবিতা আছে। আইপিটিএ’র অনেক আয়োজনে এই কবিতাটি আবৃত্তি করতেন বিখ্যাত নট শম্ভু মিত্র। বিখ্যাত গায়ক ও সঙ্গীত পরিচালক জ্যোতিন্দ্রনাথ মৈত্রের কবিতা- মধু বংশীর গলি তো শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে আর গলি থাকতো না, জাগরণের মাঠ হয়ে যেতো।

তেভাগা আন্দোলনের রিপোর্ট করতে পাঠানো হয়েছিল দৈনিক স্বাধীনতার রিপোর্টার গোলাম কুদ্দুসকে। সেই পাঠানো প্রতিবেদন দিয়েই প্রকাশিত হয়েছিল একসঙ্গে বইটি। তরুণ সাংবাদিকরা বইটি খুঁজে দেখতে পারেন। সংবাদপত্রের প্রতিবেদন নিয়ে, সংবাদপত্রে প্রকাশিত লেখা নিয়ে বিশ্বে গ্রন্থ প্রকাশের চল আছে। স্পোর্টস বিষয়ে একটা বই আমি পড়েছি। বিখ্যাত সব স্পোর্টস প্রতিবেদনের সংকলন। নানা পত্রিকা থেকে সংকলিত। স্পোর্টস প্রতিবেদন লিখতে হলে এটা একটি অতি উন্নত মানের গাইড-বুক। তেমনি ভ্রমণ নিয়ে লেখালেখির একটা সংকলন আমি এখন মুগ্ধ হয়ে পাঠ করছি।

বিদেশি দৈনিক পত্রিকার ছাপানো প্রতিবেদনের বছাইকৃত একটি প্রতিবেদন সংগ্রহ কিংবা সংবাদ সংগ্রহ মাসওয়ারী ছাপা হতো। এখন হয় কিনা জানিনা। নাম রাখা হতো ক্যাপসুল। সংক্ষিপ্ত আকারে মাসের বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ও প্রতিবেদনগুলোর সংগ্রহ। ব্রিটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরী যখন লালদীঘির পাড়ে ছিল তখন সেখানে দেখেছি দুনিয়া কাঁপানো সংবাদ, সম্পাদকীয় ও সংবাদ বিশ্লেষণ নিয়ে বছরভিত্তিক সংকলন। বছরের সেরা সংবাদ প্রতিবেদনের সংগ্রহ। সংবাদকর্মীরা তাতে নিশ্চয়ই উপকৃত হতেন। নিশ্চয়ই এখনো তেমন গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। আমরা পাঠ করার সুযোগ পাইনা উন্নত গ্রন্থাগারের অভাবে।

বাংলাদেশে এখন উন্নতমানের পত্রিকা ছাপা হচ্ছে। দেশ বিদেশের বিষয় নিয়ে এসব পত্রিকায় উন্নতমানের প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে। এসব নিয়ে কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে জানা নেই। সম্ভবত ডেইলি স্টার এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।

ডেইলি স্টারের দুই সংকলন গ্রন্থের কথা জানি। একটা হলো স্বাস্থ্য বিষয়ক ‘হ্যাভ এ নাইস ডে’। এটা ডেইলি স্টারে ১৯৯৯ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ডা. রবিউল মোর্শেদ-এর লেখা স্বাস্থ্য বিষয়ক টিপস-এর সংকলন। চমৎকার এবং উপাদেয়ও বটে। অন্যটি ডেইলি স্টারের শুক্রবারের ম্যাগাজিনের চিনটিটোর বিষয় ও উপস্থাপন সমৃদ্ধ লেখায় সংকলন। মাঝে প্রশ্ন আগে এই চিনটিটো কে হন। তিনি কি সম্পাদক মাহফুজ আনাম? ৬৮-৭১ সাল পর্যন্ত আমি ঢাকায় ছিলাম। মাহফুজ আনামের সমসাময়িকদের পরিমণ্ডলেই ছিলাম। তখন তার বন্ধুরা তাকে টিটো নামেই ডাকতেন।

যথেষ্ট পরিচিত প্রথম আলোয় প্রকাশিত খবর ও প্রতিবেদনের কোন সংকলন আছে বলে আবার জানা নেই। তাদের একটা নিজস্ব বানান বিধির বই আছে জানি। প্রথম আলোর অনেক ভালো রিপোর্ট আছে। বাৎসরিক একটা গ্রন্থ প্রকাশ করতে পারে, যখন তাদের নিজস্ব একটা প্রকাশনা সংস্থা যথেষ্ট দাঁড়িয়ে গেছে। তবে বলতে কি প্রথম আলো যথেষ্ট সৌভাগ্যবান। পাঠকপ্রিয়তার কথা আমি বলছিনা। এটা তাদের দাবির ব্যাপার। পত্রিকার ২০১১ সালে প্রকাশিত তিনটি প্রতিবেদন এ বছরের পাঠ্য বইতে স্থান পেয়েছে। তার মধ্যে দুটো হলো শিক্ষা ক্ষেত্রে সফল অদম্য মেধাবী দুজনের কথা। ষষ্ঠ শ্রেণীর পাঠ্যবই ‘কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা’তে প্রতিবেদন দুটো ছাপা হয়েছে। বলতেই হয় বাংলাদেশের পাঠপুসত্মকে এমন ধরনের লেখা অবশ্যই নতুন সংযোজন। এজন্য শিক্ষামন্ত্রি, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুসত্মক বোর্ডের কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানাই। ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবেদন দুটো পাঠ করে অনুপ্রাণিত হবে। এমন প্রত্যাশা থেকেই প্রতিবেদন দুটো ছাপা হয়েছে। পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের এই প্রত্যাশা পূরণ হোক।

যে দুজন সাংবাদিকের প্রতিবেদন ষষ্ঠ শ্রেণির উল্লেখিত গ্রন্থে ছাপা হয়েছে তাদের একজন আমাদের চট্টগ্রামের প্রণব বল। প্রণব, তোমাকে অভিনন্দন। নিশ্চয়ই তোমার সঙ্গী সাথী, পত্রিকার কর্তৃপক্ষ তোমাকে জবর অভিনন্দন জানিয়েছে। চোখে আলোহীন এক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী কিশোরকে তুমি পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছো। তুমি এক অসাধারণ জীবনাচারকে তুলে এনেছো। পাঠ্যপুস্তকে এই কাহিনী ছাপা হয়েছে। সারাদেশের কয়েক লক্ষ শিশু রাব্বীর সঙ্গে তোমার নামটাও মনে রাখবে। প্রণব জীবনে আর কী চাই। পাঠ্যপুস্তকে তোমার একটা সংবাদ প্রতিবেদন? প্রণব- তুমি গভীর রাতে চোখ বন্ধ করে বিষয়টি চিন্তা করে দেখোতো। আমি জানি তুমি গভীর গোপন এক সুন্দর আলোয় ভাসবে। তুমি আমাদেরও আলোয় ভাসালে।

বাংলাদেশের যে কোন স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর ক্লাসে ঢুকে তুমি বলবে- আমি প্রণব বল। নিশ্চয়ই সব ছাত্রছাত্রী দাঁড়িয়ে তোমাকে অভিবাদন জানাবে। মাই-ডিয়ার প্রণব, তোমার আর কী চাওয়ার থাকতে পারে?

সৌজন্যেঃ দৈনিক আজাদী।