অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন কতটা আইনসম্মত?

Monday, 07/12/2015 @ 9:20 pm

:: আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব ::

newspaper_onlineতথ্য অধিদফতর সম্প্রতি এক তথ্য বিবরণীর মাধ্যমে অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে। আবেদনের মেয়াদ আগামী ১৫ ডিসেম্বর। সরকারের নির্বাহী আদেশে আচমকা চালু হওয়া এ কার্যক্রমের উদ্দেশ্য, প্রক্রিয়া, বৈধতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে নানা মহলে নানা কথা হচ্ছে। পক্ষে-বিপক্ষে বাহাস হচ্ছে। সংবাদকর্মীদের চোখে এ উদ্যোগ ‘গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের নতুন হাতিয়ার’। আবার সরকারের যুক্তি ‘অনলাইনে শৃংখলা দরকার’। এরই মধ্যে সংবাদপত্রের এ দুই শীর্ষ সংগঠন নোয়াব (নিউজপেপারস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) ও সম্পাদকীয় পরিষদ ‘ছাপা পত্রিকার অনলাইন নিবন্ধন প্রয়োজন নেই’ মর্মে পৃথক বিবৃতি দিয়েছে। এ নিয়ে ১ ডিসেম্বর শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকরা তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তথ্য মন্ত্রণালয়ে বৈঠকও করেন। সেখানেও সম্পাদকরা ছাপা পত্রিকাগুলোকে এ নিবন্ধনের বাইরে রাখার জোর দাবি জানান। কার দাবি কতটা সঙ্গত?

এটা অস্বীকার করার জো নেই, অনলাইন পত্রিকা নিয়ে দেশে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা চলছে। ইন্টারনেটের উত্তুঙ্গ প্রসার ও প্রভাবে অনলাইন পত্রিকার এখন রমরমা বাজার। সার্চ দিলেই শত শত পত্রিকা। প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলো ছাড়া বেশিরভাগেরই মান ‘যাচ্ছে তাই’। তাদের অনেকের পুঁজি আবার প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার সংবাদের কাট-কপি-পেস্ট। নিয়মনীতি নেই। বিধি-নিষেধ নেই। হাব-ভাবে অনেকেই যেন ‘আমরা সবাই রাজা, আমাদেরই রাজার রাজত্বে’। তাই উদ্দেশ্য যা-ই হোক, নিবন্ধনের পেছনে অনলাইন সাংবাদিকতার এ ‘প্রকৃতি রাজ্যে’ শৃংখলা ফিরিয়ে আনার সরকারি যুক্তি পুরোপুরি অমূলক নয়।

বিপরীতে সংবাদপত্র সংগঠন বা সম্পাদকদের দাবিও ফেলনা নয়। কারণ- ১. ছাপা পত্রিকাগুলো প্রচলিত আইনে নিবন্ধিত ও ঘোষণাপ্রাপ্ত। অনলাইন সংস্করণ ছাপা পত্রিকারই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার জন্য নতুন নিবন্ধন কেন? ২. চলমান নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় ১৬ তথ্য সংবলিত আবেদনপত্র এবং সম্পাদক-প্রকাশকের ১০ রকম কাগজপত্র (TIN Certificate, Solvency Certificatemn) এবং প্রত্যয়নপত্র ও হলফনামা দাখিল করতে বলা হয়েছে। এ নির্দেশনা আইনানুগ প্রক্রিয়ায় নিবন্ধিত ও প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাগুলোর জন্য প্রচণ্ড হয়রানিকর। সরকার যদি বলত ‘ছাপা পত্রিকা নয়, এ নিবন্ধন কেবল অনলাইন পত্রিকাগুলোর জন্য প্রযোজ্য’; তাহলে এত তর্ক-বিতর্ক হতো না। হিসাব বা মনিটরিংয়ের স্বার্থে ছাপা পত্রিকাগুলোকে সরকার বলতে পারত, ‘আপনাদের অনলাইন সংস্করণের ডোমেইন নাম/টজখ আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের কাছে পাঠান’। তাতে কোনো সম্পাদকই হয়তো না বলতেন না।

নোয়াব ও সম্পাদকীয় পরিষদের বিবৃতির কয়েকটা বিষয়ের ব্যাখ্যা এখানে প্রাসঙ্গিক। বিবৃতিতে তারা ছাপা পত্রিকা এবং তার অনলাইনকে অভিন্ন সত্তা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একটি পত্রিকার ‘ছাপা সংস্করণ’ ও ‘অনলাইন সংস্করণ’- এ দু’য়ের বাস্তবিক বা প্রায়োগিক অবস্থান নিঃসন্দেহে অভিন্ন। কিন্তু আইনগত অবস্থান ভিন্ন। ‘ছাপা সংস্করণ’ আইনের চোখে সংবাদপত্র। আর ‘অনলাইন সংস্করণ’ সংবাদপত্র নয়। কারণটা সংবাদপত্রবিষয়ক আইনি কাঠামো। সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে ‘নিয়ন্ত্রণী’ (Regulatory) আইন ধরা হয় ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ঘোষণা ও নিবন্ধিকরণ) আইন, ১৯৭৩ এবং প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪।

এই দুই আইনে ‘সংবাদপত্র’ মানে, ‘গণসংবাদ বা গণসংবাদের ওপর মন্তব্য সংবলিত যে কোনো সাময়িকী ধরনের পত্রিকা এবং সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন আকারে সরকার সংবাদপত্র হিসেবে ঘোষণা করিতে পারে, এরূপ অন্যান্য শ্রেণীর মুদ্রিত সাময়িকী ধরনের পত্রিকাও সংবাদপত্রের অন্তর্ভুক্ত।’ অর্থাৎ সংবাদপত্র মানে মুদ্রিত পত্রিকা। ২৯ নভেম্বরের বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ ‘ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইনের আওতায় অনলাইন পরিচালিত হওয়াই যুক্তিসঙ্গত’ বলে মত দেয়। কিন্তু ওই আইনের প্রস্তাবনায় (preamble) বলা হয়েছে, ‘এটি প্রিন্টিং প্রেস রাখা, সংবাদপত্র মুদ্রণ ও প্রকাশনার ঘোষণা প্রদান এবং পুস্তক নিবন্ধিকরণের ব্যবস্থা সংবলিত একটি আইন।’ অর্থাৎ আইনটি পত্রিকার ‘ছাপা সংস্করণের’ জন্য, অনলাইন সাংবাদিকতা বা সংবাদপত্রের জন্য নয়।

আবার ২৪ নভেম্বরের নোয়াবের বিবৃতিতে, প্রচলিত আইন ও নীতিমালার আওতায় অনলাইন গণমাধ্যম পরিচালনার দাবি জানানো হয়। সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে চারটি আইনের উল্লেখ করা হয়- বাংলাদেশ ইনফরমেশন সিকিউরিটি পলিসি গাইডলাইন ২০১৩, ন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং পলিসি (এনবিপি) ২০১৪, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (সংশোধিত) আইন, সাইবার সিকিউরিটি আইন, ২০১৫ (খসড়া)। বলা হয়, ‘এসব আইনসহ ছাপা পত্রিকার জন্য প্রযোজ্য আইন ও নীতিমালাসহ অনলাইন গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে।’

আগেই বলেছি, ছাপা পত্রিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত আইনগুলো (দণ্ডবিধিসহ) অনলাইন পত্রিকার জন্য প্রযোজ্য নয়। এমনকি ইলেকট্রনিক মিডিয়াও তার বাইরে। অনলাইন বা টিভি সংবাদের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত যত মামলা হয়েছে, তার প্রায় সবটা তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ আইন, ২০০৬ (২০১৩ সালে সংশোধিত)-এর ৫৭ ধারায়। গুটিকয়েক হয়েছে পর্নোগ্রাফি আইনে। লক্ষণীয়, ছাপা সংস্করণের সংবাদে কারও মানহানি হলে সর্বোচ্চ সাজা ২ বছর। আর একই সংবাদের ‘অনলাইন কপি’ নিয়ে মামলা করলে তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সর্বোচ্চ সাজা ১৪ বছর। সঙ্গে কোটি টাকা জরিমানা। অর্থাৎ ছাপা পত্রিকা সম্পর্কিত আইনগুলোর বাইরে অন্য আইনে গেলে সাজার পরিমাণ অনেক বেশি। তাই অনলাইনের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি আইন বা এ ধাঁচের অন্য আইনে যাওয়ার ভাবনা কার্যত আত্মঘাতী হতে পারে।

সেক্ষেত্রে সবচেয়ে ‘সোনায় সোহাগা’ হয়, ‘সংবাদপত্রে’র সংজ্ঞাসহ প্রাসঙ্গিক ধারাগুলো সংশোধন করে শুধু অনলাইন পত্রিকা বা ছাপা পত্রিকার অনলাইন সংস্করণগুলোকে (ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ) বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল আইন বা ছাপাখানা ও প্রকাশনা আইনের আওতায় চলে আসা। এতে আরেকটি বড় সমস্যারও সমাধান হয়। ছাপা পত্রিকার অনলাইনে যা ছাপা হয়, তার সবটা প্রিন্ট সংস্করণে যায় না। শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর বহুল পঠিত বহু সংবাদ ছাপা সংস্করণে ঠাঁই পায় না। এমনকি অনলাইনে আজকের সর্বাধিক পঠিত খবরটি কিন্তু কালকে পত্রিকা খুলে নাও পাওয়া যেতে পারে। এমন ঘটনা ভূরি ভূরি।

তাছাড়া অনলাইনে যে সংবাদ ‘খাপখোলা তলোয়ার’, একই সংবাদ প্রিন্ট সংস্করণে ‘ঘোমটা পরা বধূ’। পাঠককে দ্রুততম সময়ে খবর দেয়ার তাগিদ অনেক সময় বস্তুনিষ্ঠ বা নির্ভুল খবর দেয়ার তাগিদকে হার মানায়। এসব ক্ষেত্রে, অনলাইনের জন্য বিষফোঁড়া তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির প্রতিকার কোথায়? অনলাইন ‘সংবাদপত্র’ হিসেবে স্বীকৃত হলে ওইসব ঝামেলারও ইতি ঘটে।

আবার নিবন্ধন প্রসঙ্গে ফেরা যাক। এটা কোনোভাবে পরিষ্কার নয়, সরকার কোন আইনে বা কিসের বলে এ নিবন্ধন কার্যক্রম চালাচ্ছে।

প্রস্তাবিত অনলাইন নীতিমালায় (জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা ২০১৫-খসড়া) একটি কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। ওই কমিশন সব অনলাইন পত্রিকার কর্মকাণ্ড সমন্বয়, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করবে।

সেখানে ‘অনলাইন গণমাধ্যম নিবন্ধন’ শিরোনামের অধ্যায়ের ২.১.২ অনুচ্ছেদে বলছে, নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট বিধি অনুসরণ করে অনলাইন গণমাধ্যমকে নিবন্ধিত করবে। বিদ্যমান অনলাইন গণমাধ্যমগুলো শর্তপূরণ সাপেক্ষে নিবন্ধিত হবে।

২.১.৪ অনুচ্ছেদ জানাচ্ছে, সরকার অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে নিবন্ধন প্রদানের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক, উন্মুক্ত, স্বতন্ত্র আইন/বিধিমালা প্রণয়ন করবে। এতে নিবন্ধন প্রদান পদ্ধতি, যোগ্যতা ও অযোগ্যতা, বাতিল ও অগ্রায়নের বিধান বর্ণিত থাকবে।

কমিশন নেই। ‘নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ’ নেই। নেই নিবন্ধন সংক্রান্ত বিধিমালা। সবটাই এখনও ‘কেতাবের গরু’। অথচ এদিকে নিবন্ধন চলছে?

এটা ঠিক, আইন/বিধিমালা হওয়ার আগ পর্যন্ত তথ্য মন্ত্রণালয় নিবন্ধন বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে (অনু-২.১.৫)। কিন্তু যে নীতিমালার ভিত্তিতে এ নিবন্ধনযজ্ঞ, খোদ সেই নীতিমালাই এখনও মাতৃগর্ভে- কী সেলুকাস? এ যেন মায়ের আগে বাচ্চার আকিকার আয়োজন!

তবুও ধরে নিলাম, সব সই। তারপর কী? তথ্য অধিদফতরের তথ্য বিবরণী আবেদন প্রক্রিয়া নিয়ে সরব। কিন্তু আবেদন-পরবর্তী প্রক্রিয়া নিয়ে নীরব। তাতে নিবন্ধন পাওয়ার যোগ্যতা/অযোগ্যতা/শর্ত, আবেদন নিষ্পত্তি বা নিবন্ধনপত্র পাওয়ার সময়সীমা, আপিল- কিছুই বলা নেই। সরকারের খোশ খেয়ালই কি তবে এখানে আইন? অনলাইনের হ-য-ব-র-ল দশা ঠেকাতে সরকার যে হ-য-ব-র-ল কার্যক্রম শুরু করেছে তাতে সরকারের ‘অনলাইন পত্রিকা প্রকাশকদের সরকারি সুযোগ-সুবিধা দান ও অপসাংবাদিকতা রোধের’ উদ্দেশ্য দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আশা করি সরকারের বোধোদয় হবে, শুভ কাজে শুভবুদ্ধি জাগ্রত হবে।

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট।
aftabragib@yahoo.com
সৌজন্যে: যুগান্তর