ঐক্যের প্রতীক সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাব

Tuesday, 22/09/2015 @ 10:26 am

:: জিল্লুর রহমান পলাশ ::

SAMSUNG CAMERA PICTURESসংবাদকর্মী ও সাংবাদিকদের সম্মিলন কেন্দ্র হচ্ছে প্রেসক্লাব। পেশাদার সাংবাদিকদের মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে একটি প্রেসক্লাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এটাই স্বাভাবিক। প্রেসক্লাব হবে দলমত নির্বশেষে একটি ঐক্যের মিলন কেন্দ্র। তা না হলে সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার সুরক্ষা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি দেশের কল্যাণে ভূমিকা রাখাও সম্ভব হবে না।

কিন্তু যুগ যুগ ধরে দেখে আসছি প্রেসক্লাবের সাংবাদিকদের মধ্যে মত বিরোধ ও দ্বন্ধ। আর এই মতবিরোধ ও দ্বন্ধের কারণে সাংবাদিকদের রয়েছে প্রেসক্লাব নিয়ে বিভক্তি। বিভক্তির এক পর্যায়ে সাংবাদিকের মধ্যে উত্তেজনা, অস্থিরতা ও অরাজকতা শুরু হয়।

এরপর শুরু হয় প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটি ভেঙে আরেকটি নতুন প্রেসক্লাব। নতুবা সাংবাদিকরা প্রেসক্লাব, ইউনিটি, ফোরামসহ বিভিন্ন নামে সৃষ্টি করেন একাধিক সংগঠন। জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু করে বিভাগীয়, জেলা শহর ও উপজেলা শহরের প্রেসক্লাবগুলোতে রয়েছে সাংবাদিকদের বিভক্তি ও দলবাজি। এ কারণেও সাংবাদিকরা বিভিন্ন মেরুতে বিভক্ত হয়ে একাধিক প্রেসক্লাব করছেন।

আমার দেখা কোন কোন জেলা বা উপজেলাতে একটি বা দুটি নয়, তিন-চারটি প্রেসক্লাব ও বিভিন্ন নামের সংগঠন রয়েছে। এছাড়া জেলা ও উপজেলায় সাংবাদিকদের মধ্যে এখন কোন প্রকার ঐক্য নেই। ফলে সাংবাদিকরা আজ বিভিন্ন মেরুতে বিভক্ত। সেই সঙ্গে সাংবাদিকরা এখন একে অন্যর প্রতিহিংসার শিকার হচ্ছেন।

১৯৯৯ এ সাংবাদিকতা শুরুর পর থেকে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলায় সাংবাদিকদের সাংগঠনিক বিষয়ে সমন্নয় দেখেছি কিন্তু স্থিতিতিভাবে এ সমন্নয় দীর্ঘদিন থাকেনি। এক শ্রেণীর সুবিধাবাদীরা সাংবাদিকতার মনোভাব বেছে নিয়ে প্রকৃত সাংবাদিকদের বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলছে। এ কারণে বিভাগীয় শহর থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের মধ্যে বিরোধ থাকায় রয়েছে একাধিক সংগঠন।

তবে এরমধ্যে শুধু ব্যতিক্রম গাইবান্ধা জেলার ‘সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাব’। প্রেসক্লাবটি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। যদিও সাদুল্যাপুর উপজেলাতেও এক সময় সাংবাদিকদের দুটি প্রেসক্লাবসহ একাধিক সংগঠন ছিল। মুলত ২০১১ সালে সাগর-রুনির হত্যাকান্ডের বিচার নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্যর সৃষ্টি হয়। ওই সময়ে সাংবাদিকরা সকল দ্বন্ধ, বিরোধ ভূলে ও সকল সংগঠন বিলুপ্তি ঘোষণা করে ঐক্যতার ভিত্তিতে একটি প্রেসক্লাবে অবস্থান শুরু করেন। বর্তমানে সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাবের নিজস্ব ভবন হয়েছে। সুন্দর, মনোরম ও পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে প্রেসক্লাবকে।

সেই সাথে সাংবাদিকদের মধ্যে রয়েছে যথেষ্ট ঐক্যবদ্ধতা। নীতি-নৈতিকতার মধ্যে দিয়ে এখানকার সাংবাদিকরা প্রেসক্লাবকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করতে কাজ করছেন। প্রেসক্লাবে সদস্য সংখ্যা মাত্র ২০ জন। এরমধ্যে ১০ থেকে ১২ জন রয়েছেন দেশের প্রথম শ্রেণির জাতীয় পত্রিকার প্রতিনিধি। এমনকি এখানকার একজন সাংবাদিকও কোন রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত নেই।

অনেক প্রেসক্লাবে ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন নিয়ে চরম উত্তেজনা ও দ্বন্ধের সৃষ্টি হয়। কিন্তু ‘সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাবের’ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনে নেই কোন বিরোধ বা দ্বন্ধ। এছাড়া পদ নিয়ে নেই কাড়াকাড়ি। দুই বছর মেয়াদী ব্যবস্থাপনা কমিটি পর্যায় ক্রমে হচ্ছে উন্মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে। ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠনে কোন ইলেকশন হয়নি, এমনকি ভবিষ্যতেও হবে না বলে অঙ্গীকার বদ্ধ রয়েছেন সাংবাদিকরা। এছাড়া প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে প্রতি বছর জাতীয় দিবস ও বিশেষ দিন যথাযথভাবে পালন ও সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে প্রেসক্লাবের উদ্যোগে সমাজের অসহায়-দুস্থদের মাঝে সাহায্যে সহযোগিতা প্রদান করে আসছে।

পাশাপাশি প্রেসক্লাবের সদস্যদের মধ্যে সর্বদা একটা পারিবারিক সৌহাদ্য, সম্প্রীতি ও সুহৃদ বন্ধন রয়েছে। এসব দেখে নিজেকে খুব ভালো লাগে। ভিতরে সর্বদাই আত্মসম্মান জাগে। আসলে আগে বুঝিনি ঐক্যবদ্ধ প্রেসক্লাবের গুরুত্ব কত। শুধু জেলা নয়, এখন উত্তরের আট জেলার মধ্যে ‘সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাব’ অনেকটা ঐক্যের প্রতীক হিসেবে সর্ব মহলে সুনাম কুড়িয়েছে।

‘সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাবের’ মতো এমন একটি ঐক্যবদ্ধ প্রেসক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থেকে নিজেকে গর্বিত মনে করি। তাও আবার প্রেসক্লাবের গুরুত্বপূর্ণ পদে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমরা সকলে চাই ঐক্যবদ্ধ থেকে ‘সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাবকে’ সারাদেশের মধ্যে একটি মডেল প্রেসক্লাবে রুপান্তর করতে। আল্লাহ চাইলে আগামীর একটি সম্ভাবনা হবে ‘সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাব’। যা সারাদেশের সকল প্রেসক্লাব ও প্রেসক্লাবের সাংবাদিকরা সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাবকে অনুসরণ করবে।

কিন্তু মাঝে মাঝে ভয় হয়, যে দেশের জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকদের মধ্যে কোন ঐক্য নেই, সেখানে তৃণমূল পর্যায়ে এর বেশি কী আর আশা করা যায়। তবু আশা করি, দেশের সকল প্রেসক্লাবে ঐক্যতা ফিরে আসুক। কারণ ঐক্যবদ্ধ প্রেসক্লাবের বিকল্প নেই।

গণমাধ্যমের পরষ্পর রেসারেসি, অশ্রদ্ধা ও হলুদ সাংবাদিকতার কারণে অনেক সময় মানুষের মনে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। এখন জরুরীভাবে প্রয়োজন সাংবাদিকদের চেইন অব কমা- প্রতিষ্ঠা করা। দেশের সকল প্রেসক্লাবকে ঐক্যবদ্ধভাবে সাজানো উচিত।

কারণ গণমাধ্যমের দুঃসময় আরও ঘণীভূত হচ্ছে। কিছু দানব গণমাধ্যমকে গিলে খাচ্ছে। এখনই যদি গণমাধ্যমের চেইন অব কমা- প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না হয় তবে গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠতার প্রতি অনাস্থা তৈরি হতে পারে। সাংবাদিকদের গৌরব, আতœমর্যাদা ও অধিকার ফিরিয়ে আনতে হলে ঐক্য অত্যাবশ্যক।

এখন শুধু সময়ের দাবী, সাংবাদিকদের দল-মতের ঊদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অতীতের মত দেশের প্রয়োজনে সাংবাদিকদের গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ প্রক্রিয়া যত দ্রুত সম্ভব শুরু করতে হবে। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে সাংবাদিকদের অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

লেখক: জিল্লুর রহমান পলাশ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি, দৈনিক যায়যায়দিন ও দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম। সাধারণ সম্পাদক, সাদুল্যাপুর প্রেসক্লাব।