শুভ জন্মদিন তোয়াব ভাই

Friday, 24/04/2015 @ 9:42 am

:: ফজলুল বারী ::

toabআজ ২৪ এপ্রিল। তোয়াব খানের ৮২ তম জন্মদিন। নট আউট ৮২! ইনি সাংবাদিক তোয়াব খান। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ ব্যক্তিত্ব। জীবিত কিংবদন্তী একজন! দৈনিক সংবাদের মাধ্যমে সাংবাদিকতা শুরু করেন ১৯৫৫ সালে। সে হিসাবে তার সাংবাদিকতার বয়স ছয় দশকের!

দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক বাংলা’র গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্বে ছিলেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেস সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রেস সচিব ছিলেন রাষ্ট্রপতি এরশাদের। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের। দেশের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা, পিআইবির মহাপরিচালক ছিলেন। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দৈনিক জনকন্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক। চিন্তায় মননে এখনো ৮২ বছরের এক তরুন! প্রতিদিন ঘড়ির কাঁটা ধরে সকালে-বিকালে দু’বার অফিসে আসেন। রিপোর্টিং-সম্পাদকীয় বৈঠকে নেতৃত্ব দেন!

জনকন্ঠের জন্যে তৈরি এবং প্রকাশিত প্রতিদিনের প্রতিটি শব্দ নখদর্পনে থাকে তার! এ এক আশ্চর্য কর্মবীর একজন! আবার জনকন্ঠ কর্মীদের সকল প্রাপ্তির আনন্দ, না প্রাপ্তির ক্ষোভ অথবা অভিমানও তাকে ঘিরে!

তার জন্ম সাতক্ষীরার গ্রামে। পড়াশুনা করেছেন সাতক্ষীরা এবং কলকাতায়। ছাত্র জীবনে জড়ান বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে। সাংবাদিকতায় এসে যাদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন তাদের অনেকে জড়িত ছিলেন বাম ধারার রাজনীতির সঙ্গে। এই লোকজনের হাতে এবং নেতৃত্বে ঢাকার মিডিয়ার প্রগতিশীল ধারার সৃষ্টি এবং বিকাশ। সংবাদ কর্মী হিসাবে এরা পরবর্তিতে অসহযোগ আন্দোলন সহ স্বাধীনতার আন্দোলনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখেন। যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সক্রিয় কর্মী হিসাবে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখেন মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক, আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক মানুষ একজন তোয়াব খান।

মুক্তিযুদ্ধের পর ঢাকা ফিরে এসে যোগ দেন দৈনিক বাংলায়। সেখান থেকে তাকে নিজের প্রেস সচিব হিসাবে বেছে নেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের জাতির জনক রাষ্ট্রপতির প্রেস সেক্রেটারি হিসাবে ইতিহাসের অনেক কিছুর সাক্ষী তিনি। সে কারনে জিয়ার রাজনৈতিক উত্থানেরও নানা বিষয় তার নখদর্পনে। রাষ্ট্রপতি এরশাদ আর বাংলাদেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিনের প্রেস সেক্রেটারি থাকায় তৎকালীন নানান রাজনৈতিক টানাপোড়েন বৃত্তান্ত তার মতো কেউ জানেন না!

সেই তোয়াব খান পরবর্তিতে আবার ফিরে এসেছিলেন তার দীর্ঘদিনের কর্মক্ষেত্র দৈনিক বাংলায়। আবার দৈনিক বাংলা থেকে তিনি চাকুরিচ্যুতও হন। যোগ দেন এসে দৈনিক জনকন্ঠে। তার হাতে বেরোয় বাংলাদেশের প্রথম চার রঙ্গা দৈনিক জনকন্ঠ, যা এক সময় ঢাকা সহ দেশের পাঁচটি শহর থেকে একসঙ্গে বেরুতো! তখন প্রচার সংখ্যায় সর্বশীর্ষে পৌঁছা জনকন্ঠ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন দেশের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে দিতে, ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে। এরজন্যে বিএনপি-জামায়াতের ক্রোধের শিকার হয় জনকন্ঠ।

১৯৯১-১৯৯৬ মেয়াদের বিএনপি সরকার তার ও জনকন্ঠের কর্নধারদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে হয়রানি করে। ২০০১ সালে ক্ষমতায় ফিরে সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ সহ জনকন্ঠকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দেয় বিএনপি-জামায়াত সরকার! জনকন্ঠের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতের বেজায় রাগের কারন জনকন্ঠে প্রকাশিত ও পরবর্তিতে বই হিসাবে বিপুল বিক্রিত ‘তুই রাজাকার’ শিরোনামের অনুসন্ধানী সিরিজ প্রতিবেদন ও বই। আজ যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, ট্রাইব্যুনালের রায়ে যাদের ফাঁসি হয়েছে এবং যারা ফাঁসির অপেক্ষায় তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমানের অন্যতম এনসাইক্লোপিডিয়া জনকন্ঠের এই ‘তুই রাজাকার’! জনকন্ঠের সঙ্গে জড়িতরা জানেন এই বিশাল কাজটি হয়েছে তার আইডিয়ায় এবং তত্ত্বাবধানে। তাতে জামায়াত-বিএনপি যে খুশি হবার নয় সেতো সোজা হিসাব।

এবার তার সঙ্গে কাজের একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি। তোয়াব ভাই একবার সিদ্ধান্ত নিলেন সারা বছর ধরে জনকন্ঠের কোন না কোন একজন সাংবাদিক বিদেশে থাকবেন। অন্য যে কোন পত্রিকার চাইতে জনকন্ঠে একটা আলাদা স্বাদ রাখার চিন্তায় তার সে সিদ্ধান্ত। সে উদ্দেশে ফিলিস্তিনের উদ্দেশে আমাকে একবার মিশর-জর্দানে, রেজোয়ানুল হককে আফ্রিকায় পাঠানো হয়। ফিলিস্তিনের ভিসা কর্তৃপক্ষ ইসরাইল। বাংলাদেশের সঙ্গে ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকায় বাংলাদেশের একজন সাংবাদিককে ইসরাইল ভিসা না দেয়াতে আমি তখন ফিলিস্তিনে ঢুকতে পারিনি।

মিশর-জর্দানের সীমান্ত এলাকায় থেকে ফিলিস্তিনের সংবাদ সূত্রগুলোর সাহায্য নিয়ে সেখানকার ইন্তিফাদা পরিস্থিতির রিপোর্ট করতে হয়েছে। তখন জনকন্ঠ বা ঢাকার কোন পত্রিকার অনলাইন বা ওতেবসাইট ডেভলপ করেনি। তাই পাঠানো রিপোর্ট পত্রিকায় কিভাবে ছাপা হচ্ছে তা দেখার সুযোগ ছিলোনা। তোয়াব ভাই তখন প্রতিদিন রাতে অফিস থেকে বাসায় যাবার আগে ফোন করতেন আমার হোটেলে। আজকের রিপোর্ট কেমন হয়েছে, কী ট্রিটমেন্টে ছাপা হয়েছে, পাঠক প্রতিক্রিয়া কী, কাল কী রিপোর্ট করা যেতে পারে এসব নিয়ে বিশদ কথা বলতেন ফোনে। এরজন্যে রিপোর্ট নিয়ে কোন অন্ধকারে থাকতে হয়নি।

এছাড়া পিতার মতো প্রতিদিন খোঁজ নিতেন ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধার। রিপোর্টের পিছনে টানা তিন মাস মিশর-জর্দানের শহরে শহরে ঘুরে বেড়াতে গিয়ে আমার হাতের টাকা ফুরিয়ে এসেছিল। তখন সেখানে আমার জন্যে বাড়তি টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। তার সঙ্গে যারা কাজ করেছেন এমন নানা অভিজ্ঞতা নানাজনের। তার সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও যে কোন রিপোর্টারের বিরল সৌভাগ্যের। কারন তিনি যে জীবন্ত এক কিংবদন্তী বাংলাদেশের সাংবাদিকতার। তার জন্মদিনে এ লেখাটির উদ্দেশ্য তাকে শুভেচ্ছা-শ্রদ্ধা জানানোর। শুভ জন্মদিন তোয়াব ভাই। সুস্থ থাকুন। শতায়ু হোন। আর আমাকে যে কথা দিয়েছিলেন তা মনে আছেতো? কথা দিয়েছিলেন আপনার সাংবাদিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখবেন। সে লেখার অগ্রগতি কদ্দুর?

একটি দূ:খ অথবা দূর্ভাগ্য উল্লেখ করে এ লেখাটি শেষ করছি। প্রতিবছর সাংবাদিকতার জন্যে বাংলাদেশের এক বা একাধিক সাংবাদিককে স্বাধীনতা পদক-একুশে পদক দেয়া হয়। কিন্তু স্বাধীনতার গত ৪৪ বছরে কোন সরকার এই বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিককে স্বাধীনতা অথবা একুশে পদকের জন্যে উপযুক্ত মনে করেনি! এ লজ্জা তোয়াব খানের নয়।সরকারগুলোর। দলবাজি আর তদবির করে যারা এসব পদক নেন তাদের। আমাদের প্রিয় তোয়াব ভাই এসব দলবাজি-পদকের উর্ধে। তার সৃষ্টির মাঝে তার সম্মান। পদক দিয়ে বা বঞ্চিত করে সে সম্মান ক্ষুন্ন করতে পারবেনা কেউ।

সূত্র: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারীর ফেসবুক ওয়াল থেকে লেখাটি নেয়া হয়েছে।